শুক্রবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

বসন্ত বাতাসে- ভাপ্পু উৎসব!

মূল লেখার লিংক
IMG_0423
ফিনিসেরা জাতি হিসেবে বেশ শান্ত, চুপচাপ, লাজুক। এতটাই বেশী যে তামপেরে তে আসার পরে আমি মাঝে মাঝে তাদের নীরবতায় হাঁপিয়ে উঠতাম। হয়ত বাসে করে কোথাও যাচ্ছি, বাসের ভীতর সবাই নট নড়ন নট চড়ন হয়ে বসে আছে। দুই একজনের ফিসফাস কথা ছাড়া বাসের ভিতরে থম ধরা নীরবতা। কারো মুখে হাসি নাই।
তামপেরে এসেছিলাম এক শরতের শেষ ভাগে। কিছু বুঝে উঠার আগেই হুড়মুড় করে শীত বাবাজী এসে হাজির হয়েছিল। অসম্ভব ঠাণ্ডা, চারিদিক অদ্ভুত সাদা আর তার মাঝে আশে পাশের মানুষগুলোর এই মৌন ব্রত দেখতে দেখতে আমি হতাশ হয়ে যাচ্ছিলাম। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করত ”ঘাও” বলে কারো উপরে লাফ দিয়ে পরে তাকে চমকে দেই, গোমড়া মুখে একটু হাসি ফুটাই। কিন্তু তাই কি আর হয়, তবে তার মাঝেও আশায় বুক বেঁধেছিলাম, সামনে ক্রিসমাস, তারপরে নিউ ইয়ার… তখন নিশ্চয় সকলের উচ্ছ্বসিত চেহারা আর প্রান ভরা হাসি দেখতে পাব…
কিন্তু কিসের কি, যেই লাউ, সেই কদু। ক্রিসমাস এগিয়ে আসছিল, অল্প কিছু আলোকসজ্জা আর দোকান পাটে সামান্য বেশী ভিড় ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ছিলনা। ভাবলাম ঠিকাছে, নিশ্চয় ক্রিসমাসের আগের দিন… কিন্তু আবারও আমাকে বেকুব করে দিয়ে ২৪ তারিখ দুপুর ১২ টা থেকে ২৫ তারিখ সারাদিন বাস চলাচল বন্ধ থাকল। শুধু বাস নয় দোকানপাট সহ সবই বন্ধ থাকল। খুব আশা নিয়ে দেখতে চেয়েছিলাম উৎসবের আমেজ, সবার হৈ চৈ, হা হা, হি হি, লাফালাফি, অকারনে চিৎকার… সেই জায়গাই বাস বন্ধ থাকায় সারাদিন শুয়ে বসে ঘুমিয়ে আর মুভি দেখেই আমার দিন কাটল।
ক্রিসমাসের কয়দিন পরেই থার্টি ফার্স্ট নাইট, আলোকসজ্জা হল, বাতি জ্বলল, মহা সমারোহে আতসবাজি দেখতে গেলাম। প্রচুর পরিমানে আতসবাজিও ফুটল। শুধু সেই উৎসবের আমেজের কমতিটা কিছুতেই কাটল না… হাজার হাজার মানুষ লেকের ধারে জমা হয়েছে, খুব চমৎকার আতসবাজি হচ্ছে, অল্প কিছু মানুষ ছাড়া সবাই চুপচাপ দেখছে। এটা কোন কথা হল, একটু চিৎকার দিবেনা, লাফাবেনা, এ ওর গায়ের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বেনা? আসলে আমি হয়ত নিজের অজান্তেই দেশীয় স্টাইলের উৎসবের আমেজ খুঁজছিলাম।
যাই হোক, মাসের পরে মাস কেটে যাচ্ছিল। দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ছিল, প্রায় সময় সূর্যের আলো পাচ্ছিলাম শুধু বরফটা কিছুতেই গলছিলনা। এপ্রিল মাসের এক তারিখেও যখন ধুমায়ে স্নো পড়ল, আমি বুঝে গেছিলাম… এই সাদার হাত থেকে আর বুঝি আর নিষ্কৃতি নাই। কিন্তু আমার ধারনা ভুল প্রমান করতেই এপ্রিলের শেষ দিকে এসেই বরফ হুড়মুড় করে গলা শুরু হল। আর তার সাথে সাথে মানুষগুলোর নীরবতার বরফও গলে যেন জল হল। এবার আমার অবাক হবার পালা। মনের আনন্দে লক্ষ্য করলাম এখন সবাই যখন তখন হেসে উঠে, বাসের মধ্যে জোরে জোরে গান বাজে, এখানে সেখানে ছোট ছোট মেলার মতন দোকান পাট বসা শুরু হল। সবার ভিতরে কি এক উৎসবের ছোঁয়া!
এর মাঝে খেয়াল করলাম যেখানে সেখানে , বিভিন্ন সুপার মার্কেটে রং বেরঙের, বিভিন্ন ডিজাইনের, ইয়া বড় বড় সব গ্যাস বেলুন, অদ্ভুত অদ্ভুত সব মুখোশ, নানান রঙের চুল, অন্যরকম সব পোশাক বিক্রি হচ্ছে। বেলুন আমাকে সব সময়েই খুব আকর্ষণ করে, আর এত রকমের বেলুন- স্পাইডার ম্যান, নাল্লে পু, ঘোড়া, গাড়ি, সিন্ড্রেলা, সূর্য মুখী ফুল সব রকমের বেলুনই পাওয়া যাচ্ছে। আমিও নড়ে চড়ে বসে দুইটা বেলুন কিনে ফেললাম। বুঝলাম কিছু একটা হতে যাচ্ছে।
এবার এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম- কি হতে যাচ্ছে? সে আকর্ণ হেসে জবাব দিল, তুমি এখনও জাননা, খুব সামনেই যে ভাপ্পু উৎসব। চেপে ধরলাম পুরো বিষয়টা ঠিকমত খুলে বলার জন্য। যা শুনলাম তা খুবই মজার।
ভাপ্পু হচ্ছে ফিনিসদের সবচেয়ে বড় প্রানের উৎসব। অনেকটা আমাদের পহেলা বৈশাখের মত। দুই দিন ব্যাপি এই উৎসব শুরু হয় এপ্রিল মাসের ৩০তারিখ সন্ধ্যায় এবং শেষ হয় ১লা মে। ৬০/৭০ এর দশকে ১লা মে অন্যান্য দেশের মত ফিনল্যান্ডেও লেবার ডে বা শ্রমিক দিবস হিসেবেই পালিত হত, ফিনিস ক্যালেন্ডারও এখনও সেটার পক্ষেই কথা বলে, কিন্তু বেশ অনেকদিন যাবত ৮০এর দশকের শেষভাগ থেকেই ভাপ্পু পুরোপুরি হয়ে গেছে শুধুই স্টুডেন্টদের উৎসব। এটি আসলে এক ধরনের বসন্তের আগমনী উৎসব বা বসন্ত বরন উৎসবও বটে।
আমার স্থানীয় বন্ধুর কাছে যা শুনলাম তাতে মূল ব্যাপারটা হল প্রতি বছর যে সমস্ত স্টুডেন্টরা উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে বা কলেজ শেষ করে। ভাপ্পুর দিনে তাদের মাথায় সাদা রঙের টুপি পড়িয়ে সেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই টুপিও কিন্তু যখন তখন পড়া যাবেনা। ৩০শে এপ্রিল সন্ধ্যা ৬ টায় অফিসিয়ালি টুপি পড়ানোর উৎসবের পরেই কেবল মাত্র সব ছাত্র ছাত্রী টুপি মাথায় টুপি তুলতে পারবে।
ফিনল্যান্ডের বড় বড় শহরগুলোতে যেমন হেলসিংকি, তামপেরে, তুরকু- প্রায় হাজার দশেকের বেশী লোক অংশগ্রহন করে এই টুপি উৎসবে, এমনকি টেলিভিশনেও দেখানো হয়ে থাকে। টুপি পড়ানোর উৎসবটা আসলে হয়ে থাকে বিভিন্ন মূর্তির মাথায় টুপি পড়ানোর মধ্যে দিয়ে। যেমন হেলসিংকিতে মার্কেট স্কয়ারে অবস্থিত হাভিস আমান্দা নামক ন্যুড মূর্তির মাথায় টুপি পড়ান দিয়ে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। তামপেরে তে ন্যুড মূর্তি কাউপ্পিয়াসের মাথায় টুপি পড়ান হয় । বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন মূর্তির মাথায় টুপি পড়ানোর পর পরেই সকল ছাত্র ছাত্রী নিজেদের মাথায় সাদা টুপি তুলে, একে অপরকে আলিঙ্গন করে, চিৎকার করতে থাকে, জোরে জোরে হুইশেল, বাঁশি ফুঁকতে থাকে। সবার মুখে শোনা যায়- হুইভা ভাপ্পুয়া বা হাউস্কা ভাপ্পুয়া মানে হল শুভ হোক ভাপ্পু অথবা হ্যাভ আ নাইস ভাপ্পু। অনেকটা আমাদের দেশীয় শুভ বসন্ত, শুভ ফাল্গুন, শুভ নববর্ষ এর মত ব্যাপার সাপার আর কি।
ভাপ্পুতে স্টুডেন্টদের সুনির্দিষ্ট ড্রেস কোড থাকে। সেটা হল আপাদমস্তক ওভারঅল। সেই ওভারঅলে আবার নাকি যত বেশী নোংরা হবে, যত বেশী আঁকি বুকি আর ব্যাচ লাগানো থাকবে তত ভালো, মজা তত বেশী।
৩০শে এপ্রিল রাতভোর স্টুডেন্টদের হৈ হুল্লোড়ের পর ১লা মে তে সবাই সেন্টারে জমা হয়, সেখানে বিভিন্ন মেলার মত দোকানপাট বসে, সরকারীভাবে র‍্যালি হয়, এখানে ওখানে ধোঁয়া উঠা খাবার, বিভিন্ন বাঁশির আওয়াজ, মুখোশসহ লেকের ধারে, পার্কে সবাই পিকনিকের আমেজে শুয়ে বসে থাকে।
১) পিকনিকের আমেজে সবার ছড়িয়ে ছিটিয়ে এলোমেলো বসে থাকা।
rest
ভাপ্পুর আরেকটা দিক হল, এই দিন থেকেই সবাই বসন্ত বা সামারের পোশাক পড়া শুরু করে আনুষ্ঠানিক ভাবে। ফিনল্যান্ডে শীতকাল এত দীর্ঘ যে আলাদাভাবে বসন্ত আসলে টের পাওয়া যায়না। মে মাসের শুরুতেও গাছে পাতা আসেনা, ফুল তো অনেক দুরের ব্যাপার। তাই এই ভাপ্পুর পর থেকেই সবাই বসন্ত, গ্রীষ্ম সব এক সাথে পালন শুরু করে।
সব শুনে আমি আহ্লাদিত হলাম, দারুন সব ব্যাপার স্যাপার তো। এইটা কোনভাবেই মিস করা যাবেনা, টুপি পড়ান থেকে শুরু করে, দোকানপাট, খাবার দাবার সব আমার দেখা চাই। আমার দুর্ভাগ্য, অসুস্থতার কারনে ৩০শে এপ্রিল সন্ধ্যা ৬ টায় টুপি পড়ান আর দেখতে যেতে পারিনি। কিন্তু তাতে কি, মে মাসের প্রথম দিনে সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেই রউনা দিলাম সিটি সেন্টারের উদ্দেশে। নামেই বসন্ত উৎসব বাইরে বরফ গললেও তখনও বেশ ঠাণ্ডা। সেন্টারের বেশ আগেই শুনলাম গাড়ি এবার অন্য দিক দিয়ে চলে যাবে। পুরো সিটি সেন্টারে সমস্ত রাস্তায় গাড়ি চলাচল বন্ধ।
২) সিটি সেন্টারে প্রধান সড়কে মানুষজনের ভিড়।
IMG_0426
গাড়ি থেকে নেমেই দেখি চারিদিকে অনেক মানুষ, স্টুডেন্টদের সহজেই চেনা যায় তাদের ওভারঅলের জন্য। ডিপার্টমেন্ট অনুযায়ী ওভার অলের রং ভিন্ন। সবার মাথায় সাদা ক্যাপ, কারো কারো মুখে মুখোশ, কম বেশী প্রায় সবারই হাতে মজার মজার সব বেলুন, কেউ বা আবার হুইশেল বাজাচ্ছে মনের আনন্দে। কার্নিভালের মত উৎসবের আমেজ চারিদিকে, সবার হাসি হাসি চেহারা।
৩) মনের আনন্দে ঘুরাঘুরি।
IMG_0422
রাস্তায় ততক্ষনে বেশ ভিড় হয়ে গেছে। আমি ভিড় ঠেলে সামনে এগুলাম। কিছুদুর গিয়েই দেখতে পেলাম কাউপ্পিয়াসের মাথায় টুপি পড়ান হয়েছে গত সন্ধ্যাতেই। বেশ লাগছিল মাথায় টুপি পরিহিত ভদ্রলোকটিকে দেখতে।
৪) গ্রাজুয়েশনের টুপি পরিহিত কাউপ্পিয়াস।
IMG_0403
৫)সামনে থেকে তোলা কাউপ্পিয়াস বাবাজীর ছবি।
IMG_0412
আমার খুব মজা লাগছিল আশে পাশের এই উৎসবের আমেজ দেখতে। চারিদিকে এত বেলুন, মাঝে মাঝে মুখেও এসে বাড়ি দিচ্ছিল কিছু বেলুনের ঝাঁক।
৬) ঝাঁকের বেলুন।
IMG_0345
৭)আরও কিছু বেলুনের ঝাঁক-
IMG_0443
বেলুনের ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে দেখি অপেক্ষমান জনতা লেকের ধারে শোভাযাত্রার অপেক্ষায় রয়েছে। বাইরে তখন হঠাৎ বাতাসের বেগ বেড়েছে।
৮) শোভাযাত্রার অপেক্ষায় অপেক্ষমান জনতা।
IMG_0358
৯) কাউপ্পিয়াসের মূর্তির পিছনের লেক। এই লেকের ধার ধরেই লোকজন সার বেঁধে র‍্যালির অপেক্ষায় ছিল।
IMG_0398
খুব বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হলনা , অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই র‍্যালি এসে হাজির। চমৎকার ছন্দবদ্ধভাবে মিউজিকের তালে তালে কাউপ্পিয়াসের মূর্তির সামনে দিয়ে লেকের ধার ধরে সিটি সেন্টারে গিয়ে র‍্যালি শেষ হল।
১০) পুলিশি প্রহরায় ভাপ্পু উৎসব বরন শোভাযাত্রা ।
IMG_0370
১১) শোভাযাত্রার একাংশ।
IMG_0376
১২) পেছন থেকে তোলা শোভাযাত্রার ছবি।
IMG_0386
আমিও পায়ে পায়ে র‍্যালির পিছন পিছন চারিপাশ দেখতে দেখতে সিটি সেন্টারে গিয়ে হাজির হলাম। সেই অনুভূতিটি আসলেই খুব অন্যরকম ছিল, বারবার দেশের পহেলা বৈশাখের কথা মনে পড়ছিল। চারিদিকে যেন রঙের মেলা বসেছে। বিভিন্ন খাবারের দোকানপাট, নানান রকমের পরচুলা, মুখোশ, বিভিন্ন রকমের খেলনা আর বহুবিধ খাবারের দোকান চারিপাশে। বাটার দিয়ে কড়া করে ভাজা মুইক্কু মাছ, স্যামন মাছ আর সসেজের গন্ধে পুরো এলাকাটা মৌ মৌ করছিল। যদিও ভাপ্পুর স্পেশাল খাবার হল তিপ্পালেইপা এবং বিভিন্ন ধরনের ডোনাট কিন্তু বিভিন্ন খাবারের স্টলে প্রায় সবধরনের খাবারই পাওয়া যাচ্ছিল।
১৩) ভাপ্পু উৎসবে পতপত করে উড়তে থাকা ফিনল্যান্ডের জাতীয় পতাকা।
IMG_0396
১৪) মেয়রের কার্যালয়ে উড়তে থাকা পতাকা।
IMG_0394
ভাপ্পুর স্পেশাল খাবার তিপ্পালেইপাও আসলে এক বিশেষ ধরনের বদখত চেহারার কড়া করে ভাজা ডোনাট। এই ডোনাটের উপর দিয়ে আবার বেশ করে চিনি ছড়ান থাকে। তিপ্পালেইপা কিন্তু ভাপ্পু উৎসবের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই বিভিন্ন সুপার মার্কেটে পাওয়া যায়। অনেকে আবার বাসাতেও বানিয়ে থাকে, এছাড়াও ভাপ্পুর দিন সিটি সেন্টারে অস্থায়ী গজান প্রায় সকল খাবারের দোকানেই এই ডোনাট পাওয়া যায়। ভাপ্পুতে যে শুধু বিশেষ খাবার পাওয়া যায় তাই নয়, বিশেষ এক ধরনের পানীয়ও ভাপ্পু উৎসব পালনে অপরিহার্য। সিমা নামক বাদামী বর্ণের এই বিশেষ পানীয়টি ঘরে যেমন প্রস্তুত হয়ে থাকে তেমন ভাবে বিভিন্ন সুপার মার্কেট গুলোতেও কিনতে পাওয়া যায়। সিমা দেখতে অনেকটা বিয়ারের মতই, প্রস্তুতপ্রণালীও কম বেশী একই রকম। সিমা তীব্র মিষ্টি সাদের আর লেবু লেবু গন্ধযুক্ত। সিটি সেন্টার জুড়ে চলমান মানুষের অনেকের হাতেই সিমার বোতল দেখা যাচ্ছিল।
১৫) বিভিন্ন খাবারে সজ্জিত খাবারের দোকান।
aro khabar
ততক্ষনে দুপুর প্রায় আসন্ন, আকশে সূর্য থাকলেও বাতাস বেশ ঠাণ্ডা, অনেকেই ইতিমধ্যে বিভিন্ন খাবারের দোকানে ঢুকে খাওয়া দাওয়া শুরু
করেছে। আমিও গুটি গুটি পায়ে এক স্টলে ঢুকে মুইক্কু মাছ ভাজা আর সব্জির অর্ডার দিলাম। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আশে পাশের মানুষের খুশি খুশি তৃপ্ত হাসিমুখ দেখতে বেশ লাগছিল। খেয়াল করে দেখলাম বসন্ত আসার সাথে সাথে তাদের গোমড়া চেহারাগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
১৬) পছন্দের মুইক্কু মাছ ভাজি।
muikku fish
১৭) মুইক্কুর পাশের ডেকচিতে আলু, সবজি আর সসেজ ভাজি।
khabar
খাওয়া দাওয়া শেষ হলে এবার সেন্টার জুড়ে ছোট বড় গজিয়ে উঠা মেলা সদৃশ দোকান গুলোতে ঘুরতে বের হলাম। যেখানেই যাই সেখানেই দেখি বেলুনের সমারোহ। বেলুন দেখলে কেন যে মাথা নষ্ট হয়ে যায় আমার বুঝিনা, ঘুরতে ঘুরতে আরও বড় বড় দুটো বেলুন কিনলাম। আগেই হাতে দুটো বেলুন নিয়ে ঘুরছিলাম এবার হল চারটে। এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি শেষে মেলার শেষ প্রান্তে গিয়ে দেখি সেখানে বাচ্চাদের খেলার জন্য অস্থায়ীভাবে রবার আর প্লাস্টিকের তৈরি এক বড়সড় খেলনাঘর, যার উপরে বাচ্চারা মনের সুখে লাফাতে পারবে। টিপে টুপে দেখলাম বেশ নরম সরম। আফসোস বড় মানুষ প্রবেশ নিষিদ্ধ ভিতরে, তাই আর যাওয়া হলনা।
১৮) মেলায় যাইরে।
IMG_0445
১৯) আবারও বেলুনের সমারহ।
IMG_0442
২০) মেলায় ভিতরে হরেক রকম মুখোশ আর খেলনার দোকান।
saj
২১) ক্যান্ডি কেনায় মগ্ন এক বালক।
IMG_0353
২২) বর্ণিল পরচুলা।
IMG_0484
২৩) বাচ্চাদের খেলাঘর।
IMG_0488
সব ঘুরে দেখা শোনার পর ভাবলাম এবার বাসায় ফিরে যাই, তাছাড়া ততক্ষনে অসুস্থ শরীরে রীতিমত ঠাণ্ডা লাগা শুরু হয়েছে। এবার ঘরে ফেরার পালা। কিন্তু যে বাসস্টপ থেকে বাস ছাড়বে তা অনেক দূরে কেননা সেন্টারের বাস চলাচল বন্ধ। অগত্যা কি আর করা, পা দুটি ভরসা। ফেরার পথে লেকের ধার দিয়ে যখন ফিরছিলাম দেখি অনেক মানুষ লেকের পাড়ে জমা হয়ে গভীর মনোযোগে কি যেন দেখছে। আর তাছাড়া মাঝে মাঝে দূর থেকে বেশ চিৎকার ভেসে আসছে। কৌতূহলী হওয়াতে ঠেলে ঠুলে লেকের একদম ধারে গিয়ে হাজির হলাম। এবার একজনকে জিজ্ঞেস করলাম ঘটনা কি। ঘটনা শুনে তো আমার চক্ষু চড়কগাছ। ঘটনা হল সদ্য গ্রাজুয়েট ছেলেমেয়েদের মধ্যে যাদের আগ্রহ, উত্তেজনা এবং সাহস বেশী, সরকারী সহযোগিতায় এবং স্টুডেন্ট ইউনিয়নের উদ্যোগে তাদের ক্রেনে করে লেকের পানিতে গলা পর্যন্ত চুবান হয়। এভাবেই তারা তাদের তীব্র আনন্দ উদযাপন করে থাকে। শুনে আমি এত অবাক হয়েছিলাম যে কি বলব বুঝতে পারছিলামনা। বেশ কিছুক্ষন তাকিয়ে তাকিয়ে তাদের পানিতে চুবানোর দৃশ্য দেখলাম। তাপমাত্রা তখন মাত্র ৩ ডিগ্রী হবে। পানিতে নামার সময় সবাই খুব উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করছিল, অনেকের হাতেই ছিল সিমা কিংবা বিয়ারের বোতল। পানি অসম্ভব ঠাণ্ডা হবার কথা কিন্তু তাদের আনন্দের চিৎকার দেখে একবারও মনে হয়নি তাদের বিন্দুমাত্র কষ্ট হচ্ছে।
২৪) দূর থেকে তোলা ক্রেনে করে লেকের পানিতে চুবানোর দৃশ্য।
dub
২৫) ক্রেনের মাথায় খাঁচা বেঁধে পানিতে নামান হচ্ছে।
dur theke panite chubano
২৬) কাছ থেকে পানিতে নামানর দৃশ্য।
panite duban
দেশ থেকে আসার পর মাঝে এই মাসগুলোতে যে নিঃসঙ্গতা আর নীরবতা বুকে চেপে বসেছিল ভাপ্পু উৎসব এক নিমিষেই তা উড়িয়ে নিয়েছিল। দীর্ঘ শীত আর অন্ধকারের অবসন্নতা সব পলকেই ভুলে গিয়েছিলাম। পহেলা বৈশাখের দিনে খুব মিস করেছিলাম ঢাকা ইউনিভার্সিটি এলাকা, প্রানের উৎসব। ভাপ্পুর উৎসব যেন সেই আমেজ কিছুটা হলেও ফিরিয়ে দিয়েছিল। সব শেষে বেশ মনের আনন্দেই সেদিন বেলুনগুলো সব আকাশে উড়িয়ে দিয়ে আমি ঘরে ফিরেছিলাম।
২৭) আনন্দের মুক্তি
IMG_0491

মেলবোর্ণে ভাতের হোটেলের সন্ধানে

ঢাকা শহরে দেড় দশক অবস্থানের সুবাদে নানান কিসিমের হোটেলে ভক্ষণ করবার সুযোগ আমার হয়েছে, তবে এর মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় হল সেই হোটেলগুলো, যেগুলোকে সাধারনত ‘ভাতের হোটেল’ নামক এক অলিখিত ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়। বাংলাদেশে যেমন বই বিক্রীর দোকানকে লাইব্রেরী বলে, অনেকটা সেইরকম নিপাতনে সিদ্ধ ভাবেই খাবারের দোকানকে বা ভোজনালয়কে হোটেল বলে। রেস্টুরেন্ট কথাটাও অবশ্য চালু আছে। নীলক্…ষেতের ‘সংগ্রাম’ হোটেলের নাম অনেকেই শুনে থাকবেন, কিম্বা মহাখালীর ‘জলখাবার’ অথবা মগবাজার মোড়ের ‘থ্রি-স্টার’ হোটেলের নাম। ফার্মগেটের আশেপাশে এরকম বেশ কয়েকটি ভাতের হোটেলে আমার প্রচুর যাতায়াত ছিল দীর্ঘদিন গ্রীনরোড এলাকায় থাকার কারনে। কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের খাবারে অরুচি এলেই ঢুঁ মারা হত কোন সস্তা ভোজনালয়ে, আর ভেতো বাঙ্গালী হিশেবে মাত্র ২০/৩০ টাকায় পেটপুরে ভাত খাওয়ার লোভ সামলাতে না পেরে ভাতের হোটেলই হত আমার গন্তব্য। অনেকে অবশ্য নোংরা বা অস্বাস্থ্যকর এইসব অজুহাতে খেতে চাইত না এসব খাবার-বিপণীতে, তবে আমার পৈতৃকসুত্রে প্রাপ্ত পাকযন্ত্রটির ঈর্ষানীয় দক্ষতা ও সবলতার গুণে আমি এসব ভাতের হোটেলের নিয়মিত কাস্টমার ছিলাম বরাবরই।
ভাতের হোটেলের সঙ্গে মানে/দামে/মর্যাদায় এর উপরের শ্রেনীর হোটেলগুলোর একটা বড় পার্থক্য হলঃ এইসব ভাতের হোটেলে কোন মেনু কার্ডের বালাই নেই। বেসিনে হাত-মুখ ধুয়ে নিয়ে টেবিল দখল করে সরাসরি আওয়াজ দিন, “মামা, ভাত লাগান” – সঙ্গে সঙ্গে ভাত হাজির। কি দিয়ে খাবেন? চিন্তার কিছু নাই, ভাতের সঙ্গে সঙ্গে ওয়েটাররুপী জীবন্ত মেনুকার্ড ও মুল্যতালিকা হাজির। আপনি একা হলে অন্য এক বা একাধিক ভোজনার্থীর সঙ্গে একই টেবিলে খেতে হবে। সবার সেটা ভাল না লাগলেও আমার কিন্তু বেশ লাগে। তরকারীর ঝোল শেষ হয়ে গেলে মামার কাছে এক বা একাধিকবার মামার বাড়ির আবদার করতে পারবেন, যেটা একটু ভদ্রগোছের হোটেলে চলে না। এতসব কারনে আমার গৃহ-বহির্ভুত ক্ষুন্নিবৃত্তির প্রধান আস্তানা ছিল ঢাকার বিভিন্ন ভাতের হোটেল। নীলক্ষেতের তেহারির দোকানগুলোও আমার পছন্দের তালিকায় ছিল, যেমন ছিল সায়েন্স ল্যাবোরেটরীর মোড়ের মালঞ্চ নামক গ্রীল চিকেনের দোকান। ওপথে যাওয়া পড়লে কাঁচা মরিচ আর পেঁয়াজ সহযোগে দু’প্লেট তেহারী কিম্বা নান রুটির সঙ্গে দু’পিস গ্রীলড চিকেন মেরে না দিয়ে কখনোই ফেরা হত না। এসব হোটেলে মেনু পছন্দ করবার বালাই নেই – তেহারীখানায় শুধুই তেহারী পাবেন, আর গ্রীল চিকেনের দোকানে শুধুই চিকেন সহযোগে নান রুটি।
তিনবছর আগে যখন দেশ ছাড়ি অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নের উদ্দেশ্যে, তখন দেশের অনেক কিছুই হারিয়েছি, যার মধ্যে অন্যতম হল যখন তখন রাস্তার পাশের ভাতের হোটেলে বা তেহারীখানায় ঢুকে ‘মামা, খানা লাগাও’ বলার স্বাধীনতা। শুনেছি সিডনীতে নাকি আজকাল বাংলাদেশী স্টাইলে তেহারীর দোকান হয়েছে; আমরা মেলবোর্নবাসীরা এখনো অতটা ভাগ্যবান নই। মেলবোর্নে বাংলাদেশী খাবারের রেস্টুরেন্ট হাতে গোনা মাত্র হালি দেড়েক, আয়তনে বিশাল এই নগরীর নানান এলাকায় ছড়িয়ে ছিঁটিয়ে। আর সে সব হোটেলও ঠিক ঢাকার ভাতের হোটেলের মত নয়, সাহেবী স্টাইলে মেনু কার্ড দেখে অর্ডার দিয়ে ১৫/২০ মিনিট পরে খাবার আসে। তাতে অভিজাত হোটেলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে বাসমতি চালের স্টীমড রাইস উইথ স্লো কুকড গোট কারী খাওয়ার স্বাদ মেলে, ডিমের তরকারী বা খাসির মাংস (গোট আবার কি বস্তু? বাংলাদেশে সব খাসি!) দিয়ে নাজিরশাইল চাউলের ভাত অপরিচিত কারো সঙ্গে একই টেবিলে বসে খাওয়ার আমেজ পাওয়া যায় না। কিছু ভারতীয় রেস্টুরেন্টে বিরানী পাওয়া যায়, তবে সার্ভিস/দাম/মানের দিক থেকে এরাও অভিজাত হোটেলের পর্যায়ে পড়ে, ভাতের হোটেলের ক্লাসে নয়। এদেশে পথচলতি খাবার হল সাবওয়ে, ম্যাকডোনাল্ডস আর কেএফসির মত ফাস্ট ফুড অথবা চাইনীজ/ভিয়েতনামীজদের ফ্রাইড রাইস উইথ ভেজিটেবল কিম্বা নানান পদের মাংস, অথবা আফগান/লেবানীজ/তার্কিশ দোকানে কাবাব ও রুটি। এগুলোর কোনটাই খেতে খারাপ না, তবে ভাতের স্বাদ কি আর ফ্রাইড রাইস বা রুটি-কাবাবে মেলে? তারপরে আছে হারাম-হালালের ঘাপলা – ফলে সিংহভাগ প্রবাসী বাঙ্গালীরা বাসার বাইরের খাবার তেমন খান না বললেই চলে। এখানে এসে ধর্মপ্রাণ বাঙ্গালী মুসলিমেরা আবার মাংস ছাড়াও আইসক্রীম বা কেকের মধ্যেও হালাল-হারাম খোঁজেন, তবে সেটা ভিন্ন প্রসংগ। ম্যাকডোনাল্ডসের আলুর চিপসও নাকি হারাম, লোকমুখে শুনতে পাই। আমি অবশ্য স্বল্পাহারী এবং সর্বভূক – শুকরমাংস এবং কিছু নাম না জানা সামুদ্রিক মাছ ছাড়া মোটামুটি সবই খাই, খেতে খারাপ না লাগলে।
যাই হোক, নতুন দেশে এসে অনেক নতুনের ভিড়ে পুরাতন সেই অভ্যাস আর ছাড়তে পারি না, তাই ভাতের হোটেলের সন্ধানে শহরের ও শহরতলির অলিগলিতে উঁকিঝুঁকি মারতে থাকি। এরই মাঝে একদিন ভাগ্যদেবী সহায় হোন, আর আমি পেয়ে যাই এমন এক খাবারের হোটেল, যেখানে মেনু কার্ডের বালাই নেই (কারন, মেনু একটাই), বসে বসে আরাম করে খাবার খেয়ে একই টেবিলে অন্যদের সঙ্গে পানির জাগ ও গ্লাস শেয়ার করতে হয় (মেলবোর্নে এটা বিরল ঘটনা)। ঢাকাইয়া স্টাইলে বারবার ঝোল চাওয়ার মত দ্বিতীয়বার কিম্বা প্রয়োজনবোধে তৃতীয়বার খাবার চেয়ে নেওয়া যায়। কোন কার্ড-ফার্ডের জায়গা নেই – নগদের কারবার, ইন ক্যাশ দে ট্রাস্ট! খেতে বসলে আশে পাশের টেবিলে (অথবা ভীড়ের সময়ে আপনার নিজের টেবিলেই) অনেক ভারতীয়-অভারতীয়-সাদা-কালো-বাদামী ভোজনরসিককে পাবেন, যারা খাবারের আদবকায়দার তথা টেবিল ম্যানার্সের গুষ্টি কিলিয়ে শুধুমাত্র উদরপুর্তিতেই ব্যস্ত। খাবারের উদ্দেশ্য তো সেটাই, নাকি? অবস্থান মেলবোর্নের শহরকেন্দ্রে, যাকে বলে কিনা, একেবারে সোনায় সোহাগা। এই হোটেলের সামনের রাস্তায় আবার একজন স্টাফ দাঁড়িয়ে থেকে পথের সব পথিককে একটা করে কাগজ ধরিয়ে দেয়, যাতে এই ব্যতিক্রমী ভোজনালয়ের ‘পেটচুক্তি’ খাবারের অফারের বর্নণা থাকে। অনেকটা যেন নীলক্ষেতের ফুতপাতে তেহারীখানার শেফদের চীতকার – মামা, আসেন, গরম গরম তেহারী আছে। যারা অল্প ডলার পকেটে নিয়ে ঘোরেন, এবং ক্ষুন্নিবৃত্তিই যাদের কাছে খাবারের একমাত্র কাজ, তারা এই অফার ফেলতে পারেন না। যেমন আমি। একটা গোলাকার বড় থালার আলাদা আলাদা চেম্বারে রঙ্গীন ভাত, বাটার নান, আলু-বেগুনের ঝোলের তরকারী, মটরশুঁটি/ছোলা/নানা রকম বীনের তরকারী, একটু আচার। একসময় আমি কাজ করতাম এই হোটেলের থেকে হাঁটার দুরত্বে, কাজেই দুপুরে বাসা থেকে লাঞ্চ না এনে এখানেই আমার খাওয়া-দাওয়া সারতাম, আর বাংলাদেশে আমার সর্বশেষ কর্মস্থলের নিকটস্থ বনানী বাজারের দোতালার ‘তেহারী নাম্বার ওয়ান’-এ কাটানো লাঞ্চ আওয়ারগুলির স্মৃতি নিয়ে জাবড় কাটতাম।
জানি না অস্ট্রেলিয়ায় আমাদের এই ব্লগের কতজন আছেন, অথবা আদৌ কেউ আছেন কি-না। তবুও আগ্রহীদের জন্য এই হোটেলটির নাম আমি বলব (কেউ এই এলাকায় এলে আওয়াজ দিবেন, ট্যুর গাইডের ভুমিকায় আমি তেমন একটা খারাপ না), তবে সবাই সেখানে খেয়ে সেই মজা নাও পেতে পারেন, যা আমি পেয়েছি। বাংলাদেশে ভাতের হোটেলে যাওয়ার অভ্যেস না থাকলে এই বিদেশে এসে খাবার দাবার নিয়ে ঝুঁকিপুর্ণ এডভেঞ্চারে না নামাই ভাল। তবে হ্যাঁ, নতুন করে অভ্যাস করে দেখতে ক্ষতি কি? নাইবা হল সাহেবী স্টাইলে খাওয়া – পেটপুরে খাওয়া তো হবেই, যাকে বলে একেবারে পয়সা উসুল করে তৃপ্তিও পাবেন। ওম ভেজিটেরিয়ান, ২৮ এলিজাবেথ স্ট্রীট (ফ্লিন্ডার্স স্ট্রীট স্টেশান থেকে খুবই কাছে) এবং ২২৭ কলিন্স স্ট্রীট (কর্নার অফ কলিন্স এন্ড সোয়ানস্টন স্ট্রীট, এই দুই স্ট্রীট থেকেই ঢোকা যায়)। ঠিক ভাতের হোটেল নয়, আবার দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোও নয়। মেলবোর্নে তিন বছরে খুঁজে ভাতের হোটেলের চরিত্রের এর চেয়ে নিকটতম আর কিছু পাই নি। ভাতের হোটেল জিন্দাবাদ (স্যরি, জয় ভাতের হোটেল)।

সোনার খনিতে (ইতি গোল্ড মাইনে) কিছুক্ষণ ( আইভরি কোস্ট টুকিটাকি )

মূল লেখার লিংক
IMG_1644
কোন গোল্ড মাইনের(সোনার খনির) কাছে যাবার সেই দুর্লভ ক্ষণ কখনও যে আসবে তা ছিল কল্পনাতীত। যদিও কল্পনারাই বা একটু ভিন্নভাবে বললে স্বপ্নেরাই এক সময় বাস্তব হয়ে ধরা দেয়। তবে আশা ছাড়া যাবে না কখনই। কারণ কঠোর নিয়ম কানুন আর কড়া প্রহরাই থাকা এই স্পর্শকাতর জায়গাটিতে যাবার আশা ছিল বহুদিন ধরেই। সেই আশা পূরণ হল এই মাত্র কদিন আগে। তবে সেজন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে বেশ কয়েক মাস। সেই সাথে অবশ্য আমার নিজস্ব সময় বের করারও একটা ব্যাপার ছিল। আর সেই সময় বের করে যখন অনেক দিনের প্রতীক্ষার এক অজানা বিষয়কে জানার সুযোগ পেলাম তখন খুশীতে হত বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম।
একটি ছোট জায়গার নাম যে এত বড় করে চেনা যায় তার এক জ্বলন্ত প্রমাণ হল ইতি। ইতি আসলে একটি গ্রামের নাম যেখানে এই সোনার খনিটি অবস্থিত।
(১)
DSC08495
আর তাই এই মাইন ফিল্ডের নাম হল ইতি গোল্ড মাইন। তবে এটি এস এম আই( SMI ) নামেও পরিচিত ফরাসী ভাষায় যাকে বলে ‘শোষিতে দে মিন দিতি’ ইংরেজিতে যাকে বলে ‘কোম্পানি অফ মাইনস অফ ইতি’।
(২)
DSC08493
১৯৯০ সালে পঁচিশ বর্গ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে এই গোল্ড মাইন তার যাত্রা শুরু করে। মাত্র ছয় মিলিয়ন ডলার দিয়ে এর যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে এর বিনিয়োগ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ষাট মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এত ব্যয়বহুল একটা প্রকল্পে তাহলে ঘুরে আসা যাক। এখানে যাবার পূর্বেই লাল মাটির স্তরের বুকে গাড়ী চাপাতে হয়। যাবার সময় ধুলার মাত্রা এতটাই বেশী যে মাস্ক না থাকলে একটু অসুবিধায়ই পড়তে হয়। মাইন ফিল্ডের ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে জি ফোর এস এর সিকিউরিটি গার্ড। বেশ কড়া প্রহরায় এক একজন শ্রমিককে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে চেক করে তবেই বাইরে অথবা ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছে এই সব নিরাপত্তা কর্মীরা।
(৩)
vlcsnap-2013-01-24-00h52m17s223
তেমনই একটি অবস্থার মধ্য দিয়ে মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম। মূল ফটক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেই রাস্তার দু পাশে দেখলাম বেশ কয়েকটি উঁচু পাহাড়। এদেশের অধিকাংশ পাহাড় একটু পাথুরে হলেও এই অঞ্চলের পাহাড়ে মাটির দেখা পেলাম।
(৪)
IMG_1614
ইতি গোল্ড মাইনে স্বর্ণ নিষ্কাসনের এই প্রক্রিয়া আসলে বেশ কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়। প্রথম ধাপটি হল পরীক্ষিত জায়গা থেকে মাটি কাঁটা।
(৫)
IMG_1620
(৬)
.
(৭)
DSC08366
তাই প্রথমেই আমরা চলে এলাম যেখান থেকে মাটি কাঁটা হচ্ছে সেখানে। মূলত এই মাটি থেকেই বের করা হয় সোনা। মাটি কাঁটার ফলে ওই জায়গাটি দেখতে অনেকটা অগ্ন্যুৎপাতের ফলে সৃষ্ট খাঁদের মত হয়ে গেছে। খুব সতর্কতার সাথে একেবারে স্তরে স্তরে বিশাল ডেজর মেশিন দিয়ে চলছে এই মাটি কাঁটার কাজ।
(৮)
vlcsnap-2013-01-24-00h53m32s202
(মাটি খনন চলছে)
একেবারে সকাল থেকে পড়ন্ত বেলা পর্যন্ত চলে এই খনন কাজ। দূর থেকে এই ডেজিং পয়েন্ট অনেকটা যত্ন করে বানানো সিঁড়ির মত মনে হবে।
মাটি কাঁটার পর তা বিশেষ প্রক্রিয়ায় একটি মেশিন দিয়ে গুড়া করা হয়। গুড়া করা সেই মাটি একটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে স্তূপাকারে লম্বাকারে মাটির বেড বানানো হয়।
(৯)
DSC08392
( এই মেশিনে মাটি গুড়া করা হয়)
(১০)
DSC03543
( মাটি ফেলে বেড তৈরি করা হচ্ছে)
vlcsnap-2013-01-24-00h52m07s125
প্রতিদিন এভাবে প্রায় ২০০০ টন মাটি ফেলা হয়। মূলত এই মাটির সাথেই মিশে আছে ছোট ছোট স্বর্ণের কণিকা বা গোল্ড ডাস্ট। আর মাটি থেকে সেই কণিক আলাদা করতে ব্যবহার করা হয় সায়েনায়েট দ্রবণ।
(১১)
IMG_1655
(ছেটানো হচ্ছে সায়েনায়েট দ্রবণ)
(১২)
DSC08469
(১৩)
DSC08474
এরপর বিশেষ কিছু পাইপের সাহায্যে অনেকটা বাগানে স্প্রে করা পানির মতই এই সায়েনায়েট ছিটিয়ে দেয়া হয় মাটির বেডের উপর।
(১৪)
DSC08466
(সায়েনায়েট ছেটানোর বিশেষ পাইপ)
(১৫)
DSC08435
(১৬)
DSC08424
ছিটিয়ে দেয়া এই সায়েনায়েটের সাথে মিশে দ্রবীভূত হয়ে যায় স্বর্ণ কণিক। স্বর্ণ কণিক যুক্ত এই সায়েনায়েট দ্রবণকে নালার সাহায্যে নিয়ে আসা হয় খনন করা একটি পুকুরে।
(১৭)
vlcsnap-2013-01-24-00h56m23s126
(নালার সাহায্যে আসছে সায়েনায়েট দ্রবণ)
vlcsnap-2013-01-24-00h54m12s88
এখানে এইরকমের বেশ কয়েকটি পুকুর রয়েছে। মূলত এই পুকুরের মত চৌবাচ্চায় দেখতে পাওয়া পানি আসলে পানি নয় । এরা সায়েনায়েট সলিউশান।
(১৮)
DSC08431
(এটা কিন্তু পানি না সায়েনায়েট দ্রবণ)
(১৯)
DSC08434
( বেশ কয়েকটি পুকুর)
স্বর্ণ কণিকা যুক্ত এই সায়েনায়েট দ্রবণকে এরপর প্রবেশ করানো হয় কয়লা ভর্তি সিলিন্ডারের মধ্যে। এই কয়লা মূলত নারকেলের মালা পুড়িয়ে তৈরি করা হয় যা ফ্রান্স থেকে নিয়ে আসা হয় ।
(২০)
vlcsnap-2013-01-24-01h15m59s109
(বস্তা ভর্তি কয়লা)
(২১)
vlcsnap-2013-01-24-01h16m07s178
(নারকেলের মালা পুড়িয়ে তৈরি কয়লা)
এভাবে বেশ কিছুদিন রাখার ফলে সায়েনায়েট দ্রবণ থেকে স্বর্ণ কণিক কয়লার খণ্ডের মধ্যে ঢুঁকে যায়। এরপর স্বর্ণ কণিক যুক্ত কয়লাকে এলকোহল ভর্তি সিলিন্ডারের মধ্যে প্রবেশ করানো হয় । এলকোহল দ্রবণে বেশ কিছুদিন রাখার ফলে স্বর্ণ কণিক গুলো কয়লার খণ্ড থেকে এলকোহল দ্রবণের সাথে মিশে যায়।
(২২)
vlcsnap-2013-01-24-01h16m12s231
(সিলিন্ডার যার মধ্যে রয়েছে কয়লা)
এরপর স্বর্ণ কণিক যুক্ত এলকোহল দ্রবণকে টিন শেডের মধ্যে অবস্থিত ইলেক্ট্রোলাইসিস সেল বা তড়িৎ বিশ্লেষণ সেলে প্রবেশ করানো হয়।
সেখানে ক্যাথোড ও এনোডের সাহায্যে এই দ্রবণকে তড়িৎ বিশ্লেষণ করা হয়। ক্যাথোড হিসেবে ব্যবহৃত হয় লোহার জালিকা যেখানে স্বর্ণ কণিকাগুলো জমা হয়। কাঙ্ক্ষিত মাত্রার স্বর্ণ এই লোহার জালিতে জমা হতে সময় লাগে পনের দিন। পনের দিন পর পর একটি বিশেষ চুল্লিতে এই লোহার জালিকা এনে এক হাজার ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় জালানো হয়।
(২৩)
vlcsnap-2013-01-24-00h54m35s71
(বিশেষ চুল্লি)
জালানোর পর গলিত স্বর্ণ একটি বিশেষ ছাঁচনিতে ঢালা হয়।
(২৪)
vlcsnap-2013-01-24-00h41m45s47
(ঢালা হচ্ছে গলিত স্বর্ণ)
vlcsnap-2013-01-24-00h42m09s33
(ছাঁচ)
এই গলিত স্বর্ণের মধ্যে কিছু গলিত লোহাও থাকে। কিন্তু স্বর্ণের ঘনত্ব লৌহের ঘনত্বের চেয়ে বেশী বলে গলিত লৌহ ছাঁচ থেকে উপচে পড়ে যায়। আর তখন ছাঁচে থেকে যায় গলিত স্বর্ণ। তাপ নিরোধক একটি বিশেষ পোশাক পরিধান করে টেকনিশিয়ানরা এই চুল্লিতে কাজ করে থাকে।
(২৫)
vlcsnap-2013-01-24-00h54m48s199
(বিশেষ পোশাক)
vlcsnap-2013-01-24-00h41m53s131
(উপচে পড়ছে লৌহ )
ছাঁচে গলানো স্বর্ণ জমাট বাঁধার পর একটা আস্ত ইটের আকার ধারণ করে যার ওজন প্রায় আটাশ কেজির মত।
(২৬)
141120122154 - Copy
( সোনার বার)
জমাট বাঁধা গরম স্বর্ণের এই বার কে পানি দিয়ে ঠাণ্ডা করা হয়।
(২৭)
vlcsnap-2013-01-24-00h42m32s8
(এভাবে ঠাণ্ডা করা হয়)
প্রতি পনের দিন পর এই খনি থেকে এরকম তিনটি বার উৎপাদন করা হয়। এভাবে আহরিত স্বর্ণ শতকরা নব্বই ভাগ খাঁটি। অধিকতর পরিশোধনের জন্য তা আবার সুইজারল্যান্ডে পাঠানো হয়।
প্রতি বছর এখান থেকে প্রায় ১.৫ টন স্বর্ণ উত্তোলন করা হয়। উত্তোলন কৃত স্বর্ণের ৪৯ ভাগ পায় ফ্রান্স আর ৫১ ভাগ পায় আইভরিয়ান সরকার। ইতি গোল্ড মাইনের দিকে গেলে চোখে পড়বে একেবারে লাল মাটি,লাল পাহাড়। মনে হয় যেন সোনার কণিকা যেন ছড়িয়ে আছে এই এলাকার চারপাশ জুড়ে। সোনার খনি যেই দেশে, যে এলাকার মাটি খুঁড়লেই বের হয় স্বর্ণ অথচ ভাগ্যের এক নির্মম পরিহাসে তারা আটকে আছে দারিদ্রের করাল গ্রাসে। কথিত আছে এই প্রাকৃতিক সম্পদই হয়েছে তাদের জীবনের জন্য এক অভিশাপ।
পশ্চিমা লোলুপ দৃষ্টি, অন্ত কলহ, জাতিগত সংঘাত যেন বারবার ফিরে আসে এদেশের নামের সাথে।