শুক্রবার, ৪ জুলাই, ২০১৪

ভুবনমোহিনী ভুটান ভ্রমণ

৭ই জুন ২০১০, কোলকাতা ছেড়েছি, এসেছি প্রথমে ফ্লাইটে বাগডোগরা ও সেখান থেকে একটা গাড়ি নিয়ে আমরা চারজন মিলে রওনা দিয়েছি ভুটানের পথে । চারজন বলতে আমার স্বামী পৃথ্বীশ, ছেলে রাহুল, আমার শাশুড়ি মা আর আমি । কোলকাতা থেকে সবকিছু ব্যবস্থা করেছেন আমাদের ট্র্যাভেল এজেন্ট ইউনিকর্ন । কোলকাতার বহু প্রতিক্ষীত মৌসুমি বায়ু আর তার দোসর বর্ষা সুন্দরী অবশেষে আমাদের পিছু নিল । প্রথম বর্ষা ধুয়ে দিল ফুন্টশোলিং যাবার রাস্তা, মহানন্দার শুষ্ক কোলে তখন চরা পড়ে..দুচোখের চাহনিতে প্রখর তাপের রুক্ষতা । মনমরা মহানন্দায় বৃষ্টির আশির্বাদ ঝরে পড়ল । তারপরে বাঁদিকে তিস্তার কোল ঘেঁষে আর ডানদিকে পাহাড়কে ছুঁতে ছুঁতে গাড়ি ছুটে চলল ...কখনো তিস্তার অববাহিকায় বৃষ্টি নেই কখোনো চা বাগানের আঙিনায় গোধূলির কনে দেখা মেঘ চা পাতার ওপরে রঙ খেলছে । যাই হোক রোদ-বৃষ্টির এই লুকোচুরি খেলার সাথেসাথে পেরোলাম আমাদের ছোট নদী , বড় নদী, আরো নদী..ড্রাইভার বন্ধুটির কাছ থেকে নাম জানলাম সব চিল, মাঝালি, চেইল, মুরতি নদী রা আমাদের পথ দেখাল । বিকেলের শেষে তরাইয়ের জঙ্গলমহল পেরিয়ে ডুয়ার্সের রাজকীয় করিডোর পেরোলাম আমরা । আবার নদী! খরস্রোতা ডায়নায় তখন জল থৈ থৈ ! ঝিরিঝিরি বৃষ্টি তখন ডায়নার বুকে নাচ করে চলেছে| সুয্যি ডোবার মূহুর্তে আমরা চা খেলাম সিঙারা সহযোগে। কিছু পরেই ভুটানগেট, এ প্রান্তে ভারত ও প্রান্তে ভুটানের ফুন্টশোলিং শহর ; ফুন্টশোলিং এ রাত কাতালাম সেন্টিনিয়াল ২০০৮ হোটেলে নাতিশিতোষ্ণ জলবায়ু রাতে চিকেন হীন চাইনিজ খেলাম চিলি মাটন এর সাথে । বার্ড ফ্লু' র জন্য ভুটানের রাজার আদেশ, চিকেন ব্যান্ড সমগ্র ভুটানে !!! ভোরে উঠেই পাহাড় পাহাড ছবি, দুচোখে মেখেনিলাম, প্রথম বর্ষার গন্ধমাখা, বৃষ্টিগন্ধ পাহাড়ের গায়ে;


৮ইজুন ভোরে হোটেলে পুরী-সবজী দিয়ে ব্রেকফাস্ট ও গরম চা খেয়ে আমরা গেলাম Royal Government of Bhutan এর immigration Office.যেখানে বহিরাগতদের জন্য পরিচয়পত্র দেখে ফোটো তুলে ভুটান শহরে প্রবেশের ভিসা প্রদান করা হয় । প্রথমে আবেদন করলাম আমরা চারজনে পারমিটের জন্য ঘন্টা খানেক পরে অনুমতি পত্র হাতে পেয়ে আবার চললাম ভুটানের রাজধানী থিম্পুতে । ফুরিয়ে গেল ফুন্টশোলিং !
মেঘের কোলে রোদ আর রোদের গায়ে মেঘের উড়নিকে সঙ্গে করে মেঘের মধ্যে দিয়ে আমাদের গাড়ি চলতে লাগল । পথে পড়ল ল্যান্ডস্লাইড। চড়াই-উতরাই দুর্গম এই পথ । একধারে গভীর খাদ অন্যধারে পাহাড়ের গা । এই সব বন্ধুর পথে আমাদের গাড়ির গতি কিছুটা কমে গেল। পাগলা ঝোরা দের কলকল হাসিভুলিয়ে দিল পথের বন্ধুরতা। পাহাড় গুলো যেন আরো সবুজ হতে শুরু করেছে এর মধ্যে। আর বৃষ্টির জল পেয়ে নানারকম ফুলেরা কথা বলে উঠল। আমরা পাহাড়ের ওপরে আর মেঘেরা ততক্ষণে আমাদের নীচ দিয়ে ভেসে চলেছে । পথেই পড়ল তরুণী তোর্সা । কি অপূর্ব তার রূপ লাবণ্য ! তোর্সা তবুও নবযৌবনা । ছোট্টবেলার ভূগোল ব‌ইয়ের সেই তোর্সা আমার ! আপন খেয়ালে তরঙ্গায়িত তোর্সার জলোচ্ছ্বাস নুড়িপাথরকে অবিরত চুম্বন করে চলেছে । সেই দৃশ্য দেখতে দেখতে তোর্সা নেমে চলে গেল আমাদের নীচে। তখন কোনিফেরাস আর ডেসিডুয়াস বৃক্ষরাজি আমাদের অভিবাদন জানাল । মেঘের বাড়ি, মেঘের বাড়ি আর মেঘের বাড়ি পথ দেখা যায়না পথ চলা ই দায় । ইতিমধ্যে তাপমাত্রা কমতে শুরু করেছে । তখন ১৪ ডিগ্রি সেল্সিয়াস । পথে টেক-চেইন জ্যাম নদী আর চুখা নদী যার ওপর বিখ্যাত চুখা হাইডেল পাওয়ার প্ল্যান্ট। বুনাগায়ে চিজ মোমো দিয়ে লাঞ্চ সারলাম । আবার নদী। রাজার নামে ওয়াংচু রিভার, সাথে রোদ ঝলমলে আকাশ | বিকেল ৪টের সময় ঝকঝকে রৌদ্র করোজ্জ্বল আকাশ আর মেঘ্মুক্ত বৃষ্টিহীন বাতাস নিয়ে পৌঁছালাম থিম্পুতে । 


রাজধানী শহর থিম্পু ইস্টার্ণ হিমালয়ের কোলে সাজানো ঝকঝকে শহর, উচ্চতা প্রায় ৮০০০ ফুট । জুনের ঠান্ডা কোলকাতার ডিসেম্বরের শুরুর মত অতি মনোরম। ৯ইজুন সকালবেলায় মেঘমুক্ত আকাশকে সঙ্গে করে হোটেলে ব্রেকফাস্ট সেরে আবার আমরা বেরিয়ে পড়লাম থিম্পুর দর্শনীয় স্থান গুলি দেখতে । প্রথমেই গেলাম একটি মেমোরিয়ালে। ১৯৭৪ সালে যেটি বানিয়েছিলেন রাজা ওয়াংচুর মা । ওয়াংচু মাত্র ৪৫ বছরেই মারা যান তাই তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে তার মা এই বিশাল বুদ্ধ মন্দির টি বানিয়ে দেন । সেখান থেকে গেলাম টেক্স্টাইল মিউজিয়াম , ভুটান হ্যান্ডিক্রাফটস এম্পোরিয়াম । অসাধারণ ক্রাফটম্যানশিপ, নিখুঁত , দৃষ্টিনন্দন সব আর্টিফ্যাক্টস কিন্তু দাম আমাদের নাগালের বাইরে। জানিনা ইউরোপিয় টুরিস্টদের ভীড় বলে জিনিসের দাম এত বেশী কিনা । কিন্তু সাধ ও সাধ্যের নাগালে কোনো জিনিসই কেনার মত খুঁজে পেলাম না সেখান থেকে আমরা গেলাম সারবেথাং এ বোটানিকাল গার্ডেন এ । কিছুক্ষণ ফুল, আর গ্রিন হাউসে সময় কাটল । খুব সুন্দর করে সাজানো এই গার্ডেন ; আমাদের শিবপুর বোটানিকাল গার্ডেনের মত বিশালতা নেই তবে বেশ কিছু নাম না জানা ফুল দেখলাম । সেখান থেকে গেলাম পেন্টিং এন্ড স্কাল্পচার স্কুল দেখতে। কলেজের ছাত্ররা তাদের ওয়ার্কশপে বানাচ্ছে কাঠের তৈরি বিখ্যাত ভুটান মাস্ক, ড্রাগন ইত্যাদি। ধৈর্য আর নৈপুন্যের সঙ্গে বানাচ্ছে ও শিখছে তারা । কোথাও স্কাল্পচারের ক্লাস হচ্ছে । তারা মূর্তি বানাচ্ছে মোম ও ধাতু দিয়ে । হোটেলে ফিরে লাঞ্চ সেরে একটু নেট ব্রাউসিং এর সময় পেলাম যদিও খুব কম সময় তার মধ্যেই আগের দিনে লিখে রাখা আমার ট্র্যাভেলগ  আপডেট করলাম । একটু রেস্ট নিয়ে ই আবার বিকেলের হালকা রোদ কে সাথী করে গেলাম টাকিন প্রিসার্ভে। টাকিন ভুটানের জাতীয় পশু । একে গোট এন্টিলোপ বলে । শাকাহারি এই পশুটি ছাগল ও গোরুর মাঝামাঝি কিন্তু কান দুটো বিশাল আর গায়ে সোনালী লোম । ঘন পাইন বনের ওপোরে তাদের রাখা হয়েছে, উঠলাম সেখানে আর তার ছবিও নিলাম । 

তারপর গেলাম পাহাড়ের মাথায় থিম্পু ভিউপয়েন্টে একঝলকে থিম্পুর মনোরম ভিউ দেখলাম । সব শেষে একটি বুদ্ধিস্ট মনাস্ট্রিতে । পাহাড় থেকে নেমে এসে হেঁটে ঘুরলাম থিম্পু ডাউনটাউন । রাতের খাওয়া সারলাম বিখ্যাত এক সুইস বেকারীতে । এটি মিড সেভেনটিস এ তৈরি হয়। এখনো ঠাটটি বজায় আছে। আমাদের কোলকাতার ফ্লুরিস এর কথা মনে করিয়ে দেয়। অতি সুস্বাদু সব স্যান্ডুইচ, প্যাটি আর কেক দিয়ে ডিনার সারলাম । রাতে হোটেলে ফিরে পরদিন যাবার তোড়জোড় শুরু হল। 

১০ই জুন স্নান ও প্রাতরাশ সেরে থিম্ফুর ফুন্টশোপেলরি হোটেলকে বিদায় জানিয়ে, পুনাখা ও ওয়াংডু শহরের পাস হাতে নিয়ে সাড়ে দশটা নাগাদ আমরা রওনা দিলাম পুনাখার পথে। এতক্ষণ একটা কথা বলতেই ভুলে গেছি, আমাদের ভারতীয় সময়ের সাথে ভুটানের ব্যাবধান আধঘন্টার । ভুটান এগিয়ে আছে এই একটা বিষয়ে । পুনাখার পথে পড়ল দোছুলা পাস, বেশ সুন্দর রমনীয় স্থান এটি। আরা পড়ল ওয়াংডি চু , বাতা চু নদী । "চু" শব্দটির অর্থ হল জল । গাড়ি ততক্ষণে নীচে নামতে শুরু করেছে । নদীর ওপরে লম্বা লম্বা গাছের থেকে ঝুলছে সার সার রঙিন ধ্বজা বা পতাকা যার ওপরে পালি স্ক্রিপ্টে লেখা তিব্বতীদের ধর্মের বাণী । আকাশে , বাতাসে মিশে যাচ্ছে সেই সব ধর্মের অমোঘ কথা, শান্তির বাণী, আদার্শতার কথা, অহিংসার কথা ; নদীর জল, বাতাস সেই বাণীর ধারক ও বাহক ...এই তাদের বিশ্বাস ! লোবেসা নামক গ্রামে পৌঁছে আমরা লাঞ্চ সারলাম থুকপা এবং চিজ মোমো দিয়ে । এবার আবার চলার পালা । কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছালাম পুনাখাতে। 

পুনাখার কাছেই ওনাখা গ্রামে পুনাটাংচু নদীর ধারে মনোময় কটেজ ; আমাদের হোটেলের নাম জাংডো পেলরি । নদীটি বিশাল লম্বা । আমাদের বারান্দায় বসে নদী দেখা যায় । পুনাখায় ঠান্ডা খুব কম । দুপুরে একটু বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে হেঁটে গেলাম নদীর ধারে। পাহাড়ের কোল আলো করে নদী অনর্গল বয়ে চলেছে নিজের খেয়ালে, গেয়ে চলেছে অবিরাম । স্বচ্ছ নদীর জলের ওপরে ছোট্ট ছোট্ট ঊর্মিমালারা কুঁচি দুলিয়ে নেচে চলেছে | সাদা বালির চর সাদা নুড়ি পাথরের সমাবেশ দেখে বুঝলাম বর্ষায় এই চর জলে থৈ থৈ করে। নদীর অতিশীতল জলে পা ডোবালাম । ভুটানে আসা পর্যন্ত চিকেনের সাথে আড়ি চলছে বলে রাহুল একটু মনমরা হয়েছিল কিন্তু নদীর জলে নামতে পেরে সে দুঃখটা ভুলে গেল ! রাতের খাওয়া সারলাম হোটেলে আজ টিপিক্যাল ভুটানিজ কুইজিন খেলাম । এসপারাগাস স্যুপ, এমা ডাটসি( লম্বা লম্বা কাঁচা লঙ্কা ও চিজ দিয়ে বানানো) , সামু ডাটসি (মাশ্রুম উইথ চিজ ) আর চাউমিন দিয়ে | পুনাখায় দিন বড় তাই সন্ধ্যে নামল রাত আটটায়। ডিনার খেয়ে এসে কটেজের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূর থেকে নদীর ধারে, পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট বাড়ির সব আলো জ্বলা দেখে মনে হোল
"তোমার সবুজ অন্ধকারে জোনাক জ্বলে ঘরে ঘরে,
নদীর সুরে সুর মিলিয়ে আমি এলাম তোমার দ্বারে
পাহাড় তোমার মাদকতায়, নদীর স্রোতের উচ্ছলতায়
পেলাম তোমায় আবার আমি আপন করে নতুন করে" 

১১ইজুন ভোরে কোনো তাড়া নেই । আমরা ব্রেকফাস্ট সেরে বেরুলাম ন'টা নাগাদ । প্রথমে গেলাম নেচার পার্কে স্থানীয় একটি স্কুল সেটি মেনটেন করে । পো চু এবং মো চু নদীর কনফ্লুয়েন্সে (সঙ্গম স্থল) তৈরী বিশালাকার দুর্গ যার নাম পুনাখা জঙ। এই জঙ বা Dzongএর অর্থ হল দুর্গ । পুনাখা জঙ তৈরী হয়েছিল গুরু রিংপোচি র ভবিষ্যত বাণী অনুযায়ী । গুরুর কথা অনুযায়ী এই দুর্গটি তাঁর কাল্পনিক বসত বাটি জ্যাংটোপেলরির অনুকরণে তৈরী । জ্যাংটোপেলরির অর্থ হল copper clad mountain তাই সেই কথা মাথায রেখে বানানো ; স্থাপত্য শিল্পের এক অসাধারণ এবং অভাবনীয় রূপ দেখলাম এই দুর্গে। পো চু আর মো চু নদীর দোয়াবে অবস্থিত এই দুর্গে আছে ভুটান সরকারের অফিস, গুরু রিংপোচির সমাধি আর বুদ্ধের ৩৩ ফুট লম্বা একটি মূর্তি । ভুটানের রাজার তথা সরকারের দুটি সমান্তরাল ভূমিকা আছে। একদিকে তিনি দেশের রাষ্ট্র নেতা এবং দেশ সামলান ও অন্যদিকে তিনি সমগ্র দেশের ধর্মীয় গুরু ( যদিও এখন তিনি চেষ্টা করছেন ভ্যাটিকান মডেল ছেড়ে ইংল্যান্ডের গণতান্ত্রিক মডেল দেশে আনার ) এই রাষ্ট্রীয় শাসন ব্যবস্থার দ্বিভাজন পরিষ্কার বোঝা গেল পুনাখা জং এ প্রবেশ করে । নদীর ওপোরে কাঠের সেতু পেরিয়ে জং এর প্রবেশ দ্বার । সেখান দিয়ে ঢুকে একধারে সারেসারে সরকারি অফিস অন্যধারে বিশাল বুদ্ধের মন্দির আর মধ্যিখানে গুরুর সমাধি ক্ষেত্র । দুর্গ তথা মন্দিরের রাজকীয় দরজা গুলি বহুধাতুর সমন্বয়ে নির্মিত এবং মন্দিরের দেযালে কাঠের ওপরে রংবেরংয়ের চিত্রকল্প অতীব দর্শনীয়।

ফিরে এসে আবার গাড়ি করে গেলাম পোচু নদীর ওপর ভুটানের সবচেয়ে দীর্ঘতম হ্যাংগিং ব্রিজ যা ৬৫০ফুট লম্বা ও মাত্র ৫ফুট চওড়া । হাওয়ায় দুলে ব্রিজের ওপর হেঁটে এ মাথা থেকে ওমাথা গেলাম । রাহুল সাথে সাথে নদীতে পাথর ফেলে ও পাথর পতনের সময় মোবাইল ফোনের স্টপওয়াচে নোট করে নিউটোনিয়ান মেকানিক্সের সূত্র (1/2 gt2)ধরে জল থেকে ব্রিজের উচ্চতা মাপল নিমেষের মধ্যে ৩১ মিটার (আন্দাজ); নদীর ধার দিয়ে হেঁটে আসার পথে ঝোপের মধ্যে একধরণের পোকাদের সমবেত ঐক্যতান শুনে তাক লেগে গেল । ফেরার পথে পুনাখার বাজারে দাঁড়িয়ে ভাদিলাল আইসক্রিম খেলাম আমরা ।
 ১২ইজুন রোদঝলমলে পুনাখার পরিষ্কার আকাশ। সকালে উঠেই দেখি আগের রাতের বৃষ্টিবাদল গেছে টুটে। আগের দিন রাতেই হোটেলের কাঠের কটেজের চালে আমি বৃষ্টির টুপটাপ শুনতে পেয়েছিলাম । যাক বৃষ্টি যে আমাদের সঙ্গের সাথী হয়নি সেই রক্ষে ; নয়ত পাহাড়ে বৃষ্টি অতি মন্দ ব্যাপার একটা । সে অভিজ্ঞতা সিকিম যাবার সময় হয়েছিল। ভুটানে আমরা চিকেন বিরহে কাতর ছিলাম । নিষিদ্ধমাংস বিফ আর পোর্ক এর প্রতি দুর্বলতা আমাদের নেই । কিন্তু প্রচুর চিজ পাওয়া যায় এখানে । তাই চিজ এর প্রেমে পড়ে গেছিলাম । সকালে চিজ অমলেট আর টোষ্ট সহযোগে ব্রেকফাস্ট সেরে আবার বেরিয়ে পড়ার পালা । এবার যাত্রা আর একটা গ্রাম ওয়াংডির দিকে। সেখানে হোটেল বুক করা আছে । মিনিট পনেরো চলার পরেই প্রথম পিটস্টপ নেওয়া হল একটি জায়গায় যেখানে আমাদের ড্রাইভার বন্ধুটি পথ দেখিয়ে নিয়ে গেল।প্রায় দু কিলোমিটার হাইকিং করে পাহাড়ের মাথায় অতি জাগ্রত একটি বৌদ্ধমন্দিরে। বেশ নতুন অভিজ্ঞতা । বেশ খানিকটা ধানক্ষেতের পাশ দিয়ে সরু সমতল রাস্তা ,তারপরেই চড়াই, আবার খানিকটা উতরাই এই ভাবে অনেকটা উঁচুতে উঠে মন্দির দর্শন হল। মা গাড়িতে বসে র‌ইলেন । পাহাড়ের গায়ে ধাপ কেটে প্রচুর ধান চাষ হয় এই জায্গাটায় । আর নদীর জল আছে বলে জলের সমস্যাও নেই । রেড রাইস ভুটানের স্টেপল ফুড। তবে আমি হোটেলে খেয়ে কোনো তফাত করতে পারিনি আমাদের পরিচিত রাইসের থেকে কেবল রঙটা একটু লালচে । মন্দির দেখে এসে প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে গাড়িতে ফিরে এলাম । আবার চলা শুরু । কিছুক্ষণের মধ্যেই পুনাটাংচু নদীর ধারে আমাদের ড্রাগন নেষ্ট হোটেলে এসে পৌঁছালাম। একদম নদীর ধারে হোটেল অসাধারণ নদীর ভিউ ,ঘরথেকে দেখা যায়। আর ওয়াংডি বড় বাতাসীয়া জায়গা। অতি মনোরম জলবায়ু ।
হাওয়ার গতি, মাতায় মতি,
পাহাড় ঘেরা, নদীর ঘোরা
নেইকো ঘরে ফেরার তাড়া
ফিফার সাথে চা-পকোড়া
আলসেমিতে ? নেইতো ক্ষতি !
আজ ১৩ইজুন । গতকাল রাতে ওয়াংডির ড্রাগন নেষ্ট হোটেলে ইন্টারনেট কানেক্সান পেয়ে আমরা   তিন জনেই যারপরনাই খুশী হলাম। রাতে ইন্ডিয়ান ফুড খেলাম,  গরম গরম  চাপাটির সাথে পনীর বাটার মশালা । সবশেষে ফ্রুট প্ল্যাটারে আম দেখে আমরা খুব উত্তেজিত হয়ে পড়লাম । ডিনার খেয়ে ঘরে ফিরে ফিফার উন্মাদনা । সকাল হতেই স্নান খাওয়া সেরে বেরিয়ে পড়া । আজ গেলাম ওয়াংডির বাজারে ।বাজারে শুঁটকি মাছ বিক্রি হচ্ছে তার গন্ধে টেঁকা দায় ।   সেখান থেকে ভুটানের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফোর্ট্রেস দেখতে। রবিবার বলে মন্দির বন্ধ ছিল কিন্তু খুব প্রাচীন এই জ্ং টি পরিদর্শন করে ভাল লাগল । আজ বেশ গরম ছিল । আর বিরাট সেই নদী পুনাটাং চু পাশে বলেই খুব হিউমিড ওয়েদার পেলাম এই স্থানটির  । পাহাড় পরিবেষ্টিত নদীর ধার মনে করিয়ে দিল ১৯৮৯ এ জার্মানির রাইন নদীর কথা । তবে রাইনের ধারে প্রচুর গ্রেপ ভিনিয়ার্ডস দেখেছিলাম । এখানে  কোনো ফ্রুট অর্চার্ড দেখলাম না  । সিনিক বিউটি জার্মানির তুলনায় কোনো অংশে কম নয় সেখানে জার্মান আল্পস আর এখানে ইস্টার্ন হিমালয়ান মাউন্টেন রেঞ্জ ।  সেবার রাইনক্রুজ নিয়েছিলাম । কিন্তু এখানে কোনো রিভার ক্রুজের ব্যবস্থা নেই দেখে বিস্মিত হলাম । নদীর ধারে তৈরী হচ্ছে ওয়াংডিফোদরং শহরের নিউটাউনশিপ । নদীর ওপর তৈরী হচ্ছে হাইডেল পাওয়ার স্টেশন ।  চাষ-আবাদ, টুরিজম, পাওয়ার স্টেশনে কাজ গাড়িচালানো এই সব করেই জীবিকা নির্বাহ হয় এদেশের মানুষের । হোটেলে ফেরার পথে এক জায়গায় দুটি নদীর সঙ্গম স্থলে এক অভিনব রঙয়ের খেলা দেখলাম পো চু আর মো চু এই দুই নদীর রঙ দু রকম ; একটি  জল নীলাভ, ক্রিস্টাল ক্লিয়ার আর একটির রঙ ঘোলা । একটা নিদ্দির্ষ্ট পয়েন্টে দুজনের রঙ কে পরিষ্কার তফাত করা যায় । খুব সুন্দর ছবি নিল পৃথ্বীশ ।

মালয়েশিয়ায় জোনাকীর ঝিকিমিকি

পায়ের নিচের সর্ষে আমায় বেশিদিন স্থির থাকতে দেয় না। শুধু ছেলে আর তার বাবার ছুটির দিকে পথ চেয়ে থাকা। কোথাও বেরিয়ে পড়ার জন্য মনটা অস্থির হয়ে যায়, সেটা দেশ-বিদেশ কোনো ব্যাপার নয়। এটা আমি অবশ্য আগের লেখাগুলোতেও বলেছি।
মালয়েশিয়া এবার আমাদের গন্তব্য। আট দিনের জন্য। আর এটাই ছিল আমার ছেলের জন্মদিনের উপহার। ভ্রমণ আমাদের পরিবারের তিনজনেরই অত্যন্ত প্রিয়।
যাক এসব কথা। মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনস ভোর চারটায় আমাদের পৌঁছে দিল কুয়ালালামপুর এয়ারপোর্টে। প্লেনটা ল্যান্ড করার জন্য যখন নিচে নামছিল, রাতের আঁধারে তখন মনে হচ্ছিল সোনার মালায় জড়িয়ে থাকা আলোঝলমলে এক শহরে নামতে যাচ্ছি।
একজন যোগ্য নেতার হাতে পড়লে অল্প দিনেই একটি দেশ কোথায় যেতে পারে, মালয়েশিয়া তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। ঘুরতে যাই ঠিকই, কিন্তুু সারাক্ষণই আমার দুঃখিনী দেশের সঙ্গে তুলনা করতে থাকি।
ভাবলাম, এত ভোরে হোটেলে যাব? হোটেল বুকিং দেয়াই ছিল। আকাশ তখনও অন্ধকারে ঢাকা। এয়ারপোর্টেই অপেক্ষা আর চিন্তা করছি, ঘুমে দু’চোখ ভেঙে আসছে। শহর অনেক দূরে। এর মধ্যে সিকিউরিটির এক লোক আমাদের কাছে জানতে চাইল, আমরা কোথায় যাব, ট্যাক্সি ঠিক করে দিলে আমরা যাব কি না? আমরা একটু দ্বিধা করছি দেখে তিনি অভয় দিয়ে বললেন, মালয়েশিয়া পুরো দেশটাই যেমন ডিউটি ফ্রি, তেমনই পত্রসব ভত্বব.
আমাদের গন্তব্য ছিল বুকিত বিনতাং। একদম ট্যুরিস্ট সেন্টার। একজন ট্যুরিস্টের জন্য যা প্রয়োজন, সব হাতের কাছে। হোটেল খুঁজতে হলো না, ট্যাক্সি ড্রাইভার একেবারে হোটেলের সামনেই থামাল। রুমে ঢুকে সোজা বিছানায় গিয়ে গভীর ঘুম।
বাংলাদেশ টাইম ন’টায় ঘুম থেকে উঠে নাস্তা খেয়ে ট্যুরিস্ট অফিসের খোঁজে বের হোলাম। এ কাজটা আমরা যেখানে যাই, সেখানেই প্রথম করি এবং চেষ্টা করি তা যেন হয় সরকারি ট্যুরিস্ট অফিস। কারণ তারা কখনোই ফাঁকি দেয় না।
একবার দিল্লি সিটি ট্যুরে আমাদের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছিল। অনেক কিছুর মধ্যে লোটাস টেম্পলও ছিল লিস্টে। গাইড এক মাইল দূরে বাসে বসিয়েই ইশারা করে বলল, ‘ও হ্যায় লোটাস টেম্পল, ফটো খিচো, ফটো খিচো।’
ঘন গাছের ফাঁক দিয়ে টেম্পলের মাথাটা দেখা যাচ্ছে কী যাচ্ছে না! প্রতিশ্রুত ভ্রমণতালিকার অর্ধেকই বাদ দিয়েছিল।
মালয়েশিয়ান সরকারি ট্যুরিস্ট কোম্পানি থেকে আমরা পাঁচটা ট্যুর বেছে নিলাম। তার মধ্যে একটা ছিল ফায়ার ফ্লাইজ শো। বাংলায় এর নাম যে জোনাকি পোকা তা জানি কিন্তু পাঠক, ভ্রমণের সঙ্গে জোনাকির সম্পর্ক কী, বুঝতে পারছিলাম না। ভিন্ন ধরনের যে কোনো কিছুর প্রতি আকর্ষণই আমাদের যাওয়ার কারণ।
কথা হলো, দুপুর দুটায় শীততাপ নিয়ন্ত্রিত মাইক্রোবাস, যাকে ওরা ভ্যান বলে থাকে, আমাদের ফেডারেল হোটেল থেকে তুলে নেবে। গন্তব্যে পৌঁছতে ঘণ্টা দেড়েক লাগবে। সেদিন ছিল ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন। পাঁচদিন ধরেই দেখছি তার জন্য অল্পবয়স্ক যুবক-যুবতীর প্রস্তুতি।
ঠিক সময়ে ভ্যান এলো, আর আমরা উঠে বসলাম। আমাদের সাথি পর্যটক ছিল দুটো মেয়ে হংকংয়ের আর তিনজন ব্রিটিশ নর-নারী। এ তিনজনই একাকী ঘুরে বেড়াচ্ছে সেখানে। পূর্বপরিচিত নন। এদের মধ্যে একজন ভদ্রমহিলা ছিলেন, যার বয়স কমপক্ষে আশি বছর।
ডিনার এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত নৌকা ভ্রমণের জন্য আমাদের দিতে হয়েছে মাথাপিছু ১৮০ রিংগিত করে। যাক, ভ্রমণ পালা শুরু হলো। শহর ছাড়িয়ে আমরা ছোট ছোট গ্রাম পেরিয়ে যাচ্ছি। রাবার আর পাম বাগানের মধ্যে দিয়ে কুয়ালা সেলাংঘর ন্যাচার পার্ক পার হয়ে অবশেষে এসে পৌঁছলাম বুকিত মেলাবতী পাহাড়ে।
সেখানে বিশাল বিশাল কড়ই গাছে ছাওয়া ছায়া ছায়া মসৃণ পিচঢালা রাস্তা। উঁচু রেলিং দিয়ে ঘেরা রাস্তার একদিকে অনেক নিচে সেলাংঘর সমুদ্রের তট দেখা যায়। রেলিংয়ের ওপর রয়েছে বেশ কিছু কামান সাজানো। অন্যদিকে পাহাড়ের গা ঘেঁষে রয়েছে ওলন্দাজদের নির্মিত লাইট হাউস, রয়েল মসোলিয়াম, বাচ্চাদের পার্ক। তবে সেখানে সবচেয়ে মজার ছিল রুপালি পাতার মতো কানওয়ালা বানর। বানরগুলো কাউকেই ভয় পাচ্ছিল না। এক বানর আমার হাত থেকে একটা একটা করে খুঁটে খুঁটে বাদাম খাচ্ছিল।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। গাইড আমাদের এখান থেকে অল্প দূরেই নিয়ে গেল ডিনার পর্ব সারার জন্য। উল্লেখ্য, কুয়াালা অর্থ শহর। আমাদের আসল গন্তব্যের যে জোনাকি দর্শন, তার একটু আগে নদীর ওপরেই বার্জের মধ্যে লোকাল রেস্টুরেন্ট। দারুণ মজার এবং অনেক ধরনের সামুদ্রিক খাবারের আয়োজন। সন্ধ্যা তখন রাতে পরিণত। নদীতে দুলছে রেস্টুরেন্ট।
চারিদিক খোলা শুধু উপরে ত্রিপল দেয়া বার্জটিতে। নদী থেকে ভেসে আসা মিষ্টি বাতাস আমাদের গায়ে মিষ্টি পরশ বুলিয়ে যাচ্ছে। একটা ভেসে থাকা গাছের ডালে একটা সাদা বক দেখতে পেলাম সে অন্ধকারেও। নদী দেখতে দেখতে আমরা গল্প করছি আর খাচ্ছি। ততক্ষণে আমাদের সবার মধ্যেই একটু একটু বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। এটাই আমরা সবাই উপভোগ করছিলাম মন দিয়ে। কারণ প্রায় সবার মনে একই চিন্তা—জোনাকি পোকা দেখার মধ্যে কীইবা আছে!
খাওয়া শেষ হলো। আবার যাত্রার পালা। এবার আমাদের অন্ধকারের মধ্যেই কোনো শব্দ না করে আস্তে আস্তে ভ্যান চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো অল্প একটু দূরে এক নদীর ধারে। নদীর নাম kampung kuantan। আধো আলো-আধো অন্ধকারে নেমে এলাম ভ্যান থেকে।
কটেজের মতো ছোটো ছোটো দু-একটা ঘর। চারিদিকে হালকা মৃদু বৈদ্যুতিক বাতির আলো। এর মধ্যে গাইড একটি ছাউনির নিচে আমাদের লাইন করে এনে দাঁড় করাল।
অনেক ট্যুরিস্ট ছিল, তবে আমরা তিনজন ছাড়া বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত আর কোনো দেশের ট্যুরিস্টই সেখানে দেখলাম না। আরবদের আমরা সবচেয়ে বেশি দেখেছি গেনটিং হাইল্যান্ডে, যেখানে সাউথ ইস্ট এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত এক ক্যাসিনো। মজার ব্যাপার, সেই ক্যাসিনোতে মালয়েশিয়ানদের প্রবেশ বা জুয়া খেলা সরকারিভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
যাক এ সব কথা, তখনও বুঝিনি কী ব্যাপার ঘটবে! ওরা আমাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে লাইফ জ্যাকেট পরিয়ে দিল। এর পর ব্যাটারিচালিত শব্দহীন এক একটি নৌকায় বারো জন করে পর্যটককে উঠানো হলো। সারি ধরে সিটে বসিয়ে বলে দেয়া হলো, কোনো ধরনের কথা না এবং কোনো ছবি তোলা চলবে না। ওই নিষেধাজ্ঞা না থাকলে হয়তো ক্যামেরার ফ্ল্যাশের আলোয় জোনাকিরা তাদের আবাস ছেড়ে পালিয়ে যেত অচিরেই। এর জন্য সে অপরূপ দৃশ্যের কোনো নিদর্শনই আমাদের কাছে থাকল না।
আস্তে আস্তে নদীর পার ঘেঁষে নৌকা চলছে, কিন্তু একটুও শব্দ নেই। তার মধ্যেই অবাক বিস্ময়ে দেখলাম নদীর ধার ঘেঁষে সারি সারি ছোট ঝোপ। তার মধ্যে কোটি কোটি জোনাকি পোকা। সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে মিটমিট করে জ্বলছে আর নিভছে।
কী যে সেই অপূর্ব দৃশ্য, আমি ভাষায় বর্ণনা করতে পারব না। নদীর দু’পারে মাইলখানেক সারিবদ্ধ জায়গাজুড়ে পৃথিবীর বৃহত্তম জোনাকির কলোনি। আস্তে আস্তে দু’তীরই ঘুরিয়ে আনল এতটুকু শব্দ না করে।
নিঃশব্দতার সেই দম বন্ধ করা অপার সৌন্দর্য দেখে ফিরে এসে সবাই অনেকক্ষণ চুপ করে ছিলাম, কারও মুখেই কোনো কথা নেই। তারপর সবাই একসঙ্গে বলে উঠল, ‘সত্যিই কী অপরূপ!’
পাঠক হয়তো বলবেন, আমাদের দেশে গ্রামে কত জোনাকি পোকা! তা আমিও জানি। কিন্তু একই জায়গায় এত জোনাকি পোকা এবং তার ওপর ওদের প্রদর্শনীর যে কৌশল, সেটা সত্যিই বিস্ময়কর!
এ ব্যাপারে ধন্যবাদ জানাই মালয়েশিয়ান ট্যুরিজম সেন্টারকে।
রাত সাড়ে দশটায় গাইড আমাদের পৌঁছে দিল হোটেলে, আর বুকিত বিনতাংয়ের রাস্তাজুড়ে চলছে তখন বড়দিনের উত্সব।
জর্জ মাইকেলের ষধংঃ ঈযত্রংঃ সধংং গানটির সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় ছেলেমেয়েরা নাচছে সান্তা ক্লজের পোশাকে। সঙ্গে অনেক অল্পবয়স্ক ট্যুরিস্টও ছিল।
কোনোরকম অশোভনীয় কিছু নেই। প্রচুর ট্যুরিস্ট আমাদের মতো ফুটপাতে দাঁড়িয়ে দেখছিল তারুণ্যের উত্সব। সেখানে আমার ছেলেও রাত ১টা পর্যন্ত ওদের সঙ্গে আনন্দোত্সবে অংশগ্রহণ করে এলো।

ঙং পাহাড়ের কোলে - কেনিয়া

photo-12.JPGদ্য গ্রেট রিফ্ট ভ্যালে

নাইরোবি এয়ারপোর্টে আমাদের জন্য অপেক্ষমাণ গাড়িতে পরিচয় আফগানস্থানের মিরওয়াইজ দুররানির সাথে। খার্তুম থেকে আমরা একই ফ্লাইটে এসেছি, কিন্তু পূর্বপরিচয় ছিল না। গ্রীষ্মদেশীয় কেনিয়ার রাস্তার দু’পাশে নানা ফুলের আর রঙের সমাহার। জঙ্গল, পাহাড়, দরিদ্র মানুষজন, খোলা সবুজ মাঠে চড়তে থাকা ঘোড়া, গরু, রাস্তার পাশের ভাঙাচোরা ফার্নিচারের দোকান, বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকা ফেরিওয়ালা, আর রাস্তার দু’পাশের ঘন সবুজ অতিক্রম হয়ে পৌঁছাই ট্রেনিং সেন্টারে। সবুজ পাহাড়ের ঢালে শত পাখির কাকলি, সকালের শিশিরে ভেজা পত্রপল্লবের মিষ্টি ভেষজ গন্ধ, সোনালি রোদের ছটা আমাদের ট্রেনিং সেন্টারে অভ্যর্থনা জানায়।
ট্রেনিং সেন্টার-এর লনে পরিচয় মার্কিন কর্নেল অ্যান্টন-এর সাথে। নিজের পরিচয় দিয়ে জানতে চাইল আমার নাম রাশিদা সুলতানা কিনা। আমি হ্যাঁ বলতেই কর্নেল বলে, “তুমি আমার সাথে একই সিন্ডিকেট-এ।” পাশে দাঁড়ানো আফগান মিরওয়াইজ দুররানির সাথে পরিচয় হলে বলে, “তুমিও সম্ভবতঃ আমাদের সিন্ডিকেটে।”
আমরা দু’জনেই প্রায় একসাথেই বলি, “কে কোন সিন্ডিকেটে সব মুখস্থ করে রেখেছ দেখছি। এই ট্রেনিং সেন্টারে কবে এসেছ তুমি?”
photo-13.JPG……..
কারেন ব্লিক্সেন মিউজিয়ামের পথে
……..
সে জানায়, গতকাল এসেছে। করার কিছু ছিল না, তাই রুম-এ ট্রেনিং ম্যাটেরিয়াল যা ছিল সেগুলো পড়েছে।
ট্রেনিং সেন্টারে দ্বিতীয় সন্ধ্যায় ছিল ‘নামচামো’ সোয়াহিলিতে নামাচামো অর্থ হচ্ছে ‘বারবিকিউ’ (আস্ত ছাগল পোড়ানো), এটি আফ্রিকানদের ঐতিহ্যবাহী উৎসব। পাহাড়ের ঢালে সবুজ লনে পার্টি শুরু হবার খানিক পরই তুমুল বৃষ্টি নামে। হুড়মুড়িয়ে সবাই ট্রেনিং সেন্টারের বারান্দায় জড়ো হয় নামচামোর যাবতীয় সরঞ্জমাদি-সহ। বৃষ্টিতে, বাতাসে, ঘাসফড়িংয়ের মতো অসংখ্য পোকা পুরো বারান্দা দখল করে নিতে আসে। বারবিকিউ শেষ হবার আগেই আমরা ভিতরে ডাইনিং-এ চলে যাই।
ক্লাস শেষে একদিন কর্নেল অ্যান্টন আমাকে আর দুররানিকে বলে, “আমি তোমাদের সাথে ডিনার করতে চাইছি।” কর্নেল খানিক দূরে গেলে দুররানি বলে, “লোকটা নির্ঘাত আজ ইনটেলিজেন্স সংগ্রহ করবে। আমি আফগান আর তুমি বাংলাদেশি।”
ডিনার টেবিলে কর্নেল আফগান যুদ্ধ সম্পর্কে দুররানির মতামত জানতে চায়। মিরওয়াইজ বলে, আফগান জনগণ এখন যুদ্ধের অবসান চায়। প্রক্সি যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত তারা। একসময় ছিল আমেরিকা রাশিয়ার প্রক্সি যুদ্ধ, ইন্ডিয়া-পাকিস্থানের, আর বর্তমানে ইরান ইউএস-এর।”
photo-16.JPGকারেন ব্লিক্সেন মিউজিয়ামের সামনে লেখক
আমি বলি, “বিন লাদেন তো তোমাদেরই তৈরি ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন।” কর্নেল বলে, “আমাদের তৈরি, এভাবে বোলো না। রাশিয়া ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। রাশিয়াকে প্রতিহত করতে আমাদের যা করার দরকার ছিল তাই করেছি। তবে প্রেসিডেন্ট রিগ্যান (নাম উচ্চারণের সাথে সাথে কর্নেলের চেহারা উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে) সোভিয়েত ইউনিয়নকে ধ্বংস করতে পেরেছে। রিগ্যান ওয়াজ আ রিয়েল হিরো।” তারপর বলে, “ইরান! ওহ! আহমেদিনিজাদ লোকটাকে কী মনে হয় তোমাদের? কী ভয়ঙ্কর তার কথাবার্তা। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কী ভয়ঙ্কর কথা সে বলে। তার দেশের লোকজন তাকে ঘৃণা করে। মিডিয়াতে দেখেছ?” আমি বলি, “শুনেছি তার দেশের দরিদ্র মানুষজনের কাছে সে জনপ্রিয়।”
কর্নেল বলে, “তারা তো অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত বা সরল লোকজন। তবে আমাদেরও কিছু ভুল আছে, আফগানস্থানে রাশিয়ার সাথে যুদ্ধ শেষ হলে আমাদের হাত গুটিয়ে চলে আসা উচিত হয় নাই। ওখানে কোনো ক্যাম্প বা বেস থাকা উচিত ছিল। তাহলে আফগানস্থানে আজকের সমস্যা তৈরি হত না।”
আমি বলি, “বাহ! তোমাদের বেস থাকলেই পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়?”
কর্নেল বলে, “আরও একটা ভুল আমাদের হয়েছে। প্রথমবার ইরাক যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া ঠিক হয় নাই। তখনই, ঐ সময়ই, বিন লাদেন আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়।”
দুররানি বলে, “আমেরিকার এই সামান্য “ভুল”-গুলোর জন্য পৃথিবীর শত শত নারী শিশু ও বেসামরিক লোকের প্রাণ দিতে হয়।”
কথা হচ্ছিল পশতুনদের নিয়ে। দুররানি বলল, “আমাদের অতিথি-বৎসলতার গল্প হয়তো তোমরা জানো। আহত এক মার্কিন সৈন্য আশ্রয় চেয়েছিল এক পশতুন পরিবারের কাছে। তারা তাকে আশ্রয় দেয়। সেবা যত্নে সুস্থ করে তোলে। তালেবানদের কাছে তাকে ধরিয়ে না দিয়ে মার্কিন ক্যাম্পে সংবাদ পাঠিয়ে নিরাপদে তাকে সেখানে পৌঁছে দেয়। মার্কিন সেই সেনা অফিসার দেশে ফিরে গিয়ে এ বিষয়ে বই লিখেছে।” সে হাসতে হাসতে আরো বলে, “ওসামা বিন লাদেনও হয়তো কোনো পশতুন পরিবারের কাছেই আশ্রয় নিয়ে কোথাও লুকিয়ে আছে। লাদেন হোক আর মার্কিন সৈন্য হোক পশতুনরা কখনোই অতিথিকে শক্রুর হাতে তুলে দিবে না। অতিথি বলে কথা।” আমরা সশব্দে হেসে উঠি এ-কথায়।
আমাদের টেবিলে যখনই কোনো আফ্রিকান কোর্সমেট এসে বসে অথবা টেবিল অতিক্রম করে যায়, তারা মার্কিন কর্নেলকে ‘হ্যালো স্যার, হাউ আর ইউ স্যার’ বলতে বলতে মুখে প্রায় ফেনা তুলে ফেলে। আবার সাদা-চামড়ার এই মার্কিন কর্মকর্তার সাথে ছবি তোলার জন্য নানা সময় লাইন দেয় আফ্রিকানরা। কর্নেলকে বলি, “তুমি তাদের ব্রিগেডিয়ার জেনারেলকেও স্যার বলছ না, অথচ আফ্রিকান অফিসাররা তোমাকে সারাক্ষণ স্যার স্যার করছে, তোমার সাথে ছবি তোলার জন্য লাইন দিচ্ছে। আমার দেশেও এর ব্যতিক্রম খুব বেশি নাই। কলোনিয়াল হ্যাঙওভার। কন্ডিশনড।”
photo-14.JPG……..
দ্য গ্রেট রিফ্ট ভ্যালে-এ কোকাকোলার পক্ষ থেকে স্বাগত-বিলবোর্ড
……..
অ্যান্টন হাসে। বলে, “লক্ষ করেছ, এরা কলোনিয়াল যুগের ব্রিটিশ ইউনিফর্ম পরে আছে- খাকি টিউনিক, কোমরে বেল্ট, এমনকি পুলিশ সুপারদের বগোলে লাঠি। এখনও কলোনিয়াল যুগের ব্রিটিশদের সবকিছু অক্ষুন্ন রেখেছে। একটুও বদলায়নি। আসলেই কলোনিয়াল হ্যাঙওভার।” কর্নেল হাসে। হয়তো মনে মনে পূর্বপুরুষ ব্রিটিশদের জন্য গর্বিত বোধ করে। মনে মনে ভাবি, হায়, আমার দেশেও তো পুলিশ মিলিটারি ব্রিটিশদের রেখে যাওয়া খাকি পোশাকিতা এখনও ধরে রেখেছে; আমার দেশে গেলেও লোকটা এরকমই হাসত।
তবে এর ব্যতিক্রমও দেখেছি। কেনিয়ার অ্যাঞ্জেলা, ফ্লোরেন্স, নাইজেরিয়ার ইন্নিহ্, জিবুতির গেল্লা, আরও দু’একজনকে দেখেছি নিজস্বতা বজায় রেখেই ক্লাসে, সিন্ডিকেট মিটিং-এ, আড্ডায় অংশ নিয়েছে। কখনোই তাদের দেখি নি সাদাদের বাড়তি তোয়াজ করতে।
এক সন্ধ্যায় লাইবেরিয়ার সংঘাতের ওপর একটি প্রামাণ্য চিত্র দেখায়। সেখানে জানা যায় আমেরিকা দেশটাকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহের জন্য ঘাঁটি হিসাবে ব্যবহার করে। আমেরিকানরা চলে যাবার পর থেকেই সংঘাতের সূত্রপাত হয় সে দেশে। দলাদলি ও বীভৎস হত্যাকা- চলতে থাকে। তাদের সংঘাতের পিছনেও আমেরিকান লাইবেরিয়ানরা দায়ী।
প্রামাণ্যচিত্রে দেখা যায়, আমেরিকান বহুজাতিক কোম্পানি ফায়ারস্টোনের উপস্থিতি। সারি সারি মৃতদেহ দেখতে দেখতে জিবুতির লে: কর্নেল গেলণ্ঢা মার্কিন কর্নেলকে জিজ্ঞাসা করে, “ লাইবেরিয়ার এত সমস্যায় আমেরিকা বর্তমানে কী ভূমিকা পালন করছে?”
কর্নেল বলেন, “কী বিপদ! আমেরিকা কোথাও হস্তক্ষেপ করলেও সমস্যা, না করলেও সমস্যা!”
চা বিরতিতে আমি কর্নেলকে বলি, “এই তথ্যচিত্রে দেখলাম রাশিয়ার বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরির জন্য তোমরা লাইবেরিয়াকে ব্যবহার করেছ।”
কর্নেল বলে, “দেখো, সাদা আমেরিকানরা লাইবেরিয়ার সমস্যার জন্য দায়ী নয়। আমাদের “প্রাক্তন দাসেরা” এজন্য দায়ী বলতে পারো।
মার্কিন দক্ষিণের রাজ্য সাউথ ক্যারোলাইনা থেকে আগত অ্যান্টনের কথাগুলি ঘুরেফিরে আমার মাথায় বার বার আসে। অন্য নানা কথাও। দার্ফুরে আমার সহকর্মীদের অনেকেই আফ্রিকান, ভারতীয় বা অন্যদেশীয়; যাদের আমেরিকা বা কানাডার দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে তাদের যদি কেউ সোমালিয়ান, পাকিস্তানি বা ইন্ডিয়ান বলে, তাদের রীতিমতো নাখোশ হতে দেখেছি।
তিনচারদিন টানা বৃষ্টি। বিশাল সব গাছের গুঁড়িতে, কাণ্ডে, শাখা-প্রশাখায় ঝুলন্ত নানা অর্কিড, বুনোলতা, ফুল। ক্লাসে যাবার ইটের সিঁড়িতে কোথাও শ্যাওলার আস্তর। পাশে ঘাস, থানকুনি পাতা, হলুদ বেগুনি ফুল জড়াজড়ি করে থাকে। দিনের বেলাও ঝিঁঝির শব্দে চারপাশ মুখর।
আরেক সন্ধ্যায় ছিল আফ্রিকান নাইট। আফ্রিকান নৃত্যগীতের সাথে আফ্রিকান খাবার পরিবেশন করা হয়, যার মধ্যে ছিল সিদ্ধ মিষ্টি-আলু, সবুজ শাক-সিদ্ধ, কচু-সিদ্ধ, গরুর মাংসের স্টু, কাঁচকলা-সিদ্ধ।
এক রাতে ডাইনিং টেবিলে জাপান প্রসঙ্গে কথা হচ্ছিল। আমি বললাম, “জাপানের হিরোশিমা-নাগাসাকিতে আণবিক বোমা ফেলে মানবতার বিরুদ্ধে যে অপরাধ তোমরা করেছ তা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশ কখনও করে নাই।”
কর্নেল বলেন, “জাপানিরা বন্দিদের প্রতি কত সীমাহীন নিষ্ঠুর আচরণ করত তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না। জাপানিদের বুশিদো স্পিরিট-এর কথা জানো তো? জাপানিরা এক ভিন্ন ধরনের জাতি। আমেরিকানরা মনে করে জাপানে আণবিক বোমা না ফেললে এই যুদ্ধে হয়ত আরো অনেকবেশি বেসামরিক মানুষ মারা যেত। যুদ্ধ শেষ হতেও অনেক সময় লাগত।”
আমি বলি, “দারুণ ব্যাখ্যা! দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানিদের জন্য সংবিধান লিখে তোমরা আমেরিকানরা তাদের উপহার দিয়েছ। তাদের সংবিধানের অনুচ্ছেদে লিখে দিয়েছ জাপান কোনোদিন সামরিক শক্তির অধিকারী হতে পারবে না। শুধু তাদের সেল্ফ ডিফেন্স ফোর্স থাকবে।”
কর্নেল হাসে। তার মুখ আবারও উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। “জেনারেল ম্যাকআর্থার। মার্কিন ইতিহাসে মাত্র পাঁচজন ফাইভস্টার জেনারেলের মধ্যে একজন। মার্কিন সেনাবাহিনীর অসামান্য মেধাবী কর্মকর্তা। তিনি জাপানিদের বিলক্ষণ চিনেছেন। এজন্যই জাপান যেন কখনও সামরিক শক্তির অধিকারী হতে না পারে তা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।” কর্নেল বলে যায়, “আমার বাবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। ফিলিপিনে যুদ্ধ করেছেন জাপানিদের বিরুদ্ধে। তিনি সতের বছর বয়সে তাঁর বাবাকে হারিয়েছিলেন। ত্রিশ-এর মন্দায় আমাদের দাদা অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে মাথায় গুলি করে আত্মহত্যা করেছিলেন। বাবা হয়তো বিশ্বযুদ্ধে মানুষ মেরেছেন, কিন্তু কোনোদিন যুদ্ধের এসব গল্প বা তিনি কখনও কাউকে হত্যা করেছেন কিনা এসব কাউকে বলেন নাই। অল্প বয়সের তুলনায় শেষ বয়সে বাবা অনেক উদার এবং দয়ালু হয়ে উঠেছিলেন। অথচ মৃত্যুর আগ-পর্যন্ত বাবাকে কোনোদিন বলতে শুনি নাই হিরোশিমা নাগাসাকিতে বোমা ফেলা আমেরিকার ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। অন্যদিকে দেখো নাৎসিরা কীভাবে গ্যাস চেম্বারে ঢুকিয়ে ঢুকিয়ে মানুষ মেরেছে। ব্যাপার ভাবতে অবাক লাগে দে ওয়্যার ইয়োরোপিয়ানস! দে আর হোয়াইট অ্যান্ড দে আর ক্রিশ্চিয়ানস অলসো! কীভাবে তারা এত নিষ্ঠুর হল!”
আমি বলি, “তোমরা হোয়াইট এবং ক্রিশ্চিয়ানরা আনবিক বোমা ফেলেছ, ভিয়েতনাম, আফগানিস্থান, ইরাকে এত মানুষ হত্যা করেছ, তোমরা নিষ্ঠুর না?”
মিরওয়াইজ বলে, “আমার তো মনে হয় তোমরা সাদা এবং খ্রিস্টান ইউরোপিয়ান জামার্নদের উপর আণবিক বোমা না ফেলে জাপানিদের ওপর ফেলেছ তারা অসাদা এবং অখ্রিস্টান বলেই।”
কর্নেল বলে, “তোমাদের দু’জনের এত আমেরিকা বিদ্বেষ!” মিরওয়াইজ হাসতে হাসতে বলে, “এশিয়ানরা খুব খারাপ। জাপানিদের তো চিনেছ। ভিয়েতনামিদের তোমরাই সবচেয়ে ভালো চেনো। আফগানিস্তান একটা দেশ যে কখনোই কারো উপনিবেশ ছিল না।”
প্রতিদিনই ক্লাসে পাওয়ার-পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন থেকে হারিয়ে যেতাম কাচের দরজার বাইরে দুর্বিনীত সবুজে। নীল, বেগুনি, হলুদ, লেজঝোলা নানা রঙের পাখির কাকলিতে-নৃত্যে, আর ক্লাসের বিরতিতে দেখতাম দূরে ঙং পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের, কুয়াশার খেলা।
সঙ্গীত নিয়ে এক আলাপচারিতায় অ্যান্টন জানায় ক্লাসিক্যাল সঙ্গীত এবং পিয়ানোর ভীষণ ভক্ত সে। জনপ্রিয় ধারার র‌্যাপ সঙ্গীতের প্রসঙ্গে বলে, “আমেরিকার বিশেষকিছু গোত্রের লোকজন এইসমস্ত শস্তা জনপ্রিয় সংস্কৃতি তৈরি করেছে। কি অশ্লীল এসবের লিরিকস। কানে তোলা যায় না।”
ট্রেনিং সেন্টারে কর্নেলকে একদিনও ড্রিংক করতে দেখি নাই। তাদের নাকি মিশনে গেলে পান করা নিষেধ আছে। আমেরিকাতে মাঝেমধ্যে ড্রিংক করে। জেনেছি সময়-সুযোগ পেলেই নিয়মিত বাইবেল পাঠ করে।
photo-20.JPG……..
নাইভাসা লেক-এ মিরওয়েজ দুররানি ও অ্যান্জেলার সাথে লেখক
……..
কেনিয়াতে দেখেছি উপনিবেশিকদের সন্তানেরা দামি গাড়ি, দামি বাড়ি, তাদের নিজেদের ক্লাব, রেস্টোরান্ট সব মিলিয়ে এখনও প্রভুর মতো অথবা প্রভুদের সন্তানদের মতোই আছে। শুনেছি কেনিয়ার রাজনীতিতে ও অর্থনীতিতে প্রাক্তন কলোনাইজার ব্রিটিশদের ব্যাপক প্রভাব আছে। তবে কেনিয়ানদের আতিথেয়তা, সারল্য ও আন্তরিকতায় মুগ্ধও হয়েছি।

‘ I had a farm in Africa, at the foot of the Ngong Hills.’
উইকএন্ডে একদিন গ্রেট রিফট উপত্যকা এবং নাইভাসা হ্রদে বেড়াতে যাই। জানা যায়, গ্রেট রিফট ভ্যালি ধরে সুবিশাল পর্বতশ্রেণীর মাঝ দিয়ে যে প্রশস্ত এবং দীর্ঘ সড়কটি গেছে, সেটি তৈরি করে ব্রিটিশদের হাতে সেসময়কার ইতালীয় যুদ্ধবন্দিরা। যুদ্ধবন্দি ইতালিয়দের ব্রিটিশরা নিয়ে এসেছিল পাহাড় জঙ্গল কেটে সড়ক নির্মাণের জন্য। অনেকেই এই নির্মাণের সময় মারা যায়। ঝকঝকে এই সড়ক অতিক্রমণের সময় ঐ যুদ্ধবন্দিদের দীর্ঘশ্বাস আর আহাজারি অনুভব করি। পার হই লংগনট, ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি। আমরা যাই নাইভাসা লেক-এ, আর আমাদের নৌকার পাশেই মাথা উঁচু করে থাকে কয়েকটা জলহস্তী। ভয় পেয়ে আফগান মিরওয়াইজ মাঝিকে বলে এখান থেকে দ্রুত নৌকা ফেরাতে। মিরওয়াইজের ভয় দেখে আমি আর অ্যাঞ্জেলা দু’জনেই একসাথে হেসে উঠি।
photo-8.JPGনাইভাসা লেক-এ হিপোপটেমাস
নাইভাসা লেক-এ বক, সারস-সহ শত পাখির ওড়াউড়ি। পিছনে লংগনট, ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি। নাইভাসা লেক থেকে যাই সেরেংগেতি রিজার্ভ ফরেস্ট-এ। ‘আউট অব আফ্রিকা’ ছায়াছবির বিভিন্ন সাফারি দৃশ্যের চলচিত্রায়ণ হয়েছিল এখানে। দর্শনার্থীদের নিরাপত্তার জন্য এখানে মাংশাসী কোনো প্রাণী নাই। চলচ্চিত্রের শুটিং-এর জন্য আমেরিকা থেকে পোষা সিংহ এনে এখানে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। মেরিল স্ট্রিপ, রবাট রেডফোর্ড চোখের সামনে ফিরে আসে নানা অভিব্যক্তি আর সংলাপ নিয়ে।
লংগনট ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির পটভূমিতে উঁচু ঘাসে হরিণ, জেব্রা ছাড়াও হাজারো পশুপাখি চড়ে বেড়াচ্ছে, ছুটছে। গায়ের পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে জেব্রা অথবা ইলান্ডের দল। একশ’ ভাগ আদিম। আধ্যাত্মিক আর অপার্থিব। পাখির কাকলি, পশুদের শব্দ এমন মধুর হতে পারে কোনোদিন ভাবি নাই। মনে হচ্ছিল আদম হাওয়াকে ঠিক এমনই পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন আল্লাহ্।
এক ডিনারের আড্ডায় অ্যান্টন জানাল কারেন বি−ক্সেন মিউজিয়াম আমাদের ট্রেনিং সেন্টারের খুব কাছেই। মনে পড়ে কারেন বি−ক্সেন-এর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ‘আউট অব আফ্রিকা’র চলচ্চিত্র রূপ দেখে আফ্রিকার নৈসর্গিক সৌন্দর্যের প্রেমে পড়েছিলাম। কারেনের প্রেমিক ডেনিস ফিঙ্ক হাটনের কবরও ঙং হিলে কোথাও। উইকএন্ডে গেলাম কারেন বি−ক্সেন জাদুঘরে। কারেন কান্ট্রি ক্লাব, কফি এস্টেট পার হয়ে যখন মিউজিয়ামে পৌঁছাই, বাড়িটিতে শেষ বিকালের আলো। সামনে সবুজ ঘাসের লন, দূরে নীলাকাশে মাথা তুলে থাকা ঙং পাহাড়। বাড়িটিতে পা দিতেই কারেন বি−ক্সেনের সময়ে চলে যাই, ভাবি, কারেন প্রতিদিন তার বাড়ি থেকে এই পাহাড়টি দেখত। চলচ্চিত্রের নানা দৃশ্য, ‘আউট অব আফ্রিকা’ বইয়ের নানা শব্দাবলি আমার মাথায় অনুরণন তোলে। বাড়ি থেকে যে ঙং পাহাড় দেখা যায় সেখানে কারেনের প্রেমিক ডেনিস তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী শায়িত আছেন। বাড়ি থেকে প্রেমিকের কবর চিহ্নিত করার জন্য কারেন ঙং পাহাড়ে হাটনের কবর কাপড় দিয়ে ঘিরে দিয়েছিল। ইতিহাসের বাড়িতে ঢুকি। বাড়ির ভিতরে সব পার্টিশান দেয়াল মেহগনি কাঠের। ঢুকেই বাঁদিকে প্রথম রুমে তার বড় বড় ছবি। তার বন্দুক রাখার স্থান। লোহার সিন্দুক। মাথায় হ্যাট পরা সুন্দরী ব্যারনেস। ভাইয়ের সাথে ছবি। ভাই তার কফি খামারে ম্যানেজারের কাজ করত। স্বামীর সাথে দাঁড়ানো ছবি। পায়ের কাছে শিকার করা সিংহ, গর্বিত ব্যারন আর ব্যারনেস। ডাইনিং রুমে তার ব্যবহৃত চেস্ট অব ড্রয়ার, দেওয়ালে তার আঁকা চিত্রকর্ম। আফ্রিকান নারীর, কিশোরের পোট্রেট। তিনি চিত্রকরও ছিলেন। ডাইনিং রুমের বাঁপাশের কোনায় কোনো চিত্রকরের আঁকা তার বৃদ্ধ বয়সের একটি পোর্ট্রেট। মাথায় হ্যাট পরিহিত, অতিশীর্ণকায়, ফ্যাকাসে, ধুমপায়ী কারেন।
মিউজিয়ামে কেনিয়ান গাইড বলে, “তিনি কেনিয়ানদের খুবই ভালবাসতেন। কালোদের ভালবাসতেন বলেই তিনি দুইবার নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হবার পরও পুরস্কার দেওয়া হয়নি।” উপস্থিত কেনিয়ানরা গভীর মনোযোগে এ কথা শোনে।
লিভিংরুমে প্রচুর বই। ইউরোপ থেকে নিয়ে এসেছিলেন। স্বামী-স্ত্রীর দুটো ভিন্ন বেডরুম। এটাই নাকি তৎকালীন অভিজাত ইউরোপীয়ানদের দস্তুর ছিল।
কারেন তার স্বামীর সাথে ডিভোর্স হয়ে যাবার পর প্রেমিক ডেনিস ফিঙ্ক হাটনকে নিয়ে এ বাড়ীতেই থাকতেন।
কারেন বি−ক্সেন, আইজাক ডেনিসন ছদ্মনামে সাহিত্য চর্চা করতেন। নারী লেখকদের সাহিত্যের মান নিয়ে সেসময় বুদ্ধিজীবীরা খুবই নেতিবাচক ধারণা পোষণ করতেন। যে কারণে পুরুষের ছদ্মনামেই কারেনের সাহিত্যযাত্রা শুরু।
কারেন ব্রিটিশ পূর্ব-আফ্রিকা বা বর্তমান কেনিয়ায় আসেন ১৯১৩ সালের শেষ দিকে। তিনি আসেন তার আত্মীয় সুইডিশ ব্যারন ব্রোর ভন বি−ক্সেনকে বিয়ে করতে। তরুণ ব্যারন এবং ব্যরনেস নাইরোবি থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে ঙং পাহাড়ের কাছে খামারের জন্য জমি কিনে কফি উৎপাদন শুরু করেন। তার কফি খামারের ম্যানেজারের দায়িত্বে ছিল ইউরোপীয়ানরা। প্রায় ৭০০ স্থানীয় মজুর ছিল কারেনের খামারে। তারা ছিল স্থানীয় কিকুয়ো গোত্রের লোকজন। তারা খামার মালিকদের ১৮০ দিনের জন্য শ্রম দিতে চুক্তিবদ্ধ হত। বিনিময়ে সামান্য মজুরি আর খামারের অচাষাবাদযোগ্য জমিতে বসবাসের অনুমতি পেত। অথচ ব্রিটিশরা উপনিবেশ স্থাপনের আগে যুগ যুগ ধরে কিকুয়োরাই ছিল এই সমস্ত জমির মালিক।
কারেনের স্বামী তার প্রতি অবিশ্বস্ত ছিলেন বলে জানা যায়। তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কারেনের উপস্থিতিতেই তার অন্য প্রেমিকা নিয়ে হাজির হতেন। মাত্র ২৯ বছর বয়সে কারেন সিফিলিসে আক্রান্ত হন। ব্যাধিমুক্তির জন্য প্রতিদিন তাকে কয়েক ফোঁটা আর্সেনিক খেতে হত।
কারেন বি−ক্সেন মিউজিয়ামের গাইড জানায় সে তার স্বামীর কাছে থেকে এ রোগ পেয়েছিল। আবার এও শোনা যায় যে তার বাবার সিফিলিস ছিল। উত্তরাধিকার সূত্রে সে তা পায়। শেষের দিকে ফিঙ্ক হাটনের সাথে কারেনের সম্পর্ক বেশ অস্থিরতায়ে কাটে। কিছুকাল পরেই ফিঙ্ক হাটন তাঁর নিজস্ব বিমান জিপসি মথ-এ দুর্ঘটনায় মারা যান। ‘আউট অব আফ্রিকা’ ছবিতে আমি ডেনিস ফিঙ্ক হাটনকে ততটা চিনে উঠি নাই, যতটা চিনেছি কারেন বি−ক্সেনের ‘আউট অব আফ্রিকা’ বইটি পড়ে। প্রেমিক ডেনিস ফিঙ্ক হাটনকে কারেন ভীষণ ভালবাসতেন। প্রত্যাশা ছিল হাটন তাকে বিয়ে করবে। কিন্তু ফিঙ্ক হাটন চাননি স্থায়ী কোনো বন্ধনে জড়াতে। ব্যবসায়ে ঋণে আকণ্ঠ ডুবে যাওয়ার পর হয়তো প্রত্যাশা ছিল হাটন তাকে বিয়ে করলে তাঁর স্ত্রী হিসাবে তার প্রিয় আফ্রিকায় থেকে যাওয়া হবে। স্বামীর সাথে ডিভোর্সের পর এই বাড়িতেই প্রেমিকের সাথে থাকতেন। মেহগনি কাঠের দেয়ালে, ঘরের বাতাসে লেখকের একাকিত্ব, প্রণয়, প্রেমিকের মৃত্যু… ব্যথায় প্রতিদিন আর্সেনিক নিতে থাকা লেখকের অশরীরী আলোছায়া তৈরি হয় বাড়িটিতে আর আমার মনের ভেতর।
photo-15.JPGনাইভাসা লেক-এ বকের বিচরণ
স্বামীর সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক অবসানের পর কারেন একাই কফি খামার পরিচালনা করে। খুবই স্বনির্ভর আর দক্ষ কর্মী ছিল সে। তার কাজ, খামার, খামারের কর্মী, ঙং পাহাড় এলাকায় অসামান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, এসবই ভালবাসা। কিন্তু মাটি এবং আবহাওয়া কফি চাষের অনুপযুক্ত হওয়ায় তার ব্যবসায় লোকসান হতে থাকে, দিনে দিনে আকন্ঠ ঋণে ডুবে যেতে থাকে কারেন। ঋণ মেটাতে এমনকি তার অধিকাংশ আসবাবপত্র বিক্রি করে দিতে হয়। ১৯৩১ সালে খামারটি বিক্রি করে দেয় সে।
‘আউট অব আফ্রিকা’ বইয়ের শেষে কফি খামার, তার বাড়ি, আসবাবপত্র, সব বিক্রি করে ট্রেনে চেপে সমুদ্র বন্দরের দিকে রওয়ানা দেয় কারেন, আফ্রিকা ছেড়ে চলে যাবার জন্য। তার অনেক স্মৃতির অতিপরিচিত ঙং পাহাড় চোখের সামনে অপসৃত হয়ে যায় চিরকালের জন্য।
আফ্রিকার জন্য কারেনের বেদনা শুধু যে ব্যবসায় ক্ষতি আর প্রেম হারানোর বেদনা তা নয়, বরং সেটলারদের স্বর্গরাজ্য কেনিয়া হারানোর ব্যথা।
কারেন উপনিবেশ যুগে সাদা ও কালোদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান দেখেছে, আর দশজন ঔপনিবেশিকেরই মতো। “the highlands were in very truth the Happy Hunting Grounds…. while the pioneers lived in guiless harmony with the children of the land.”
কারেনের আফ্রিকা বর্ণনায়, অনুদ্ধারযোগ্যভাবে হারিয়ে যাওয়া এক জগতের জন্য শোচনা দেখা যায়, সেই জগতের রঙ-রস, এক রাজসিক বিবিক্ততা আর প্রকৃতির সহবাসী জীবনের শুশ্রƒষা তার রচনাকে অভিষিক্ত করে।
বিংশশতকের প্রথম দুই দশকে অধিকাংশ ইউরোপীয় সেটলারদের কাছে কেনিয়া ছিল ‘Timeless Paradise’। প্রেসিডেন্ট থিওডর রুজভেল্ট, চার্লস, প্রিন্স অব ওয়েলস-সহ আমেরিকা ইউরোপের বহু ধনকুবের কেনিয়ায় সাফারিতে আসেন।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকরা কেনিয়ায় ব্রিটিশ আইন ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলেও তারা নিজেদের অত্যাচারী, নিষ্ঠুর ও ঔপনিবেশিক মনে করত না। তারা নিজেদের দাবি করত “benign stewards of the land and its people.”
বি−ক্সেন যদিও ক্ষমতাধর ভূস্বামী ছিল, তার কর্মচারী মজুর এবং স্থানীয় আফ্রিকানদের সাথে তার ভালবাসা ও শ্রদ্ধার সম্পর্কের জন্য সে সুখ্যাতও ছিল। সে সময় তার দেখা কিকুই, মাসাই, সোমািল মুসলমান এবং ভারতীয় ব্যবসায়ীদের প্রতি সে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করত।
তার সমসাময়িক অন্যান্য ইউরোপিয়ানরা যেভাবে আফ্রিকানদের জংলি, নিষ্ঠুর, বর্বর, বোকা, এ-সমস্ত লেবেল এঁটে দিত, কারেন তাদের ব্যতিক্রম ছিল। আফ্রিকান সব গোত্রেই বয়স্কদের সম্মানের চোখে দেখা হয়। কন্যা পক্ষকে গরু, ছাগল ইত্যাদি নানা যৌতুক দিয়ে আফ্রিকান ছেলেদের বিয়ে করতে হয়। অন্যান্য ইউরোপিয়ানরা একে কুৎসিত প্রথা মনে করলেও কারেন বি−ক্সেন এ-সমস্ত প্রথার মধ্যে যুক্তি, সম্মান, সুসংস্কৃতির চিহ্নই দেখত।
প্রেমিক ফিঙ্ক হাটনকে সে এঁকেছে একধরনের ‘ফিলসফার কিং’-রূপে। অসামান্য পা-ণ্ডিত্য এবং একই সাথে চরিত্রের সহজাত মহিমা, প্রকৃতির সঙ্গে আত্মার যোগ-থাকা এমন একজন যে সবজায়গাতেই মানানসই, আবার ঠিক কোনো জায়গাতেই নয়।
“When he came back to the farm, it gave out what was in it; it spoke - as the coffee plantations speak, when with the first showers of the rainy season they flower, dripping wet, a cloud of chalk …When I heard his car coming up the drive. I heard, at the same time, things of the farm all telling what they really were.”
এই বাড়িটি ছাড়া ডেনিশ ফিঙ্ক হাটনের অন্য কোন বাড়ি ছিল না। বিভিন্ন সাফারিতে যাওয়ার মাঝের সময়টুকু এ বাড়িতেই তিনি সময় কাটাতেন। তার বই এবং গ্রামোফোন এ বাড়িতেই থাকত।
ডেনিস ফিঙ্ক হ্যাটন অভিজাত ব্রিটিশ পরিবারে জন্মেছেন এবং অক্সফোর্ড ও ইটনে পড়ালেখা করেছেন। হাটন ১৯১১ সালে ২৪ বছর বয়সে আফ্রিকায় আসেন ব্যবসায়ী হিসাবে। তাঁর “তুখোড় শিকারী” পরিচয় অন্য সবকিছু ছাড়িয়ে যায়। আফ্রিকানরা তাঁকে ভালবাসত। কারেনের সাথে দেখা হয় ১৯১৮ সালে এক ডিনারে। তিনিই ছিলেন কারেনের জীবনের সেরা প্রেম। “To love the ground he walks upon, to be happy beyond words when he’s here and to suffer worse than death when he leaves.”
কিন্তু হাটন ছিলেন কারেনের মতোই আরেকজন, যে কখনও সামাজিক নিয়ম-কানুনের তোয়াক্কা করে না। কারেনের এই প্রেমে আনন্দ যেমন ছিল, বেদনাও কম ছিল না। কারেনকে নিয়ে ফিঙ্ক হাটন তাঁর জিপসি মথ পে−নটিতে ঘুরে বেড়াতেন ঙং পাহাড়ের মেঘরাজ্যে। কারেনের বর্ণনায় এটি ছিল তার আফ্রিকা জীবনের সবচেয়ে আনন্দময় ঘটনা। কিন্তু ফিঙ্ক হাটন কারেনের সাথে স্থায়ী কোনো সর্ম্পক গড়তে আগ্রহী হন নাই। কারেন একবার তাঁর সন্তানধারণ করে এবং তার গর্ভপাত ঘটে। বিয়ে করে স্থায়ী সম্পর্কে কারেন যেতে চাইলেও হাটন তা চান নি।
photo-18.JPG……..
কেনিয়ার কারেন এলাকায় ট্রেনিং-এ লেখক
……..
ডেনিস ফিঙ্ক হাটন ছিলেন জাদু-ব্যক্তিত্ব। তাঁর পথে পথে ভালবাসা ছড়ানো ছিল। রসবোধের কারণে সারাজীবনই সব মানুষের প্রিয়পাত্র ছিলেন। শিল্প, কবিতা, সঙ্গীত সবকিছুতেই তাঁর তুখোড় পারদর্শিতা ছিল। ভালবাসার পাত্র ছিলেন আফ্রিকানদেরও। মৃত্যুর কয়েক সপ্তাহ পূর্বে পর্যন্ত কারেনের সাথেই তিনি থাকতেন। বিমান দুর্ঘটনায় মারা গেলে তাঁর মৃতদেহ কারেনের কাছেই পৌঁছে দেওয়া হয়। মৃত্যুর পর তাঁকে তাঁর শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী ঙং পাহাড়েই সমাধিস্থ করা হয়। ডেনিস ফিঙ্ক হাটন মৃত্যুর পরও আফ্রিকার আদিম ও স্বর্গীয় সৌন্দর্যের মাঝে থাকতে চেয়েছিলেন। তাঁর সমাধিতে তাঁর পরিবারের সদস্যরা কোলরিজের কবিতা উৎকীর্ণ করে দেয় :
‘He prayeth well, who loveth well
Both man and bird and beast.’
কারেন বি−ক্সেনের বাড়িতে ঢোকার পর থেকেই তার ব্যর্থ দাম্পত্য, প্রণয়, ফিঙ্ক হাটনের মৃত্যু, ঋণে আকণ্ঠ নিমজ্জিত কারেনের বাড়ির সব আসবাব বিক্রি করে দেওয়া, বাড়ি বিক্রি করে দেওয়া, ধূমপায়ী, নিঃসঙ্গ, অসুস্থ, আর্সেনিক খেতে থাকা লেখক, তার বাড়ির জানালায় দৃশ্যমান প্রেমের তীর্থ ঙং পাহাড়, তার একাকিত্ব, বেদনা, সবই আমার মধ্যে ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হয়। বাকি যে কয়দিন কেনিয়াতে ছিলাম কারেনের ঘোরেই আচ্ছন্ন ছিলাম আমি।

জাপানে কোদো উৎসবে

rs3.jpg
সাদো দ্বীপ
16_kodo_lg.jpg
২০০৬-এর আর্থ সেলিব্রেশন কোদো উৎসবে ড্রাম বাজাচ্ছেন দুই শিল্পী
When I dance
I cannot Judge
I cannot hate
I cannot separate myself from life
I can only be joyful & whole
That is why I dance
–Hans Bos
rs1.jpg…….
সাদো দ্বীপের পাশে সমুদ্রের মাঝে ছোট গোল নৌকায় লেখক
…….
কিয়োতোর এক সান্ধ্য আসরে আমার বান্ধবী স্যালি প্রথম জানায় দুদিন পর তারা যাচ্ছে কোদো উৎসবে। আমার দু’চোখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন দেখে সে জানায় নিগাতার কাছাকাছি জাপান সমুদ্রের সাদো দ্বীপে ড্রাম ও সঙ্গীত উৎসব। স্যালি ও উপস্থিত অন্য বন্ধুরা বলে, “তুমিও চলো, দারুণ এক অভিজ্ঞতা।” আমার দোনোমনো কাটে না। কোদো প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতেই, স্যালি, দেইদ্রা-দের চোখমুখের উদ্ভাস দেখে শেষমেশ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।
আমার বন্ধুরা কিয়োতো জার্নাল-এর স্টল বসবে বলে একদিন আগেই রওয়ানা হয়ে যায়। আমি জু’হাচি কিপ্পু টিকিট কিনি, ছাত্রছাত্রীদের জন্য বছরের বিশেষ সময়ে বিশেষ ছাড় দেওয়া টিকিট। সকালবেলা ট্রেনে চেপে অপূর্ব নৈসর্গিক সৌন্দর্যের ভিতর দিয়ে পার হই একের পর এক শহর। বেশ ক’বার ট্রেন বদলাই। ইট, কংক্রিট, পাহাড়, নদী, সমুদ্রে দৃশ্যপটের বদল ঘটে। পাহাড়, জঙ্গল, শহর আর স্বপ্নোপম উপত্যকার মধ্য দিয়ে নিগাতায় নায়্যেৎসু স্টেশনে পৌঁছাই। স্টেশনে নেমে ফেরির টিকিট কাটি। ফেরিতে উঠেই প্রথমে তিনতলার ডেকে চলে যাই। ক্রমশ দূরে সরে যেতে থাকে ম্রিয়মাণ হতে থাকা বন্দরের কোলাহল। আমার মতো অনেকেই ডেকে বসে উপভোগ করে জাপান সমুদ্রের উত্তাল জলরাশি। অল্প সময়ের মধ্যেই আর কোনোকিছুই দৃশ্যমান থাকে না। তিনতলার কেবিনরুমে এসে দেখি ব্যাকপ্যাক পাশে নিয়ে নানা বর্ণের নানা বয়সের নারী-পুরুষ নির্বিচারে কার্পেট-মোড়ানো মেঝেতে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কারো পায়ের কাছে মাথা, মাথার কাছে পা। সাদো দ্বীপে কোদো দর্শনার্থী এসব মানুষের বেশিরভাগই হয়তো কেউ কাউকে চেনে না, অথচ কী সহজে এ অন্যের পাশে বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। রুমের এক কোনায় একটুখানি খালি জায়গা পেয়ে এক মেয়ের পাশে আমিও শুয়ে পড়ি এবং মুহূর্তে ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যাই।
দূর থেকে দৃশ্যমান বিন্দুর মতো, সমুদ্রের মাঝে পাহাড় ঘেরা, কোলাহলপূর্ণ ছোট্ট সাদো দ্বীপে আমাদের ফেরি ভেড়ে। হোটেল, এটিএম ম্যাশিন-সহ উন্নত শহরের সব সুবিধাই এই দ্বীপে আছে। ফেরি থেকে নেমেই স্যালিকে খুঁজে বের করি। স্যালি বলে, “আগে কনসার্টের টিকিট কেটে নাও, আর খোঁজ নাও কোনো তাঁবু ভাড়া পাওয়া যায় কিনা। শুনেছি, এখানকার হোটেল, ব্যাকপ্যাকার্স, সব বুকড হয়ে গেছে। তবে কিছু তাঁবু ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে।” আমি ভয় পেয়ে যাই, শেষে খোলা আকাশের নিচে ঘুমাতে হয় কিনা। আমার বন্ধুরা সবাই কিয়োতো থেকেই তাদের তাঁবু নিয়ে এসেছে।
কনসার্টের টিকেটের লাইনে বেজায় ভিড়। সাদা, কালো, লাতিন, জাপানি, নানা দেশের ভলান্টিয়াররা হিমশিম খাচ্ছে ভিড় সামলাতে। কাউন্টারে জানলাম সে-রাতে কোনো ব্যাকপ্যাকার্স হোটেল খালি নাই। পরদিন রাতে তারা আমার জন্য ব্যবস্থা করতে পারবে। সাদো দ্বীপের প্রথম রাতে পাহাড়ের নিচে সারি সারি তাঁবুর মাঝে একটা তাঁবু ভাড়া পাই। রাতে ভয় লাগে। মনে হয় পাহাড়ের পাদদেশে তাঁবুতে যদি সাপ বা আনজানা কোনো পোকা ঢুকে কামড়ায়। অবশ্য জাপানিদের যে কোনো আয়োজনের ওপর ভরসা রাখা যায়। ভেতর থেকে তাঁবুর চেইন টেনে দিলে এটি হয়ে ওঠে একটা নিঃশ্ছিদ্র খুপরি। কাছাকাছির মধ্যেই আমার বন্ধুরা, স্যালি আর দেইদ্রা ঘুমাচ্ছে। আমার ঘুম আসে না। বাইরে ড্রামের শব্দ। সমুদ্রতীরে লোকজন নাচছে, গাইছে। তাঁবু ছেড়ে উঠে আমিও সমুদ্রতীরে চলে আসি। একপাশে দক্ষিণ আফ্রিকার সাদা-কালো নারী-পুরুষেরা ফায়ার ড্যান্স করছে। কাছেই ড্রাম বাজাচ্ছে, গিটার বাজাচ্ছে, গাইছে একদল জাপানি নারী-পুরুষ। সমুদ্রগর্জন। অন্ধকারে আগুন নিয়ে নৃত্যরত মানুষ, রাতের কুয়াশা, ড্রামের শব্দ, মনে হয় পরাবাস্তব কোনো ছবির ভিতরে আমি। দু’চোখ ঘুমে জড়িয়ে এলে তাঁবুতে ফিরে যাই। ভোররাতে ঘুম ভেঙে যায় গরমে। বাইরে আলো ফুটছে। সাগরপারে এসে দেখি রাতে যারা নাচছিল বা গাইছিল তাদের অনেকেই বেলাভূমির বালিতে পড়ে শিশুর মতো ঘুমাচ্ছে।
রাতে ঘুম না হওয়ায় প্রথম কনসার্টের দিন সকালবেলা থেকেই সাদোর সমুদ্রতীরেই সাম্বা ড্যান্স, জাপানি স্থানীয় নাচ, নানা দেশের নানা নাচ চলছে। এ যে অনুষ্ঠানসূচির অংশ তা নয়; বিভিন্ন দেশ থেকে আগত দর্শনার্থীরাই নাচছে, আরেক পাশে নাচছে জাপানিরাও। সাদো দ্বীপে তিনদিন দিনরাত চলতে থাকে জাপানি লোকজ নৃত্য, ড্রাম, আফ্রিকান সঙ্গীত-নৃত্য, সাম্বা নৃত্য, আগুন নৃত্য, পৃথিবীর নানা প্রান্তের নানা উৎসবের তূরীয় আমোদপ্রমোদ। শহরের রাস্তায় সুদৃশ্য ড্রামসহ মুখোশ-পরা দেবতা-অপদেবতারা ঘুরছে দ্বীপকে বিপদ্-মুক্ত করতে। সাগরপারে গিয়ে বসি। রাতে ঘুম না হওয়ার ক্লান্তিতে ফেরি-বন্দরের কাছে বাঁধানো পাড়ের সিঁড়িতে গা এলিয়ে দেই এবং তৎক্ষণাৎ গভীর ঘুমে তলিয়ে যাই। ঘুম ভেঙে দেখি প্রায় এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। ক্লান্তির চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলাম আমি। নিজেরও অবাক লাগে এত হাজার মানুষের চোখের সামনে, ড্রাম আর সঙ্গীত-নৃত্যের এই কলরব-রৌরবে কীভাবে ঘুমিয়ে পড়লাম আমি! দুপুরে মঙ্গোলীয় আর থাই স্টল থেকে খাবার কিনে খাই। এই কোলাহল থেকে একটু দূরে, উঁচু পাহাড়ের পাশে, লোকজন টিকেট কিনে সমুদ্রে গোল-গোল নৌকায় চড়ছে। ঐতিহ্যবাহী পোশাক-পরা সাদো দ্বীপের নারীরা এইসব নৌকার চালক, সমুদ্রের মাঝে ছোট গোল নৌকায় এইসব নারীদের দেখে মনে হয় “কমলে কামিনী”। আমিও টিকিট কেটে লাইনে দাঁড়াই। দুলতে-থাকা ছোট নৌকায় সুন্দরী চালকের বরাভয় সত্ত্বেও, শক্ত হয়ে বসে থাকি।
rs2.jpg
বিকাল পাঁচটায় শিরোই পাহাড়ের পাদদেশে দীর্ঘ লাইন। “আর্থ সেলিব্রেশন”-এ অংশ-নেওয়া স্বেচ্ছাসেবীদের হাতে শিরোই পাহাড়ের শানুদেশ থেকে পাহাড়চূড়ায় ওঠার পাথুরে পথে দারুণ দৃষ্টিনন্দন চতুষ্কোণ ফ্রেমে ঝোলানো অফ-হোয়াইট একেকটা লণ্ঠন। প্রত্যেক লণ্ঠনের কাগজে কালো ক্যালিগ্রাফিতে লেখা একটা করে হাইকু (জাপানি ঐতিহ্যবাহী তিন-লাইনের কবিতা)। পাহাড়ে নেমে-আসা সন্ধ্যার আঁধারে এমন স্নিগ্ধ মৃদু উদ্ভাস, আলোকসজ্জার এমন নান্দনিক রূপ, আমি জীবনে কোনোদিন আর কোথাও দেখি নাই।
কোদো মানে হৃৎস্পন্দন, সমুদ্র মন্থন করে যা সুর তুলে আনে। সার বেঁধে অনেকগুলো ড্রামে হালকা স্টিক দিয়ে একসাথে গুঞ্জন তোলে। যেন লক্ষকোটি মৌমাছি একত্রে অবিরাম গুনগুনিয়ে চলেছে। সেই গুঞ্জন সমস্ত মনপ্রাণচেতনায় প্রবাহিত, তরঙ্গায়িত হতে থাকে। হঠাৎ অট্টনিনাদে একবার ড্রাম বেজে ওঠে, তারপরে একেবারে নিশ্ছিদ্র নৈঃশব্দ্য। অন্তরীক্ষ ভেদ করে যাওয়া ড্রামের সেই শব্দের অনুরণন দীর্ঘকাল ধরে কনসার্টের সব দর্শক-স্রোতা সমস্ত সংবেদনে অনুভব করে। এতে বিমূঢ়, বিহবল দর্শকেরা এই বাদ্যধ্বনি ও সঙ্গীতে সাদো দ্বীপের অরণ্য ও সমুদ্রের গভীরতাকে হৃদয়ঙ্গম করে। দক্ষিণ আফ্রিকার কালো মেয়ে সোফি বলে, “কোদোর এই কনসার্ট আধ্যাত্মিক এক অভিজ্ঞতা, একমাত্র জাপানিরাই পারে এই সৌন্দর্য তৈরি করতে।” কোদো দেখে ফেরা যে-কারো সাথেই কথা বলুন আপনি, তাদেরই মুখ থেকেই দেখবেন বিমূঢ়তা-বিহ্বলতা প্রকাশক শব্দের পর শব্দ বেরিয়ে আসছে। অসংখ্য ড্রামের বজ্রগর্জন আর কলাবিৎদের নানা সূক্ষ্ম কারুকলা, শব্দ ও নৈঃশব্দ্যের এমন প্রকৃতিজোড়া নকশিকাঁথা, এ-অভিজ্ঞতার রেশ জীবনে কেটে যাবার নয়। প্রকৃতি থেকে প্রেরণা নেওয়া নতুন কিছু নয়। কিন্তু সমুদ্র, বাতাস তথা প্রকৃতি মন্থন করে ড্রামে বা বাঁশিতে সুর তোলা, নৃত্যের ছন্দ তোলা কোদো দলেই সম্ভব।
নিউইয়র্কে জুলিয়ার্ড স্কুলে জ্যাজ সঙ্গীতের ওপর পড়ালেখা করে ওয়াতানাবে কাউরু যখন পরিকল্পনা করেন অফ-সেন্টার (কেন্দ্রাতিগ) কিছু একটা করবেন, তাঁর মনে হয় দেশে ফিরে কোদো দলে বাঁশি বাজানোই তাঁর জন্য হতে পারে আদর্শ স্থানান্তর। ওয়াতানাবে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমি যখন কোদো দলে ইন্টারভিউ দিতে আসি, দলের প্রধান বংশিবাদক ইয়ামাগুচি মতোফুমির সাথে দেখা হলে বলি, ‘আপনার কাছে বাঁশি বাজানো শিখতে খুবই আগ্রহী আমি। ক্লাসিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড আছে আমার।’ ইয়ামাগুচি বলেন, ‘বই পড়ো, সমুদ্র দর্শন করো, বাতাসকে বুঝতে চেষ্টা করো, পাহাড়, বৃক্ষ দ্যাখো, প্রকৃতি থেকে থেকে সুর তুলে নাও।’ টানা দশবছর কোদো দলে থেকে, সদস্যদের মধ্যে ‘বুশিদো’ স্পিরিট গড়ে তোলেন তিনি, যার মূলমন্ত্র হলো: বিশ্বস্ততা, শৃঙ্খলা আর দেশপ্রেম।
rsj.jpg……..
জাপানি পোশাকে জাপানি মেয়েদের সঙ্গে
…….
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোদোর উদ্বোধনী প্যারফরম্যান্স হয় ১৯৮১ সালে, বার্লিন ফেস্টিভাল-এ। তারপর থেকে এটা ক্রমাগত ছড়িয়ে গেছে, আরও সংহত আর বৈচিত্র্যপূর্ণ হয়েছে। বর্তমানে কোদো বহদূরবিস্তৃত হয়েছে। নোবেল পুরস্কার অনুষ্ঠানে, ওয়ার্ল্ড কাপ ফেস্টিভিটি, কার্নিয়েজ হল, সাদো দ্বীপের গ্রামের স্কুল… সর্বত্র। টানা তিনদিন ধরে জাপান সমুদ্রে সাদো দ্বীপে কোদো উপভোগ করা মানে শুধু কনসার্টে যাওয়া নয়, কোদোর মধ্যে দিয়ে জাপানি সংস্কৃতির দর্শন, অভিজ্ঞতা, আদর্শের মধ্য দিয়ে যাওয়া। পাহাড়চূড়ায়, খোলা অরণ্যে তিনটি পূর্ণাঙ্গ দিবসে কোদো কনসার্ট, আর্থ সেলিব্রেশন, সঙ্গীত, পরিবেশ আন্দোলন, প্যাশন, যূথবদ্ধতা, সবকিছুর মহামিলনমেলা। শিল্পোন্নয়নের কালে জাপানের গ্রামগুলো দ্রুত যুবা-শূন্য হয়ে পড়ে। সব তরুণই শহরে চলে যায় উচ্চশিক্ষার্থে বা চাকুরির খোঁজে। তাদেরকে গ্রামে ফিরিয়ে আনতেই কোদোর জন্ম। ঐতিহ্যবাহী তাইকো (ড্রাম) বাদনের এক নবজন্ম ঘটে এতে। এটি শুধু ড্রাম বা বাঁশি উৎসব নয়, বরং ড্রাম, বাঁশি, পাপেট, থিয়েটার, সবকিছু মিলিয়ে এই কোদো কনসার্ট এবং আর্থ সেলিব্রেশন।
সাদো দ্বীপে দ্বিতীয় রাতে ঘুমাই এক ব্যাকপ্যাকার্স হোটেলে। আমি ছাড়া দুই ব্রিটিশ ভদ্রমহিলা ছিল আমার রুমমেট, সারা ম্যাকডোনাল্ড ও পলি মিচেল। গোসল-শেষে কিছুসময় আড্ডা দেই। সারা এবং পলি দু’জনেই ইরাকে ব্রিটিশ আক্রমণের সমালোচনা করছিল। মেঝেতে রোল-করা তোশক-চাদর বিছিয়ে মাথার কাছের টেবিল ফ্যান ছেড়ে আমরা তিনজন ঘুমিয়ে পড়ি। পরদিন বিকাল পাঁচটায় শিরোই পাহাড়ের পাদদেশে দীর্ঘ লাইন। লাইনে আমার ঠিক পিছনে দাঁড়ানো কিমোনো পরিহিতা এক প্রৌঢ়া। কিমোনো ও খড়মে ছন্দোময় তার হাঁটার ভঙ্গি আর তার চাহনি বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছিল কিয়োতোর গীয়ম এলাকায় দেখা গেইশাদের কথা। তার দিকে তাকিয়ে হেসে ‘হাই’ বলতে সে তার পরিচয় দেয় একজন শিল্পী বলে। তার চাহনি, ভ্রূকুটি, হাসি, দাঁড়ানোর ভঙ্গিমা, সব যেন শিল্প। ষাটোর্ধ্ব এই ভদ্রমহিলা জানায়, একসময় সে গেইশা ছিল। তোকিওতে গান গায় এখনও।
দ্বিতীয় দিনের শিরোইয়ামা পাহাড়চূড়ার কনসার্টে জাপানি কোদো দলের সাথে যোগ দেয় ন্যুইয়র্ক থেকে আগত আফ্রিকান ট্যাপ ড্যান্সাররা। আফ্রিকান নৃত্যদলের দলনেতা স্টেজে এসে বলেন, আগে আমরা ছিলাম অন্ধকারের যুগে, তারপর ছিলাম দাস, তারপর নিগ্রো, তারপর নিগার, এখন আমরা জেগে উঠছি। পায়ের গোড়ালি দিয়ে শব্দ ও ছন্দ তুলে নৃত্য আর আফ্রিকার ড্রামের নিনাদ দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ রাখে। আফ্রিকার দলের দলনেতা বলেন, “আমাদের পূর্বপুরুষদের যখন দাস হিসেবে নিয়ে আসে আফ্রিকা থেকে, বুনো প্রকৃতি, মাদল, কোনোকিছুই আমাদের আর থাকে না। কিন্তু আমাদের রক্তের ভিতরে নাচ-গান। আমাদের পায়ের গোড়ালিতে ছন্দ তুলে শব্দ করে আমরা বাদ্যযন্ত্রের অভাব পুষিয়ে নেই। সঙ্গীত, নৃত্য, ড্রামে পুরো আফ্রিকা নেমে আসে জাপানের সাদো দ্বীপে শিরোই পাহাড়ের চূড়ায়।”
কোদোর প্রশিক্ষণ বরাবরই চরম শ্রমসাধ্য। ইদানীং অবশ্য কোদোর সদস্যদের বিয়ের অনুমতি হয়। মদ্যপান বা ধূমপান সংক্রান্ত আইনও খানিকটা সহজ করা হয়েছে। কাঠের তৈরি এক প্রাচীন স্কুলঘরে কোদো দলের শিক্ষার্থীরা শিক্ষাগ্রহণ করে। কঠিন অনুশীলনে চলে তাদের শিক্ষাজীবন। প্রতিভোরে ঘুম ভেঙে নিজ হাতে বাড়িঘর ধুয়ে সাফ করে নিজ হাতে কাপড় কেচে দশ কিলোমিটার দৌড়ায় প্রশিক্ষণার্থীরা। পাহাড়ি পথ ধরে নেমে সমুদ্রতীরে দৌড়ায় পাঁচ কিলোমিটার পথ, তারপর ফিরে আসে। স্টেজে সুবিশাল ড্রাম বাজানোর জন্য শরীরকে সক্ষম করে তুলতে হয়। বিশেষ করে “মিয়াকে” বাজাতে হয় লো স্টান্স-এ, যা কীনা হাঁটু ও কোমরের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। ওদাইকো, ইয়োদাইশি, মিয়াকোজিমা ইত্যাদি ঐতিহ্যবাহী ড্রাম পিটানোতেও প্রচুর শারীরিক শক্তির প্রয়োজন। হাঁটু মুড়ে আধবসা ভঙ্গিতে টানা দশ-পনের মিনিট বসে থাকাও কষ্টদায়ক। দলের সদস্যদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে হাঁটু মুড়ে বসার ভঙ্গি দর্শকদের কাছে দারুণ শৈল্পিক ও দৃষ্টিনন্দন মনে হয়। কোদো দলের সদস্যদের সবারই দ্বীপে নিজস্ব বাগান ও ধানক্ষেত আছে। সবাই মিলে ধানচাষ করে। বাগান করে। কোনো কীটনাশক ব্যবহার করা হয় না সেখানে।
ব্রিটিশ মেয়ে জেন-এর সাথে স্যালি পরিচয় করিয়ে দেয়। জেন জানায় টানা চারদিন সাইকেল চালিয়ে কিয়োতো থেকে নিগাতায় সাদো দ্বীপে এসেছে সে। সাইকেলে তার তাঁবুও নিয়ে এসেছে। রাতে সাগরের তীরে বা অন্য কোথাও তাঁবু টাঙিয়ে ঘুমিয়েছে। মুগ্ধতা নিয়ে জেনকে দেখি। জাপান থাকার সময়ে একদিন সর্বোচ্চ চল্লিশ কিলোমিটার বন্ধুদের সাথে সাইকেল চালিয়েছিলাম। সেটাকে তখন এক বিশাল বাহাদুরি মনে হয়েছিল। তাও মাঝখানে দুই ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়ে দিনশেষে সেদিন আমি মরার মতো ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম।
দ্বিতীয় দিনের কনসার্ট শেষে রাত ১২টায় সাদো দ্বীপ থেকে রওয়ানা হই। উৎসবমুখর দ্বীপ পিছনে ফেলে জাহাজে চড়ি। স্যালি, আলভি, দেইদ্রা, মাইকা সবাই হাত নেড়ে বিদায় জানায়। ডেকে দাঁড়িয়ে দেখি স্বপ্নের সাদো দ্বীপ ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। রাত আড়াইটায় নামি নায়েৎসু বন্দরে। স্টেশনে নেমে গন্তব্যস্থলের ট্রেনের সময় জেনে নেই। ভোর ছয়টার ট্রেন, ভাবছি এসময়টা কী করব। স্টেশনের আশেপাশে কোনো হোটেলে উঠব কীনা। দেখি, আমার চারপাশে শীতাতপ-নিয়ন্ত্রিত ওয়েটিংরুমে জাপানি এবং সাদাচামড়ার তরুণ-তরুণীরা চাদর-বিছানা বের করে স্টেশনের মেঝেতে ঘুমিয়ে পড়ছে। আমিও দ্বিধা কাটিয়ে তাদের অনুসরণ করি।
ট্রেনে আমার সামনে বসে জাপানি এক প্রৌঢ়া। তার পাশে পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর বয়সী রোগা এবং ক্লান্ত এক তরুণ ঘুমিয়ে আছে। এদের সাদো দ্বীপে নানা সময়ে দেখেছি। সমুদ্রে গোসল করতে দেখেছি। তবে ছেলেটিকে সবসময় বিষণ্ন মনে হয়েছে। ভদ্রমহিলা হিরোশিমায় গবেষণা করে। আমাকে জানায় ১৯৭২ সালে গবেষক হিসাবে সে বাংলাদেশে এসেছিল। পাশের ছেলেটিকে দেখে জিজ্ঞাসা করি, “তোমার ছেলে? সে কি অসুস্থ?” লাজুক হাসিতে সে বলে, “আমার বয়ফ্রেন্ড সে।” একটু ধাক্কা খাই আমি। এ-পর্যন্ত যতবার এই অসমবয়সী যুগলকে দেখেছি, ছেলেটির চোখে-মুখে এক মুহূর্তের জন্য কোনো প্রেমিকের চোখের আলো আমি দেখি নাই। কোনো আনন্দ নাই, সারাদিন তাকে ক্লান্ত, অসুস্থ, বৃদ্ধার ইচ্ছার দাস মনে হয়েছে।
ঢুলুঢুলু দু’চোখে অথবা ঘুমে, পাহাড়, সমুদ্র, উপত্যকা, নানা শহর পার হয়ে শিগায় আমার বাড়ি পৌঁছাই।

রোদ নদী পাহাড় আর লামাদের কাছে

13.JPG
১৭০০ সালে তিব্বতি আগ্রাসন ঠেকাতে বানানো ভুটানি ’জং’।
৮ ডিসেম্বর ২০১০, তাশি নামগায়
ভুটানের পারো শহরে একটি রিসোর্টের রেস্টুরেন্টে বসে আছি আমি আর আমার মা। রিসোর্টের নাম ‘তাশি নামগায়’। লক্ষ করছি এই রিসোর্টে যারা আমাদের সাথে সকালের নাস্তা করছে তাদের কারো মধ্যেই তাড়াহুড়া নেই। কয়েকটি ওয়েইটার ছেলেমেয়ে এদিক-ওদিক খাবার আনা-নেয়া করছে। তাদের হাঁটাচলা ও কথা বলার ধরনে কোথাও আতিশয্য নেই।
bigri_huye_ghar1.JPG…….
ভেঙে যাওয়া পুরানো ডিজাইনের একটি বাড়ির সামনে লেখক।
…….
এক ধরনের ধীরস্থির ভাব, যেন কোনো কিছুই তাদের উত্তেজিত করে না। যেন খাবার আসতে একটু দেরি করলে কী আর হবে? চোখে ভক্তি নেই, শ্রদ্ধা আছে। কথা বলার ভঙ্গিতে তোষামোদি নেই, হাসির ছটা। ১৯৭২ সালে জিগমে সিনগে ওয়াংচুক কি এই কারণে “সামগ্রিক সুখ সূচক” বা “গ্রস হ্যাপিনেস ইন্ডেক্স” ধারণার প্রবর্তন করে গিয়েছিলেন?
—————————————————————–
চ্যানেল বদলাতে বদলাতে দেখি একটা ভুটানি চ্যানেলে দেখা যাচ্ছে একটা মেয়ে বাথরুমে বসে কাঁদছে। কান্নার অভিনয়টা খুব বাস্তব মনে হচ্ছে। আমার মা বলে, “পৃথিবীতে সব দেশেই দেখি মেয়ে মানুষ কান্দে।” মায়ের মন্তব্য শুনে আমি হাসলাম।
—————————————————————-
এই কারণেই কি রাজা পৃথিবীকে বোঝাতে চেয়েছিলেন যে একটি দেশের উন্নয়ন বিচার করা উচিত সেই দেশের মানুষের সুখশান্তি দিয়ে, আর্থিক সম্পদ দিয়ে নয়? যখনই ভাবছি একথা দেখি একজন সাদা চামড়ার মহিলা হন্তদন্ত হয়ে রেস্টুরেন্টে ঢুকলেন। হাতে ল্যাপটপটা খুব উত্তেজিত হয়ে রেখে নাস্তা খোঁজা শুরু করলেন। তিনি নাস্তা প্লেটে নিচ্ছেন আর তার সঙ্গী আরেক মহিলাকে বলছেন রাতে তার ভালো ঘুম হয়নি। উনাদের কাজ বিষয়ে দুই একটা কথা কানে আসতেই নিশ্চিত হলাম উনি কোনো উন্নয়ন গবেষক। আমার মনে হল এই মহিলা ভুটানিদের জীবন নিয়ে ভুটানিদের চাইতে বেশি চিন্তিত। তা না হলে সবাই এত শান্ত, এই মহিলা কেন এত অশান্ত?
রেস্টুরেন্টের সামনে খোলা জায়গায় রোদ দেখা যাচ্ছে। আমি আর আমার মা সকালের নাস্তা সেরে কফি হাতে খোলা জায়গায় গিয়ে বসলাম। রিসোর্টের পাশ দিয়েই একটা নদী গেছে। আর ওই পাড়ে শুধু পাহাড় আর পাহাড়। নদীর নাম জানা নেই। পাহাড়ের নামও জানা নেই। তবে মাসের নাম যে ডিসেম্বর সেটা না জানলেও জানতে হবে কারণ কনকনে ঠাণ্ডা সারাক্ষণই মনে করিয়ে দেবে “এটা ডিসেম্বর মাস!” গতকাল এসে পৌঁছেছি আমরা। গতকাল কোথাও যাইনি। আজকে সকালেই আমরা বের হব থিম্পুর উদ্দ্যেশে। কিন্তু এই রোদ, এই পাহাড়, এই নদী ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছে না। আমি আর আমার মা ঠিক করে এসেছি আমরা আমাদের যা ইচ্ছা করে করবো। আমাদের তাই কোনো তাড়াহুড়া নেই। বসলাম ততক্ষণ যতক্ষণ না একজন ওয়েইটার এসে বলল “ড্রাইভার আগিয়া।”
নিচে গিয়ে দেখি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে একটা ছোট নীল গাড়ি আর তার ড্রাইভার। ড্রাইভারের নাম সোনেম, ৬ ফুট লম্বা, পরনে ছাই রঙের ভুটানি পোশাক। সোনেমকে দেখে মনে হল সে আমাদের দেখে খুশি হয়েছে। আমরাও সোনেমকে দেখে খুশি হলাম। আমাকে আর মাকে আন্তরিকতার সাথে ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে গাড়িতে উঠতে বলল সোনেম। শুরু হল আমাদের যাত্রা পাহাড়ি রাস্তায়। আমাদের গাড়ি চলতে শুরু করলো থিম্পুর উদ্দ্যেশে। পাহাড়ি পথ, চিকন একটা নদী সুতার মত পাহাড়গুলিকে যেন এক সাথে বেঁধে রেখেছে।
আজকের দিনটা উজ্জ্বল। পাহাড়ের কাঁধ ঘেঁষে রোদ এসে চিকচিক করছে নদীর পানি। মা আর আমি রোদ পেয়ে হাতপা ছড়িয়ে গাড়ির ভিতর বসে আছি। দূরে দেখা যায় পাহাড়ের চূড়া। এর মধ্যে ঘর বেঁধে বসে আছে মানুষ। এরা এখানে বেশির ভাগ কৃষি কাজ করে। এখন শীতকাল তাই কোনো আবাদী ক্ষেত দেখা যাচ্ছে না সেরকম। কিন্তু বোঝা যাচ্ছে এখানের মানুষের প্রধান কাজ কৃষি কাজ, পশুপালন আর উঠানে সব্জিবাগান করা।
২.
দেড় ঘণ্টা লাগল থিম্পু পৌঁছাতে। থিম্পু ভুটানের রাজধানী। তাই মনে মনে আশা করছিলাম শহরটা বড় হবে। পারোর মত ছোট হবে না। পারো শহরের চাইতে থিম্পু বড় কিন্তু যত বড় ভেবেছিলাম তত বড় না। আসলে ঢাকা, নিউইয়র্ক, ইস্তানবুল বা ব্যাঙ্কক শহর দেখলে থিম্পুকে শহর হিসাবে ছোট মনে হওয়ারই কথা। শহরে ঢুকে প্রথমে আমরা দুপুরের লাঞ্চ করলাম। সোনেম আমাদের নিয়ে গেল একটা শস্তা হোটেলে। হোটেলের নাম তান্দিন। এখানে যেমন ইন্ডিয়ান টুরিস্ট আসে তেমনি এটি ইউরোপীয়দের মধ্যেও যে জনপ্রিয় সেটা বোঝা গেল বিভিন্ন ধরনের মানুষের আসা-যাওয়া দেখে। হোটেলটার ভিতরে খুব ঠাণ্ডা। আমরা হোটেলে রেজিস্ট্রেশন করে ব্যাগ রেখে বের হয়ে গেলাম। প্রথম কাজ ভুটানের আরেকটি ডিসট্রিক্ট পুনাখা যাওয়ার জন্য ইমিগ্রেশন অফিস থেকে পারমিশন নেয়া। মাকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে আমি পাসপোর্ট নিয়ে ইমিগ্রেশন অফিসে ঢুকলাম। সেখানে দেখা হল নানানদেশী টুরিস্টদের সাথে। এর মধ্যে কালো পোশাক পরে বিশাল মোটর সাইকেল নিয়ে থামতে দেখা গেল কয়েকটি যুবককে। এরা এসেছে ইন্ডিয়া থেকে মোটর সাইকেল নিয়ে ভুটান ভ্রমণ করতে। পৃথিবীতে কত ধরনের ভ্রমণপিয়াসী মানুষ আছে!
ইমিগ্রেশন অফিস থেকে বের হয়ে আমরা থিম্পু শহর দেখতে বের হলাম। আমাদের হাতে মাত্র এক ঘণ্টা আছে। এর মধ্যে গাড়িতে করে ঘোরাঘুরি করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। গাড়ি ঢাল বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। অনেক ওপরে একটা জায়গায় গিয়ে সোনেম গাড়ি থামাল। আমরা নামলাম। সোনেম দূরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল ওই দিকে রাজার বাড়ি। কিন্তু খুব বেশি কিছু দেখতে পেলাম না। পড়ন্ত বিকালে পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখতেই বেশি ভাল লাগছিল। সোনেম আমাকে আর মাকে ছবি তুলে দিল আর বলল সে আমাদের এখন নিয়ে যাবে আর্ট স্কুলে। সোনেমের কথা শুনে আমি আর সময় না নিয়ে গাড়িতে উঠে গেলাম। এই শীতে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকাটাও কঠিন। গাড়ি একই পথ ধরে আবার নিচে নামতে থাকলো। প্রায় ১৫ মিনিট ড্রাইভ করার পর গাড়ি গিয়ে পৌঁছাল একটা বিশাল গেটের সামনে। আমি আর মা গেট দেখেই খুশি। এই গেটটিকে আর্ট স্কুলের গেট মনে হচ্ছে না, মনে হচ্ছে একটা মন্দিরের গেট। ভিতরে ঢুকে দেখি লামাদের পোশাক পরে ছাত্রছাত্রীরা ঘুরছে। একটা ক্লাসরুমে উকি দিয়ে দেখি ভিতরে ছেলেমেয়েরা কেউ কেউ গোল হয়ে বসে কথা বলছে, কেউ কেউ ভাষ্কর্য বানাচ্ছে, কেউ কেউ পটারির সরঞ্জাম জড়ো করছে।
কয়েকটা ভাস্কর্য কাছে থেকে দেখার চেষ্টা করলাম। বেশির ভাগই বৌদ্ধের মূর্তি। বিভিন্ন আকৃতি ও মাধ্যমের। একটা কাজের দিকে চোখ আকৃষ্ট হল। কয়েকটা ছোট ছোট নারীমূর্তি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে নাচের ভঙ্গি করে। কোনো মূর্তিরই হাত নেই। আরেকটু কাছে গিয়ে ভাল মত দেখি প্রত্যেকটা মূর্তি একই ভঙ্গিতে দাঁড়ালেও একেকটা মূর্তির হাতের ও পায়ের পজিশন আলাদা। এই মূর্তিগুলো একসাথে দেখে প্রথম মনে হয়েছিল মডার্ন ভাস্কর্য কিন্তু কাছে গিয়ে দেখি পুরানো একটা ফর্ম। আমার একটু আগ্রহ হল জানতে যে ভুটানের আধুনিক শিল্পচর্চার ধরনটা তাহলে কী? এখানকার শিল্পচর্চা কি মূলত ধর্মকেন্দ্রিক? এর পর যতদিন ছিলাম খোঁজার চেষ্টা করেছি নতুন কোনো ফর্ম দেখা যায় কিনা। আমার চোখে পড়েনি বলে যে নেই সেটাও মেনে নিতে পারি না। বের হয়ে সোনেমকে জিজ্ঞেস করলাম আর কোনো বড় আর্ট স্কুল বা কলেজ আছে কি না। সোনেম বলল, নেই।
সন্ধ্যা নেমে এসেছে প্রায়। আমরা হোটেলের দিকে রওয়ানা দিলাম। প্রায় চলে এসেছি কাছে তখন মনে হল একটু হ্যান্ডিক্রাফটের দোকান ঘুরে গেলে কেমন হয়। কিন্তু গিয়ে দেখি ততক্ষণে সব দোকান বন্ধ হয়ে গেছে। কিছু দোকান খোলা দেখা যাচ্ছিল, দেখে নামলাম। কিন্ত গিয়ে বুঝলাম এগুলো টুরিস্টদের দোকান নয়। এখানে পাওয়া যায় নিত্যনৈমিত্তিক ব্যবহার্য্য জিনিস। কী ধরনের কাপড় বা জিনিসপত্র ভুটানিরা ব্যবহার করে সেটা বোঝার জন্য একটু ঘুরাঘুরি করলাম। আবিষ্কার করলাম যা পাওয়া যায় তার অধিকাংশই ইন্ডিয়া, চায়না ও বাংলাদেশ থেকে আসা। একটু হাঁটাহাঁটি করে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম। কিন্তু হোটেলের ভিতর এত ঠাণ্ডা যে মন চাইল রেস্টুরেন্টে বসেই কাটাই। আমি আর মা খাবার অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করছি তখন দেখি আমাদের পাশের চেয়ারে এসে বসেছে একজন লম্বা ইয়োরোপীয় লোক আর তার সাথে একজন ইন্ডিয়ান। তারা ঢুকেই প্রথমে দুইটা বিয়ার অর্ডার দিলেন। তাদের কথা যাতে শুনতে না হয় সে জন্য আমি টিভির দিকে তাকালাম। কিন্তু কথা না শুনে থাকা যাচ্ছে না। কারণ তারা কথা বলছেন জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে এবং ইন্ডিয়ান ভদ্রলোক ব্যাখ্যা করছেন কেন তিনি মনে করেন এই জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে উন্নয়ন সংস্থাগুলি যতটা উদ্বিগ্ন ততটাই নিষ্কর্ম!
আমি ভাবলাম, গত কয়েকদিন ধরে আমি জলবায়ু পরিবর্তনের উপর লিখছি কিন্তু এখানে এসেও দেখি এই কথাই শুনতে হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে চিন্তিত ব্যক্তিরা এখানেও পৌঁছে গেছে!
যেহেতু মা চুপচাপ বসে আছে আর পাশের টেবিলের লোকগুলোর গলার আওয়াজ বিয়ারের জোরে আরো বাড়ছে–তাদের গল্প শুনতে শুনতে খাওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায়ই ছিল না। চিকেন মোমো, ভাত, মাছ, আর সব্জি দিয়ে আমরা প্রায় এক ঘণ্টা ধরে ডিনার করলাম। তারপর মা আর আমি খরগোশের মত প্যাকেট হয়ে লেপের নিচে ঢুকে গেলাম।
৯ ডিসেম্বর ২০১০, তান্দিন
থিম্পুর তান্দিন হোটেলের ভিতর যমের ঠাণ্ডা। বিছানা থেকে উঠতে খুব কষ্ট হচ্ছিল কিন্তু উঠে রেস্টুরেন্টে বসে যখন পুরি-সব্জি খাওয়া শুরু করলাম তখন মজার খাবারের আমেজে ঠাণ্ডার কথা ভুলে গেলাম। আরো ভুলে গেলাম আগের রাতের শীতের স্মৃতি, যখন গাড়ি চলতে শুরু করল পাহাড়ি রাস্তার আঁকাবাঁকা ঢাল দিয়ে পুনাখা শহরের দিকে। যত বেলা যায় রোদের তেজ তত বাড়তে থাকে। বেলা সোয়া এগারোটায় শহর ছেড়ে গাড়ি যখন গ্রামের পাহাড়ি রাস্তা ধরে যাচ্ছে তখন দেখি রাস্তার ধারে টেবিলের উপর বিভিন্ন প্রকার ফল সাজিয়ে বসে আছে ভুটানি মহিলারা। সোনেমকে বললাম থামতে। বিভিন্ন রঙের ও সাইজের আপেল পলিথিন প্যাকেটে ভরে বিক্রি করছে এক মহিলা। তার পিছনে সূর্য পাইন গাছ আর শুকিয়ে যাওয়া আপেল গাছের মাঝখান থেকে উঁকি দিচ্ছে। এরকম আপেল গাছ ঘেরা আপেলের দোকান থেকে আপেল কিনে খেতে মন চাইবেই। কিন্তু আপেলের চেহারা দেখে সেই ইচ্ছাটা আর করল না। কারণ এটা আপেলের সিজন না। দেশে-বিদেশে রফতানির পর অবশিষ্ট আপেলগুলি প্যাকেটে সংরক্ষিত হয়ে এই মুহূর্তে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। এদের স্বাস্থ্য তত ভাল না, জায়গায় জায়গায় পচন দেখা যাছে। এর মধ্যেও বেছে কয়েকটা আপেল কিনলাম। মা গাড়িতে উঠে আপেল খাওয়া শুরু করল কচ কচ শব্দ করে।
আপেল খাওয়ার কচ কচ শেষ হতেই দেখি ব্লু পাইন গাছের ঘনত্বও বাড়ছে। আমরা যেই পাহাড়ের উপর দিয়ে যাচ্ছি সেটাতে ব্লু পাইন গাছ বেশি। কিন্তু দূরে পাহাড়ের উপরে যে পাইন গাছ দেখা যাছে তার জাতটা আবার ভিন্ন। পাইন গাছ দেখতে দেখতে আমরা পৌঁছালাম একটা রাস্তার বাঁকে। এখান থেকে দূরে বিভিন্ন ধরনের পাহাড় দেখা যায়। সবচাইতে কাছেরগুলি সবুজ আর বাদামি, তার পরের সারি নীল এবং তার পরের সারি সাদা। নাম না জানা যেই সব চূড়া মাথায় বরফ নিয়ে স্থির দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের চোখ চলে যায় সেইসব অজানা সাদার দিকে। মা বলল দার্জিলিংয়ে এরকম সারি সারি পাহাড়ের দৃশ্য দেখা যায়। এইসব দৃশ্য আমাদের এত টানে কেন? এই সব দৃশ্য কেন এত রহস্যে ঢাকা? এর মধ্যে কি লুকিয়ে আছে আমাদের জন্ম মৃত্যু, আমাদের আগের ও পরের জন্ম?
আমার মনে হচ্ছিল সোনেমের একটু রেস্ট দরকার। আমাদের বা দিকে পাহাড় আর ডান দিকে সারি সারি গাছ। আমি সোনেমকে বললাম চা খাওয়ার জন্য কোথাও থামতে। সামনে একটা রেস্টুরেন্ট দেখে সোনেম গাড়ি থামাল। বেলা সাড়ে এগারোটা হবে তখন। রেস্টুরেন্টের ভিতরে কাস্টমাররা ঘরোয়া পরিবেশে চা খাচ্ছে আর টিভি দেখছে। আমিও একটা চা নিলাম। কাউকে দেখে বোঝার উপায় নাই কে কাস্টমার আর কে রেস্টুরেন্টের লোক। সোফায় বসে থাকা যুবককে জিজ্ঞেস করলাম “আপ ইয়াহাপে কাম কারতেহে?”
উনি একটু হেসে জবাব দিলেন “ম্যায় কাস্টমার হু, ট্রাক চালাতিহু।”
আমি বললাম, “আপ কা নাম কেয়াহ্যা?”
“মেরা নাম জোখ বাহাদুর রাই, আপলোগ কাহাছে আরাহে হে?”
আমি বললাম “বাংলাদেশ, পুনাখা যায়েগা আভি।”
“হাম ভি পুনাখা যাতেহে, সিমেন্ট লেকার ভুতং ছে পুনাখা মে পউছনাহে।” ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে প্রতি বাক্যে ক্রিয়াপদকে যথাসম্ভব পেচিয়ে, হিন্দির কাছাকাছি কোনো একটা ভাষা বলে ও শুনে যা বুঝলাম তা হল এই ট্রাক ড্রাইভার সেই ট্রাক ড্রাইভারদের একজন যারা ভুটান থেকে বাংলাদেশে আপেল ট্রাকে করে নিয়ে যায়। উনি আরো জানালেন যে বাংলাদেশ থেকে অনেক লোক ভুটানে আসে কাজ করতে। কেউ মিস্ত্রী, কেউ অপারেটর, কেউ দোকানে কাজ করে।
চা খেতে খেতে দোকানের ভিতরটা ভাল ভাবে লক্ষ করলাম। রেস্টুরেন্টের ঠিক মাঝখান দিয়ে একটা হিটার, সেটা থেকে একটা পাইপ ছাঁদ পর্যন্ত উঠে গেছে। নিচের অংশটা গোল একটা ড্রামের মত। এর ভিতরে লাকড়ি দিয়ে আগুন জলছে আর পাইপ দিয়ে ধোয়া উঠে যাচ্ছে ছাদে। নিচের ড্রামের মত অংশটা দেখে বোঝা যায় এটা অনেক পুরানো পদ্ধতির হিটার। শহরে এ ধরনের হিটার দেখা যায় না। রুমের মধ্যে হিটারের পর সবচাইতে বেশি চোখে পড়ে কাচের শোকেস। কাচের শোকেসে একটা অদ্ভুত ধরনের খাবার দেখা যাচ্ছে। কাছে গিয়ে বুঝলাম শুকরের মাংস মশলা মাখিয়ে ড্রাই করে রাখা। এখানকার খুব প্রচলিত খাবারের একটি। দেয়ালে শেলফে সাজান রয়েছে বাংলাদেশ থেকে আসা প্রাণ জুস। শোকেসের পিছনে ক্যাশে যে লোকটি দাঁড়িয়ে আছে সে তিব্বতীয় বংশোদ্ভূত। খোঁজ নিয়ে জানলাম যে এই এলাকাতে বেশির ভাগ লোক তিব্বত থেকে রেফ্যুজি হয়ে এসেছিল এবং বংশপরম্পরায় এখানেই আপেল চাষকে পেশা হিসেবে নিয়েছে। চা খেয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে দেখি রাস্তার ঠিক উল্টা দিকেই পাহাড়ের উপর তিব্বতি রেফ্যুজিদের বাড়ি। আর বাড়ির সামনে শুকনা আপেল গাছ। এসব আপেল গাছের আপেল আমাদের দেশের ফলের দোকানে সাজানো থাকে।
জোখ বাহাদুর রাই ছোট খাট মানুষ। সে সাদা রঙের বিশাল ট্রাকে গিয়ে উঠল। আর এদিকে ছয় ফুট লম্বা সোনেম উঠলো নীল রঙের ছোট্ট একটা গাড়িতে। মনে মনে বললাম “সব আল্লাহর ইচ্ছা।” রওনা দিলাম আমরা। ঘটনাবিহীন দুই ঘণ্টা পরে পৌঁছে গেলাম পুনাখা। আরেকটা সুন্দর শহর চোখের সামনে হাজির হল তার প্রাণ নিয়ে। এই প্রাণটি হল এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া নীল রঙের নদী। উপর থেকে মনে হচ্ছে একটা নীল সাপ এঁকেবেঁকে হেঁটে যাচ্ছে। এই নদী যেন এই সবগুলি পাহাড়ের প্রাণ।
Damchen4.jpg
রিসোর্টের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া দামচেন নদী।
গাড়ি গিয়ে থামল একটা রিসোর্টে। নাম ‘দামচেন রিসোর্ট’। রুমের ভিতরে গিয়ে দেখি একটা দেয়াল জুড়ে বিশাল জানালা। আর জানালা দিয়ে দেখা যাছে সেই নদী। থিম্পুর ৫ ডিগ্রী সেলসিয়াস থেকে এসে যখন দেখি সূর্যের কিরণে নদী চক চক করছে আর তার আভা যখন ঝির ঝির বাতাসে দুলে দুলে গাছের পাতায় খেলছে তখন মন চায় শুধুই তাকিয়ে থাকতে। করলামও তাই। বেশ কিছুক্ষণ বসে বসে তাকিয়ে রইলাম যেন কোথাও এই চোখ স্থির নয়, যেন কোথাও এই বাতাস স্থির নয়, যেন কোথাও এই পাহাড় স্থির নয়। একটা বই নিয়ে শুয়ে পড়লাম। বই পড়তে পড়তে এক সময় চোখ বন্ধ হয়ে গেল। একবার যখন চোখ খুললাম, দেখি পাহাড়ের উপর অন্ধকার নামছে। নদীর পানি আরো নীল হয়ে গেছে। আমার চোখ আবার বুঁজে এলো।
যখন চোখ খুলল তখন পুরাপুরি অন্ধকার। আমি শুধু ঘুমাইনি আমার মাও ভাল ঘুমিয়েছে।
কয়েকবার ডাকাডাকির পর সে উঠল। আজকে মাকে রানীর মত লাগছে। কেন লাগছে জানি না। মনে হয় অনেকদিন পর মাকে দেখলাম অসময়ে বেভোর ঘুমাচ্ছে। মা আর আমি আমাদের দীর্ঘ ঘুম নিয়ে একটু হাসাহাসি করলাম। তারপর গেলাম পুনাখা টাউনে রাতের খাবার খেতে। সোনেম বলল এক নেপালি আন্টি নাকি ভাল রাঁধে। যেয়ে দেখি নেপালী আন্টি ছোট্ট একটা রেস্টুরেন্টের ভিতর বসে বসে হিন্দী ড্রামা সিরিয়াল দেখছে। রান্না খাওয়াতে তার মোটেও আগ্রহ নাই। টিভির দিকে তাকিয়ে অর্ডার নিয়ে আবার টিভির দিকেই তাকিয়ে রইলো। তার ওখানে ভাত, ডাল, সব্জি আর মাছ ভাজা দিয়ে রাতের খাবার সারলাম। খাবারটা মোটেই ভাল ছিল না। তারপরও যেহেতু সোনেম আমাদের এখানে নিয়ে এসেছে আমাদের কিছুই করার ছিল না। রুমে ফিরে কিছুক্ষণ টিভি দেখলাম। একটু বই পড়লাম। তারপর আবার ঘুম।
১০ ডিসেম্বর ২০১০, পুনাচু
ভোর বেলা দরজা খোলার আওয়াজ শুনে ঘুম ভাঙল। দেখি মা পা টিপে টিপে বের হচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, কই যাও। মা বলে একটু হেঁটে আসি। এদিকে আমার লেপের নিচের আরাম রেখে কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে না। ঘড়িতে সাতটা বাজে। আমি ঘরের সব পর্দা সরিয়ে দিলাম। উপরে পাহাড়ের উপর ঘন কুয়াশা আর মেঘ একাকার হয়ে আছে। নিচে পুনাচু নদীর নীল পানি দুই ধারে সাদা পাথরের মাঝখান দিয়ে বয়ে চলছে। সাদা পাথরগুলি দেখে মনে হয় মেঘের ডিম। যেন ভোর রাতে এই ডিম থেকে বাষ্প বের হয়ে মেঘেদের জন্ম হয়। সাদা লেপের নিচে ওম নিতে নিতে দূরে পাহাড়ের উপর গাছগুলির দিকে তাকিয়ে রইলাম। এক সময় সূর্য মেঘের আড়াল থেকে বের হয়ে এলে মেঘ আর কুয়াশা আলাদা হল। এখন পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা সাদা মেঘ দেখে ভাবছি, সারাদিন ধরে দৃশ্যপটের এই পরিবর্তন কয়েকদিন একটানা দেখতে থাকলে হয়ত কখনো বুঝতে পারব পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসের সাথে বৌদ্ধ ধর্মের কোনো সম্পর্ক আছে কি না। মনে পড়ল মহেশখালিতে পাহাড়ের উপর বৌদ্ধ মন্দির দেখেছি, মনে পড়ল চট্টগ্রামে, বান্দরবান, রাঙামাটিতে রয়েছে বৌদ্ধ মন্দির। তাহলে কি দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতেই বৌদ্ধ ধর্মীয় মানুষ বেশি থাকে?
বাইরে জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখছি মা হেটে রুমের দিকে আসছে। আটটা বেজে গেছে। আমি উঠে হাতমুখ ধুয়ে চা বানালাম। ততক্ষণে ঘরের ভিতর রোদ চলে এসেছে। মা আর আমি সামনে নদীর দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে চা আর বিস্কুট খেলাম। রোদ এসে আমার মুখে পড়ছে। এই কয়েকদিনের সর্দি আজকে থেকে বোধহয় শেষ হল। এক ঘণ্টা ধরে দুই কাপ চা খেয়ে শরীরটা বেশ ঝরঝরা হয়ে গেল। চা খেয়ে মা এবার রোদ পোহাতে বসল বাইরে। আমি আবার বিছানায় শুয়ে ভাবতে থাকলাম। এবার চলছে দিবাস্বপ্ন — পরিবর্তনের কাহিনীর দ্বিতীয় পর্ব। কোথায় গেল ভোরের কুয়াশা? কোথায় গেল সাদা মেঘ? সবাই চলে গেছে, রয়ে গেছে পাহাড়। দাঁড়িয়ে একা একা। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে গ্রাম থেকে মানুষেরা নামছে, নামছে গরুও। রাস্তা দিয়ে হঠাৎ হঠাৎ দুই একটা গাড়ি যাচ্ছে।
কথা ছিল সকালে নেপালি আন্টিজির রেস্টুরেন্টে নাস্তা খেয়ে বের হব। কিন্তু সকালের চা-বিস্কুট এখনো আমাদের দিব্যি শক্তি দিয়ে চলেছে। তাই গাড়িতে উঠেই সিদ্ধান্ত নিলাম যে আর নাস্তা করব না, বরং একটু ঘুরে এসে একবারে দুপুরের খাওয়া খাব। বের হয়ে পড়লাম আমরা। গাড়ি পাহাড়ের ঢাল বেয়ে আস্তে আস্তে উপরে উঠছে। আমরা দেখতে যাচ্ছি একটি মন্দির। মন্দিরটি একেবারেই নতুন। মাত্র তিন মাস হল এই মন্দির প্রার্থনা করার জন্য খুলে দেয়া হয়েছে। আমরা যখন পৌঁছলাম মন্দিরে তখন বেলা পোনে এগারটা। সকালের রোদ ধীরে ধীরে প্রখর হচ্ছে। ভুটানের তৃতীয় রাজা জিগমে সিংগে ওয়াংচুকের চারজন স্ত্রী ছিল। তাদের একজনের বাবা পুনাখা জেলায় অনেক সম্পত্তি ও হোটেল বানানোর পাশাপাশি আরো বেশ কিছু সামাজিক কল্যাণমূলক কাজ করেছেন। তার একটি হচ্ছে এই মন্দির। এই মন্দিরটির নির্মাণ কাজ শেষ হবার পর মন্দিরটিকে সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে তিন মাস আগে। আমি এর আগে যত মন্দিরে গিয়েছি তার সবগুলোই ছিল শ খানেক বছরের পুরানো। নতুন মন্দিরটি দেখে আমার অন্য রকম ভাল লাগল। নতুনের মধ্যে লক্ষ করলাম এখানে দেয়াল জুড়ে কাচের বাক্স বানানো হয়েছে । টানা কাচের বাক্সের ভিতর রাখা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের মূর্তি।
আজকে থেকে ১০০ বছর পর এই মন্দিরটি দেখতে কেমন হবে তা নিয়ে যখন ভাবছি তখন হঠাৎ মনে হল কাচের এই ব্যবহার কি নতুন নাকি অনেক আগেও কাচ ব্যবহার করা হয়েছে। হতে পারে কাচ ব্যবহার করা হয়েছে কিন্তু এইরকম করে দেয়ালে ব্যবহার করা হয়েছে কিনা আমি জানি না। ব্যাংককের মন্দিরে বোধহয় দেখেছিলাম এরকম কাচের ব্যবহার। কিন্তু সেটাও ছিল অন্য রকম। এই ধরনটা আমার কাছে কিছুটা আধুনিকই মনে হল। মন্দিরের ভিতরের সব কিছু চকচক করছে, একজন মাথান্যাড়া মহিলা লামা জানালার কাছে দাঁড়িয়ে চুপচাপ এক মনে বই পড়ছে। আমাদের দেখে বৌদ্ধের মূর্তির সামনে রাখা বহুরঙ্গের কারুকাজ করা সরু নলওয়ালা একটা ছোট্ট কেতলি থেকে প্রথমে সোনেমের হাতে পানি দিল। সোনেম ভক্তি ভরে সেই পানি খেল। তাকে দেখে আমরাও খেলাম একে একে। পানি খাওয়ার দিকে মন দেয়ার থেকে আমার মন বেশি ছিল কেতলিটার দিকে। মনে হল পানি তো খেলাম না, খেলাম কোনো সুগন্ধি।
মন্দির থেকে বের হয়ে সামনে দেখি একটা মহিলা ঘাস কাটছে আর তার বাচ্চা একটা সাদা উঁচু টুপি পরে তার পাশে খেলছে। মন্দিরের প্রবেশ পথ বরাবর একটা সিঁড়ি নিচের দিকে নেমে গেছে। সেখানে সিঁড়ির ময়লা পরিষ্কার করছে এক যুবক। আমার একজন প্রিয় বন্ধুর কথা মনে পড়ে গেল। আমার এই বন্ধুটি একটি কবিতা সময়ে-অসময়ে বার বার আবৃত্তি করত। “হুজুর, মসজিদের এই মার্বেল পাথরগুলি পরিষ্কার করা ছাড়া আমার আর কোনো কাজ নেই।” মন্দিরের সামনে ঘাস কাটা ও ময়লা পরিষ্কার করার তদারকির দায়িত্বে ছিলেন এক ভদ্রলোক। আমি তার দিকে তাকিয়ে হেসে বললাম “আপ ইয়াহা কেয়া কারতেহে?” লোকটি আমাদের দিকে এগিয়ে এসে বলল, “ম্যায় গভমেন্ট অফিস মে কাম কারতি হু, ইস জাগামে কাম দেখনেকিলিয়ে আতিহু। থিম্পুমে রাহতি হু।” এর পর উনি আমার সাথে হিন্দিতে কথা বলে যেতে লাগলেন। আমি হিন্দি ভাল বুঝি না, বলতেও পারি না। আর সে যেই ভাষায় কথা বলেছিল সেটা লেখা আমার জন্য কঠিন। তাই সংক্ষেপে আমি তার কাছে যা শুনলাম তাই লিখে যাচ্ছি।
ভুটানি পোশাক পরা এই ভদ্রলোক প্রথমে জানতে চাইলেন আমরা কোথা থেকে এসেছি। যখন শুনলেন আমরা বাংলাদেশ থেকে এসেছি তখন উনি বললেন যে উনার স্ত্রী বাংলাদেশে ব্যবসার জন্য প্রায়ই যান। সেই কারণে তাকেও কয়েকবার যেতে হয়েছে। তার স্ত্রী বাংলাদেশ থেকে খাবার, কসমেটিক্স, ড্রিঙ্কস ইত্যাদি আমদানি করেন। বাংলাদেশ থেকে এই সব মাল জাহাজে করে কলকাতা পর্যন্ত আসে, সেখান থেকে আসে ভুটানে।
আমার মার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন আমার সাথের মহিলাটি কে। যখন শুনলেন এই মহিলাটি আমার মা তখন উনি বলতে শুরু করলেন, আমি এক লামাকে চিনি বাংলাদেশ থেকে আসে। প্রায় দেড়শ বছর আগে এই লামা তার মাকে খুঁজতে খুঁজতে পুনাখাতে এসেছিল। সে জানত তার মা পুনাখাতে কোনো এক পাথরের নিচে চাপা পড়ে মারা গিয়েছিল। তার মা কোনো পাপ করেছিল বলে তার ছেলে মায়ের পাপমুক্তির জন্য লামা হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশে অনেক দিন থাকার পর তার মনে হয়েছিল সে তার মাকে খুঁজে বের করবে। যেহেতু লামারা কারো অস্তিত্ব কল্পনা করলে তা কোথায় সেটা বলে দিতে পারেন ওই লামা জানতেন যে তার মা রয়েছে পুনাখাতে একটা কিরা হয়ে। সুদূর বাংলাদেশ থেকে এসেছিল সেই লামা এই পুনাখা শহরে। পুনাখাতে এসে সে এই পাথরের কাছে বসেছিল অনেক দিন–যদি মায়ের দেখা মেলে। ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে তাকে এই পাথরের কাছে বসে থাকতে দেখে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে এই লোকটি কে? পুনাখাতে কেউ জানত না যে সে একজন লামা। এরই মধ্যে লামার অধ্যবসায় দেখে ভগবান একদিন প্রসন্ন হলেন। সকলকে অবাক করে আকাশ থেকে এক শক্তি এসে বিশাল সেই পাথরকে দুই খণ্ড করে দেয়। তার ভিতর থেকে বের হয়ে আসে একটা বিচ্ছা। হিন্দিতে যাকে বলে “কিরা”। এই কিরা বের হয়ে যেদিকে যায় লামা তার পিছন পিছন যায়। এটা দেখে গ্রামের মানুষ বুঝতে পারে এই লোক যেই সেই লোক নয়, সে একজন লামা। লামা তখন তার পাপমুক্তির জন্য সেই কিরাকে পুনাচা নদীর পানিতে ছেড়ে দেয়।
10.JPG
কিংবদন্তীর পাথর: শখানেক বছর আগে নাকি এক বাঙালি লামা এই পাথরের নিচে তার মায়ের আত্মাকে খুঁজতে এসেছিল।
কিন্তু তাতেও তার মায়ের পাপমুক্তি ঘটে না। এরপর তার মা জন্ম নেয় আরেকটি কিরা হয়ে। এবার সে তার পিছু নেয় কিন্তু এভাবে যেতে যেতে লামা দেখে যে কিরাটি আস্তে আস্তে এক গ্রামবাসীর রান্নাঘরের চুলার ভিতরে ঢুকে যায়। সে অপেক্ষা করে কিরা কখন বের হয়ে আসবে। কিন্তু কিরা আর বের হয় না। এটা দেখে সেই লামা ওই চুলার মালিকের বাড়িতে কাজ নেয়। সে বাড়ির সব কাজ করত। একদিন সে ভাবে কিরা আর ফিরবে না। তাই সে ঠিক করে বাংলাদেশে চলে যাবে। কিন্তু বাড়ির মালিক লামাকে ছাড়তে চায় না। তাকে অনেক সোনাদানা দিতে চায়। কিন্তু লামা কিছুই নিতে চায় না। সে বলে তার কাজ শেষ, তাকে ফিরে যেতে হবে। কিন্তু তারা যদি কিছু দিতে চায় তাহলে একটা জিনিসই লামা নিতে পারে। আর তা হল মাটির চুলা। শেষ পর্যন্ত বাড়ির মালিক রাজি হয়। মাটির চুলা ভাঙা হয়। তখন ওই কিরা বের হয়ে আসে। লামা ওই কিরাটিকে নিয়ে নদীর পানিতে ছেড়ে দেয়। লামার মায়ের পাপমুক্তি ঘটে। লামা ফিরে যায় বাংলাদেশে। এখনো ওই লামা বেচে আছে এবং বাংলাদেশে আছে।
গল্প শুনতে শুনতে দেখি আমাদের পাশ দিয়ে ১২-১৩ বছর বয়সী ৪-৫ টা মেয়ে হেঁটে যাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম এরা কারা? উনি বললেন এরা লামা ছাত্রী। এরা এখন স্কুলে পড়ছে। বড় হয়ে এরা ইউনিভার্সিটিতে পড়বে। এখানে এখন প্রায় ৬০ জন ছাত্র-ছাত্রী আছে। আর এক বছরের মধ্যে এখানে ১০০ জন ছাত্র-ছাত্রীর আবাসিক ব্যবস্থা হবে। এটা ভবিষ্যতে একটা ইউনিভার্সিটি হবে। গভমেন্ট অফিসার গল্প বলতে বলতে অনেক দূর থেকে কাছে চলে আসছিলেন। এক পর্যায়ে মনে হচ্ছিল উনি গায়ের উপর উঠে আসবেন। তখন মনে হল উনাকে এখানেই থামানো উচিত। এর চাইতে বেশি গল্প বলতে দিলে উনি মাথায় উঠে যাবেন। আমরা বিদায় নিয়ে ফিরে আসার সময় উনি আমাকে বললেন মরিচ, তেল আর মাংস কম খাবেন, নাহলে তাড়াতাড়ি বুড়ি হয়ে যাবেন। আমার মা আর সোমেন কথা বলছে এই অফিসারের বাচালতা নিয়ে। তাদের কথা আর গভমেন্ট অফিসারের বাড়তি বকবকানি ছাপিয়ে আমি তখন কল্পনায় দেড়শ বছর আগে ও দেড়শ বছর পরে চলে গেছি।
রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে ঠিক করলাম দুপুরের খাবার খেয়ে তারপর যাব ভাঙা পাথর দেখতে। তাই আমরা গেলাম নেপালি আন্টিজির হোটেলে। অর্ডার দিলাম ভাত, মাছ ভাজা, সব্জি আর ডাল। অর্ডার দিয়ে যখন বসে আছি তখন দেখি লাল রঙের কাপড় পরে ন্যাড়ামাথা ১৪-১৫ বছর বয়সী দুইটা ছেলে ঢুকল। আমাদের দেশে ১৪-১৫ বছর বয়সী ছেলে-মেয়েরা যেমন ফাস্টফুডের দোকানে খেতে আসে তেমনি এসে ছেলেদুটো সিঙ্গারা অর্ডার দিল। আমি তাকিয়ে ওদের পরনে লামাদের কাপড় দেখছি। ছেলেদুটো টিভির দিকে মুখ করে বসল। আমরা তাদের পিছনে কোনাকুনি একটা টেবিলে বসে। টিভিতে তখন দেখাচ্ছে কউন বানেগা ক্রোড়পতি। অমিতাভ বচ্চন কথা বলছেন। ওরা টিভি দেখছে আর নিজেদের মধ্যে ওদের ভাষায় কথা বলছে। আমি বুঝলাম না ওদের কথা কিন্তু লক্ষ করলাম ওদের হাবভাব ও চালচলন। চট করে কী মনে করে একটা ছবিও তুলে ফেললাম। ছবি তুলে মনে হল আমি আসলে ভাবছিলাম বিশ্বায়নের কথা।
Bhutan 175.jpg…….
নদ ও নদীর মিলনস্থল।
……..
নেপালি আন্টিজির ফাঁকিঝুকি রান্না খাবার খেয়ে আমরা রওয়ানা দিলাম জং-এর দিকে। জং মানে দুর্গ। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই এটা কোনো দুর্গ। দুর্গটা নদীর মাঝখানে একটা দ্বীপের মধ্যে। এক পাশ থেকে একটা নদ আর অন্য পাশ থেকে একটা নদী এসে মিলেছে এখানে। আমি সোনেমকে জিজ্ঞেস করলাম নদ ও নদীর মধ্যে পার্থক্য কী। সোনেম আমার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না। মা বলল, “নদ হছে উশৃঙ্খল, আর নদী হছে শান্ত।” আমি বললাম “কী রকম?” মা বলল, “এই যেমন কপোতাক্ষ হচ্ছে নদ, আর পদ্মা হচ্ছে নদী। নদের ভাঙন আর বয়ে চলা সর্বগ্রাসী। আর নদীর গভীরতা বেশি কিন্তু নদীর ভাঙন আর বয়ে চলার মধ্যে আছে একটা শিষ্টতা যা সাধারণত নারীর মধ্যেই লক্ষ করা যায়।” আমার মনে পড়ে গেল এই প্রশ্ন আমি অনেক মানুষকে করেছি, আবার অনেক মানুষ আমাকেও করেছে। কেউ আমাকে সঠিক জবাব দেয়নি।
এইসব ভাবতে ভাবতে দুর্গের সামনে চলে এলাম। দুর্গের মূল ফটকে ঢুকতে হলে একটা ৫৫ মিটার লম্বা ক্যান্টিলিভার ব্রিজ পার হতে হয়। ব্রিজের দুই পাশে যতদূর চোখ যায় মনোরম দৃশ্য–পাহাড় আর নদ-নদীর অপূর্ব মিলনস্থল। ব্রিজ পার হয়ে ভিতরে ঢুকে দেখি ডান দিকে দুর্গের উঁচু দেয়াল। ভিতরে ঢুকতে হলে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠতে হয়। মা পারবে না অত উপরে উঠতে। তাই মাকে রোদ পোহাতে বসিয়ে রেখে আমি সিঁড়ি বেয়ে উপড়ে উঠে গেলাম। দুর্গটা খুব বেশি বড় না। চার পাঁচ তলা সমান উঁচু হবে। ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে ভুটানিরা বানিয়েছিল এই দুর্গ তিব্বতীয় আগ্রাসন থেকে নিজেদের রক্ষা করবার জন্য। চারিদিকে দালানে ঘেরা মাঝখানের বিশাল কোর্টইয়ার্ডে বেশিরভাগ জায়গায় ছায়া পড়ে আছে। যেই জায়গাটুকুতে সূর্যের আলো এসে পড়েছে সেটা দেখে আমার মনে হয়েছে এই আলো কোথায় যেন আমি দেখেছি আগে। তবে কি আমারও পুনর্জন্ম হয়েছে নাকি? একে একে লাল কাপড় পরা লামারা হেঁটে যাচ্ছে। আমি তাদের দেখছি আর ভাবছি কী হল আমার। এই ধর্মীয় পরিবেশের আছড় কি আমার উপর পড়েছে? পুনর্জন্মের কথা ভাবতে না চাইলেও কি এরকম পরিবেশে এই ভাবনা তৈরি হয়?
কোর্ট ইয়ার্ডের মাঝখানে দাঁড়িয়ে দিবাস্বপ্নে যখন বিভোর আমি তখন দেখি একজন লামা দরজা খুলে দিয়ে আমাকে ডাকছে। আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকালাম। কাঠের উঁচু সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলাম। বিল্ডিংয়ের মূল দরজাটা বিশাল বড়–কাঠের খোদাই করা। ভিতরে ঢোকার পর লামা ইশারা করে আমাকে বলল ভিতরের কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে। আমি লামাকে অনুসরণ করলাম। আমার পিছনে কয়েকজন চাইনিজ যুবক আর যুবতী উঠে আসছে। কাঠের সিঁড়িগুলো খুব খাড়া, সারাক্ষণ মনোযোগ দিতে হয়। লামা উঠছে, আমি তার পিছনে উঠছি। একটার পর একটা সিঁড়ি। উপরে ওঠা আর শেষ হয় না যেন। মনে হল পাঁচতলা পর্যন্ত উঠলাম। উঠে দেখি একটা ঘরে বৌদ্ধের দুইটা মূর্তি পাশাপাশি। তফাৎ হছে একটা মূর্তির মুখের মধ্যে উদ্বেগের ছায়া। অন্য মূর্তির মুখটা একটু কাত করা, প্রসন্ন ভাব। এই পার্থক্যটা আমাকে ভাবিয়ে তুললো। আমি কাঠের জানালার পাশে বসে বৌদ্ধের মুখভঙ্গি দেখছি আর হঠাৎ একটা শূন্যতা বোধ করলাম। এই পরিবেশ, এই অবয়ব, এই গন্ধ, এই প্রাচীন কাঠ মনে হল আমার অতি পরিচিত। আমার সামনে বসে পূজা করলেন চাইনিজ পরিবারের সদস্যরা। হঠাৎ মনে হল আমি মায়ের কাছে যেতে চাই। আমি নেমে গেলাম। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মনে হল আমি কখন মায়ের কাছে যাব। দুর্গে ঢোকার মূল সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় মাকে দূর থেকে দেখে আশ্বস্ত হলাম।
দুর্গ থেকে বের হয়ে আমরা গেলাম একটা হ্যান্ডিক্র্যাফটের শোরুমে। এটি আসলে একটি ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন। ঘুরে ঘুরে দেখে আমি দুইটা বুকমার্ক কিনলাম। টাকা দেয়ার সময় দেখি ওই সেন্টারে কয়েকটি বই রাখা। তার মধ্যে সবচাইতে উপরের বইটির নাম “গালিভার’স ট্রাভেলস”। তার পাশে আরেকটি বই। সেটার নাম “ইয়ুথ লিডারশিপ ডেভেলপমেন্ট”। বইগুলো দেখে বোঝা যায় এই বইগুলো কেউ কখনো পড়েনি। আর ইয়ুথ লিডারশিপ যে “ইয়ুথ লিডারশিপ ডেভেলপমেন্ট” নামের বই পড়ে হয় এই ধারণা যেই প্রতিষ্ঠান চর্চা করে… তা থেকে বুঝলাম এটা একটা এনজিও উদ্যোগ।
যেই বইই পড়ুক না কেন ভুটানি যুবক-যুবতীরা আলোয় আলোয় আলোকিত হোক সে আকাঙ্ক্ষা করতে করতে আমরা রওয়ানা দিলাম সেই পাথর দেখতে। যেই রাস্তা দিয়ে গেলাম তার দুই পাশে লাল ফুলের গাছ। গাছগুলির নাম জানি না। কিন্তু ভাবতেই ভাল লাগে আমরা একটা পথ দিয়ে যাচ্ছি যার চারিদিকে লাল ফুল। ওই পথের মাঝখানে এসে গাড়ি থামল। পথ থেকেই পাথর দেখা যাচ্ছে। বিশাল এক পাথর। সামনে গিয়ে দেখলাম পাথরের ঠিক মাঝখান দিয়ে একটা ফাটল। তার পাশেই একটা মন্দির, কিন্তু সেটা তালা দেয়া। বাইরে থেকে কিছু দেখার উপায় নেই। লামার নামটা জানতে চাইলাম। কোথাও কিছু পাওয়া গেল না। শুধু পাথরের গায়ে একটা মন্ত্র লেখা। “ওম মানি পেদ্মে হুম।”–“পৃথিবীর সব রত্নের সন্ধান মেলে পদ্মের মাঝে।” পদ্মফুলের পাপড়ির বিন্যাসে আছে ভারসাম্য। আর জীবনের ভারসাম্য লুকিয়ে আছে পদ্মের গভীরে ।
আমরা ফিরে আসছি হোটেলের দিকে। পথে পড়ল ভুটানের সবচাইতে দীর্ঘ সাসপেনশন ব্রিজে যাবার রাস্তা। সোনেম গাড়ি পার্ক করল একটা শ্মশানের সামনে। মেঠো পথ ধরে হেঁটে গেলাম আমরা ভিতরের দিকে। একটু উঁচুতে গিয়ে পিছন ফিরে দেখলাম শ্মশান। ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। বিচ্ছিন্ন ভাবে শোকার্ত মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। আমি ছবি তুলতে চাইলাম, আমার বাবার কথা মনে পড়লো। মা একটু ধমক দিয়ে বলল এই সব কী দেখে! আমি আবার হাঁটা শুরু করলাম। এবড়োখেবড়ো গ্রামের পথ। দুপুর আড়াইটার করকরে রোদের মধ্যে হেঁটে সাসপেনশন ব্রিজের উপর উঠলাম। লোহার পাত দিয়ে বানানো ঝুলন্ত ব্রিজে দাঁড়িয়ে চোখে পড়ে নানা রঙের পাহাড় আর স্বচ্ছ নীল নদী। নদীর দুই ধারে সাদা পাথর। দূর থেকে দেখা যাচ্ছে বিচ্ছিন্ন ভাবে লাল কাপড় পরা লামা। এই শহর লামাদের শহর।
ফিরে এলাম হোটেলে। সকালে নদী দেখেছি কিন্তু ঠাণ্ডার জন্য নামতে পারিনি। একবার এই নদীতে না নামলেই না। মা আর আমি স্যান্ডেল পরে প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত গুটিয়ে রেডি। নদীর কাছে গিয়ে সাদা বালু পারিয়ে পা পানিতে দেয়া মাত্রই সারা শরীরে হিম বয়ে গেল। উহ কী ঠাণ্ডারে! আমার মন ঠাণ্ডা থেকে উঠে গিয়ে মায়ের পায়ের দিকে স্থির হল। আমার শুধু মনে হচ্ছে মা যদি পড়ে যায়। মহিলার শখ কম না। পানিতে পা ভিজিয়েছে ভাল, কিন্তু সে দেখি আবার আরো গভীরে যায়। মহিলাকে ধমক দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
সূর্য ডুববে ডুববে করছে। আমরা রুমে ফিরে এলাম। আজকে পুনাখায় আমাদের শেষ দিন। আমরা কালকে রওয়ানা হব পারোর দিকে। রুমে এসে খাবার অর্ডার দিলাম। সন্ধ্যার সময়টা কিছুই করার থাকে না পুনাখার মত জায়গায়। চারিদিকে সারাদিন কোনো কোলাহলও নেই যে থামবে আর হঠাৎ করে অনুভব করব সন্ধ্যা নামছে। এ এক অদ্ভুত সন্ধ্যা নামা। নীরবে অন্ধকার নামে পাহাড়ের উপর, মনে হয় যেন বিশালাকৃতি পাহাড়গুলো ধীরে ধীরে সূর্যকে গ্রাস করে এই সময় আর সন্ধ্যা নেমে গেলে গ্রাস করে অন্ধকার। পাহাড়গুলি সর্বভূক।
১২ ডিসেম্বর ২০১০, খাঙখু
সকালে ঘুম ভাঙল পারো শহরের খাঙখু রিসোর্টে। গতকাল সারাদিন রাস্তায় থেকে বিকালে পৌঁছেছি পারো শহরে। আজকে আমার জন্মদিন। বিছানায় শুয়ে তাকিয়ে আছি জানালার দিকে। ভুটানে এসে আমি ভাবছি আমার যদি আবার জন্ম হয় তাহলে আমি কী হয়ে জন্মাতে চাই। একবার মনে হল গরু হলে কেমন হয়। ওই যে জানালা দিয়ে দূরে পাহাড় দেখা যাচ্ছে। আর ওই যে দূরে পাহাড়ের ঢালে নিরীহ গরুরা বিচরণ করছে। পুনর্জন্ম নিয়ে এই ভাবনার গতি-প্রকৃতি আসলে এত বিচিত্র। মা বাইরে থেকে ঘরে এসে আমাকে বলল “হ্যাপি বার্থডে।” আমি ভাবলাম আমি আবার আমার মায়ের মেয়ে হয়েই জন্মাতে চাই।
সকালে নাস্তা করে মা রোদ পোহাল, গোসল করল। আর আমি ওরহান পামুকের ইস্তানবুল বইটা নিয়ে শুয়ে শুয়ে পড়লাম। এগারোটা বাজলে উঠে রেডি হওয়া শুরু করলাম। আজকে ড্রাইভারের নাম তেঞ্জিন। মোটাসোটা খাটো মানুষ। আজকে আমরা যাচ্ছি সোনেম যেখানে আর্চারি খেলছে সেখানে। জায়গাটা পারো শহর থেকে অনেক দূরে একটা পাহাড়ে। আজকে ওইখানে সারাদিনব্যাপী আর্চারি গেমের ম্যাচ হছে। আমরা দুপুরে হোটেল পারোতে দুপুরের লাঞ্চ সেরে তারপর রওনা দিলাম ম্যাচ দেখার উদ্দেশে। গাড়ি সমতলে অনেকদূর গিয়ে তারপর আস্তে আস্তে ওঠা শুরু করলো পাহাড়ে। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথের দুই ধারে অনেক দূরে দূরে বিচ্ছিন্ন ভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মানুষের বসতবাটি। মাঝে মাঝে চোখে পড়ে ৪ তলা ৫ তলা বিল্ডিং। তেঞ্জিন সোনেমের ভাই। আজকে সোনেম আর্চারি খেলবে বলে তেঞ্জিনকে বলেছে আমাদের নিয়ে ঘুরতে। যাওয়ার পথে তেঞ্জিন আমাদেরকে দেখাল সোনেমের বাড়ি। সোনেমের বাড়ি ৪ তলা। পুরো বিল্ডিংটাই তার।
তেঞ্জিন প্রায় এক ঘণ্টা গাড়ি চালিয়ে আমাদের নিয়ে গেল একটা ব্রিজের কাছে। এখান থেকে আর গাড়ি যায় না। এখান থেকে ঠিক কতদূর হাঁটতে হবে জানি না। আমি ব্রিজ পার হয়ে পাহাড়ের ওপরে ওঠা শুরু করলাম। মাকে রেখে গেলাম ব্রিজের কাছে। এখানের দৃশ্যটা খব সুন্দর। ছোট একটা সাসপেনশন ব্রিজ। এর উপরে উঠে দাঁড়ালে দুই ধারে পায়ের নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর পানি সারাক্ষণ পাথরের গায়ে বাধা পেয়ে ছলাৎ ছলাৎ শব্দ করছে। এই শব্দ আবার পাহাড়ের গায়ে বাড়ি খেয়ে ফিরে আসছে শো শো করে। পাহাড় আর নদীর এই সহাবস্থান এই জায়গাটিকে একটি বিশেষ পরিবেশ দিয়েছে। সব চাইতে মজার ব্যাপার হল এখানে কোনো টুরিস্ট আসে না। আশেপাশে একটা জীর্ণ দোকান আর দুই একটা বাড়ি দেখে বুঝলাম এখানে টুরিস্টদের আসার কথা নয়।
দূরে দেখা যাচ্ছে গ্রাম। আমি পাথরের ওপর সাবধানে পা রেখে একটু একটু করে উঠতে লাগলাম পাহাড়ের উপর। কিন্তু পথ আর শেষ হয় না যেন। প্রায় ৮০-৯০ মিটার উপরে ওঠার পর আমি বসে পড়লাম একটা পাথরের ওপর। একটু জিরিয়ে আবার ওঠা শুরু করলাম। আরো কিছুদূর গিয়ে দেখি এবার একটা সমতলভূমি। একটা ক্ষেতের চারিদিকে ও মাঝখানে আইল দেয়া। আমি আইল ধরে হাঁটা শুরু করলাম দূরে বাড়িগুলোর দিকে। পথে দেখি দুইটা ৯-১০ বছর বয়সী ছেলে আসছে। আমি তাদেরকে ডেকে ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে আমি আর্চারি গেম যেখানে হচ্ছে সেখানে যেতে চাই। তারা আমার কথা বুঝলো মনে হল কিন্তু ওরা কী কারণে যেন শুধু হাসছে। ওদের হাসি দেখে আমারও হাসি পেল। আমি মনে মনে বলছি “এই শয়তানের বাচ্চা, হাসছিস কেন?” এদিকে আমি এমন একটা জায়গায় আটকে আছি যেখানে গরুর হাম্বা হাম্বা ডাক শোনা যাচ্ছে। আমার মনে হল সবাই আমাকে নিয়ে তামাশা করছে। ছোট ছেলে দুইটা একদিকে, আর অন্য দিকে গরু। এখান থেকে যে যাব কোন দিকে তাও বুঝতে পারছি না। সামনে কোনো রাস্তা দেখা যাচ্ছে না। আমি ডান দিকে গিয়ে একটা বাড়ির উঠানে ঢুকলাম। ডাকাডাকি করলাম “কয়িই হ্যায়?” কোনো মানুষের সাড়াশব্দ তো নেইই তার মধ্যে দেখি উঠানে দুইটা মোরগ মারামারি করছে। এদিকে গোয়াল থেকে গরু সমানে ডেকে চলছে। আমি যখন ভাবছি বাহ কী সুন্দর বিপদ তখন দেখি একটা ছোট শূকরের বাচ্চা আমার দিকে ধেয়ে আসছে। আমি বললাম কাজ সারা। এখন কী হবে! আর শূকরের বাচ্চাটা সামনে আসতেই আমি একটা চিৎকার দিলাম। শূকরের বাচ্চাটা আমাকে দেখে ভয়ে পালালো। আহ কী শান্তি!
এইদিকে কোনো রাস্তা না দেখে আমি উঠান থেকে বের হয়ে বাড়ির পিছনে গেলাম খুঁজতে কোনো রাস্তা আছে কিনা। তখন দেখি বেড়ার পিছন থেকে একটা লোক এসে বেড়ার কাঠ বেয়ে নামলো। তখন বুঝলাম আমাকেও ওই ভাবেই পার হতে হবে। আমি বেড়ার কাঠের খাজের উপর পা রেখে বেড়ার উপর উঠে গেলাম। শয়তান পিচ্চি দুইটা ছেলে আমাকে সাহায্যও করলো না এদিকে আমার দিকে তাকিয়ে হাসছে। আমি ওদেরকে দূর থেকে হাত দিয়ে মাইর দেয়ার ইশারা করলাম। ওদের একজন তখন আমার কাছে এসে বলে “গিভ মি এ পেন”। আমি বললাম, “ইউ ডিড নট হেল্প মি, অ্যান্ড ইউ ওয়ান্ট এ পেন!–যাহ পেন দিমু না।” ওদেরকে কাচকলা দেখিয়ে আমি বেড়া পার হয়ে হাঁটা শুরু করলাম।
আরো কয়েকটা বাড়ির উঠানের মধ্যে দিয়ে বেড়া পার হয়ে সামনে আবার একটা উঁচু জায়গা দেখা গেল। উঁচু জায়গায় উঠতেই দেখি দূরে দেখা যাচ্ছে আর্চারি খেলোয়াড়দের জটলা। খেলা চলছে। আমাকে দেখে দূর থেকে এগিয়ে আসল সোনেম। সোনেমকে দূর থেকে এগিয়ে আসতে দেখে আমি একটা পাথরের উপর বসে পড়লাম। অনেক লম্বা রাস্তা পার হয়ে এতদূর আসা। খুব পানির পিপাসা পাচ্ছিল। সোনেম আগে থেকেই বুঝতে পারছিল বোধহয় তাই দেখি সে হাতে করে একটা ছোট সাদা বোতল নিয়ে এসেছে। হাতে নিয়ে দেখি সেটা বাংলাদেশ থেকে আসা প্রাণ-এর লিচু জুস। আমার মা কবে যেন বলছিল যে অনেক ছোটবেলায় সে দেখেছিল আমার নানা ভুটান থেকে আমদানি করা জুস খেত। আমার মায়ের ইচ্ছা ছিল সে ভুটানে এসে ওই জুসটা খাবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে আমাকে ভুটানে এসে বাংলাদেশের লিচু জুস খেতে হচ্ছে।
লিচু জুস খেয়ে ঠাণ্ডা হয়ে আমি তীর-ধনুক হাতে নিলাম। বেশ কয়েকবার তীর ছুঁড়ে প্র্যাকটিস করলাম। খেলা চলছে। এক জনের পর আরেকজন তীর ছুড়ছে। কারো তীর টার্গেট পর্যন্ত যাচ্ছে না। এবার এলো সোনেমের পালা। সোনেম ইতিমধ্যে দুইবার টার্গেটে তীর ছুড়তে পেরেছে। তাই তার কোমরে দুইটা রুমাল ঝুলছে। সোনেম যখন তীর-ধনুক হাতে নিল আমি হাতে নিলাম ক্যামেরা। খুব অভিজ্ঞ ভঙ্গিতে সে তীর-ধনুক তাক করল। তীর ছুটে অনেক দূর গেল। আমি দেখতে পারলাম না কোথায়। তার আগেই দেখি অনেক দূর থেকে অন্য পক্ষ চিৎকার করছে। আর তারপরেই শুরু হল সব খেলোয়াড়দের চিৎকার। আমিও আনন্দে বিহবল। সব খেলোয়াড়রা আমাকে এসে বলতে লাগল, “ইউ ব্রট গুড লাক ফর সোনেম।” আমি খুশি হয়ে গেলাম। আর সাথে সাথে দেখি খেলোয়াড়রা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে হাত ধরে নাচ ও গান শুরু করল একই সাথে। আমার মনে হল আমি ওদের আনন্দের অংশ হয়ে গেলাম। চশমা পড়া একজন আর্চারি খেলোয়াড় আমাকে এসে অভিনন্দন জানালো আর বললো আমার হাত নাকি ভালো, প্র্যাকটিস করলে আমিও টার্গেটে পৌঁছাতে পারবো। শুনে খুশি হলাম কিন্তু মনে খচ খচ করছে মা একা বসে আছে অনেকক্ষণ ধরে। আমাকে যেতে হবে।
প্রায় আধ ঘণ্টা লেগে গেল গাড়ি পর্যন্ত যেতে। খুব কম করে হলেও প্রায় ১৫০ মিটার উপরে তো উঠেছি । আবারো ঘরবাড়ি, উঠান, ক্ষেত, পাথুরে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামতে হল। গিয়ে দেখি মা শুয়ে আছে গাড়ির সিটে। বেশ ঠাণ্ডা পড়েছে। অপরাধবোধে মনটা একটু খচ খচ করলো কিন্তু একটু পরে ভাবলাম সারাজীবন মাকে জ্বালিয়েছি, আরেকটু না হয় যন্ত্রনা দিলাম। মাকে দেখে জিজ্ঞেস করলাম কী করছিল। সে বলল দূর থেকে বসে আমার পাহাড়ে ওঠা দেখছিল। তেঞ্জিন গাড়ি স্টার্ট দিল। গাড়ি ছুটছে পারো শহরের দিকে। সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে।
আমাদের আজকে ভুটানে শেষ দিন। কালকে সকালে উঠে রওনা দিব ঢাকার উদ্দেশে। কিছু কিনলে আজকেই কিনতে হবে। আমরা তেঞ্জিনকে বললাম আমাদেরকে হ্যান্ডিক্রাফটের দোকানে নিয়ে যেতে। তেঞ্জিন আমাদেরকে নিয়ে এলো একটা রাস্তায় যার দুই ধারে শুধুই হ্যান্ডিক্রাফটের দোকান। আমরা নেমে হাঁটা শুরু করলাম। বেশিক্ষণ নেই হাতে। একটু পরেই আমাদের ফিরতে হবে। আমার নাম ঋতু। আমি কখনোই কিছু না নিয়ে ফিরি না, মরুভূমিতে থাকলে সেখান থেকেও বালু নিয়ে ফেরার মানুষ আমি। মায়ের সাথে দোকানে গিয়ে ছোটবেলার কথা মনে হল — যখন আমি হাঁটতে পারতাম না, আমার মা আমাকে হাতে ধরে শপিং মলে হাঁটত। নস্টালজিয়া আজকে আমাকে কিছু না কিনে ফিরতে দিবে না। আমি কিনলাম ১০০ রুপি দিয়ে একটা পায়ের নূপুর, ২৫০ রুপি দিয়ে এক জোড়া কানের দুল। দেখলাম একধরনের লেবুর রুম স্প্রে বিক্রি হচ্ছে ১৫০ রুপিতে। আমার মন বলল এটা ভালো হবে। কিনে ফেললাম। একটা হাতে রঙ করা পাথর আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। দাম জিজ্ঞেস করে শুনি সেটা ৪০০ রুপি। আমি চলে আসছি দেখে ওই দোকানের এক যুবক আমাকে জিজ্ঞেস করলো কত দিতে চাই। আমি কিছু বললাম না। তখন সে বলল এই পাথরটা তার নিজের হাতে রঙ করা। শিল্পীকে চোখের সামনে দেখে আবার পাথরটার দিকে তাকালাম। প্রথম বারের চাইতেও সুন্দর লাগল দ্বিতীয় বার দেখে। ২০০ রুপিতে দিতে রাজি হল শিল্পী। বললাম “প্যাকেট করে দিন।”
হোটেলে ফিরে আমরা অনেকক্ষণ টিভি দেখলাম বিছানায় শুয়ে শুয়ে। ব্যাগ গুছালাম। আমাদের দীর্ঘ আরামের দিন শেষ হতে যাচ্ছে। মা দেখি বিছানায় সেঁটে শুয়ে আছে। চ্যানেল বদলাতে বদলাতে দেখি একটা ভুটানি চ্যানেলে দেখা যাচ্ছে একটা মেয়ে বাথরুমে বসে কাঁদছে। কান্নার অভিনয়টা খুব বাস্তব মনে হচ্ছে। আমার মা বলে, “পৃথিবীতে সব দেশেই দেখি মেয়ে মানুষ কান্দে।” মায়ের মন্তব্য শুনে আমি হাসলাম।
১৩ ডিসেম্বর ২০১০
আজকে সকালে উঠে আমরা একটা সুন্দর দেশের পাহাড়দের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি। গত কয়েকদিনে শীতে আমাদের যেই কষ্ট হয়েছে তা আমরা দুইজনেই ভুলে যাব দেশে ফিরে গেলে। মনে থাকবে রোদমাখা পাহাড়ের চূড়াগুলো। মাকে দেখলাম আজকে সকালে উঠেও হোটেলের বাইরে কনকনে ঠাণ্ডায় রোদ পোহাচ্ছে। সকালের নাস্তা শেষ করে রেডি হয়ে নিচে নেমে গেলাম। ১১টায় প্লেন ছাড়বে। খাংখু রিসোর্ট থেকে এয়ারপোর্ট দেখা যায়। গতকাল একটা প্লেনও দেখেছিলাম ল্যান্ড করতে। ১০ মিনিট লাগল রিসোর্ট থেকে এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে। এই দশ মিনিট ধরে রোদে চিক চিক করা নদীর পানির দিকে চেয়ে থাকলাম। গাড়ি থেকে নদীর বয়ে যাওয়ার শব্দ শোনা যায় না। কিন্তু আমার মনে হলো আমি একটা ছল ছল শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আর এই শব্দটা সাথে নিয়ে আমি বিদায় নিচ্ছি।