বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

মালাকার দিনরাত্রি

সাবরিয়া মনিরাঃ সাইকেল চালাতে হবে শুনে আঁতকে উঠলাম। একে তো ভিনদেশ, তার ওপর ট্রাফিক আইন সম্পর্কে ধারণা নেই। আর দুই চাকার এই যান শেষ চালিয়েছি তা-ও ১৫-১৬ বছর আগে। এত দিন পর পারব তো!হাতেন হোটেলের লবিতে বসে এমন সাতপাঁচ ভাবছি। হঠাৎ ডাক পড়ল সবার, দ্বিচক্রযান এসে গেছে। হোটেলের সামনের রাস্তায় লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে রাখা গোটা বিশেক সাইকেল থেকে একটা বেছে নিয়ে গাইডের পিছু নিলাম। মালাকার রাস্তা ধরে ধীরগতিতে দ্বিচক্রযান এগোচ্ছে।টুরিজম মালয়েশিয়ার আমন্ত্রণে ঢাকা থেকে ১০ জনের একটি দল মালয়েশিয়া সফরে এসেছে। সেই দলে আমিও আছি। কুয়ালালামপুর
বিমানবন্দরে এসে নামলাম। তারপর পুত্রাজায়া হয়ে পরের দিন ঐতিহাসিক শহর মালাকায়। এটি মালয়েশিয়ার তৃতীয় ক্ষুদ্রতম একটি রাজ্য এবং ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের একটি অংশ।
ঝকঝকে রাস্তার কোথাও এতটুকু ধুলাবালু নেই। গাড়িঘোড়াও কম। এক পাশে সজ্জিত দালানকোঠা। আরেক পাশে দিগন্তবিস্তৃত নদী। মিনিট পাঁচেক দ্বিচক্রযান চালানোর পর আমরা যে জায়গায় গিয়ে থামলাম, সেটার নাম পোর্ট ডি সান্টিয়াগো। টিলার ওপর একটা দুর্গের ভগ্নাবশেষ এটি। ষোড়শ শতকে পতুর্গিজরা বানিয়েছিল। আর উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশরা ধ্বংস করেছিল। ব্রিটিশরা একসময় দুর্গটিতে গোলাবারুদ মজুত রাখত। ভাঙাচোরা দুর্গ ফটকের দুই পাশে দুটি কামান। ফটক পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি ধরে ওপরে উঠে আরও একটি ভগ্নাবশেষের দেখা মিলল।
টিলার ঢালে দুদিকে দুটি জাদুঘর। একটি মিউজিয়াম অব ডেমোক্রেসি, অপরটি মিউজিয়াম অব গভর্নর হাউস নামে পরিচিত। টিলার পাদদেশে মালাকা কেন্দ্রীয় পুলিশ ফাঁড়ি। ফাঁড়ি পেরিয়ে রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে কয়েকখানা বেইচার দেখা মিলল। কৃত্রিম ফুল, পাখি, লতাপাতা ও কার্টুনের নানা চরিত্র দিয়ে সাজানো একধরনের রিকশাকে মালয়িরা বেইচা নামে ডাকে। আমাদের দেশের রিকশার মতোই বেইচাও প্যাডেল ঘুরিয়ে চালাতে হয়।
আকাশে গনগনে সূর্যটা তখন আগুন ঝরাচ্ছে। মালয়েশিয়ায় ঋতু বলতে গরম আর বৃষ্টি। এই প্রচণ্ড রোদ, তো পরক্ষণেই ঝুমবৃষ্টি। অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরিতে সবার গলা শুকিয়ে কাঠ। বোতলের পানিতে গলা ভিজিয়ে ফের দ্বিচক্রযানে চেপে বসলাম। এপথ-ওপথ ঘুরে এসে দাঁড়ালাম রেড ফোর্ট চত্বরে। ক্ষণিক বিরতি দিয়ে সোজা জঙ্কারস স্ট্রিটের দিকে রওনা হলাম। সেখানে যেতে যেতে মালাকার আসল রূপটা দেখা গেল।রাস্তার দুই পাশে পুরোনো আমালের দালানকোঠাগুলো গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনেকটা আমাদের পুরান ঢাকার মতো দেখতে। ফারাক একটাই। মালাকার ভবনগুলো অনেক পরিপাটি। আর রাস্তাগুলো ছিমছাম। দ্বিচক্রযান রেখে একটা মন্দিরে ঢুকলাম। মন্দির থেকে বেরিয়ে পাশেই মসজিদ। খানিক দূরে একটা চীনা মন্দির। ভেতরে ঢুকতেই চীনা স্থাপত্যের অনুপম কারুকার্য নজর কাড়ে। মন্দিরের ভেতরে আছে ছোট্ট একটি হাসপাতাল। সেখানে আকুপাংচার পদ্ধতিতে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এই রাস্তাকে স্ট্রিট অব হারমনিও বলে অনেকে। কারণ, এখানে ধর্ম-বর্ণ-গোত্র বলে আলাদা কিছু নেই। সবাই একসঙ্গে বসবাস করে নিজ নিজ ধর্ম পালন করে। বললেন টুরিজম মালয়েশিয়ার বিপণন ব্যবস্থাপক ও আমাদের ১০ জনের দলটির অধিনায়ক বোরহান উদ্দিন আহমেদ।
জঙ্কারস স্ট্রিট থেকে কাছেই একটা রেস্তোরাঁয় দুপুরের খাবার সেরে হোটেলে ফিরলাম। সন্ধ্যায় রওনা হলাম মালাকার হাং তুয়া স্টেডিয়ামের দিকে। হারি রায়া ওপেন হাউস উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে সেখানে। অনুষ্ঠানে আসবেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী। স্টেডিয়ামের মূল ফটক দিয়ে ঢুকতে নিরাপত্তার কড়াকড়ি চোখে পড়ল না কোথাও। নিয়ম রক্ষার খাতিরে জনাকয়েক পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। ফটকটি নেহাত সাদামাটা। কিন্তু ১৪টি দেশের অতিথিদের অভ্যর্থনা জানানো হলো লালগালিচায়। ভেতরে বড় কয়খানা শামিয়ানা টানানো। সেখানে অতিথিদের বসার ব্যবস্থা। সামনে বিশাল মঞ্চ।
হারি রায়া মানে হচ্ছে ঈদের খুশি। মুসলিমপ্রধান দেশ মালয়েশিয়ায় মাসব্যাপী ঈদের আনন্দোৎসব পালিত হয়। খানাপিনা, নাচাগানা—সবই থাকে সেই উৎসবে। আর ওপেন হাউস মানেই সবার জন্য উন্মুক্ত। এদিন মালয়িরা মনভরে আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে ওঠে। এবারের হারি রায়ার মূল অনুষ্ঠান মালাকায় হয়ে গেল গত ৩০ আগস্ট। পরের দিনই ছিল মালয়েশিয়ার মারডেকা বা স্বাধীনতা দিবস।
রাত তখন সাড়ে আটটা। টেবিলভর্তি খাবারদাবার। শুরু হলো স্থানীয় শিল্পীদের ঐতিহ্যবাহী নাচ আর গান। খানিক পরেই মান্যগণ্য অতিথিরা বেইচায় চড়ে আসা শুরু করলেন। এলেন প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি উতামা মোহাদ নাজিব তুন হাজি আবদুল রাজাক ও তাঁর স্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী হারি রায়া ওপেন হাউসের উদ্বোধন ঘোষণা করলেন। মুহুর্মুহু করতালি আর আকাশে চলে আতশবাজির খেল। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে চলল অতিথিদের বক্তৃতা। সবশেষে ভোজপর্ব। নেচে-গেয়ে, উদর পূর্তি করে খেয়ে হারি রায়া ও মারডেকার আনন্দ উপভোগ করল সবাই।

চলুন ঘুরে আসি, নয়া মস্কো...


প্রিন্স হাওলাদারঃ ইমিগ্রেশন পেরিয়েই কে আমাকে নিতে এসেছে, খুঁজতে লাগলাম। বুকে ‘রুদেএন’ লাগানো এক দশাসই প্রবীণকে দেখে রুশে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আমার জন্য এসেছেন?’ শুনে তাঁর উত্তর, ‘চোর্ত ইভো জ্নায়েত! (আমি কোত্থেকে জানব)!’ আর তাতেই বুঝে গেলাম, হ্যাঁ, রাশিয়ার মাটিতেই ‘ল্যান্ড’ করেছে আমার পা দুটো।ব্যাখ্যা করলেন ভদ্রলোক, ‘আমি ট্যাক্সি ড্রাইভার। আমাকে বলেছে, ইস্তাম্বুল থেকে কেউ একজন আসবে। তুমি যদি সে লোক হয়ে থাকো, তাহলে অকারণে সময় নষ্ট না করে চলো বেরিয়ে পড়ি।’

১৭ বছর পর আবার মস্কো! ভ্নুকোভা এয়ারপোর্ট
থেকে বিশাল কালো মার্সিডিজ এগিয়ে চলেছে রাশিয়ান পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটির (রুদেএন) দিকে। এখানেই ১২ নম্বর ব্লকের হোটেলে থাকা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম তলায় সেমিনার। সারা বিশ্ব থেকে রুশ ভাষার শিক্ষকদের আনা হয়েছে রুশ ভাষার নতুন যেসব দিক উন্মোচিত হয়েছে, তার সঙ্গে পরিচিত করার জন্য।
১৯৮৬ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত সময়টা কাটিয়েছি রাশিয়ার ক্রাসনাদার শহরে। আসা-যাওয়ার পথে মস্কো। একবার ইংল্যান্ডে যাওয়ার সময় মাস দেড়েক একনাগাড়ে থাকতে হয়েছিল মস্কোয়।
১৭ বছর আগের মস্কোর রাজপথের সঙ্গে এখনকার পথের কোনো মিল নেই। সন্ধ্যার নিয়নের আলোয় ধাবমান যে গাড়িগুলোর দিকে চোখ গেল, তাতে আমি স্তম্ভিত। বিশাল এই গাড়িরাজ্যে রুশ প্রতিনিধিত্ব নেই। রাজ্যের দামি দামি সেরা মডেলের গাড়ির এক উন্মুক্ত প্রদর্শনী যেন রাস্তায়। আর আশপাশে যে প্রান্তর ছিল, তা প্রাসাদোপম অফিসবাড়িতে বদলে গেছে। গাড়ির চালককেই মিনমিন করে জিজ্ঞেস করলাম, ‘রাশিয়ায় তৈরি গাড়ি...’
মুখের কথা মুখেই থাকল। গাড়ির গতিতেই মুখ চলল তাঁর, ‘রাশিয়ার গাড়ি তুমি মস্কোতে দেখবে কীভাবে? মস্কোতে কি এখন আর গরিব লোক আছে নাকি? হাতে টাকা থাকলেই বিদেশি গাড়ি কিনে ফেলে। রাশিয়ায় তৈরি গাড়ি দেখতে পাবে শুধু মফস্বলে গেলে।’ কথাটা কতটা সত্যি, তার পরিচয় মিলবে আমার সাত দিনের মস্কো সফরে গুনে গুনে তিনটি রুশ গাড়ির দেখা পাওয়ার মধ্যে।
দীর্ঘদিন মস্কোয় চাকরি করছেন আবদুর রোকন। ক্রাসনাদারেই পড়াশোনার পাট চুকিয়ে মস্কোর পিপলস ফ্রেন্ডশিপ ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করে মস্কোতেই স্থিত হয়েছেন। আমার আসার সংবাদ পেয়ে বিএমডব্লিউ গাড়ি চালিয়ে তিনি হাজির। বললেন, শনিবার এক ফাঁকে মস্কো শহরটি ঘুরে দেখাবেন।
মিকলুকা-মাখলায়া সড়কের ছাত্রপাড়াটি দূর থেকে দেখে মনে হয় আগের মতোই। কিন্তু ভেতরে ঢুকলেই পরিবর্তনটা টের পাওয়া যায়। হোস্টেলগুলোর চারপাশে গোটা বারো ক্যাফে। দীনহীন স্তালোবায়া (ছাত্রদের ক্যানটিন) এখন আর নেই। কিছু কিয়স্ক গড়ে উঠেছে, যেখানে মুখরোচক খাদ্যসম্ভার। সসেজ-রুটি, শরমা ধরনের খাবার, যা ক্লাসে যাওয়ার আগে চট করে কিনে খেতে খেতে পথ চলা যায়। পুরো ছাত্রপাড়ায় সিগারেট নিষিদ্ধ। কারও যদি ধূমপানের ইচ্ছে জাগে, তাহলে অবশ্যই বাইরে রাস্তায় এসে নির্দিষ্ট স্থানে তা করতে হবে।
ট্রাফিক আইন না মানলে বিশাল অর্থদণ্ড। কিন্তু যেখানে অবারিত রাস্তা, সেখানে চালকেরা যে গতিতে গাড়ি চালাচ্ছেন, তা বিস্ময়কর। তবে, আইন ভাঙার প্রবণতা নেই বললেই চলে। কর্মদিবসগুলোতে বাস, ট্রলিবাসের জন্য ডানের লেন নির্ধারিত। সে লেনে গাড়ি ঢুকলেই সর্বনাশ—বিশাল অঙ্কের অর্থদণ্ড। রাস্তায় রাস্তায় লুকানো সিসিটিভি। আইন ভেঙে ভাবছেন পার পেয়ে যাবেন—উঁহু।
মস্কোয় চলাচলের জন্য এখনো সেরা বাহন মেট্রো। দ্রুতগতিসম্পন্ন এই যানে চলাচল আরামদায়ক। মেট্রো এখন পরিচ্ছন্ন। স্টেশনগুলোও সব সময় ঝকঝকে তকতকে রাখার চেষ্টা করা হয়। আগের ঢিলেঢালা সরকারি সেবার বদলে ত্বরিতগতির পরিচ্ছন্নতা অভিযান স্টেশনগুলোতে আবর্জনা জমতে দেয় না। তবে সেই পাঁচ কোপেকের দিন শেষ। এখন মেট্রোর ভাড়া ২৮ রুবল। ভালো লাগল, ট্যাব, মোবাইলে ডুবে থাকা মানুষের পাশাপাশি মেট্রোতে বই হাতে মানুষের সংখ্যা কমেনি দেখে।
ব্যাংক এবং মানি এক্সচেঞ্জ সর্বত্রই। যে কেউ ইচ্ছেমতো ডলার, পাউন্ড, ইউরো কিনতে পারে, ভাঙাতেও পারে সেখানে। এক ডলারের বিনিময়ে পাওয়া যায় ৩২ রুবল থেকে শুরু করে ৩৩ রুবল পর্যন্ত।
সরকারি দোকান বলে কিছু চোখে পড়ল না। আগে ‘উনিভেরসাম’ নামে তরিতরকারি-মাছ-মাংসের দোকান ছিল সবখানেই। সেগুলো দেখিনি। তার স্থান নিয়েছে বিশাল বিশাল সব সুপারমার্কেট। বিদেশি পুঁজিও খাটছে সেখানে। বড় বড় ব্র্যান্ডের উপস্থিতি সবখানেই। কেএফসি, ম্যাকডোনাল্ডস, জাপানের সুশির দোকান যেমন আছে, তেমনি বিশেষ রুশ খাবারও রয়েছে। নিজের দিকে ক্রেতা টানার জন্য ওয়েটাররা মিউজিক বাজিয়ে একপাক নেচেও নিচ্ছেন।
শিক্ষকেরা কেমন আছেন, প্রশ্ন রেখেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন শিক্ষকদের কাছে। ভ্লাদিমির পুতিন বেতন বাড়ানোর কথা বলেছেন ঠিকই, কিন্তু এখনো তা কাগজে-কলমে রয়ে গেছে। নতুন একজন শিক্ষক ৩০ হাজার রুবল মতো পান, যা দিয়ে মস্কোর মতো শহরে টিকে থাকা মুশকিল। তাই অধিকাংশ তরুণ শিক্ষক চাকরির বাইরেও কিছু না কিছু করে থাকেন। একটা তুলনামূলক ছবি তুলে ধরলেই বোঝা যাবে সমস্যাটা। একজন নবীন মেট্রোচালকের শুরুর বেতনই ৬০ হাজার রুবল। সেটা বেড়ে ৮৫ হাজার হয়। শিক্ষকদের অবস্থা এ থেকেই বোঝা যায়। তবে অধ্যাপকদের বেতন অনেক। আগে পুরো শিক্ষক সমাজই যে অর্থনৈতিক চাপে থাকত, সেটা এখন আর নেই।

সংস্কৃতিজগতের পরিবর্তনটা চোখে পড়ে। সেটাকে ইতিবাচক না বলার কোনো কারণ নেই। মস্কোর বিখ্যাত সার্কাস দেখলাম। বিশাল এরেনায় একদিকে ধ্রুপদি সংগীত, অন্যদিকে রকসংগীতের সরঞ্জাম। এক ঘণ্টার পুরো অনুষ্ঠানে কারও মুখে কোনো কথা নেই। আগে দেখেছি, ক্লাউনরা কথা বলে মানুষ হাসায়, এবার দেখলাম, মৌনতা আর মূকাভিনয়ই তাদের সঙ্গী। তন্ময় হয়ে তা উপভোগ করা ছাড়া উপায় নেই।

কেমন নাটক হচ্ছে, সে সংবাদও নেওয়া হলো। একটি অডিটরিয়ামে শুধু আমাদের জন্যই পরিবেশন করা হলো নাটক। মাত্র চারজন অভিনয় করলেন ১৪টি চরিত্রে। লোকজ ধারায় (বাবা ইয়াগার কথা মনে পড়ে?) নির্মিত এই নাটকে মুহূর্তের মধ্যেই একেকজন একেক চরিত্র হয়ে যাচ্ছেন, যা দেখে বিস্ময় জাগে মনে। রূপকথা দিয়েই ব্যঙ্গ করা হয়েছে শাসন-শোষণের। রাশিয়ায় নাটক মরে যায়নি।
লেনিন লাইব্রেরির পাশে চাইকোভস্কির নামে যে কনসারভেটরিটি আছে, সেখানে মোৎসার্ট, বিটোফেন এবং নতুন রুশ কম্পোজিটারদের রচনা থেকে বাদন শোনার অভিজ্ঞতা হলো। পিয়ানো আর বেহালা যে কীভাবে আকৃষ্ট করতে পারে, তা এখানে উপস্থিত না থাকলে বুঝতে পারতাম না। একেবারে নিচু থেকে ধীর লয় কখন যে দ্রুত লয় হয়ে শব্দ বাড়িয়ে কাঁপিয়ে দিচ্ছে মিলনায়তন, তা মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে দেখলাম।
মস্কো ভ্রমণে ক্রেমলিন, বালশোই থিয়েটার, মসফিল্ম, মস্কো নদী, নোভাদেভিচি কবরস্থানসহ কত জায়গায়ই তো বুড়ি ছোঁয়ার মতো ছুঁয়েছি। মস্কো এখন জৌলুশের শহর। তার পরও মনে হয়, এখানেই একদিন সব মানুষকে সমান দেখার স্বপ্ন বুনেছিল মানুষ! এখন এখানে সব আছে, আরও বেশি বেশি করে আছে; শুধু সেই স্বপ্নীল আবেশটি কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
প্রিন্স হাওলাদার
দৈনিক সুন্দরবন বাংলাদেশ 

সাজানো সিঙ্গাপুর


ফয়সাল আহম্মেদ: ‘পুর’ মানে নগর। জনপদের নামের সঙ্গে ‘পুর’ যুক্ত হলে বিস্তৃত হয় তাৎপর্য। উদাহরণ—রংপুর, গাজীপুর, ফরিদপুর প্রভৃতি। সিঙ্গাপুরও তেমনই এক নগর। সাগরঘেরা একটা দ্বীপ-দেশ। সেই দেশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বিশাল এক সিংহমূর্তি—নাম মারলায়ন। সিঙ্গাপুর সদলবলে বেড়াতে যাওয়ার পর আমাদের এক বন্ধু ঘোষণা করল, নামটা ছিল আসলে সিংহপুর। এরা ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারে না দেখে সিঙ্গাপুরের মতো শোনায়।

ঢাকা থেকে আকাশপথে কমবেশি চার ঘণ্টার দূরত্ব। কিন্তু গিয়ে মনো হলো সিঙ্গাপুর যেন বাংলাদেশেরই কোনো
অংশ। রাস্তায় চলতে দেখা মেলে অনেক বাংলাদেশির। সিঙ্গাপুর শহরটা প্রায় পুরোটাই কৃত্রিম। প্রাকৃতিক বলতে শান্ত-সমাহিত সমুদ্রটাই শুধু। কিন্তু বিশ্বজুড়ে যেখানে যা কিছু ভালো, যা কিছু মহান—সবই যেন কপি-পেস্ট করে রাখা হয়েছে সিঙ্গাপুরে। দারুণ কিছু বানিয়ে ফেলতে তাদের উৎসাহে ভাটা পড়ে না মোটেও। সেটার পেছনে দিন-রাত সে কি যত্নআত্তি আর রক্ষণাবেক্ষণ, না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন—তা সে কংক্রিটের ইমারত হোক আর সবুজ বন বা তৃণভূমিই হোক।
 
এত্তটুকুন একটা শহর, অথচ তার সবকিছু ঠিকঠাক ঘুরেফিরে দেখেশুনে নিতে সপ্তাহ খানেক সময় লাগবেই। অবশ্য ‘সিঙ্গাপুর ফ্লায়ার’ নামে বিশাল যে চরকি বানিয়ে রাখা আছে, সেটায় চড়লে এক দফাতেই একনজর দেখে ফেলা যায় এ-মাথা ও-মাথা।
আমরা গিয়েছিলাম কয়েকটি পরিবার একসঙ্গে। একেকজনের একেক দিকে আগ্রহ। কেনাকাটা করতে গিয়ে কেউ ঢোকে প্রসাধনীর দোকানে, কেউ উঁকি দেয় ইলেকট্রনিকস অংশে, কেউ যায় কাপড়চোপড়ের সন্ধানে। শহরের প্রাণকেন্দ্র অরচার্ড পয়েন্টে ব্র্যান্ড দোকানগুলোয় উইন্ডো শপিং আর সত্যিকারের কেনাকাটার পর্ব হয়তো চায়না টাউন, ধোবি ঘাট বা লিটল ইন্ডিয়ায়। বাংলাদেশিদের প্রধান আকর্ষণ ‘মোস্তফা সেন্টার’-এর জন্য চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা সময় রাখাই উচিত, অন্তত পুরোটা ঘুরে দেখতে হলেও।
একদিন সন্ধ্যায় খুব আয়োজন করে গেলাম নাইট সাফারিতে। শহরের পশ্চিম প্রান্তে ছোটখাটো কৃত্রিম জঙ্গল বানিয়ে রাখা আছে। পর্যটকদের ট্রামে চড়িয়ে জঙ্গল ঘোরানো হয়। রাতের আঁধারে বাঘ, সিংহ, হাতি, হরিণ, জেব্রা দেখার মধ্যে একধরনের গা-ছমছমে অনুভূতি কাজ করে। ছোট বাচ্চাদের মজাটাই মনে হয় বেশি, তবে বড়রাও কিছু কম যান না।
আরেক দিন খুব সকালে উঠে গেলাম ইউনিভার্সাল স্টুডিওতে। দিনভর সময় কাটানোর দারুণ একটা জায়গা। সকাল ১০টায় খোলে, বিকেল পাঁচটা বাজলেই বন্ধ। কাজেই দেরি করার উপায় নেই। একপাশে মাদাগাস্কারের সব চরিত্র। সেখান থেকে দুর্ধর্ষ ওয়াটার ওয়ার্ল্ডের শো। তারপর জুরাসিক পার্কে বহু যুগের হারিয়ে যাওয়া পৃথিবী দেখতে দেখতে আচমকা পানিতে পতন। পাশেই হয়তো প্রাচীন মিসর। সেখানে মমির প্রতিশোধ যে কত ভয়াবহ হতে পারে, সেটা বলার নয়। এরপর চতুর্মাত্রিক ‘শ্রেক’ দেখা শেষ করে, ‘ট্রান্সফরমার মোশন সিমুলেটর’-এ ১০০তলা থেকে পতনের অভিজ্ঞতা নিতেই হবে। পুরো বিবরণে যাচ্ছি না, ইউনিভার্সাল স্টুডিওর ওয়েবসাইটে গিয়ে বাকিটা জেনে নিন।

ক্যাবল কারে চড়ার জন্য আরেক দিন সকাল-সকাল উঠতে হলো। মাউন্ট ফেবার থেকে সোজা সান্তোসা আইল্যান্ড। সেখানে নানা রকম রাইড। প্রথমে কেউ কেউ নাক সিঁটকালেও, পরে অন্যদের চাপাচাপিতে রাইডে চড়ার জন্য স্বীকার করল, না চড়লে বিরাট মিস হতো।

যাহোক, ‘গার্ডেন বাই দ্য বে’-র টিকিট আগেই করা ছিল। কৃত্রিম ঝরনা, জলপ্রপাত, মেঘ, বৃষ্টি আর হাজার হাজার ফুলের মেলা। এই দারুণ গ্রিন হাউসের বাইরে বিশাল বিশাল সুপার ট্রি। রাত নামলে সেখানে আলো জ্বলে। মুগ্ধ চোখে সেটা কিছুক্ষণ দেখার পর গেলাম মারলায়ন পার্কে। উদ্দেশ্য, রিভার ক্রুজ। সমুদ্রের পানি টেনে এনে শহরের মাঝখানে নদী বানানো হয়েছে। সেই নদীতে নৌকায় চড়ে শহরটা দেখা আর আকাশছোঁয়া দালানগুলো কোনটা কততলা, সেটা গুনতে থাকা। আর একটু পর পর গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলা—আহ্, আমাদের দেশেও তো কত্ত নদী!
অভিভূত হওয়ার কিছু বাকি ছিল। রাতের বেলা মেরিনা বের চারপাশে শুরু হয় চোখজুড়ানো লেজার শো। সেটা না দেখলে সিঙ্গাপুর যাওয়াই বৃথা।
সিঙ্গাপুরে খাওয়াদাওয়ার অভাব নেই। হরেক দেশের, হরেক স্বাদের। দামি রেস্তোরাঁ যেমন আছে, তেমনি বেশ কিছু হকার্স সেন্টার আর ফুড কোর্টও দেখলাম। আমাদের সবচেয়ে পছন্দ হলো একধরনের আইসক্রিম। রাস্তার পাশে বিক্রি করে। দামে সস্তা, কিন্তু স্বাদ সেই রকম!
ফয়সাল আহম্মেদ
দৈনিক সুন্দরবন বাংলাদেশ

সিন্ধুর টিপ সিংহল দ্বীপ

ফয়সাল আহম্মেদঃ প্রতিবছরের মতো এবারও যখন আমাদের ভ্রমণপিয়াসী দলটি হাতড়ে বেড়াচ্ছে সীমিত টাকায় কোথায় কোথায় যাওয়া যায়, চীনের প্রাচীর থেকে হো চি মিন সিটি—কিছুই বাদ গেল না আলোচনায়। শেষ পর্যন্ত ঠিক হলো সিংহল দ্বীপ বা শ্রীলঙ্কা। যা ভেবেছিলাম, তার চেয়েও অনেক সুন্দর দেশটি। সেখানকার মানুষের মিষ্টি ব্যবহার, ঝকঝকে-তকতকে রাস্তাঘাট, জিবে জল আনা সব খাবারদাবার ও নৈসর্গিক সৌন্দর্য—সবই আমাদের অভিভূত করেছে। আর সবচেয়ে অবাক হয়েছি বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তাদের হাসিমুখ দেখে। আমি চ্যালেঞ্জ করতে পারি, কেউ আর
কোনো দেশে এটা দেখেননি।
কলম্বো: শুরুতেই রাজধানী
ছয় দিনের একটি বেড়ানোর প্রোগ্রাম নিয়ে আমাদের আটজনের দলটি রওনা দিলাম মিহির লঙ্কা ফ্লাইটে। রাজধানী কলম্বোর বন্দরনায়েকে বিমানবন্দরের বাইরে এসেই বুঝলাম, আমাদের স্থান বাছাই চমৎকার হয়েছে। শহরের কিছু যানজট পেরিয়ে চারদিক দেখতে দেখতে যখন গাড়িটি এসে পৌঁছাল শহরের শেষ প্রান্তে লাভিনিয়ার সাগরসৈকতের হোটেল বারজায়ায়, তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে। অবশ্য পথেই দাঁড়িয়েছিলাম একটি খাবারের দোকানে। সেখানে অনেক খাবারের ভিড়ে এক কোনায় বিক্রি হচ্ছিল আমাদের চিতই পিঠার মতো একটি জিনিস, ওপরে ডিমপোচ দিয়ে। তা দেখেই রাফফাত হইচই করে উঠল, উহ্, এইটা তো ট্র্যাভেল অ্যান্ড লিভিংয়ে পিটার কুরুবেদার ‘মাই শ্রীলঙ্কা’-তে দেখেছি। এর নামই ‘ওপাস ওপাস’। আরে এই তো দেখা যাচ্ছে ‘মালু পান’, (ত্রিকোনাকার রুটি) এগুলো কিন্তু খেতেই হবে।
রাতের খাওয়া হলো সমুদ্রসৈকতের একটি রেস্তোরাঁয়। মিটিমিটি মোমের আলোয় সাগরের গর্জন, সেই সঙ্গে ভেসে আসা স্প্যানিস আর ইংরেজি গান—সব মিলে অপূর্ব এক পরিবেশে ডিনার সারলাম। খাওয়া আর আড্ডা দিতে দিতে অনেক রাত হয়ে গেল। পরদিন সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লাম কলম্বো দেখতে।
শহরজুড়েই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ডাচ, পর্তুগিজ ও ব্রিটিশদের তৈরি নানা কীর্তি ও স্থাপত্য। কলম্বোতে আপনি দেখতে পারেন সেন্ট অ্যান্থনি’স চার্চ, অল সেইন্টস চার্চ, উলভেনডাল চার্চ, সীমা মালাকা মন্দির; রয়েছে অনেক বৌদ্ধমন্দির, পুরোনো পার্লামেন্ট ভবন, প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম, পুরোনো টাউন হল। সময় হাতে থাকলে আরও দেখে নিতে পারেন জাদুঘর এবং প্রাচীনতম ও বৃহত্তম হিন্দুমন্দির বৈলাশানাথন স্বামীমন্দির।
শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটার সাঙ্গাকারা আমাদের কাছে খুব জনপ্রিয় একজন। কাজেই দলের ভেতর থেকে দাবি উঠল, সাঙ্গাকারার রেস্তোরাঁ ‘মিনিস্ট্রি অব ক্র্যাবে’ যেতেই হবে। শহরের একেবারে প্রাণকেন্দ্র, অর্থাৎ মূল বাণিজ্যিক এলাকায় একটি ওপেন মলে এটির অবস্থান।
বলে রাখা ভালো, কেউ যদি শ্রীলঙ্কায় গিয়ে কিছু কেনাকাটা করতে চান, তাহলে তা কলম্বোতেই সেরে নিতে হবে। ওডেল, কটন কালেকশনসহ বেশ কয়েকটি বড় দোকান রয়েছে। শ্রীলঙ্কা থেকে কিনতে পারেন চা-পাতা, ভেষজ কসমেটিকস, বিভিন্ন ধরনের পাথর, সুতির কাপড়ের তৈরি পোশাক ও মসলা।
ক্যান্ডি
দুই দিন কলম্বোতে ঘোরাঘুরি করে আমরা রওনা দিলাম শৈল শহর ক্যান্ডির দিকে। বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ এবং বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের অন্যতম পবিত্র ভূমিও এই ক্যান্ডি। এখানে যাওয়ার পথে আমরা গেলাম ‘এলিফ্যান্ট অরফানেজ’ বা হাতিদের আশ্রয়কেন্দ্র দেখতে। ১৯৭৫ সালে পিনাওয়ালাতে এটি প্রতিষ্ঠিত হয় আহত ও অনাথ বাচ্চা হাতিদের রাখার জন্য। আমরা যখন পৌঁছালাম, ওদের তখন গোসল করার জন্য নদীতে নেওয়া হয়েছে। অপূর্ব সুন্দর একটি পাহাড়ি নদী, যেখানে গোসল করছে ২৫ থেকে ৩০টি ছোট-বড় হাতি। দুপুরে হাতির দল ফিরে গেল তাদের থাকার জায়গায়, সেখানে তাদের খাওয়ানো হলো।
ক্রমেই পথ হয়ে উঠল পাহাড়ি। পাহাড় বেয়ে গাড়ির পাশাপাশি ট্রেনও ছুটে যাচ্ছে। রাস্তার পাশে চোখে পড়ল চা-বাগান, মাটি ও বাঁশ-বেতের তৈরি জিনিসের ওপর। ক্যান্ডি শহরটা একটা লেক ঘিরে। আর উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় বসে যিনি এখানে শান্তির পরশ বুলিয়ে যাচ্ছেন, তিনি গৌতম বুদ্ধ। বহিরাভোকান্ডা বৌদ্ধবিহারে শ্বেতপাথরে নির্মিত গৌতম বুদ্ধের এই মূর্তি দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। শহরের সব জায়গা থেকেই এটি চোখে পড়ে।
গলে
ক্যান্ডি থেকে গেলাম সাগরে ঘেরা শহর গলেতে। সবাই যাওয়ার যে পথ, অর্থাৎ যে এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে গাড়ি চালাল, তা দেখে আবার আমরা অভিভূত। গাড়ির গতি ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার, কিন্তু একটুও ঝাঁকুনি খেতে হচ্ছে না। চলতে চলতেই আমরা স্বপ্ন দেখলাম, এ রকম চারটি রাস্তা আমরা তৈরি করব বাংলাদেশে। শুধু ওই বড় রাস্তাই নয়, এদের সব পথই পরিষ্কার ও মসৃণ। গলেতে ঢোকার মুখে প্রথমেই চোখে পড়ল ভারত মহাসাগর। সাগরের পাড় ঘেঁষেই শহরের রাস্তা। কিন্তু শহরটা কোথায়? এখানে তো সবটাই সাগর। উত্তাল ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে চারপাশে।
পর্তুগিজ ও ডাচ স্থাপনার অনেক নির্দেশন দেখতে পাওয়া যায় গলেতে। এ কারণেই এটিও বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ। পণ্ডিতেরা মনে করেন, ওল্ড টেস্টামেন্টে ‘তারনিস’ বলে যে জায়গার কথা উল্লেখ আছে, গলে আসলে সেই জায়গা, যেখানে বাদশা সোলায়মান তাঁর বাণিজ্যতরি পাঠিয়েছিলেন।
গলেতে সবচেয়ে সুন্দর দেখার জায়গা ডাচদের পুরোনো নগর এবং এর পুরোনো লাইটহাউস। পুরোনো জিনিস ও মুখোশের বেশ কয়েকটি দোকান রয়েছে এখানে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরে গেলে তিমি দেখতে সাগরে যাওয়া যায়। এ ছাড়া সময় থাকলে দেখে আসা যায় রেইন ফরেস্ট, কচ্ছপের হ্যাচারি ও ডাচ মিউজিয়াম।
যেভাবে যাবেন
শ্রীলঙ্কার ভিসা পাওয়া যায় কলম্বো বিমানবন্দরে পৌঁছে। নিজেও যেতে পারেন, ট্র্যাভেল এজেন্টও নিয়ে যায়। খরচ প্রতিজন ৭৫ থেকে ৮৫ হাজার টাকা।
ফয়সাল আহম্মেদ
দৈনিক সুন্দরবন বাংলাদেশ

শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০১৫

অজন্তার বিষ্ময়কর সৃষ্টি (ইলোরা)

ইলোরা ভারতের মহারাষ্ট্র
রাজ্যের আওরঙ্গবাদ শহর থেকে ৩০ কিমি (১৮.৬ মাইল) দূরে অবস্থিত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। রাষ্ট্রকুট রাজবংশ এই নিদর্শনের স্থাপনাগুলো নির্মাণ করেছিল। এখানে রয়েছে প্রচুর স্মৃতি সংবলিত গুহার সারি। এটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান মর্যাদায় ভূষিত হয়েছে।
ভারতের শিলা কেটে কোন কিছু তৈরি করার প্রাচীন প্রতিরূপ স্থাপত্যটি এখানে অনুসৃত হয়েছে। এখানে মোট ৩৪টি গুহা রয়েছে যেগুলো চরনন্দ্রী পাহাড়ের অভ্যন্তর থেকে খনন করে উদ্ধার করা হয়েছে। গুহাগুলোতে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং জৈন ধর্মের মন্দিরের স্বাক্ষর রয়েছে। ৫ম থেকে ১০ম শতাব্দীর মধ্যে এই ধর্মীয় স্থাপনাগুলো নির্মিত হয়েছিল। এখানে বৌদ্ধ ধর্মের ১২টি হিন্দু ধর্মের ১৭টি এবং জৈন ধর্মের ৫টি মন্দির রয়েছে। সব ধর্মের উপাসনালয়ের এই সহাবস্থান সে যুগের ভারতবর্ষে ধর্মীয় সম্প্রীতির নিদর্শন বহন করে।

পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুহাচিত্র ও ভাস্কর্যের জন্য ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো অজন্তা গুহাকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের অন্তর্ভুক্ত করে।ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের আওরঙ্গবাদ জেলায় অজন্তা গ্রামের পাশেই পাহাড়ের গায়ে অবস্থিত ২৯টি গুহায় রয়েছে অপূর্ব সব ভাস্কর্য,দেয়ালচিত্র বা ফ্রেসকো এবং পাথর খোদাই কাজ।পাহাড়ের গায়ে পাথর কেটে এই গুহাগুলো সৃষ্টি করা হয়েছে ।এই গুহা-মন্দিরগুলো দুটি পর্বে নির্মিত হয় ।১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দ সময়ে ৯,১০,১২ এবং১৫ নম্বর গুহা-মন্দির নির্মিত হয়।সাতবাহন রাজবংশের সময় হীনযান বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী এখানে গৌতম বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে সৃষ্টি করা হয় ম্যুরাল,ফ্রেসকো ও ভাস্কর্য ।এখানে দ্বিতীয় পর্বের কাজ হয় ৪৬০ থেকে ৪৮০ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ২০ বছর সময়ের মধ্যে।ভক্তক রাজবংশের সম্রাট হরিসেনার রাজত্বকালে ২৩টি গুহায় মন্দির নির্মিত হয়।গুহাগুলোতে শিল্পীরা রীতিমত পরষ্পরের সাথে প্রতিযোগিতা করে গুহার দেয়ালে ফুটিয়ে তোলেন তাঁদের শিল্পকর্ম যা মানব সভ্যতার শিল্পকলার ইতিহাসের এক অনন্য সম্পদে পরিণত হয় ।৪৮০ খ্রীস্টাব্দে সম্রাট হরিসেনার রাজত্বের অবসান হলে মন্দিরগুলো ধীরে ধীরে পরিত্যাক্ত হয় ।বিস্মৃতির অন্ধকারে তলিয়ে যায় এই অতুল কীর্তি ।অরণ্য গ্রাস করে নেয় পুরো এলাকা ।গুহাগুলো পরিণত হয় সাপ ও অন্যান্য বন্য জন্তুর আবাস স্থলে ।শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে যায়।১৮১৯ সালে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির ব্রিটিশ সেনা অফিসার জন স্মিথ জঙ্গলে বাঘ শিকার করতে গিয়ে প্রথমে ১০ নম্বর গুহাটি খুঁজে পান । বাদুর, সাপ আর অন্যান্য ছোট বড় জন্তুর ভয় সত্ত্বেও জন স্মিথ গুহার শিল্প সম্পদ দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান ।এরপর এখানে শুরু হয় প্রত্নতাত্বিক অভিযান।
গুহা মন্দিরগুলোতে দুটি বা তিনটি প্রবেশদ্বার রয়েছে । একটি মূল প্রবেশদ্বার ও অন্যগুলো পার্শ্বদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হত ।দুটি দরজার মাঝখানে রয়েছে চারকোণা জানালা ।ভিতরে রয়েছে অনেকগুলো স্তম্ভ ।মন্দিরের সামনে চত্বরে একসময় ছিল অনেক ভাস্কর্য । এর ধ্বংসাবশেষ এখনো সংরক্ষিত রয়েছে ।প্রথম গুহায় রয়েছে বৌদ্ধ জাতক কাহিনীর বিভিন্ন ঘটনার ভাস্কর্য ।গুহার দেয়ালে গৌতম বুদ্ধের একটি বিশাল মূর্তি উত্কীর্ণ রয়েছে । ধর্মচক্রপ্রবর্তন মুদ্রায় এই বুদ্ধ মূর্তিটি শিল্প নৈপূণ্যে অনবদ্য ।গুহার অন্যান্য দেয়ালে রয়েছে জাতক কাহিনীর ফ্রেসকো ।গুহার স্তম্ভগুলো কারুকার্যশোভিত । অন্যান্য গুহার ভিতরেও একই ভাবে বোধিস্বত্তের বিভিন্ন রূপের ভাস্কর্য ও দেয়ালচিত্র রয়েছে । এছাড়া রয়েছে মঞ্জুশ্রীসহ বিভিন্ন বৌদ্ধ দেবদেবীর মূর্তি ।গুহা গুলোর অলংকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে লতাপাতা, মানুষ,অপ্সরা,যক্ষ,নাগ এবং বিভিন্ন বাস্তব ও কাল্পনিক প্রাণীর মূর্তি ও ফ্রেসকো ।গুহাগুলোর মেঝে ছাড়া দেয়ালের ও ছাদের প্রতিটি অংশে রয়েছে কারুকার্য,মূর্তি, ফ্রেসকো ও ম্যুরাল ।দ্বিতীয় গুহার প্রবেশদ্বার অন্য গুহাগুলোর চেয়ে একটু অন্যরকম ভাবে নির্মিত । কারুকার্যও বেশি ।গুহা গুলোর সামনে রয়েছে বারান্দা ।বারান্দার ছাদ ও স্তম্ভগুলো দৃষ্টিনন্দন কারুকার্যে শোভিত ।প্রতিটি গুহার মাঝখানে রয়েছে প্রশস্ত জায়গা বা হল ।হলগুলোর চারদিকে রয়েছে বড় চারটি স্তম্ভ ।ছাদ যেন ধ্বসে না পড়ে সে জন্য রয়েছে পাথরের খিলান ।চতুর্থ গুহাটি বেশ বড় ।তবে এর কিছু অংশের নির্মাণ অসমাপ্ত রয়েছে ।চতুর্থ গুহায় বোধি স্বত্ব অবলোকিতেশ্বরের বিভিন্ন মুর্তি উত্কীর্ণ রয়েছে । অজন্তায় গুহাচিত্রের জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে তা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের গুহাচিত্রের পদ্ধতির চেয়ে সম্পূর্ণ পৃথক ।ভারতের প্রাচীনতম মন্দিরচিত্রেরও অন্যতম হলো অজন্তার মন্দির চিত্র ।পাহাড় কেটে কিভাবে এই মন্দিরগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল তা আজও স্থাপত্যজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক বড় বিষ্ময়।প্রতিদিন দেশ বিদেশ থেকে অসংখ্য পর্যটক আওরঙ্গবাদ শহর থেকে একটু দূরে অজন্তার ভুবনবিখ্যাত মন্দির দেখতে আসেন ।প্রাচীন ভারতীয় শিল্পীদের অপূর্ব শিল্প প্রতিভায় বিষ্ময়ে বিমুগ্ধ হন তাঁরা ।(শান্তা)

পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুহাচিত্র ও ভাস্কর্যের জন্য ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো অজন্তা গুহাকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের অন্তর্ভুক্ত করে।ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্যের আওরঙ্গবাদ জেলায় অজন্তা গ্রামের পাশেই পাহাড়ের গায়ে অবস্থিত ২৯টি গুহায় রয়েছে অপূর্ব সব ভাস্কর্য,দেয়ালচিত্র বা ফ্রেসকো এবং পাথর খোদাই কাজ।পাহাড়ের গায়ে পাথর কেটে এই গুহাগুলো সৃষ্টি করা হয়েছে ।এই গুহা-মন্দিরগুলো দুটি পর্বে নির্মিত হয় ।১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ১০০ খ্রিস্টাব্দ সময়ে ৯,১০,১২ এবং১৫ নম্বর গুহা-মন্দির নির্মিত হয়।সাতবাহন রাজবংশের সময় হীনযান বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী এখানে গৌতম বুদ্ধের জীবনের বিভিন্ন ঘটনার ভিত্তিতে সৃষ্টি করা হয় ম্যুরাল,ফ্রেসকো ও ভাস্কর্য ।এখানে দ্বিতীয় পর্বের কাজ হয় ৪৬০ থেকে ৪৮০ খ্রিস্টাব্দে মাত্র ২০ বছর সময়ের মধ্যে।ভক্তক রাজবংশের সম্রাট হরিসেনার রাজত্বকালে ২৩টি গুহায় মন্দির নির্মিত হয়।গুহাগুলোতে শিল্পীরা রীতিমত পরষ্পরের সাথে প্রতিযোগিতা করে গুহার দেয়ালে ফুটিয়ে তোলেন তাঁদের শিল্পকর্ম যা মানব সভ্যতার শিল্পকলার ইতিহাসের এক অনন্য সম্পদে পরিণত হয় ।৪৮০ খ্রীস্টাব্দে সম্রাট হরিসেনার রাজত্বের অবসান হলে মন্দিরগুলো ধীরে ধীরে পরিত্যাক্ত হয় ।বিস্মৃতির অন্ধকারে তলিয়ে যায় এই অতুল কীর্তি ।অরণ্য গ্রাস করে নেয় পুরো এলাকা ।গুহাগুলো পরিণত হয় সাপ ও অন্যান্য বন্য জন্তুর আবাস স্থলে ।শতাব্দীর পর শতাব্দী কেটে যায়।১৮১৯ সালে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির ব্রিটিশ সেনা অফিসার জন স্মিথ জঙ্গলে বাঘ শিকার করতে গিয়ে প্রথমে ১০ নম্বর গুহাটি খুঁজে পান । বাদুর, সাপ আর অন্যান্য ছোট বড় জন্তুর ভয় সত্ত্বেও জন স্মিথ গুহার শিল্প সম্পদ দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান ।এরপর এখানে শুরু হয় প্রত্নতাত্বিক অভিযান।
গুহা মন্দিরগুলোতে দুটি বা তিনটি প্রবেশদ্বার রয়েছে । একটি মূল প্রবেশদ্বার ও অন্যগুলো পার্শ্বদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হত ।দুটি দরজার মাঝখানে রয়েছে চারকোণা জানালা ।ভিতরে রয়েছে অনেকগুলো স্তম্ভ ।মন্দিরের সামনে চত্বরে একসময় ছিল অনেক ভাস্কর্য । এর ধ্বংসাবশেষ এখনো সংরক্ষিত রয়েছে ।প্রথম গুহায় রয়েছে বৌদ্ধ জাতক কাহিনীর বিভিন্ন ঘটনার ভাস্কর্য ।গুহার দেয়ালে গৌতম বুদ্ধের একটি বিশাল মূর্তি উত্কীর্ণ রয়েছে । ধর্মচক্রপ্রবর্তন মুদ্রায় এই বুদ্ধ মূর্তিটি শিল্প নৈপূণ্যে অনবদ্য ।গুহার অন্যান্য দেয়ালে রয়েছে জাতক কাহিনীর ফ্রেসকো ।গুহার স্তম্ভগুলো কারুকার্যশোভিত । অন্যান্য গুহার ভিতরেও একই ভাবে বোধিস্বত্তের বিভিন্ন রূপের ভাস্কর্য ও দেয়ালচিত্র রয়েছে । এছাড়া রয়েছে মঞ্জুশ্রীসহ বিভিন্ন বৌদ্ধ দেবদেবীর মূর্তি ।গুহা গুলোর অলংকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে লতাপাতা, মানুষ,অপ্সরা,যক্ষ,নাগ এবং বিভিন্ন বাস্তব ও কাল্পনিক প্রাণীর মূর্তি ও ফ্রেসকো ।গুহাগুলোর মেঝে ছাড়া দেয়ালের ও ছাদের প্রতিটি অংশে রয়েছে কারুকার্য,মূর্তি, ফ্রেসকো ও ম্যুরাল ।দ্বিতীয় গুহার প্রবেশদ্বার অন্য গুহাগুলোর চেয়ে একটু অন্যরকম ভাবে নির্মিত । কারুকার্যও বেশি ।গুহা গুলোর সামনে রয়েছে বারান্দা ।বারান্দার ছাদ ও স্তম্ভগুলো দৃষ্টিনন্দন কারুকার্যে শোভিত ।প্রতিটি গুহার মাঝখানে রয়েছে প্রশস্ত জায়গা বা হল ।হলগুলোর চারদিকে রয়েছে বড় চারটি স্তম্ভ ।ছাদ যেন ধ্বসে না পড়ে সে জন্য রয়েছে পাথরের খিলান ।চতুর্থ গুহাটি বেশ বড় ।তবে এর কিছু অংশের নির্মাণ অসমাপ্ত রয়েছে ।চতুর্থ গুহায় বোধি স্বত্ব অবলোকিতেশ্বরের বিভিন্ন মুর্তি উত্কীর্ণ রয়েছে । অজন্তায় গুহাচিত্রের জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে তা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের গুহাচিত্রের পদ্ধতির চেয়ে সম্পূর্ণ পৃথক ।ভারতের প্রাচীনতম মন্দিরচিত্রেরও অন্যতম হলো অজন্তার মন্দির চিত্র ।পাহাড় কেটে কিভাবে এই মন্দিরগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল তা আজও স্থাপত্যজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক বড় বিষ্ময়।প্রতিদিন দেশ বিদেশ থেকে অসংখ্য পর্যটক আওরঙ্গবাদ শহর থেকে একটু দূরে অজন্তার ভুবনবিখ্যাত মন্দির দেখতে আসেন ।প্রাচীন ভারতীয় শিল্পীদের অপূর্ব শিল্প প্রতিভায় বিষ্ময়ে বিমুগ্ধ হন তাঁরা ।(শান্তা)
MAIN LINK

টিপু সুলতানের মহীশুরে একদিন

বিটিভিতে যখন সোর্ড অব টিপু সুলতান দেখানো হতো, আমি ছিলাম মুগ্ধ দর্শক। মহীশুরের রাজপ্রাসাদ দেখে ভেবেছি কবে যাবো সেখানে! ছোট ছিলাম তখন, তাই ভাবনা শধুমাত্র স্বপ্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলো। তারপর একদিন সুযোগ হলো আমার স্বপ্নটাকে বাস্তব করার।
সময়টা ২০০৪ সালের জানুয়ারী মাস। ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী ব্যাঙ্গালোর শহরে ব্যক্তিগত কাজে প্রায় এক মাস থাকা হয়। ঠিক সেই সময়টাতেই একদিন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো মহীশুর ঘুরতে যাওয়ার। এক শুক্রবার খুব সকালে মাইক্রোবাস ভাড়া করে ব্যাঙ্গালোর থেকে মহীশুরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম।
মহীশুর হচ্ছে কর্ণাটকের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর, ব্যাঙ্গালোর থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দক্ষিন-পশ্চিমে চামুন্দী পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত। সকাল দশটার ভিতর মহীশুর শহরে পৌঁছে গেলাম। এই শহরকে সাধারণত ‘প্রাসাদের শহর’ বলা হয়ে থাকে। তাই প্রথমেই গেলাম মহীশুরের রাজ প্রাসাদে।
এই রাজপ্রাসাদের আরেকটি নাম আছে- আমবা ভিলাস প্রাসাদ (Amba Villas Palace)। এই প্রাসাদটি হচ্ছে মহীশুরের রাজকীয়  ওদিয়ার পরিবারের বাসস্থান। ওদিয়ার বংশ ১৩৯৯ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত মহীশুর রাজ্য শাসন করেছিলো। যাহোক, মহীশুর রাজপ্রাসাদ ভারতের অন্যতম একটি দর্শনীয় স্থান এবং দর্শনার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় তাজমহলের পরেই এর অবস্থান। ইন্দো-সারাসেনিক স্টাইলে নির্মিত এই রাজপ্রাসাদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, এতে হিন্দু, মুসলিম, রাজপুত এবং গথিক স্থাপত্য শৈলীর অপূর্ব সংমিশ্রণ আছে। তিন তলা এই প্রাসাদটি পুরোটাই ঘিয়া রংয়ের গ্রানাইট পাথরে নির্মিত এবং এর গম্বুজগুলো নির্মিত গাড় গোলাপী রংয়ের মার্বেল পাথরে, সাথে আছে ১৪৫ ফুট উঁচু পাঁচ তলার সমান একটি টাওয়ার। আর আছে প্রাসাদের চারপাশে নয়ন জুড়ানো বাগান। এর নকশায় ছিলেন ব্রিটিশ স্থাপত্যবিদ হেনরি আরউইন।

মহীশুর রাজপ্রাসাদ
 প্রাসাদের মূল প্রবেশ পথেই একজন গাইড পেলাম। একজন বিদেশী হিসেবে ২০০ রুপী দিয়ে টিকেট কেটে প্রাসাদের ভিতরে যখন ঢুকতে যাবো, শুনলাম ভিতরে ক্যামেরা নিয়ে যাওয়া যাবে না! হা হুতোম্মি! ঘুরবো, দেখবো অথচ ছবি তুলতে পারবো না! যখন গিয়েছিলাম, প্রাসাদের এক অংশে সংস্কার কাজ চলছিলো। আর পুরো প্রাসাদটিও দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা ছিলো না। শুধুমাত্র চারটি বিশেষ রুম দেখতে পেয়েছিলাম। আজ এতো বছর পর সবকিছু ঠিকমতো মনে নেই, তবে বিশাল দরবার হলের কথা ভালোই মনে আছে। দরবার হলের বিশালতায় নিজেকে খুব ক্ষুদ্র মনে হচ্ছিল। প্রতিটি পিলারের কারুকাজ দেখে যেনো মোহিত হচ্ছিলাম। দরবার  হলের সাথেই বিশাল ব্যালকনি, যেখানে এসে সামনের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হওয়া ছাড়া আমার আর কিছুই করার ছিলো না! আমি যে পুরো চামুন্দী পাহাড়ের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে পাচ্ছি!
বারোটার মধ্যেই রাজপ্রাসাদ দেখা শেষ করে রওয়ানা দিলাম শ্রীরঙ্গাপাটনার দিকে। এই সেই শ্রীরঙ্গাপাটনা, মহীশুর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের যে ছোট্ট শহরটি হঠাৎ করেই আঠারশ শতাব্দীর দিকে বিখ্যাত হয়ে উঠে, শের-ই-মহীশুর টিপু সুলতানের রাজধানী হওয়ার কারণে। শহরটির চারপাশ দিয়ে কাবেরী নদী প্রবাহিত হওয়ায় এটি আসলে একটি দ্বীপ! প্রথমেই শহরটির একেবারে মাঝে অবস্থিত  শ্রীরঙ্গনাথস্বামী মন্দিরে গেলাম। গ্রানাইট পাথরে তৈরী ভারতের অন্যতম প্রাচীন এই মন্দিরটির বিশালতা উপলদ্ধি করতে না করতেই সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে দৌড় লাগালাম দরিয়া দৌলাত বাগের দিকে- টিপু সুলতানের বাগান প্রাসাদ। দরিয়া দৌলাত বাগ অর্থ হচ্ছে ‘সমুদ্রের সম্পদ’। ১৭৮৪ সালে প্রধানত সেগুন কাঠ দিয়ে ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত সবুজ রংয়ের প্রাসাদের চারপাশের বাগানে যেনো টিপু সুলতানের ছোঁয়া অনুভব করতে পারছিলাম। কৈশোরের হিরোর বাগান বাড়ি বা গ্রীস্মকালীন বাড়িটি দেখে চোখের জল আর বাঁধ মানছিলো না! এখানে টিপু সুলতানের সময়কালের সমরাস্ত্র, পেইন্টিং এবং মুদ্রা দেখতে দেখতে একটি তৈলচিত্রের দিকে চোখ আটকে গেলো। স্যার রবার্ট কার পর্টারের আঁকা “শ্রীরঙ্গপাটনামের ঝড়” (Storming of Srirangapattanam) –এ ১৭৯৯ সালের ৪ঠা মে ব্রিটিশদের কাছে টিপু সুলতানের চূড়ান্ত পরাজয়টা যেনো জীবন্ত হয়ে উঠেছে! বাগান বাড়ি থেকে শ্রীরঙ্গপাটনা ছেড়ে চলে যাবার পথে থামলাম- টিপু সুলতানের সমাধিক্ষেত্রে। শহরের পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত এই সমাধিক্ষেত্রটি টিপু সুলতান নিজেই নির্মান করেছিলেন তাঁর বাবা-মায়ের শেষ ঠিকানা হিসেবে। ইংরেজদের কাছে টিপু সুলতানের পতন হলে ১৭৯৯ সালের ৫ই মে তাঁকে এখানে সমাধিস্থ করা হয়। চারকোণা এই সমাধিক্ষেত্রের উপরে উঠে গেছে ইট দিয়ে তৈরী গম্বুজ। চারপাশের খোলা করিডোরগুলো তৈরী করা হয়েছে কালো পাথরের পিলার দিয়ে। এই সমাধিক্ষেত্র কমপ্লেক্সের ভিতরে একটি মসজিদও আছে, যাতে মোঘল স্থাপত্যশৈলীর ছাপ পাওয়া যায়। ভারতের ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামে যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ টিপু সুলতানের সমাধিক্ষেত্র থেকে আবার চলে এলাম মহীশুর শহরে। বেলা তখন প্রায় তিনটা।
শ্রীরঙ্গনাথস্বামী মন্দির, মহীশুরশ্রীরঙ্গনাথস্বামী মন্দির, মহীশুর
দরিয়া দৌলাত, মহীশুরদরিয়া দৌলাত, মহীশুর
দরিয়া দৌলাত-২, মহীশুরদরিয়া দৌলাত-২, মহীশুর
টিপু সুলতানের সমাধিক্ষেত্র, মহীশুরটিপু সুলতানের সমাধিক্ষেত্র, মহীশুর
দ্রুত মধ্যাহ্ন ভোজন শেষ করে দেখতে গেলাম মহীশুর চিড়িয়াখানা। এতোকিছু থাকতে চিড়িয়াখানায় কেনো? মহীশুর চিড়িয়াখানার কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে। সরকারীভাবে এর নাম শ্রী চামারাজেন্দ্র জু’লজিকাল গার্ডেন। ১৮৯২ সালে মহীশুরের মহারাজা শ্রী চামারাজ ওয়াদিয়ার এই চিড়িয়াখানার পত্তন করেন এবং এভাবেই এটি হয়ে উঠে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন চিড়িয়াখানা। এর আরেকটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে – এখানেই ভারতের যে কোনো চিড়িয়াখানা থেকে সবচেয়ে বেশি হাতি আছে। চিড়িয়াখানা দেখতে দেখতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে এলো। এই সময়ই রওয়ানা দিলাম খুবই আকর্ষনীয় এক জিনিস দেখতে!
মহীশুর শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তর- পশ্চিমে কাবেরীসহ আরো দুটি নদীর মিলিত স্থানে নির্মিত কৃষ্ণরাজ সাগর বাঁধের উদ্দেশ্যে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে রওয়ানা দেবার মূল কারণটা হচ্ছে বৃন্দাবন গার্ডেনের আলো ঝলমলে নৃত্যরত ঝর্না (Dancing Fountain) দেখা! ভারতের সবচেয়ে পুরাতন সেচ বাঁধের নিচেই তৈরী করা হয়েছে বৃন্দাবন গার্ডেন। কাশ্মিরের শালিমার গার্ডেনের অনুকরণে নির্মান করা এই গার্ডেনে আছে প্রচুর প্রজাতির বৃক্ষ এবং পুষ্প। তবে এর সবচেয়ে আকর্ষনীয় দিক হচ্ছে, যেটার কারণেই দর্শনার্থীরা এখানে আসেন, সেটি হচ্ছে নৃত্যরত ঝরণা। মিউজিকের তালে তালে ঝরনা থেকে পানি বেরিয়ে আসে সিনক্রোনাইজড ভঙ্গিতে। এবং এই নৃত্য শুরু করা হয়  সন্ধ্যা সাতটা থেকে, চলে এক ঘন্টা। রক্তিম সন্ধ্যার আলোতে এই আলোকজ্জ্বল ঝরনার মিউজিকের তালে নাচাটা- এক মোহনীয় পরিবেশের সৃষ্টি করে। পুরো একটি ঘন্টা শুধু মিউজিকই শুনলাম আর ঝর্নার নাচই দেখলাম। সারাদিনের দৌড়াদৌড়ি যেনো এই এক ঘন্টায় ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেলো।
রাতের বৃন্দাবন গার্ডেনের ঝর্নারাতের বৃন্দাবন গার্ডেনের ঝর্না
 নির্মল আনন্দে উদ্ভাসিত হয়ে সাড়ে আটটার দিকে বাঁধ থেকে যখন ব্যাঙ্গালোরের দিকে রওয়ানা দিলাম, তখন মন থেকে মহীশুরের রাজ বংশ উধাও, টিপু সুলতান উধাও, সেখানে শুধু বিরাজ করছিলো এক অপার্থিব মুগ্ধ মৌনতা! তাই ঘড়ির হিসেবে পরের দিন (রাত বারোটার পর) যখন ব্যাঙ্গালোরে এসে পৌঁছালাম, তখন ক্লান্তির জায়গায় ভর করেছিলো জীবনের অসম্ভব প্রিয় কিছু মুহূর্ত, প্রিয় কিছু স্মৃতি জমা হওয়ার আনন্দ।

একদিন ভূমধ্যসাগরের তীরে

প্রাচীনকালের মানুষেরা ভেবেছিলো সাগরটির অবস্থান পৃথিবীর মধ্যখানে, যে কারণে নাম হয়েছিলো ভূমধ্যসাগর। আর কেনইবা ভূমধ্যসাগর বলবে না? এটা যে এশিয়া, ইউরোপ এবং আফ্রিকার সংযোগস্থলে অবস্থিত! তাই ছোটবেলা থেকেই ভূমধ্যসাগর দেখার এক প্রবল ইচ্ছা মনের ভিতর সুপ্ত ছিলো। সেই ইচ্ছাটা পূর্ণ হলো এই যৌবনে এসে।

লিবিয়ান স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের অধীনে চাকরী নিয়ে ২০১০ সালে স্বস্ত্রীক গিয়েছিলাম লিবিয়াতে। আমাদের পোস্টিং হয়েছিলো লিবিয়ার গারিয়ান টিচিং হাসপাতালে। গারিয়ান শহরটি আমাদের দেশের বান্দরবনের মতো, এক বিশাল পর্বতশ্রেণির গা বেয়ে উঠে যেতে হয়। পর্বতশ্রেণিটি নাফুসা মাউন্টেন রেঞ্জ নামে পরিচিত। লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপলি থেকে প্রায় আশি কিলোমিটার দক্ষিনে অবস্থিত নাফুসা মাউন্টেন এরিয়া লিবিয়ান সিভিল ওয়ারে খুব গুরুত্বপূর্ণ এক ভূমিকা রেখেছিলো।  অনেক কাল থেকেই নাফুসা মাউন্টেন এরিয়া লিবিয়ার উপজাতি মানুষদের সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিলো, কিন্তু গাদ্দাফীর শাসনামলে তাদের এই বৈশিষ্ট্য চাপা পড়ে, তাই যখন গণ আন্দোলন শুরু হয়, প্রথম থেকেই এই এলাকার জনসাধারণ বিদ্রোহীদের সমর্থন দেয়। ১৮ই আগষ্ট, ২০১১-তে  বিদ্রোহী বাহিনী যখন গারিয়ান দখল করে, ত্রিপলী দখল করা তখন সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ত্রিপলীর পতন ঘটে ২৩ আগষ্ট, ২০১১। 

Nafusa Muntain Range নাফুসা মাউন্টেন রেঞ্জ
গারিয়ান টিচিং হাসপাতালে সেই সময়ে আমরা স্বামী স্ত্রী ছাড়া আর কোনো বাংলাদেশী ডাক্তার বা নার্স ছিলো না। পুরো গারিয়ানেই এক বাংলাদেশী পরিবার ছিলো, তারা প্রায় দশ বছর যাবত সেখানে বসবাস করছিলেন। গারিয়ানে যাওয়ার তৃতীয় দিনেই তাঁদের সাথে আমাদের পরিচয় হলো। সেলিম ভাই এবং তাঁর স্ত্রী আমাদের দুইজনকে প্রথম দেখাতেই আপন করে নিলেন। সেই হাসপাতালে বেশকিছু ভারতীয় ডাক্তার ছিলেন, ছিলো পাকিস্তানী ডাক্তার পরিবারও। এক সপ্তাহের মধ্যেই আমাদের আড্ডাগুলো হয়ে উঠলো উপমহাদেশের ছোট সংস্করণ- বাংলাদেশী, ভারতীয় আর পাকিস্তানীদের মিলনমেলা। এরকমই এক আড্ডায় সিদ্ধান্ত হলো শুক্রবার জুমার নামযের পর আমরা সবাই ত্রিপলিতে যাবো। ত্রিপলিতে তখন বাণিজ্যমেলা চলছিলো,  বানিজ্যমেলায় ঘুরে রাতে ভূমধ্যসাগরের পাড়ে খাবার খাবো। ঠিক হলো প্রত্যেক পরিবার একটি করে আইটেম রান্না করে নিয়ে যাবে।

যথাসময়ে শুক্রবার দুপুর দুইটায় আমরা বাংলাদেশী দুই পরিবার, ভারতীয় দুই পরিবার আর পাকিস্তানী তিন পরিবার পাঁচটি প্রাইভেট কারে করে ত্রিপলির উদ্দেশ্যে যাত্রা করি। সময় খুব বেশি লাগেনি, আশি কিলোমিটারের মতো রাস্তা প্রায় এক ঘন্টায় পৌঁছে গেলাম। যাত্রাপথে ছোট একটি শহরের মাঝখান দিয়ে যাওয়ার সময় সেলিম ভাই জায়গাটার নাম বললেন আজিজিয়া। মনে পড়ে গেলো স্কুলের ভুগোল পড়ার সময় পড়েছিলাম পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণতম জায়গার নাম লিবিয়ার আজিজিয়া। ১৯২২ সালের ১২ই সেপ্টেম্বর আজিজিয়ার তাপমাত্রা দেখা যায় ৫৭.৮° সেলসিয়াস। সেই থেকে আজিজিয়া পৃথিবীর সবচেয়ে উষ্ণতম স্থান। এখন কিন্তু সেরকম উষ্ণ লাগলো না!

Azizia- Libya আজিজিয়া- পৃথিবীর উষ্ণতম স্থান
ত্রিপলিতে পৌঁছেই আমরা বাণিজ্য মেলায় চলে গেলাম। ঢাকা বাণিজ্য মেলা দেখে ত্রিপলি বাণিজ্য মেলা খুব ছোট লাগলো। কিন্তু সাজানো গোছানো। লোক সমাগম ভালোই ছিলো। এক শালের দোকানে কথা বলতে গিয়ে জানা গেলো তারা এই বছরই ঢাকা বাণিজ্যমেলায় স্টল দিয়েছিলেন, ইরানী স্টল। ঢাকার মেলার খুব প্রশংসা করলেন। আমাদের দলের ভারতীয় আর পাকিস্তানী সদস্যদের সামনে গর্বে আমার চোখে জল এসে গেলো।

Trade Fair, tripoli ত্রিপলি বাণিজ্য মেলায় আমরা ক’জনা
বাণিজ্য মেলায় উত্তর আফ্রিকার অনেকগুলো দেশের স্টল ছিলো, ছিলো অনেক ইরানী স্টলও। আর ছিলো একপ্রান্তে বিশাল প্যাভিলিয়ান জুড়ে ভারতীয় স্টল। আমাদের ভারতীয় সদস্যরা সেই স্টলেই সময় কাটালেন অনেকক্ষণ। কোনো বাংলাদেশী স্টল না দেখে আমি একা একা মেলার এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। কখন সন্ধ্যা হয়ে রাত হয়ে গেলো খেয়ালই হয় নি। রাত আটটার দিকে আমরা সবাই মেলার প্রধান গেটে একত্রিত হয়ে রাতের ত্রিপলি দেখতে বের হলাম। প্রায় দুই ঘণ্টা যাবত ত্রিপলির মার্কেটগুলো ঘুরে রাত দশটার দিকে ভূমধ্যসাগরের পাড়ে গেলাম।

ভূমধ্যসাগরের ত্রিপলির অংশটি খুব সুন্দর করে বাঁধানো। গাদ্দাফী সরকার এটিকে টুরিস্ট স্পট হিসেবে গড়ে তুলছিলো। ত্রিপলিতে আমাদের কক্সবাজারের মতো কোনো সমুদ্র সৈকত দেখতে পেলাম না। তবে লিবিয়ার প্রায় সব বড় বড় শহর ভূমধ্যসাগরের তীরেই অবস্থিত। অন্যান্য বেশ কিছু শহরে কক্সবাজারের মতোই সমুদ্র সৈকত আছে। ত্রিপলির তীরে বিশাল জায়গা জুড়ে বাঁধানো। শিশুদের খেলার জন্য অনেকগুলো স্লিপার জাতীয় জিনিস আছে, আছে বসার জন্য প্রচুর বেঞ্চ, একটু পর পর খেজুর গাছ, আর আছে পয় নিষ্কাশনের জন্য ভালো সুব্যবস্থা। রাতের বেলাতে আশে পাশ খুব ভালোভাবে দেখতে পাচ্ছিলাম না। দূর থেকে নোঙর করা বিভিন্ন জাহাজের আলোগুলো দেখে এক অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছিল। ঠিক করলাম একবার দিনের আলোয় এখানে আসবো। পরের সপ্তাহেই আমি এবং আমার স্ত্রী আবার এসেছিলাম, দিনের আলোয় অবলোকন করেছিলাম ভূমধ্যসাগরকে। খুব ভালোও লাগেনি আবার খুব খারাপও লাগেনি। আসলে ত্রিপলি অংশটিকে কখনোই সৈকতের মতো মনে হয় না। আধুনিকতার ছোঁয়ায় এর ভালো লাগার অংশটিই হারিয়ে গেছে। 

Meditarean Sea দিনের আলোয় ভূমধ্যসাগর

Meditarean Sea ভূমধ্যসাগরের তীরে স্বস্ত্রীক লেখক


যাহোক রাতের আলোয় আমাদের উপমহাদেশীয় আড্ডা হয়ে উঠলো অসাধারণ। খেলাধুলা, ধর্ম, সমাজনীতি থেকে শুরু করে রাজনীতিও পর্যন্ত চলে এলো সেই আড্ডায়। হলো অনেক তর্ক বিতর্ক, কিন্তু কোনো তর্কই আমাদের উপমহাদেশের মতো যুদ্ধংদেহী হলো না! অবশেষে রাত প্রায় বারোটার দিকে আমরা খাওয়ার আয়োজন শুরু করলাম।

Meditarean Sea ভূমধ্যসাগরের তীরে রাতের খাওয়া
(এই লেখাটি ২১শে ডিসেম্বর, ২০১২ সালে দৈনিক যুগান্তরের 'যেতে যেতে পথে'- এ প্রকাশিত।