বৃহস্পতিবার, ৭ আগস্ট, ২০১৪

মায়াবী লাঙ্কাউই


কেদা ফেরিঘাটে দশ মিনিটের লাইন ধরলাম। উঠলাম কোয়াগামী লঞ্চে। লাঙ্কাউইর ফেরিঘাটের নাম কোয়া। সামনের দিকে বসার জায়গা পেলাম। যাত্রীদের বেশির ভাগই পর্যটক। কিছুক্ষণের মধ্যেই বড় পর্দায় একটি ছবি চালিয়ে দেওয়া হলো। অ্যাকশন ছবিটি চীনা ভাষার। সহযাত্রী মালয় তরুণরা মনোযোগ দিয়ে দেখছিল।
মায়াবী লাঙ্কাউই
পৌনে দুই ঘণ্টা লাগল কোয়া পৌঁছাতে। টার্মিনালে প্রসাধনী, গয়না, শোপিস, খেলনা, মেয়েদের পোশাক, ফাস্ট ফুড ইত্যাদির অনেক দোকান। গাইড আমীর হামজা একটা গাড়ি আনিয়ে নিলেন। চালক আমীরের হাতে চাবি গুঁজে দিয়ে বিদায় নিল। বলে গেল, ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়ান। আমীর চালায় ভালো। পাঁচ মিনিটে আমাদের আস্থা অর্জন করল। একটা বাঙালি হোটেলে নিয়ে খেতে বসিয়ে দিল। দ্রুত খাওয়া সেরে কাছে মসজিদে জোহরের নামাজ পড়লাম। মসজিদের গম্বুজ স্বর্ণখচিত, দেয়ালে কোরআনের আয়াত খোদাই করা। গাছগাছালি ঘেরা মসজিদটি নয়নাভিরাম। পরে জেনেছিলাম এই মসজিদটি লাঙ্কাউইর অন্যতম দ্রষ্টব্য। এর নাম মসজিদ আল হানা।
হোটেল সুপার ওয়ানে আমাদের থাকার জায়গা ঠিক হয়েছে। এর জানালা দিয়ে কোয়া উপসাগর দেখা যায়। দুই ঘণ্টা বিশ্রাম দিয়ে আমীর হামজা আমাদের চেনাং বিচ নিয়ে যায়। রাস্তা দারুণ উঁচু-নিচু। শহর ছেড়ে গ্রামের মধ্য দিয়ে যেতে থাকি। অনেক বাড়িতে কলাগাছ দেখি। কোনো কোনো বাড়িতে সবজির আবাদ। কিছু কাঠের দোতলা বাড়িও চোখে পড়ল। ত্রিশ মিনিট পর গাড়ি থামল চেনাং বিচে। সৈকতের দৈর্ঘ্য বেশি নয়, সাগর এখানে শান্ত। তীরঘেঁষে সবুজ বৃক্ষের টিলা সৈকতকে আরো রূপসী করেছে। অন্যরা যখন শপিং মলে গেল আমি, জসিম স্যার ও নওশের ঝাপালাম সমুদ্রে। অনেক বিদেশি এখানে- শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ ও আরবি। স্নান শেষে পরিশ্রান্ত দেহ লুটিয়ে দিলাম বেলাভূমে। নওশের ও জসিম স্যার প্যারাসুটে করে আকাশে উড়াল দিল। উচ্চতা ভীতি থাকায় আমি শুয়ে শুয়ে দেখলাম। নওশেররা ফিরে এলো প্রায় এক ঘণ্টা পর।
ফেরার সময় আমীর নিয়ে গেল কোয়ার সবচেয়ে বড় চকোলেট দোকানে। বিক্রয়কর্মীর সংখ্যাই হবে এক শ। পছন্দমতো চকোলেট কিনে গাড়ির পেছনে রাখলাম। তারপর হোটেলে গেলাম নৈশভোজ সারলাম। অল্পক্ষণ জিরিয়ে গেলাম হকার মার্কেটে। প্লাস্টিকের বড় ছাতার নিচে টেবিল। তার ওপর পণ্যসম্ভার। কেউ কেউ রাস্তায় মাদুর পেতে বসিয়েছেন পণ্যের পসরা। বেশির ভাগ দোকানিই মহিলা। রাত বেশি হয়ে যাওয়ায় ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছিল অনেকেই। কার কিংবা মাইক্রোতে সবাই তুলে নিচ্ছেন নিজেদের সামগ্রী। কথা বলে জানলাম, গাড়িগুলো তাদের নিজস্ব। গাড়ি করেই সকালে আসেন ও রাতে ফেরেন। পরিচিতরা জানায়, লাঙ্কাউইতে জিনিসপত্রের দাম কুয়ালালামপুরের চেয়ে চড়া। তাই বেশি কিছু কিনলাম না।
পরদিন সকালে গিয়েছিলাম ঈগল স্কয়ারে। বারো মিটার উঁচু লালচে বাদামি রঙের ঈগল মূর্তিটি লাঙ্কাউইয়ের অন্যতম আকর্ষণ। নীলাভ জলরাশি আর দূরের পোতাশ্রয়ে পণ্যবাহী জাহাজের আনাগোনা এখানে দাঁড়িয়ে দেখতে ভালো লাগে। সাগরের পানিতে দূর পাহাড়ের ছায়া পড়েছে। এ সৌন্দর্য ভাষার অতীত।
আরো মালয়েশিয়া
মায়াবী লাঙ্কাউইকুয়ালালামপুর
নতুন ও পুরনো সব স্থাপনায় সমৃদ্ধ মালয়েশিয়া। সমুদ্র মাঝের দেশটিতে পাহাড় আছে, চিরহরিৎ বনও আছে। রাজার সরকারি বাসভবন ও প্রশাসনিক দপ্তর কুয়ালালামপুরের অন্যতম দর্শনীয় স্থান। বুকিট পেটালিং পাহাড়ের ঢালে নির্মিত প্রাসাদটিতে নতুন ও পুরনো স্থাপনাশৈলীর সম্মিলন ঘটেছে। মালয়েশিয়ার জাতীয় মসজিদটিও দৃষ্টিনন্দন। ইংরেজ আমলে নির্মিত প্রশাসনিক ভবনটি এখন মালয়েশিয়ার সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট ভবন। ইংল্যান্ডের বিগ বেনের মতো এখানেও আছে বিশালাকার কয়েকটি ঘড়ি। ভবনটির আরেক নাম তাই বিগ বেন, মালয়েশিয়া। ঠিক উল্টো দিকেই স্বাধীনতা স্কয়ার; পরিচিত মাদরেকা স্কয়ার নামে। এটি মালয়েশিয়ার জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ড। টুইন টাওয়ারের কথা তো নতুন করে বলতে হবে না। এ ছাড়া কুয়ালালামপুর বার্ড পার্কে বিরল প্রজাতির সব পাখি দেখার সুযোগ আছে। কুয়ালালামপুরের সগো, টাইম স্কয়ার এবং প্যাভিলিয়ন মার্কেট কেনাকাটার জন্য ভালো। যেতে পারেন চায়না মার্কেটেও।
প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ার ক্যাপসুল টাওয়ারে পোরা আছে মালয়েশিয়ার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। টাওয়ারের চূড়ায় সংরক্ষিত আছে মাহাথির মোহাম্মদের ভিশন ২০২০। অজানা পরিকল্পনাটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে ২০২০ সালের ১ ডিসেম্বর। কুয়ালালামপুর থেকে মাত্রই আধাঘণ্টার পথ।
যেতে পারেন মালয়েশিয়ার বিনোদন শহর গেন্টিং। কুয়ালালামপুরের পুডু বা গোম্বাক বাস টার্মিনাল থেকে বাসে গেন্টিং যাওয়ার ভাড়া জনপ্রতি ১০ রিঙ্গিত। ট্যাক্সিতে লাগে ২০০ রিঙ্গিত। ১ রিঙ্গিত সমান ২৩ টাকা ৪৬ পয়সা।
কিভাবে যাবেন
প্রতিদিন ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুর ফ্লাইট আছে। ভাড়া মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনস (৪০ হাজার টাকা), বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস্ (৪২ হাজার টাকা), ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ (৩২ হাজার টাকা)। কুয়ালালামপুর থেকে বিমান, সড়ক ও রেলপথে যাওয়া যায় লাঙ্কাউই। এয়ার এশিয়া, মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনস ও ফায়ার ফ্লিজ বিমান প্রতিদিন কুয়ালালামপুর থেকে যায় লাঙ্কাউই। ভাড়া প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা। লাঙ্কাউই বিমানবন্দর কোয়া শহর থেকে বারো কিলোমিটার। কুয়ালালামপুর থেকে এক্সপ্রেস লাঙ্কাউই ট্রেনে ছয় ঘণ্টায় কুয়ালা কেদায় এবং সাত ঘণ্টায় কুয়ালা পারলিসে যাওয়া যায়। বাসেও প্রায় একই সময়ে কুয়ালা কেদা ও কুয়ালা পারলিসে পৌঁছা যায়। কেদায় ট্রেনভাড়া সাত শ থেকে দেড় হাজার টাকা, পারলিসে ৯০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা। আর বাসে কেদা যেতে ভাড়া ৮০০ আর পারলিসে এক হাজার টাকা। সেখান থেকে ফেরি করে লাঙ্কাউই। ভাড়া কেদা ও পারলিস থেকে যথাক্রমে ৩৬০ টাকা ও ২৯০ টাকা।
মিনহাজুল ইসলাম জায়েদ

বুধবার, ৬ আগস্ট, ২০১৪

ছবির মতো থিম্পু

0
অঅ-অ+
ভোরে তখনো অন্যরা ওঠেনি। আকাশ ছিল ঝকঝকে। ফুন্টসোলিংয়ে নদীর পাড় ধরে হাঁটতে থাকলাম। এটি ভুটানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর, প্রবেশমুখ। কাল বাংলাবান্ধা দিয়ে সীমানা পেরিয়ে জলদাপাড়া হয়ে ভারতের জয়গাঁও পৌঁছেছি। একটা মাত্র গেট দিয়ে ভারত ও ভুটান আলাদা হয়েছে জয়গাঁওয়ে। কাল সন্ধ্যায় ফুন্টসোলিং এসে ভুটান বেড়ানোর ছাড়পত্র নিয়েছি। মামুলি কাজ। অল্পক্ষণেই শেষ হয়েছে। দলে আরো আছে শাকের ভাই, রাহমান ভাই, কামাল ভাই, শাওন, নোভা আর মোর্তোজা। পথে একটা বৌদ্ধমন্দির পেলাম। অনেক বুড়ো মানুষকে দেখলাম প্রেয়ার হুইল ঘোরাচ্ছে।
ছবির মতো থিম্পু
৮টায় আমাদের জিপ ঠিক হলো। নিয়ে যাবে থিম্পু। ড্রাইভারের নাম জয়। বয়স মেরেকুটে ২২ হবে। নেপালি ছেলে, চটপটে, জয়গাঁও থাকে। অল্প পরেই পাহাড় বাইতে শুরু করল জয়ের জিপ। একটা করে বৃত্ত পূরণ হচ্ছে আর ফুন্টসোলিং নিচে নামছে। বেশ মজা লাগছে দেখতে। মোট আটটি বৃত্ত পূরণ করে আমরা পাহাড়ের ডগায় উঠলাম। এখান থেকে পাহাড়ের পর পাহাড় আর পাহাড়। চোখের সীমাতক পাহাড়, সীমা ছাড়িয়েও। সবুজ ঢেউ আমাদের চারপাশে। মাঝেমধ্যে ওই দূরে চলমান সাদা ফিতা। দুরন্ত চপলা ঝরনা পাহাড় বেয়ে গেয়ে চলেছে। কাছে গেলে ফিতাটি শাড়ির পাড় হয়ে যায়। মুগ্ধ চোখে দেখি। জয়ের জিপে আতিফ আসলাম গেয়ে চলেছেন... ও লামহে, ও বাতে কোই না জানে...। আতিফের আকুতি পাহাড়ে মাতম তুলছে।
পথে বসতি নেই বললেই চলে। দুপুর নাগাদ একটা পেট্রল পাম্পের কাছে মালভূমি মতো জায়গায় পৌঁছলাম। আরো কিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। একটা ছোটমোট রেস্তোরাঁও আছে। জয় গেল তেল আনতে। আমরা রেস্তোরাঁয় গিয়ে খাবার অর্ডার করলাম যে যার মতো। আমি ফ্রায়েড রাইস আর খাসি। শাওন চাউমিন আর মুরগি। শাওন খাবার শেষ করতে পারে না। তাই বাকিটা আমার ভোগেই আসবে ভেবে নিয়ে আগেই শুরু করে দিলাম। আড়াইটা নাগাদ চলা শুরু করলাম। আবার সবুজের ঢেউ আর সাদা ফিতা। একজায়গায় আমাদের নিচে একটা বিরাট পাওয়ার প্লান্ট দেখলাম। কিছু বসতিও চোখে পড়ছে- আলগা আলগা পাঁচ-সাতটা বাড়ি। আরো কিছুক্ষণ পর সেনাবাহিনীর চেকপোস্ট। বেশি ঝক্কি করে না, তবে সময় নষ্ট করে। সন্ধ্যারও কিছু পরে রাস্তা খুব প্রশস্ত হয়ে এলো। কোনো একটা থালার মাঝে ঢুকে পড়েছি মনে হলো। প্রায় ৮টা বাজলে থিম্পুর টাইম স্কয়ারের কাছে পৌঁছি। নোভা, মোর্তোজা, শাওন আর রহমান ভাই গেলেন হোটেল খুঁজতে। আমি মার্কেটে বেড়াতে গেলাম। শাকের ভাই আর কামাল ভাই আড্ডা দিতে থাকলেন। আমি একটা পাঞ্জাবি খুঁজলাম। কাল ঈদ। জামাকাপড়ের মধ্যে আছে খালি জিনস আর টি-শার্ট। একটা টিভির দোকানে মমতাজের গানের সিডি দেখে মজা লাগল। পাঞ্জাবি না পেয়ে মমতাজের সিডি কিনলাম। কাল জয়ের গাড়িতে বাজাব।
ছবির মতো থিম্পু
হোটেলের মালিক বাঙালি। ছোটাছুটিও করছে বাঙালি ছেলেপুলে। মাঝারি মানের হোটেল। গরম পানির ব্যবস্থা আছে। কষে আধা ঘণ্টা গোসল করলাম। কামাল ভাইও ততক্ষণে প্রস্তুত। দলনেতা রহমান ভাই আমাদের নিয়ে চললেন রাতের খাবার খেতে। রাস্তাঘাট শুনশান। আকাশে চেয়ে চাঁদ খুঁজলাম। ঈদের রেশও নেই থিম্পুতে। একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে উঠলাম। বেশ চকচকে। কিন্তু মাছ-মাংসের ছিটেফোঁটাও নেই, পুরোই ভেজ। অগত্যা এত রাত বলে, রুটি আর তরকা গিললাম। খাওয়া সেরে শাকের ভাইকে সঙ্গে নিয়ে রাতের থিম্পু দেখতে বেরোলাম। দোকানপাট বন্ধ, লোকজনও নেই। একজনকে কোনোমতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, লাউঞ্জ বা ক্যাফে কোনোটা খোলা পাওয়া যাবে? তিনি ডান দিকের সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে যেতে বললেন। মাটির তলে নেমে গেলাম। টানেলে লাল বাতি জ্বলছে। একটা ছোট্ট কাঠের দরজা পেলাম। কাউবয় আমলের স্যালুন মনে হলো। ভেতরে ঢুকে দেখি সব ইয়ং ছেলেপুলে। কফি বা বিয়ার খাচ্ছে। ছোট্ট একটা ডায়াস আছে, একটা মেয়ে ভুটানি ভাষায় গান করছে। আমরা কিছু বিফ নিলাম। তারপর কফি দিয়ে শেষ করলাম। ততক্ষণে পৌনে তিনটি গান শেষ হয়েছে। আমরা দু-তিনবার তালি দিয়ে বেরিয়ে এলাম। রাস্তা খালি। ঘরে ঢুকে দেখি কামাল ভাই নাক ডাকছেন। আমিও পাল্লা দিয়ে কিছুক্ষণ ডাকলাম, তারপর ঘুমিয়ে পড়লাম। বেড়াতে গেলে ভোরেই বিছানা ছাড়ি। কেমন করে যেন ঘুম ভেঙে যায়। ভারী একটা জামা গায়ে দিয়ে হোটেল ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। দোকানপাট সেই সকালেই সব খোলা। গিয়ে দাঁড়ালাম ক্লক টাওয়ারে। বাতাসটা খুব ভালো। এত পাতলা বাতাস অনেক দিন পাইনি, জোরে জোরে বারবার নিঃশ্বাস নিলাম। পুবের পাহাড় ফুড়ে দিনের প্রথম আলো লাগল এসে গায়ে। এত মোলায়েম, এত সতেজ!
সকালে হোটেলেই ব্রেকফাস্ট পেলাম বেডের সঙ্গে ফ্রি- রুটি বা নুডলস, ডিম আর চা। তারপর দলেবলে চললাম থিম্পু দেখতে। জয় ড্রাইভার ভুটানের পার্লামেন্ট বিল্ডিংয়ে নিয়ে গেল। একটি টলমলে ঝিরির পাশে একটা বড় সবুজ চত্বর। চত্বরে অনেকগুলো পাইন গাছ, তার পরেই দৃষ্টিনন্দন কাঠের ভবনটি। ঝিরির ওপর একটা কালভার্টও আছে। সবুজ চত্বরে অনেক ছোট ছোট নীল ফুল ফুটে আছে। ভবনটির ওপর-নিচে নানা নকশা। মানুষজন নেই বেশি। এটাই পার্লামেন্ট ভবন। আমরা ঘুরে ঘুরে প্রায় দেড় ঘণ্টা থাকলাম সেখানে। এরপর গেলাম হেরিটেজ মিউজিয়াম দেখতে। এটা আসলে খামারবাড়ি। বড় বড় গরুর গাড়ির চাকা, কাস্তে, ধান ভাঙানোর কল, দুধ থেকে মাখন বানানোর কল ইত্যাদি রাখা আছে। কাছে একটা খোলা জায়গায় অনেক পাইন পাতা বিছানো হয়েছে- মানে একটা বেড তৈরি করা হয়েছে। দেখি ঝলমলে জামাকাপড় পরা আধুনিক ১০-১২ জন ছেলেমেয়ে। ভুটানি মনে হলো না। শুধিয়ে জানতে পেলাম, তারা দিল্লি থেকে এসেছে। আগামীকাল রাতে এখানে ফ্যাশন শো হবে।
ছবির মতো থিম্পু
খামারবাড়ি থেকে গেলাম ভাস্ট ভুটান। ভুটানি শিল্পীদের আড্ডাস্থল এই ভাস্ট ভুটান। টাইম স্কয়ারের কাছেই। সুবীরদার কাছ থেকে কামা ওয়াংদির কথা জেনে এসেছি। কামাদা বাচ্চাকে স্কুল থেকে আনতে গিয়েছেন। তবে আর যাঁরা ছিলেন, তাঁরা অভ্যর্থনা জানাতে কার্পণ্য করলেন না। পনিরের চা এনে দিলেন। একটা বড় কাচের গ্লাসের প্রায় পুরোটায় চা থাকে। ফুন্টসোলিংয়ে দাম ১০ রুপি। পনিরের চা প্রথম দু-চার চুমুক ভালো লাগে, তারপর আর ইচ্ছে করে না। চায়ে চুমুক দিতে দিতে ঘরে নজর বুলাই। সব জায়গায় ছবি- পাহাড় আর বুদ্ধের বেশি। এর মধ্যে কামাদা চলে এলেন। সঙ্গে শক্তপোক্ত এক ছেলে। নাম বলল, কর্মা। চীন সীমান্ত এলাকার ১০ দিনের ট্রেকিং সেরে সদ্য ফিরেছে থিম্পু। কিছুক্ষণ পর ছবি দেখাতে বসল। পুরোটা পথ পাহাড়ি আর পথজুড়ে বরফ। ছবি দেখেই মাৎ হয়ে গেলাম। কামাদা দুপুরে ভোজ দিলেন- ফ্রায়েড রাইস আর ঝিরির মাছ। ঝাল ঝাল, দারুণ খেতে। খেয়ে ভাস্টেই গড়িয়ে নিলাম। বিকেলে গেলাম থিম্পু পিকে। এখান থেকে পুরো থিম্পু শহর এক নজরে দেখা যায়। পাহাড়ের গায়ে পাইন গাছে অজস্র রংবেরঙের প্রেয়ার ফ্ল্যাগ ঝুলছিল। সন্ধ্যার কিছু আগে থিম্পু শহরে বাতি জ্বলে ওঠা দেখতে ভালো লেগেছিল। সন্ধ্যার খানিক পরে পিক থেকে নেমে এসে ক্লক টাওয়ারে বসেছিলাম। হালকা বাতাস ছিল, বাতাসে হিম ভাব ছিল। কামাল ভাই কথা বলতে ভুলে গেলেন, আমিও চুপ। শাওন হঠাৎ বলে উঠল, ওই যে চাঁদ। ঈদের চাঁদ। বাড়ির কথা মনে পড়ল। রাহমান ভাই বললেন, আজ তোমাদের বিরিয়ানি খাওয়াব। আরো পনেরো মিনিট বাতাস খেয়ে দলেবলে আমরা বিরিয়ানি খুঁজতে বেরুলাম।
কিভাবে যাবেন
ছবির মতো থিম্পু
ঢাকা থেকে দ্রুক এয়ারের বিমান প্রতি মঙ্গল ও শুক্রবার সকাল ৯টা ২০ মিনিটে ভুটানের পারোর উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ভাড়া ২০০০০ টাকা (যাওয়া-আসা)। সড়কপথে গেলে ভারতের ডাবল এন্ট্রি ভিসা লাগবে। উল্লেখ্য, ভুটানে ভারতীয় রুপি চলে এবং মুদ্রামান সমান। ঢাকার কল্যাণপুর থেকে এসআর ট্রাভেলসের বাসে বাংলাবান্ধা গিয়ে শেয়ারের জিপে জয়গাঁও যাওয়া যায়। আবার চেংড়াবান্ধা থেকে শিলিগুড়ি গিয়ে তেনজিং নোরগে বাস টার্মিনাল থেকে জয়গাঁওয়ের বাস পাবেন। কলকাতা থেকেও জয়গাঁও যেতে পারেন। সময় লাগে ছয়-আট ঘণ্টা। ফুন্টসোলিংয়ে থাকতে পারেন প্যারাডাইস, মাদ্রাজ বা হিমালয় হোটেলে। ভাড়া শুরু হয় ৫০০ রুপি থেকে। থিম্পুতে থাকতে পারেন দ্রুক, রিগনাম, কাসাং বা ডেগং হোটেলে। থিম্পু থেকে পারো ৬৫ কিলোমিটার। সময় লাগে দুই ঘণ্টা। পারোতে থাকতে পারেন কেকে, রেভেনস নেস্ট, সোনাম ট্রোফেলে। ভাড়া দুই বিছানার এক কক্ষ এক থেকে আড়াই হাজার টাকা।
মাহবুব আলম পল্লব