শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০১৫

সুইডেনের ভিসা যেভাবে পাবেন

সময়নিউজ ডট নেট :
ঢাকা :
জ্ঞান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সুইডিশ জাতি বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আর এ কারনে সারা বিশ্বের অসংখ্য মানুষ উন্নত জীবনের লক্ষ্যে আজ সুইডেনে পাড়ি জমাচ্ছে। কিছু সংখ্যক যাচ্ছে পড়াশুনা অথবা ব্যবসায়িক কাজে আর কিছু সংখ্যক মানুষ যাচ্ছে কেবলমাত্র প্রযুক্তির শিখরে অবস্থানকারী দেশটিকে ঘুরে দেখতে। প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক লোক সুইডেনের ভিসার জন্য আবেদন করে থাকেন।

সুইডেনের ভিসার আবেদন প্রক্রিয়া

ব্যবসায়িক এবং কনফারেন্সের কাজে, স্বল্পকালীন ভ্রমনে অথবা পরিবার ও বন্ধুদের সাথে দেখা করার জন্য সুইডেন যেতে আগ্রহী ব্যক্তিকে ঢাকাস্থ সুইডেন দূতাবাসের মাধ্যমে ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে। সুইডেন ইউরোপের সেনজেন এলাকা ভুক্ত দেশ হওয়ায়, ৯০ দিন বা এর চেয়ে কম সময়ের জন্য সুইডেন যাওয়ার জন্য ভিসা আবেদন করতে ঢাকাস্থ সুইডেন দূতাবাসের মাধ্যমে সেনজেন ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে।
আর ভিসার মেয়াদ যদি ৯০ দিনের বেশি প্রয়োজন হয় তবে ‘দীর্ঘ সময়ের জন্য ভিসা’র (visa for longer stays) আবেদন করতে হবে। ‘দীর্ঘ সময়ের জন্য ভিসা’ কে ‘ডি’ টাইপ ভিসা অথবা জাতীয় ভিসা (National Visa) বলা হয়। এই ‘ডি’ টাইপ ভিসার মেয়াদ সর্বচ্চো এক বছর।

ভিসার ক্যাটাগরী

ব্যবসায়িক এবং কনফারেন্স ভিসা (Business and Conference Visa)
ট্যুরিস্ট ভিসা (Tourist Visa)
আত্মীয় ও বন্ধুদের সাথে দেখা করার ভিসা (Visiting Family and Friends Visa)

ব্যবসায়িক এবং কনফারেন্স ভিসা (Business and Conference Visa)

ব্যবসায়িক কাজে সুইডেন যেতে চাইলে বিজনেস ভিসা অথবা সেনজেন ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে। এই ভিসার মেয়াদ ৩ মাস। যদি ৩ মাসের বেশি সময় প্রয়োজন হয় তবে দূতাবাসে কারণ উল্লেখ করে নির্ধারিত ফর্মের মাধ্যমে ‘বসবাসের অনুমোদনপত্র (residence permit) অথবা ‘দীর্ঘ সময়ের জন্য ভিসা’র (visa for longer stays) আবেদন করতে হবে। ‘দীর্ঘ সময়ের জন্য ভিসা’ কে ‘ডি’ টাইপ ভিসা বলা হয়।

সুইডেনের বিজনেস ভিসার আবেদনের নিয়ম:
পাসপোর্ট (পাসপোর্টের মেয়াদ ৩ মাসের বেশি থাকতে হবে)
সেনজেন ভিসা ফর্মটি সঠিক ভাবে পূরণ করতে হবে।
ভিসার জন্য আবেদন ফর্মটি সুইডেন দূতাবাস থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন অথবা সুইডেন দূতাবাসের ওয়েবসাইট থেকেও সংগ্রহ করতে পারবেন।  সুইডেন ভিসার জন্য আবেদন ফর্মটির ডিরেক্ট ডাউনলোড লিংকটি নিচে দেয়া হল –                                                                                               

**  সুইডেনের সেনজেন ভিসা ফর্ম

    সুইডেনে অবস্থিত যে কোম্পানির কাছে ব্যবসায়িক কাজে যেতে হবে, সেই কোম্পানির আমন্ত্রণপত্র ভিসার আবেদনপত্রের সাথে জমা দিতে হবে।
    আবেদনকারীর নিজস্ব তথ্য
    সুইডেনে যাওয়ার তারিখ ও সুইডেন থেকে ফিরে আসার তারিখ
    ব্যবসায়িক কাজের ধরণ
    সুইডেনে থাকাকালীন যে ব্যক্তি আপনাকে সাহায্য করবে (ব্যবসায়িক অংশীদার অথবা সুইডেনে অবস্থানরত আক্তিয়)
    ‘ভিসা আবেদনকারীদের জন্য প্রশ্নাবলী’  (Questionnaire for visa applicants) ফর্মটি সঠিক ভাবে পূরণ করে আবেদন ফর্মটির সাথে জমা দিতে হবে। 
    পাসপোর্ট, ভ্রমণের অন্যান্য কাগজপত্র এবং এগুলোর ফটোকপি
    আবেদনকারীর ছবি:

  - সদ্য তোলা ২ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি (৩৫ মি.মি. x ৪৫ মি.মি.)
  - ছবি অবশ্যই রঙ্গিন হতে হবে
  - ছবিতে আবেদনকারীর সম্পূর্ণ মুখ স্পষ্ট বোঝা যেতে হবে
  - মাথায় কোন প্রকার টুপি অথবা মাথায় বাঁধার ফিতা অথবা পাগড়ি অথবা কাপড় থাকা যাবেনা। শুধু মাত্র ধর্মীয় ক্ষেত্রে রাখা যেতে পারে কিন্তু সম্পূর্ণ মুখ স্পষ্ট বোঝা যেতে হবে।

    ট্র্যাভেল ইন্সুরেন্স থাকতে হবে, যা জরুরী ডাক্তারি সেবা, অ্যাম্বুলেন্স সেবা সহ অন্যান্য সেবার খরচ বহন করতে পারবে।  ট্র্যাভেল ইন্সুরেন্স কমপক্ষে ৩০০০০ ইউরো (২৫,১৭,৫৬৫ টাকা) এর হতে হবে। ট্র্যাভেল ইন্সুরেন্সের পরিমাণ সময় সাপেক্ষে পরিবর্তনশীল। আবেদনের সময় সুইডেন দূতাবাস থেকে জেনে নিতে পারেন। 
    সুইডেনে যাওয়ার ফ্লাইট বুকিং ডকুমেন্ট
    যে কোম্পানি থেকে যাবেন তার কভার লেটার

বিজনেস ভিসা ফী: ভিসার জন্য আবেদন প্রার্থী     ভিসা ফী
সেনজেন ভিসা     ৬৫০০ টাকা
দীর্ঘ সময়ের জাতীয় ভিসা (‘ডি’ টাইপ ভিসা)     ৬৫০০ টাকা
৬-১২ বছরের শিশু     ৩৮০০ টাকা
০-৬ বছরের শিশু (৬ বছরের চেয়ে কম বয়স)     ফ্রী

* ভিসার ফী সময় সাপেক্ষে পরিবর্তন হতে পারে
* ভিসার ফী অফেরত যোগ্য

ট্যুরিস্ট ভিসা (Tourist Visa)

ভ্রমণের জন্য সুইডেন যেতে চাইলে ভ্রমণ বা  ট্যুরিস্ট ভিসা অথবা সেনজেন ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে। এই ভিসার মেয়াদ ৩ মাস। যদি ৩ মাসের বেশি সময় প্রয়োজন হয় তবে দূতাবাসে কারণ উল্লেখ করে নির্ধারিত ফর্মের মাধ্যমে ‘বসবাসের অনুমোদনপত্র (residence permit) অথবা ‘দীর্ঘ সময়ের জন্য ভ্রমণ ভিসা’র (visa for longer stays) আবেদন করতে হবে। ‘দীর্ঘ সময়ের জন্য ভিসা’ কে ‘ডি’ টাইপ ভিসা বলা হয়।

সুইডেনের ট্যুরিস্ট ভিসার আবেদনের নিয়ম:

    পাসপোর্ট (পাসপোর্টের মেয়াদ ৩ মাসের বেশি থাকতে হবে)
    সেনজেন ভিসা ফর্মটি সঠিক ভাবে পূরণ করতে হবে।
    ভিসার জন্য আবেদন ফর্মটি সুইডেন দূতাবাস থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন অথবা সুইডেন দূতাবাসের ওয়েবসাইট থেকেও সংগ্রহ করতে পারবেন।  সুইডেন ভিসার জন্য আবেদন ফর্মটির ডিরেক্ট ডাউনলোড লিংকটি নিচে দেয়া হল –                                                                 

 **  সুইডেনের সেনজেন ভিসা ফর্ম

    ভ্রমণকারীর পরিবারের বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। এজন্য ‘পরিবার সম্পর্কীয় বিবরণ ফর্ম’ (Family Appendix for Applicants) সঠিক ভাবে পূরণ করতে হবে।
    আবেদনকারীর ছবি:

  - সদ্য তোলা ২ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি (৩৫ মি.মি. x ৪৫ মি.মি.)
  - ছবি অবশ্যই রঙ্গিন হতে হবে
  - ছবিতে আবেদনকারীর সম্পূর্ণ মুখ স্পষ্ট বোঝা যেতে হবে
  - মাথায় কোন প্রকার টুপি অথবা মাথায় বাঁধার ফিতা অথবা পাগড়ি অথবা কাপড় থাকা যাবেনা। শুধু মাত্র ধর্মীয় ক্ষেত্রে রাখা যেতে পারে কিন্তু সম্পূর্ণ মুখ স্পষ্ট বোঝা যেতে হবে।

    কি উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করতে চান তার কাগজপত্র, হোটেল বুকিং এর কাগজ অথবা কোন এজেন্সির মাধ্যমে গেলে তার কাগজপত্র
    আবেদনকারী কি কাজ করেন তার প্রমাণপত্র। যেমন – আবেদনকারী চাকরি করেন নাকি পড়াশুনা।
    ভ্রমণ করার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ আছে কিনা তার প্রমাণপত্র (ব্যাংক স্টেটমেন্ট)
    ট্র্যাভেল ইন্সুরেন্স থাকতে হবে, যা জরুরী ডাক্তারি সেবা, অ্যাম্বুলেন্স সেবা সহ অন্যান্য সেবার খরচ বহন করতে পারবে।  ট্র্যাভেল ইন্সুরেন্স কমপক্ষে ৩০০০০ ইউরো (২৫,১৭,৫৬৫ টাকা) এর হতে হবে। ট্র্যাভেল ইন্সুরেন্সের পরিমাণ সময় সাপেক্ষে পরিবর্তনশীল। আবেদনের সময় সুইডেন দূতাবাস থেকে জেনে নিতে পারেন। 
    সুইডেনে যাওয়ার ফ্লাইট বুকিং ডকুমেন্ট

ট্যুরিস্ট ভিসা ফী: ভিসার জন্য আবেদন প্রার্থী     ভিসা ফী
সেনজেন ভিসা     ৬৪০০ টাকা
দীর্ঘ সময়ের জাতীয় ভিসা (‘ডি’ টাইপ ভিসা)     ৬৪০০ টাকা
৬-১২ বছরের শিশু     ৩৭৫০ টাকা
০-৬ বছরের শিশু (৬ বছরের চেয়ে কম বয়স)     ফ্রী

* ভিসার ফী সময় সাপেক্ষে পরিবর্তন হতে পারে
* ভিসার ফী অফেরত যোগ্য

আত্মীয় ও বন্ধুদের সাথে দেখা করার ভিসা (Visiting Family and Friends Visa)

আত্মীয় বা বন্ধুদের সাথে দেখা করার জন্য সুইডেন যেতে চাইলে আত্মীয় ও বন্ধুদের সাথে দেখা করার ভিসা অথবা সেনজেন ভিসার জন্য আবেদন করতে হবে। এই ভিসার মেয়াদ ৩ মাস। যদি ৩ মাসের বেশি সময় প্রয়োজন হয় তবে দূতাবাসে কারণ উল্লেখ করে নির্ধারিত ফর্মের মাধ্যমে ‘বসবাসের অনুমোদনপত্র (residence permit) অথবা ‘দীর্ঘ সময়ের জন্য ভিসা’র (visa for longer stays) আবেদন করতে হবে। ‘দীর্ঘ সময়ের জন্য ভিসা’ কে ‘ডি’ টাইপ ভিসা বলা হয়।

সুইডেনের আত্মীয় ও বন্ধুদের সাথে দেখা করার ভিসার আবেদনের নিয়ম:

    পাসপোর্ট (পাসপোর্টের মেয়াদ ৩ মাসের বেশি থাকতে হবে)
    সেনজেন ভিসা ফর্মটি সঠিক ভাবে পূরণ করতে হবে।
    ভিসার জন্য আবেদন ফর্মটি সুইডেন দূতাবাস থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন অথবা সুইডেন দূতাবাসের ওয়েবসাইট থেকেও সংগ্রহ করতে পারবেন।  সুইডেন ভিসার জন্য আবেদন ফর্মটির ডিরেক্ট ডাউনলোড লিংকটি নিচে দেয়া হল –                                                                         

**  সুইডেনের সেনজেন ভিসা ফর্ম

    পাসপোর্ট ও ভ্রমণের অন্যান্য কাগজপত্র এবং তার ফটোকপি
    ভ্রমণকারীর পরিবারের বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। এজন্য ‘পরিবার সম্পর্কীয় বিবরণ ফর্ম’ (Family Appendix for Applicants) সঠিক ভাবে পূরণ করতে হবে।
    আবেদনকারীর ছবি:

  - সদ্য তোলা ২ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি (৩৫ মি.মি. x ৪৫ মি.মি.)
  - ছবি অবশ্যই রঙ্গিন হতে হবে
  - ছবিতে আবেদনকারীর সম্পূর্ণ মুখ স্পষ্ট বোঝা যেতে হবে
  - মাথায় কোন প্রকার টুপি অথবা মাথায় বাঁধার ফিতা অথবা পাগড়ি অথবা কাপড় থাকা যাবেনা। শুধু মাত্র ধর্মীয় ক্ষেত্রে রাখা যেতে পারে কিন্তু সম্পূর্ণ মুখ স্পষ্ট বোঝা যেতে হবে।

    সুইডেনে বেড়াতে যাওয়ার আমন্ত্রণপত্র। কোন তারিখে বেড়াতে যেতে চান এবং কোন তারিখে সুইডেন থেকে ফিরবেন তা ‘আমন্ত্রণ ও প্রশ্নাবলী’ (Invitation and Questionnaire) ফর্মে সঠিক ভাবে উল্লেখ করতে হবে
    ভ্রমণকারীর পরিবারের বিস্তারিত তথ্য দিতে হবে। এজন্য ‘পরিবার সম্পর্কীয় বিবরণ ফর্ম’ (Family Appendix for Applicants) সঠিক ভাবে পূরণ করতে হবে।
    ট্র্যাভেল ইন্সুরেন্স থাকতে হবে, যা জরুরী ডাক্তারি সেবা, অ্যাম্বুলেন্স সেবা সহ অন্যান্য সেবার খরচ বহন করতে পারবে।  ট্র্যাভেল ইন্সুরেন্স কমপক্ষে ৩০০০০ ইউরো (২৫,১৭,৫৬৫ টাকা) এর হতে হবে। ট্র্যাভেল ইন্সুরেন্সের পরিমাণ সময় সাপেক্ষে পরিবর্তনশীল। আবেদনের সময় সুইডেন দূতাবাস থেকে জেনে নিতে পারেন। 
    সুইডেনে যাওয়ার ফ্লাইট বুকিং ডকুমেন্ট
    আবেদনকারী যে আত্মীয় বা বন্ধুর সাথে দেখা করতে যাবেন, সেই আত্মীয় বা বন্ধু যদি সুইডেনে বসবাসরত হন তবে তার সুইডেনে বসবাসের প্রমাণপত্র যেমন- স্থানীয় আয়কর অফিস (Local Tax Office) অথবা সুইডিশ ন্যাশনাল ট্যাক্স বোর্ড (Swedish National Tax Board) এর ওয়েবসাইট থেকে প্রমাণপত্র সংগ্রহ করে আবেদনকারীর ভিসা আবেদনপত্রের সাথে জমা দিতে হবে
    আবেদনকারী কি কাজ করেন তার প্রমাণপত্র। যেমন – আবেদনকারী চাকরি করেন নাকি পড়াশুনা। চাকরি করলে চাকরির প্রমাণপত্র, বেতনের পরিমাণ, ব্যাংক বই এর কপি আবেদনপত্রের সাথে জমা দিতে হবে
    ভ্রমণ করার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ আছে কিনা তার প্রমাণপত্র (ব্যাংক স্টেটমেন্ট)

আত্মীয় ও বন্ধুদের সাথে দেখা করার ভিসা ফী: ভিসার জন্য আবেদন প্রার্থী     ভিসা ফী
সেনজেন ভিসা     ৬৫০০ টাকা
দীর্ঘ সময়ের জাতীয় ভিসা (‘ডি’ টাইপ ভিসা)     ৬৫০০ টাকা
৬-১২ বছরের শিশু     ৩৮০০ টাকা
০-৬ বছরের শিশু (৬ বছরের চেয়ে কম বয়স)     ফ্রী

* ভিসার ফী সময় সাপেক্ষে পরিবর্তন হতে পারে
* ভিসার ফী অফেরত যোগ্য

 সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০১৫

সবুজ সুইডেনে

যাত্রার আগে ভেবেছিলাম, ও, সুইডেন, মানে ইউরোপ? তাহলে তো ছয়-সাত ঘণ্টার বিমান-ভ্রমণ। কিন্তু ই-টিকিটের দিকে তাকিয়ে চক্ষু চড়কগাছ! ঢাকা থেকে কাতারের রাজধানী দোহা পাঁচ ঘণ্টা; দুই ঘণ্টা দোহা বিমানবন্দরে ট্রানজিট যাত্রী হিসেবে বসে থাকা, তারপর আবার ছয় ঘণ্টার বিমান-ভ্রমণ আমাকে সুইডেনের আরলান্ডা বিমানবন্দরে পৌঁছে দেবে। আর যাত্রার সময়টায় ঘড়ি যে বাঁদরামি করবে, তা-ও নিশ্চিত হলাম, অর্থাৎ দোহায় গেলেই বাংলাদেশ সময় থেকে বিয়োগ হবে দুই ঘণ্টা, স্টকহোমে সেটা গিয়ে দাঁড়াবে চার ঘণ্টায়। ঢাকায় যখন সকাল ১০টা, স্টকহোমে তখন ভোর ছয়টা।
সুইডিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে আট দেশ থেকে আটজন সাংবাদিক স্টকহোমে এসেছেন পরিবেশসচেতনতা নিয়ে হাতে-কলমে কিছু শিখতে। তালিকা দেখেই বুঝেছি তুরস্ককে ইউরেশিয়ার দেশ ধরে নিলে এশিয়া থেকে শুধু আমিই। বাকিরা কানাডা, হাঙ্গেরি, লাতভিয়া, পোল্যান্ড, গ্রিস আর মেক্সিকোর অধিবাসী।
ঢাকা থেকে দোহারপথে বাঙালি যাত্রীদেরই আধিক্য, কিন্তু দোহা থেকে স্টকহোমের বেশির ভাগ যাত্রীই ইউরোপীয়। কাতার এয়ারওয়েজের সুপরিসর এয়ারবাসে তিনটি সারিতে আটটি করে আসন। দুই, চার, দুই—এই হলো আসনবিন্যাস। যাওয়া-আসার চার ভ্রমণেই আমি জানালা থেকে এক আসন ডানে।

২.
কীভাবে কোথায় যেতে হবে, তার দিক-নির্দেশনা দেওয়াই ছিল। আরলান্ডা বিমানবন্দরে নেমে ইমিগ্রেশন অফিসারের সামনে যেতেই শুনি, পাশের অফিসার একজন যাত্রীকে প্রশ্ন করছেন রুশ ভাষায়। অবাক হলাম। আমার সামনের তরুণী অফিসারকে ইংরেজিতেই জিজ্ঞাসা করলাম, ‘এখানে রুশ ভাষায়ও কথা বলা হয় দেখছি! রুশে কথা বললে আমারও সুবিধা হয়।’
নিখুঁত রুশ উচ্চারণে তরুণী বললেন, ‘আমিও মস্কোতে পড়াশোনা করেছি।’
পরবর্তী কথোপকথন সহজ হয়ে গেল। পাসপোর্টে সিল পড়তে সময় লাগল না।
এখান থেকে ট্রেনে করে যেতে হবে স্টকহোম। মাত্র ২০ মিনিটের যাত্রা। কিছুক্ষণ পরপরই ট্রেন আছে। ভিড় নেই বললেই চলে। সুইডেনে নেমেই বিভিন্ন বিলবোর্ডে ‘গ্রিন’ শব্দটি বারবার চোখে পড়ছিল। পরিবেশ রক্ষার জন্য কী কী করছে ওরা, তার যেন একটা প্রদর্শনীই চলছে গোটা স্টকহোমে।
হোটেল রেইজেন পর্যন্ত যে সবুজ ট্যাক্সিতে (সবুজ মানে হলো প্রাকৃতিক গ্যাস বা ইথানলে যে গাড়ি চলে) আমার যাত্রা, এটার চালক একজন ইরাকি। এখন যদিও সুইডেনের নাগরিক। আমার চামড়ার রং দেখে আলাপ জমালেন। জানিয়ে দিলেন, নিজ দেশে অস্থিরতা থাকায় ৩৫ বছর ধরে এ দেশে থাকছেন। দেশের অবস্থা ভালো হলে আর এখানে থাকবেন না।
‘এই দেশ ভালো লাগে না?’
‘দেশটা ভালো। কিন্তু এখানে বয়স্কদের ভুলে যায় তরুণেরা। বয়স্কদের কষ্ট দেখে আমার সহ্য হয় না।’ তারপর বিড়বিড় করে বলেন, ‘আমিও তো বৃদ্ধ হব? নিজের দেশে যে সম্মান পাওয়া যাবে, সেটা এখানে পাওয়া যাবে না।’
হোটেল রেইজেনে একটি খাম, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ইয়ান রেখে গেছেন। সঙ্গে একটি চিরকুট, প্রিয় জাহীদ, কাল সকাল আটটায় হোটেল লবিতে দেখা হবে। শুভ হোক সুইডেন-ভ্রমণ।

৩.
খেতে হবে কিছু। পকেটে সুইডিশ ক্রোনার নেই। ডলার ভাঙাতে হবে। হোটেলের অভ্যর্থনাকারী মেয়েটাই হাতে ধরিয়ে দিলেন একটি ম্যাপ আর বুঝিয়ে দিলেন, কোথায় গেলে মিলবে ক্রোনারের সন্ধান।

৪.
রাস্তাগুলো দেখলে মন ভরে যায়। ট্রাফিক ব্যবস্থায় কোনো খুঁত নেই। লাল বাতি জ্বললেই থেমে যাচ্ছে গাড়ি। পথচারীরা নির্বিঘ্নে রাস্তা পার হচ্ছেন। অসংখ্য সাইকেল চলছে একেবারে ডানদিকের লেইন ঘেঁষে। হাঁটছেও অসংখ্য মানুষ। কিছু যদি ফেলতে হয়, তবে ফেলছে নির্দিষ্ট স্থানে। রাস্তায় কোনো ময়লা ফেলতে দেখিনি কাউকে। হোটেলের সামনেই নদী। জেটি থেকে ছোট-বড় জাহাজ যাচ্ছে গন্তব্যে। এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টার জন্য ক্রুইজও আছে এক ঘণ্টা পর পর।
আমরা আট সাংবাদিক আর সুইডিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ইয়ান সফরের পাঁচ দিন একসঙ্গে থাকতে থাকতে বড় আপন হয়ে গেলাম। স্টকহোম আর মালমো শহরে কাটানো এ সময়টাতে বর্জ্যব্যবস্থাপনা, যোগাযোগব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব বাড়ি, রেস্তোরাঁ ইত্যাদি দেখলাম। ২০৩০ ও ২০৫০ সাল দুটিকে লক্ষ্য হিসেবে নিয়ে পরিবেশ বাঁচানোর আন্দোলনে কীভাবে সংযুক্ত হচ্ছে সুইডেন, তা জানাল।
মালমোতে একটা ঘটনার কথা মনে করে এখনো হাসি পায়। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার জন্য আরও কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, সেটা বলছিলেন মালমো নগর উন্নয়ন বোর্ডের রুসলান নিলসন। পোল্যান্ডের সিজারো রুশ ভাষায় বললেন, ‘কারও টাকা থাকলে কীভাবে খরচ করবে, তা ভেবে পায় না। আমাদের দেশের মতো দেশ হলে বুঝত, টাকা খরচ করার কত জায়গা আছে।’
নিলসন কথা বলতে বলতেই বললেন, ‘আমি রুশ ভাষা বুঝি!’
সিজারোর মুখ চুন।
যে দোকানগুলোয় যাওয়ার সুযোগ ঘটেছিল, তাতে পরিবেশবান্ধব পণ্য ও খাদ্যের সমাহার দেখা গেল। সুইডিশ নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে দেখেছি, তাঁরা আগ্রহ নিয়েই সহযোগিতা করেন।

৫.
মালমো শহরের পাশেই বাল্টিক সাগর। সেই সাগরের ওপরে সেতু। মালমো থেকে প্রতি ২০ মিনিট পর পর ট্রেন যায় সাগর পেরিয়ে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে। পৌঁছুতে লাগে ঘড়ি ধরে ২০ মিনিট। আমরা সবাই সাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে একটু কি অন্যরকম হয়ে যাই? আমরা কি যে যার দেশের সমুদ্রের কথা মনে করি? মনে করি, সাগরের মতো উদার হতে পারলে পরিবেশ নষ্টকারীদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যেত?

জাহীদ রেজা নূর | তারিখ: ২৭-০৬-২০১২

গন্তব্য সুইডেন

ফেব্রুয়ারির কোন একদিন কীল থেকে আমার বরের এক কলিগ ফোন করে জানালো শিপে করে সুইডেন যাওয়ার এক অফার আছে। আমরা যেতে আগ্রহী নাকি ? শুনে আমাদের গিসেন ইউনিভার্সিটির অনেকেই লাফ দিয়ে রাজী হয়ে গেলো। শুরু হয়ে গেলো তোড়জোড় । কিভাবে বুকিং দেওয়া হবে? কতজন যাবে? নেটে সব ঘেঁটে বুকিং দেওয়া হোল প্রায় এক মাস আগে। আমরা গিসেন থেকে বাংলাদেশী, নেপালি, ইন্দোনেশিয়ান এবং ইথিওপিয়ান মিলে ১৭ জনের এক দল তৈরি হলাম। কীল থেকে আরও চারজন বাংলাদেশী , একজন ইরানী ও একজন কাজাখিস্তানি আমাদের দলে যোগ দিয়েছিলো। গত ৩০ শে মার্চ ছিল সেই কাঙ্ক্ষিত দিন। ঠিক করা হয়েছিলো আমরা গিসেন থেকে ট্রেনে কীল পৌছাবো । সেখান থেকে আমাদের সমুদ্র যাত্রা শুরু হবে সুইডেনের উদ্দেশ্যে । সেই মোতাবেক ৩০ মার্চ ভোর সাড়ে পাঁচটায় আমাদের ভ্রমণ শুরু হোল। আমরা বাসে করে ট্রেন স্টেশনে পৌছালাম । সোয়া ছয়টায় আমাদের ট্রেন ছাড়ল। বলে রাখা ভালো আমরা কীল পর্যন্ত যেতে মোট চারবার ট্রেন বদল করেছিলাম । প্রথমে যদিও শুনে খুব বিরক্তি লেগেছিল কিন্তু যাত্রা শুরু করে মনে হয়েছে এই সিদ্ধান্তই ঠিক ছিল। কেননা বাচ্চারা একটানা বেশীক্ষণ ট্রেনে থাকতে চাচ্ছিল না । কারণ আমাদের আট ঘণ্টার ট্রেন জার্নি ছিল। আর তাই এই ট্রেন বদলের মাধ্যমে তারা কিছুক্ষণ বাইরে আসতে পেরে বেশ খুশি ছিল। 

Giessen স্টেশন থেকে প্রথম ট্রেনে এক ঘণ্টার জার্নি শেষে আমরা kassel নামক স্টেশনে পৌছালাম । সেখান থেকে পরবর্তী ট্রেনে উঠে আরও এক ঘণ্টার জার্নি করলাম। যেহেতু এক ট্রেন থেকে আরেক ট্রেনে উঠার কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রেন ছেড়ে দিচ্ছিল তাই স্টেশনগুলো দেখার বা ছবি তোলার খুব একটা সুযোগ ছিল না । তবুও দুই একটা স্টেশনে চেষ্টা করেছিলাম ছবি তুলতে। আমরা দুই বাংলাদেশী পরিবারে বাচ্চা নিয়ে মোট সাতজনের দল খুব আরামেই ট্রেন জার্নি করেছিলাম। ছুটির দিন থাকায় যাত্রী তেমন না থাকায় আমরা বগীর বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসতে পেরেছিলাম । জানালা দিয়ে মনোরম সব দৃশ্য দেখতে দেখতে গল্প হাসিতে দারুণ কেটেছিল সময়। আমার মেয়েটা অসুস্থ থাকায় অবশ্য ওকে নিয়ে একটু কষ্ট হয়েছিলো। ২য় ট্রেনে এক ঘণ্টার জার্নি শেষে আমরা Göttingen স্টেশনে পৌছালাম । সেখান থেকে আরও সোয়া এক ঘণ্টার জার্নি শেষে Uelzen স্টেশনে পোঁছালাম এই স্টেশনে অল্প কিছু সময় পেয়েছিলাম বাইরে দাড়িয়ে থাকার । তাই কিছু ছবি তোলার সুযোগ হয়েছিলো। স্টেশনটি দেখতে অনেক সুন্দর ছিল। এখান থেকে আমাদের সবচেয়ে বেশি সময়ের ট্রেন জার্নি শুরু হোল।
আড়াই ঘণ্টার জার্নি শেষে আমরা ইউরোপের ২য় ব্যস্ত ট্রেন স্টেশন এবং জার্মানির সবচেয়ে ব্যস্ততম স্টেশন Hamburg এসে পৌছালাম । এত বড় স্টেশন এত মানুষের ভিড় , এত প্লাটফর্ম দেখে দিশেহারা অবস্থা হয়েছিলো। বেশ দৌড়ের উপর থাকতে হয়েছিলো পরবর্তী ট্রেন ধরার জন্য।
পরবরতি ট্রেনে উঠে আরও এক ঘণ্টার জার্নি শেষে আমরা বন্দর নগরী কীল এসে পৌছালাম ।
কীল স্টেশন থেকে বের হয়ে অল্প একটু হাঁটতেই আমরা নির্দিষ্ট জাহাজের ডকে পৌঁছে গেলাম । মনের মধ্যে অজানা এক উত্তেজনা টগবগ করছিলো জীবনের প্রথম অনেকটা সময়ের জন্য জাহাজে সমুদ্র ভ্রমণের কথা মনে করে । আমরা যে জাহাজে করে সুইডেন যাওয়ার জন্য ঠিক করেছিলাম সেই জাহাজের নাম Stena line. এটি মূলত মালবাহী এবং যাত্রীবাহী জাহাজ। Kiel থেকে ছেড়ে গিয়ে সুইডেনের Göteborg নামক বন্দর নগরীতে যায়।এটি north sea হয়ে Baltic sea এর উপর দিয়ে যায়। এছাড়াও পৃথিবীর আরও বিভিন্ন দেশে তাদের এমন সার্ভিস দিয়ে থাকে। আমরা সব রকম অফিসিয়াল চেকিং শেষ করে সন্ধ্যে ৭ টার দিকে জাহাজে উঠে পড়লাম । Stena line এর ক্রুদের আন্তরিক অভ্যর্থনার মাঝ দিয়ে জাহাজে প্রবেশ করলাম। আমাদের প্রত্যকের নামে যে কার্ড দেওয়া হয়েছিলো তাই ছিল আমাদের কেবিনের চাবি। নতুন এই বিষয়টি আমাকে বেশ মজা দিল।তো আমরা রুমে প্রবেশ আধা ঘণ্টার মধ্যে ফ্রেশ হয়ে জাহাজের ছাদে চলে গেলাম। জাহাজ ততক্ষণে ছেড়ে দিয়েছে । জাহাজের ছাদে তুষার পড়ে বেশ ভেজা আর পিচ্ছিল ছিল। আর ছিল প্রচণ্ড বাতাস আর ঠাণ্ডা । এর মাঝেই মহা উৎসাহে অবাক হয়ে সব দেখতে লাগলাম আর ছবি তুলতে থাকলাম। ছেড়ে আসা সন্ধ্যার আলোকিত কীল শহরের দৃশ্য দারুণ লাগছিলো । প্রায় ঘণ্টা খানেক থেকে বাতাস, তুষার আর ঠাণ্ডার জন্য জাহাজের ভিতর ঢুকে গেলাম। 


এবার জাহাজটি ঘুরে দেখার চেষ্টা করলাম। জাহাজের ভিতর এতটাই জাঁকজমক মনে হচ্ছিলো কোন দামী হোটেলে আছি। আসলে এর আগে হয়তো এমন কোন জাহজে না উঠায় এরকম মনে হয়েছে । জাহাজটি ১১ তলা বিশিষ্ট । একসাথে ৩০০ গাড়ি এবং ১৩০০ জন যাত্রী ধারণ করতে সক্ষম। জাহজের আট তলায় অভ্যর্থনা লাউঞ্জ। খুব ঝলমলে সেই অংশটুকু ।আমাদের কেবিন ছিল আট তলায়। ছয় তলা পর্যন্ত এবং সাত তলার কিছু অংশ গাড়ির জন্য বরাদ্দ। এছাড়া সাত তলায় রেস্টুরেন্ট , শপিং মল আছে। আট তলায় বার, বাচ্চাদের খেলার জায়গা, লাউঞ্জ, gamble খেলার ব্যবস্থা এবং যাত্রীদের কেবিন । নয়, দশ এবং এগারো তলার কিছু অংশেও কেবিন ।ছাদে হেলিকপ্টার প্যাড , সুইমিং পুল এবং বারবিকিউ করার ব্যবস্থা। ছাদে একটা অংশ উন্মুক্ত বার হিসেবে আলাদা করা আছে। এছাড়া ছাদে যাত্রীদের বসার জন্য বেঞ্চ দেওয়া আছে। বাচ্চাদের বিনোদন দেওয়ার জন্য একটা বড় পাপেট ও দেখলাম। আমরা বাংলাদেশী তিন পরিবার পাশাপাশি চারটা রুম পাওয়ায় ঐ অংশটুকু আমাদের বাসা হয়ে গেলো। রাতের খাবার শেষ করে বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে আমরা তিন ভাবী মিলে সাড়ে ১১ টার দিকে আবার ছাদে গেলাম। তখন লোকজন না থাকায় খুব নীরব ছিল । আমরা ভেবেছিলাম এতক্ষণে জাহাজ সমুদ্রে প্রবেশ করেছে । কিন্তু চারদিকে তাকিয়ে দেখি এখনো দূরে পাড়ের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে । অন্ধকারের মাঝে পাড়ে অবস্থিত বাড়িগুলোর আলো , নদীতে অন্য জাহাজের আলো , দূরে একটি বড় ব্রিজের লাইটিং দেখতে অসাধারণ লাগছিলো। কিন্তু ক্যামেরা নিয়ে না উঠায় তা ফ্রেমে বন্দী না করার আফসোস রয়ে গেলো। 

জাহাজে উঠার পর কোন রকম ভয় না কাজ করলেও রাতে ঘুমাতে গিয়ে হঠাৎ মনের মধ্যে কি এক ভয় ঢুকে গেলো। আর তাই ঘুমটা খুব একটা ভালো হয় নি । মেয়ের শরীর ভালো না থাকায় সকালে তাড়াতাড়ি উঠে সূর্যোদয় দেখার ইচ্ছে থাকলেও রুম থেকে বের হতে দেরি হয়ে গেলো। সাতটার দিকে ছাদে গিয়ে দেখি চারদিকে শুধু পানি আর পানি । বুঝলাম আমরা সমুদ্রের মাঝে আছি। সকালের সূর্য তার আলো বিলিয়ে যাচ্ছে উদার ভাবে। এ এক অভাবনীয় দৃশ্য। বলে বোঝাতে পারবো না। একা একা বেশ অনেকক্ষণ ছাদে দাঁড়িয়ে থেকে অসম্ভব ভালো লাগছিলো। এর মাঝে কিছু ছবিও তুলে নিলাম।কিন্তু সেই ঠাণ্ডা আর প্রচণ্ড বাতাস বেশিক্ষণ সইতে না পেরে নীচে চলে গেলাম। গিয়ে বরকে পাঠালাম দেখতে । 

জাহাজ সোয়া দশটার দিকে প্রায় ১৫ ঘণ্টার জার্নি শেষে সুইডেনের Göteborg এসে পৌঁছাল। আমরা রুমে আমাদের লাগেজ রেখে কিছু খাবার নিয়ে সারাদিনের জন্য জাহাজ থেকে নেমে পড়লাম । তারপর শুরু হোল আমাদের নতুন একটি দেশের নতুন একটা শহর দেখার মিশন। 
আমরা যখন জাহাজ থেকে নেমে এলাম তখন অনেককেই দেখলাম ট্রলি ভর্তি করে পানীয় নিয়ে বের হয়ে আসতে । আমাদের দলে কীলের যে ভাবী ছিলেন তিনি বললেন সুইডেনে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণের পর আর মদ কেনা যায় না । কিন্তু জার্মানে এই বাঁধা নেই এবং সুইডেনের চেয়ে দাম কম বলে গটেবরগ এর অনেকেই জাহাজে করে কীল থেকে কিনে নিয়ে আসে। শুরুতেই গটেবরগ বাসীর একটা তথ্য পেলাম। দিনটি ছিল চমৎকার রোদ্রজ্জল । ঘুরতে এসে এমন আবহাওয়া না পেলে নতুন শহর দেখতে কিছুটা হলেও খারাপ লাগতো। কারণ শীতের দেশে যতক্ষণ রোদ থাকে ততক্ষণ বেশ আরাম । সূর্য আড়াল হলেই ঝপ করে আবার ঠাণ্ডা জেঁকে ধরে। জাহাজে থাকতেই কোথায় যাওয়া হবে, কতক্ষণ থাকা যাবে তা ঠিক করে নিয়েছিলো । কারণ আমরা সকাল সাড়ে ১০ টা থেকে বিকাল ৬ টা পর্যন্ত শহর দেখার সুযোগ পাবো ।

Gothenburg , জনসংখ্যার দিক দিয়ে সুইডেনের ২য় বৃহত্তম নগরী ।এর আয়তন ৪৫০ বর্গ কি মি। এর জনসংখ্যা প্রায় ৫২০,৩৭৪( ৩১ ডিসেম্বর ২০১১) ।এটি একটি বন্দর নগরী ।দুটো বিমানবন্দর আছে।এই শহরে দুটো ইউনিভার্সিটি আছে। আছে অনেক দর্শনীয় জায়গা। 
সব জায়গা তো আর দেখা সম্ভব নয় । তাই আমরা এই অল্প সময়ের মধ্যে কয়েকটা জায়গা দেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। জায়গাগুলি দেখার জন্য আমরা ট্রামে উঠার সিদ্ধান্ত নিলাম।আমাদের সাথে গিসেন থেকে আসা নেপালিরা এবং মালয়েশিয়ার ছেলেটিও ছিল।ট্রামে উঠতে গিয়ে যে চিন্তা মাথায় এলো আমাদের কাছে সুইডিশ ক্রনার ছিলনা বিধায় তারা আমাদের ট্রামে টিকেট কাটতে দিবে কিনা ইউরোতে সেই নিয়ে। ট্রামে উঠে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জানালেন ইন্টারন্যাশনাল কোন ক্রেডিট কার্ড থাকলে চলবে। আমাদের গিসেনে টিকেট কাটার সিস্টেম ড্রাইভারের ওখানে থাকলেও Gothenburg এ ট্রামের দরজার কাছে মেশিন দেওয়া।সেখানেই টিকেট কাটতে হয় এবং ট্রামে উঠে সেখানেই টিকেট চেক করিয়ে নিতে হয় । না হয় জরিমানা কাটা হয় । আমি আমার জীবনে প্রথম ট্রামে চড়েছি । ট্রামে ডে টিকেট কাটা যায় না বলে পরের স্টপেজে নেমে রাস্তার পাশে ছোট একটি দোকান থেকে সবার জন্য সারাদিনের টিকেট কেটে নেয় হোল। 

এর পরের ট্রামে উঠে আমরা প্রথম বোটানিক্যাল গার্ডেনে গেলাম।এটি Carl Skottsbergs Gata এ অবস্থিত। ওরা বলে Botaniska tradgarden. এটি সুইডেনের বৃহত্তম বোটানিক্যাল গার্ডেন ।এর পাশেই Gothneburg university র বিল্ডিং অবস্থিত। গার্ডেনটির মোট আয়তন ১৭৫ হেক্টর এবং এতে প্রায় ১৪০০ ভিন্ন প্রজাতির গাছ, অর্কিড আছে। খুব সুন্দর একটি জায়গা। কোথাও উচু পাহাড় আবার কোথাও নিচু ঢাল গার্ডেনের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছিল। শীতে ঘাস মরে হলুদ হয়েছিলো এবং গাছে পাতা না থাকায় পুরো সৌন্দর্য মিস করেছি । আমরা প্রায় ঘণ্টা দুয়েক সেখানে ছিলাম । 

তারপর সেখান থেকে আমরা ট্রামে করে চলে এলাম একটা সাইন্স মিউজিয়ামের কাছে। যার নাম Universeum. এটি Södra vägen এ অবস্থিত।এটি একটি পাবলিক বিজ্ঞান কেন্দ্র যা ২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । যেহেতু হাতে সময় কম ছিল তাই ভিতরে আর যাওয়া হয় নি।এর বাহিরে বিশাল ডাইনোসর দেখে বাচ্চারা বেশ খুশি হয়েছিলো। আবার এর পাশের পাহাড় থেকে একটি পাইপের মাধ্যমে পানি প্রবাহিত করে সেই পানির ধারা জমাট বরফের মত কিভাবে হয়ে আছে তা দেখে আমরাও বিস্মিত হলাম । 

সেখান থেকে ট্রামে উঠে আমরা শহরের মার্কেট এলাকায় চলে এলাম। তখন ঘড়ির কাঁটায় আড়াইটা বাজে। সবার খিধে লেগে গিয়েছিলো। একটা টার্কিশ দোকান খুজে আমরা দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। তারপর মার্কেট এর ভিতর ঘুরে দেখলাম। তারপর গেলাম Feshkekorka নামক ইনডোর ফিশ মার্কেট দেখতে।এটি Rosenlundsvägen এ অবস্থিত। কিন্তু দুর্ভাগ্য ছুটির দিন থাকায় বন্ধ ছিল। তাই কিছুটা সময় হাতে থাকায় আবার খুব বেশি হাতে না থাকায় আর কোন নতুন জায়গা দেখতে না গিয়ে ট্রামে করে কিছুক্ষণ শহর ঘোরার সিদ্ধান্ত নেওয়া হোল । ট্রামে করে প্রায় ঘণ্টা খানিকের বেশি ঘুরে অনেক দূর গেলাম। মনে হয় শহর ছাড়িয়ে গিয়েছিলাম। একটা জায়গায় ট্রাম লাইন পাহাড়ের ভিতর দিয়ে গিয়েছিলো। ট্রামে করে যাওয়ার সময় এক ঝলক স্টেডিয়ামের দেখা পেলাম। 

আমার এই শহর ঘুরে যেসব অনুভূতি হয়েছিলো তা সংক্ষেপে বলি। ট্রাম লাইন থাকায় কি না জানিনা শহরের রাস্তাগুলোর উপরে তারের ছড়াছড়ি ছিল। তার মাঝখানে মাঝখানে বাতি এবং আরও কি যেন ছিল যা আমার ভালো লাগেনি। কেমন জঞ্জাল মনে হয়েছিলো। এই শহরের একটা জিনিস আমার খুব চোখে লেগেছিল তা হোল রাস্তার পাশে বিল্ডিঙগুলো এমনভাবে তৈরি করা যেন দুই পাশে দেওয়াল উঠিয়ে রেখেছে । প্রায় সব বিল্ডিং একই উচ্চতার বলেই হয়তো এমন লাগছিলো। বিল্ডিংগুলো অনেক প্রাচীন বলে সেগুলোতে বিভিন্ন মূর্তি যুক্ত নকশা দেখেছিলাম। আরও একটা জিনিস খুব চোখে লেগেছিল তা হোল বেশিরভাগ ভবনের ছাদ লাল টালির যা অন্যরকম এক সৌন্দর্য এনে দিয়েছিলো। এবং এক লাইনের সব ভবন একই নকশার। সবগুলো ভবনকে একটা ভবন মনে হচ্ছিলো। কিছু আধুনিক নকশার বাড়িও দেখেছিলাম। শহরটিতে প্রচুর বড় বড় মূর্তি দেখেছি। এবং এই শহরটি পাহাড়ের উপর তৈরি। এই পাহাড়ের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হোল এটি পাথরের তৈরি। শহরে অনেক আফ্রিকান মুসলিম চোখে পড়েছিলো। এছাড়াও বেশ কিছু নাছোড় টাইপের ভিক্ষুক দেখলাম।আর একটা জিনিস ছিল এদের বেশির ভাগ জায়গায় wifi থাকায় সহজেই নেট ব্যবহার করা গিয়েছিলো। 

আমাদের জাহাজে পৌঁছাতে প্রায় সাড়ে ছয়টা বেজে গিয়েছিলো। ততক্ষণে সূর্য তার আলো একটু একটু করে কমিয়ে আনছিল। আমরা জাহাজে ঢুকে একটু ফ্রেশ হয়ে ছাদে চলে এলাম।ছাদ থেকে চারদিকের
চমৎকার কিছু ছবি তুলে সূর্যাস্তের অপেক্ষায় রইলাম। এদিকে প্রচণ্ড বাতাসের জন্য বেশিক্ষণ থাকা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল তাই কিছুক্ষণ ভিতরে থেকে গরম হয়ে আবার এসে অপেক্ষা করেত থাকলাম। অবশেষে সেই চমৎকার দৃশ্য দেখার সুযোগ হোল। আমার ক্যামেরার চারজ শেষ হয়ে যাওয়ায় মন মতো সেই দৃশ্য ধরে রাখতে পারিনি। এতসময় অপেক্ষার পর মনে হোল যেন টুপ করেই সূর্যটা ডুবে গেলো।আবার প্রায় ১৪ ঘণ্টার জার্নি শেষে পরদিন সকাল সাড়ে নয়টায় আমরা কীল এসে পৌঁছালাম । শেষ হোল আমাদের সমুদ্র ভ্রমণ এবং সুইডেন দেখা। আমরা সেদিন কীল দেখার সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই শহরে থেকে গেলাম।
আমরা সুইডেন ভ্রমণ শেষে কীলে আমার বরের সহকর্মী মহিউদ্দিন ভাইয়ের বাসায় বেড়ানোর প্রস্তাব পেয়ে থেকে গেলাম।জাহাজ থেকে নেমে তার বাসায় পৌঁছে আড়াই ঘণ্টার মত থেকে গোসল , নামাজ, খাওয়া দাওয়া করে আবার বেড়িয়ে পড়লাম নতুন কিছু দেখার জন্য। তার আগে কীল সম্পরকে একটু বলি। 
কীল, Schleswig-Holstein স্টেটের একটি বড় এবং জনবহুল শহর যা উত্তর জার্মানিতে অবস্থিত। এটি হামবুর্গ থেকে প্রায় ৯০ কি মি উত্তরে অবস্থিত। এর আয়তন ১১৮. ৬ বর্গ কি মি এবং জনসংখ্যা ২৪২,০৪১ ( ৩১ ডিসেম্বর ২০১১)জন। 
আমাদেরকে মহিউদ্দিন ভাই কীল শহর না ঘুরিয়ে শহর থেকে একটু দূরে নতুন এক জায়গায় নিয়ে গেলেন। যা কীল শহর থেকে ১৯ কিমি দূরে অবস্থিত। ছোট্ট সেই শহরটির নাম Laboe. এটি Plön জেলার একটি পৌরসভা এবং Baltic Sea এর উপকূলে অবস্থিত। 
তো আমরা বাসে এক ঘণ্টার জার্নি শেষে Laboe তে গিয়ে পৌঁছালাম। যাওয়ার পথে গ্রাম চোখে পড়লো। এই দেশে শহরের বাড়িগুলোর চেয়ে গ্রামের বাড়িগুলো মনে হয় বেশি সুন্দর। দেড় তলা দুই তলার বাড়ি সামনে কিছু জায়গা নিয়ে তৈরি হয়। দেখে মনে হয় ছবির মত । কিছু বাড়ির ছাদ ছন দিয়ে তৈরি দেখলাম । বাস থেকে নেমে কিছুদূর গিয়ে সুন্দর একটি বীচ দেখতে গেলাম।যদিও বীচটি কিছুটা কৃত্রিম ভাবে তৈরি। সেদিনের দিনটিও রোদে ঝলমলে ছিল । তাই প্রচুর লোকের সমাগম ছিল। বীচটিকে কেন্দ্র করে রাস্তার পাশে প্রচুর হোটেল, রেস্তোরা, ছোট খাবার দোকান এবং আইসক্রিমের দোকান গড়ে উঠেছে । রোদ উপভোগ করার জন্য দোকানগুলির বাইরেও বসার ব্যবস্থা ছিল ।চারদিকের চমৎকার প্রকৃতি দেখতে দেখতে বেশ অনেকটা পথ হেঁটে আমরা একটা সাবমেরিন দেখতে গেলাম। সেটা বীচের পাশেই। U 995 নামে সাবমেরিনটি দ্বিতীয় বিশ্বে জার্মানের পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করেছিলো । এটি ১৯৪৫ সালে নরওয়ে দখল করে নেয় এবং ১৯৪৮ সালে জার্মানিকে ফেরত দিয়ে দেয় । ১৯৭২ সালে মিউজিয়াম শিপ হিসেবে জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় Laboe তে । মাসুদ রানার বইতে অনেকবার সাবমেরিন নিয়ে পড়ায় এটির ভিতরে যাওয়ার জন্য আমি ও আমার বর এক বাক্যে রাজি হয়ে গেলাম । দুইজনে ৭ ইউরো দিয়ে টিকেট কেটে ভিতরে ঢুকলাম । আমি ঢুকে তো থ। এ তো লোহা লক্করের গুদাম। চারদিকে শুধু মেশিন আর মেশিন । কত টাইপের তা নিজের চোখে না দেখলে বুঝা যাবে না । আমার কল্পনার চেয়ে অনেক চাপা জায়গা । এর মধ্য দিয়ে সাবমেরিনের মানুষগুলো কিভাবে চলাচল করতো ভেবে আমি অবাক হলাম। এই সাবমেরিনটি চালাতে ৫০ জন ক্রু লাগতো। এত যন্ত্রপাতির মাঝেই রান্নার জায়গা , থাকার জায়গা , বাথরুম সবকিছুই ছিল । এত সংকীর্ণ জায়গার মধ্যে এতগুলো মানুষ কিভাবে পানির নীচে দিনের পর দিন থাকতো ভাবতে গিয়ে কেমন যেন লাগলো। তাই বেরিয়ে আসলাম । আমার বর অবশ্য খুব ধীরে সুস্থে দেখে তার অনেকদিনের কৌতূহল মেটাচ্ছিল । 
রাস্তার ওপাশে Laboe Naval Memorial মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এটি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নিহত সৈনিকদের সম্মানে তৈরি করা হয় । ১৯২৭ সালে শুরু হয়ে ১৯৩৬ সালে সম্পন্ন হয়।সেটা দেখার মত পর্যাপ্ত সময় আমাদের হাতে না থাকায় আমরা বাইরে থেকে কিছু ছবি তুলে নিলাম। এর পর আমরা হাঁটতে হাঁটতে পানির কাছে গেলাম। সেখানে বাচ্চারা বালুর মাঝে মজা করে খেলল । আমরাও কিছু ছবি তুলে ফেরার জন্য ঘুরলাম। যদিও ইচ্ছে ছিল ছোট শিপে করে কীলে যাওয়ার কিন্তু ছুটির দিন থাকায় ছয়টার মধ্যেই শিপ বন্ধ হয়ে গেলো। তাই আমরা আবার বাসে করে কীল চলে এলাম। সেদিন রাতে সেখানে থেকে পরদিন ট্রেনে করে গিসেন চলে এলাম। সবকিছু খুব সুন্দর ভাবে শেষ হলেও শেষ ট্রেন থেকে নামার সময় আমাদের ভ্রমণসঙ্গী হুমায়ূন ভাই তার পিঠের ব্যাগ ভুলে ট্রেনে ফেলে চলে আসলেন। সেই ব্যাগে ছিল বেশ কিছু ইউরো, দুইটা স্মার্ট ফোন ,ক্যামেরা, পাসপোর্ট, চাবি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজ। আমাদের সব আনন্দ মুহূর্তে পানসে হয়ে গেলো। আমার বরও ও তিনি আবার ট্রেন স্টেশনে গেলেন। ব্যাগে যে মোবাইল ছিল তাতে কল দিলে একজন জার্মানি রিসিভ করে বলল , সে ব্যাগটি পেয়েছে ।পরের দিন সকাল বেলা আসলে দিতে পারবে। তিনি পরদিন সকাল বেলা গিয়ে ব্যাগ নিয়ে আসলেন । বাসায় এসে দেখেন সব আছে শুধু ক্যামেরাটি নেই। বুঝা গেলো ভদ্রলোক নিজের পুরুস্কার নিজেই পছন্দ করে নিয়ে নিলেন । 
শেষ হোল আমার সুইডেন ভ্রমণ কাহিনী ।

September 11, 2014

সুইডেন: নিশীথ সূর্যের দেশ

ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সুইডেন এক আকর্ষণীয় স্থান হতে পারে। আপনি যদি প্রকৃতিপ্রেমিক হন বা স্কেন্ডিনেভীয় ইতিহাসে আগ্রহী হন তবে সুইডেনকে অবশ্যই আপনার ভ্রমণ তালিকায় রাখবেন। সুইডেন আয়তনের দিক দিয়ে বাংলাদেশের চেয়ে তিনগুণ বড় হলেও লোকসংখ্যা মাত্র পঁচানব্বই হাজার। সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম। স্টকহোমকে বলা (beauty on water). কথাটি কিন্তু অতিরঞ্জিত নয়। স্যাটেলাইট হতে তোলা ছবি দেখলে মনে হয় স্টকহোম জলের উপর ভাসছে, বাল্টিক সাগর হতে বড় কোন ঢেউ এসে বুঝি স্টকহোমকে ডুবিয়ে দেবে। কিন্তু আসলে তা নয়। ম্যালার দ্বীপের পাড়ে স্টকহোম অপূর্ব এক সুন্দর শহর। সুইডেন ভ্রমণ স্টকহোম দিয়েই শুরু করা যাক। আপনি যদি সরাসরি স্টকহোম আরলান্দা বিমান বন্দরে অবতরণ করেন তা’হলে আপনার কাস্টম চেকিং সময়সাপেক্ষ হতে পারে। আর যদি ভায়া লন্ডন কিম্বা ইউরোপীয় কোন দেশ হতে আরলান্দায় অবতরণ করেন তা’হলে কোন প্রকার চেকিং হবেনা। চেকিং লন্ডন কিম্বা ইউরোপীয় ট্রান্জিট দেশেই হয়ে যাবে। আরলান্দা বিমান বন্দর হতে বাস, ট্যাক্সি, লোকাল ট্রেন কিম্বা ‘আরলান্দা এক্সপ্রেস’ ট্রেন দিয়ে সরাসরি স্টকহোম এসে পৌছাতে পারেন। ট্যাক্সিতে ভাড়া ৪৫০, ট্রেনে ১০০ আর বাসে ৭৫ ক্রোণার লাগতে পারে, ক্রোণারকে ১০ দিয়ে গুন করলেই টাকার হিসেবটা পাওয়া যাবে।
স্টকহোম
ছোট বড় চৌদ্দটি দ্বীপ নিয়ে বৃহত্তর স্টকহোম। দ্বীপগুলো পরস্পর সেতু দিয়ে সংযুক্ত। স্টকহোম নাম করনের পশ্চাতে কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন ইতিহাস আছে। ১৩শ শতকে হেলজেন্সহোলম নামক জায়গায় স্টকহোম শহরের গোড়াপত্তন হয়। হেলজেন্সহোলম ছিল বর্তমান বৃহত্তর স্টকহোমের ছোট একটি দ্বীপ, বর্তমানে এই দ্বীপে জাতীয় সংসদ স্থাপিত। ব্যবসা বাণিজ্যের সুবিধের জন্য দুটি সেতুর মাঝে শহরটিকে সরিয়ে আনা হয় বলে শহরটির নাম হয় স্টকহোম। সুইডেনের পার্শবর্তী দেশ এস্টোনীয়া স্টকহোম থেকে প্রায় ৪০ কিমি দূরে সমৃদ্ধশালী জনপদ সিগটুনা আক্রমণ ও ধ্বংস করলে সিগটুনাবাসীরা তাঁদের মূল্যবান সম্পদ লেক ম্যালারেনে নিক্ষেপ করে নতুন দ্বীপে চলে আসে। ‘স্টক’ শব্দের অর্থ রক্ষিত স্থান আর ‘হোলম’ শব্দের অর্থ ‘দ্বীপ’। অর্থাৎ স্টকহোম সম্পদ রক্ষাকারী দ্বীপ। পর্যটক বা দর্শনপ্রাথীদের জন্য স্টকহোমের ‘গামলাস্তন’ বা পুরানো শহর দর্শনীয় স্থান। পর্যটকরা স্টকহোমে এসেই পুরানো শহরে চলে আসেন। পুরানো শহরের পাশেই গড়ে উঠেছে অধুনিক নতুন শহর। স্টকহোম সেন্ট্রাল স্টেশান হতে বের হয়েই আপনি ‘রানীর সড়ক’ বা ড্রতনিংগতান ধরে হাঁটতে হাঁটতে ছোট সেতু পার হয়ে সংসদ ভবনের মাঝের রাস্তা ধরে পুরানো শহরে চলে আসতে পারেন। ড্রতনিংগতানে গাড়ি-ঘোড়া চলার নিয়ম নেই। কাজেই আপনি ধীরে ধীরে হেঁটে সময় নিয়ে আসতে পারেন। এই সড়কের দু’ধারে রয়েছে বিভিন্ন দোকান এর মধ্যে বেশ কয়েকটি বিখ্যাত শপিং সেন্টার আর কালচারাল হাউজ। ড্রতনিংগতানের শেষ মাথায় ছোট সেতুটি পুরানো আর নতুন শহরের সংযোগস্থল। যদি আপনার মাছ ধরার শখ থেকে থাকে তবে সেতুর উপর দাঁড়িয়ে ছিপ দিয়ে ম্যালার লেক হতে মাছ ধরতে পারেন। ছিপ দিয়েই মাছ ধরতে হবে, জাল ফেলার নিয়ম নেই। মাছ ধরা সুইডিশদের বিরাট এক নেশা। এইতো দিন কয়েক আগে প্রবাসী আবিদ ভাই ভোর রাতে এই সেতুর উপর হতেই সাড়ে চৌদ্দ কিলো এক বিশাল লাক্স (সোলমন) মাছ ধরলেন। এতো বড় মাছ এর আগে খুব কমই ধরা পরেছে। সেতুর ওপারেই সংসদ ভবন। সংসদ ভবনের ভেতর দিয়েই পায়ে হাঁটা পথ। পথের শেষে রাজবাড়ি। রাজা কার্লগুস্তাব এই প্রসাদেই বাস করেন। রাজবাড়ির পাশ দিয়েই সরু পাথরের রাস্তাটি চলে গেছে পুরানো শহরে। পুরানো শহরে ঢোকার আগে রাজপ্রসাদটি ঘুরে ফিরে দেখতে ভুলবেন না। রাজপ্রাসাদে পাহারাদার থাকলেও আপনাকে কেউ বাঁধা দেবেনা বরং সাহায্য করবে। এক সময় প্রতিবেশী দেশ ডেনমার্কের বেশ আধিপত্য ছিল সুইডেনের উপর। ১৫২০ সালে ডেনিস রাজা দ্বিতীয় ক্রিশ্চিয়ানের রাজ্যাভিষেক উপলক্ষে স্টকহোমে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে রাজপ্রতিনিধি, আভিজাত সম্প্রদায়, বিশিষ্ট জনগণ ও নগরবাসীদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। দীর্ঘ তিনদিন উৎসব চলার পর অভিজাত সম্প্রদায় কথায় কথায় প্রচলিত ধর্মমতের বিরুদ্ধে উষ্মা প্রকাশ করেন। গীর্জার প্রধান ধর্মজাযক গুস্তাভ ট্রোল্লে তাদের অভিযুক্ত করলে আদালত দ্রুতই তাদের মৃত্যুদণ্ড দেয়। দণ্ডাদেশের পরদিন থেকে বর্তমান পুরানো শহরের বড়বাজারে (Stortorget) মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে থাকে এবং দুদিনেই অভিজাত সম্প্রদায়ের ১০০ জনের শিরোচ্ছেদ করা হয়। ইতিহাসে এই হত্যাকাণ্ড এক কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আছে। এই হত্যাকাণ্ড ব্যাপক আলোড়নের সৃষ্টি করে ও অনেক ঘটনার জন্ম দেয়। অবশেষে ১৫২৩ সালে গুস্তাভ ভসা স্টকহোম অবরোধ করে নিজেকে সুইডেনের প্রথম রাজা হিসেবে ঘোষণা দেন এবং রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। সুইডেনের বর্তমান রাজা সেই রাজবংশেরই বংশধর। স্টকহোম হত্যাকাণ্ডের ৩১৩ বছর পর ১৮৩৩ সালে স্টকহোমে জন্মগ্রহণ করেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলফ্রেড নবেল। নবেল তাঁর প্রভূত সম্পত্তির যে উইল করে যান, তার থেকে দেয়া হয় ‘নবেল পুরস্কার’। পৃথিবীতে সম্মানজনক নবেল পুরস্কারের বিকল্প নেই। স্টকহোম পুরানো নগরীর বড়বাজার চত্তরেই গড়ে উঠেছে ‘নবেল মিউজিয়ম’। নবেল বিজয়ীদের দুর্লভ নিদর্শন রয়েছে এই মিউজিয়মে, রবিঠাকুরও রয়েছেন এখানে। নবেল মিউজিয়মের পাশেই রাজপ্রাসাদ এবং আরো অনান্য পুরানো স্থাপনা। পুরানো শহরের রাস্তাগুলো সরু পাথর বিছানো। হাঁটার সময় পায়ের শব্দ হয় তবে হেঁটে আনন্দ আছে। হেঁটে হেঁটে ক্লান্ত হয়ে গেলে ‘শান্তি, প্রেম ও আইসক্রীম’ নামক দোকানটিতে বসে সদ্য তৈরী আইসক্রীম ও কফি পান করে মন ও দেহ দুটোকেই চাঙা করে তুলতে পারেন। দোকানটির নাম শুনে ভড়কে যাবেন না। সুইডিশে যে নামটি আছে তার বাংলা করলে ঐ নামই দাঁড়ায়। পুরানো শহরেই আছে ‘রয়েল কয়েন কেবিনেট’। এই যাদুঘরে বয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে পুরানো মুদ্রা, মুদ্রাটি যীশুর জন্মের ৬২৫ বছর পূর্বের আর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও ভারী মুদ্রা। মুদ্রাটি প্রায় ২০ কেজি ওজন বিশিষ্ট সুইডিশ তামা দিয়ে তৈরী এবং পৃথিবীর প্রথম ব্যাংক নোট। অনেকের হয়তো জানা নেই যে, ১৬৬১ সালে সুইডেন প্রথম ব্যাংক নোট প্রর্বতন করে। ‘গামলাস্তন’ বা পুরানো শহরে এলে এই তিনটি দেখতে ভুলবেন না।
হগাপার্ক
স্টকহোমের ভেতর ‘হগাপার্ক’ একটি বিশিষ্ট স্থান। এই পার্কের ভেতর এক বিশাল প্রাসাদে বাস করেন সুইডেনের জননন্দিতা রাজকুমারী ভিক্টোরিয়া। সবুজ গাছপালায় ঘেরা পার্কের পাশেই রয়েছে ‘প্রজাপতি হাউজ’। ‘হগাপার্ক’ নাম উল্লেখে একটি ঘটনা সামনে এল। সুইডিশ কিছু কিছু শব্দের বা স্থানের বানান এক রকম আর উচ্চারন অন্যরকম। দেশ ও ভাষা বিশেষে এটি হতে পারে, হতে পারে ব্যাকরণগত ভাবেও। বেশ কিছুদিন আগে বাংলাদেশের জনৈক পর্যটক সপ্তাহ খানেক স্টকহোমের আনাচে কানাচে ভ্রমণ করে দেশে ফিরেই ‘সুইডেন শান্তির দেশ’ নামে বিশাল এক ভ্রমণ কাহিনী লিখে ফেললেন। এক পর্যায়ে তিনি ‘হগার্পাক’ ও দেখে গিয়েছেন। পার্কের প্রবেশ দ্বারে লিখা Haga Parken. পর্যটক ও লেখক মহাশয় সুইডিশ উচ্চারণ সমস্যায় যাননি তবে ‘হগা’কে ‘হাগা’ বানিয়ে পাঠক পাঠিকাদের নিদারুণভাবে ভুল ম্যাসেজ দিয়েছেন- যা কোন লেখকের উচিৎ নয়। ঐ বইটিতে সুইডেন এবং সুইডেনের প্রবাসী বাঙালি সমাজ সম্পর্কে অনেক অমার্জনীয় ভুল তথ্য আছে। আশা করি আপনারা যারা সুইডেন ভ্রমণে আসবেন উচ্চারণগতভাবে অতটুকু অমার্জনীয় হবেন না। স্টকহোমের ভেতর আরো কিছু দর্শনীয় স্থান আছে যেমন সিটি হল, এখানে প্রতি বছর নবেল ডিনার হয়ে থাকে, দিউররর্গোডেন, ভসা মিউজিয়ম, স্কানসেন, মিল্লেসগোর্ড ইত্যাদি। প্রতিটি স্থানই আপনাকে প্রচুর আনন্দ দেবে। এছাড়া মালমো, উপসলা, গোথের্গ, লুলিও, কিরুনা শহর গুলো দেখে আনন্দ পাবেন।
দ্বীপমালা
চৌদ্দটি দ্বীপ নিয়ে বৃহত্তর স্টকহোম গঠিত হলেও ম্যালার হ্রদ হতে বাল্টিক সাগর পর্যন্ত দীর্ঘ জল পথে দ্বীপ রয়েছে আরো প্রায় বারশ। এই দ্বীপগুলোর কোন কোনটি একেবারেই নির্জন জনশূন্য। তবে প্রায় সবগুলো দ্বীপেই বোট নিয়ে যাওয়া যায়। এই বিশাল দ্বীপপুঞ্জ বা দ্বীপমালার শেষ দ্বীপটি ‘সান্দহাম’, বাংলা প্রতিশব্দ ‘বালির বন্দর’। বালি আর পাথর দিয়ে ঘেরা বলেই হয়তো দ্বীপটির নাম ‘সান্দহাম’ বা বালির বন্দর। স্টকহোম থেকে সান্দহামের দূরত্ব প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয় দ্রুতগামী বোটে। দ্বীপমালার দ্বীপগুলো পাড়ি দিয়ে জলের উপর তরঙ্গ তুলে যাত্রী নিয়ে বোট এসে ভীড়ে সবুজ বনবিথী আর পাইনসমৃদ্ধ সান্দহামে। আকাশ পথে হেলিকপ্টারেও আসা যায় তবে তা ব্যয় সাপেক্ষ। দ্বীপের পর দ্বীপ পেছনে ফেলে দীর্ঘ আড়াই ঘন্টা পর যখন বোট সান্দহামের কোলে এসে ভীড়ে তখন চোখ জুড়ে নামে মনমুগ্ধকর মুগ্ধতা। সান্দহামের পর আর কোন স্থলভূমি নেই, এখান থেকেই শুরু উত্তাল বাল্টিক সাগর। সুইডেন ভ্রমণে অবশ্যই দ্বীপ ভ্রমণ মিস করবেন না। স্টকহোম রাজবাড়ির সম্মুখে ছোট বড় বোটের সারি। এখান থেকেই বিভিন্ন দ্বীপে বোট যায়। বোটের ভেতর চা, কফি এমনকি মধ্যাহ্ন ভোজের ব্যবস্থা আছে তবে মূল্য আংশিক বেশি।
গোতল্যান্ড
মূলভূমি থেকে মাত্র নব্বই কিলোমিটার দূরে কাঁচস্বচ্ছ বালটিক সাগরে ভাসছে ৩১৪০ স্কয়্যার কিলোমিটারের মাঝারি দ্বীপ গোতল্যান্ড। দ্বীপটি নিয়ে প্রচীনকাল থেকেই কিংবদন্তী আছে। কোন এক জাদুকরের মন্ত্রে দ্বীপটি প্রতি সন্ধ্যায় ভেসে উঠতো আবার প্রভাতের সঙ্গে সঙ্গেই সাগরের গভীরে তলিয়ে যেত। নবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত সুইডিশ লেখিকা সেলমা লর্গালফের অমর চরিত্র নয় বছর বয়েসী বালক নীল্স হলর্গেসন বালুচরে একটি পয়সা খুঁজতে গিয়ে হঠাৎ করেই দ্বীপটির দেখা পেয়েছিল। সে শুধু স্বল্প সময়ের জন্য, তারপরই দ্বীপটি চোখের নিমেষে হারিয়ে গিয়েছিল। কিংবদন্তী আছে দ্বীপের প্রথম বাসিন্দার নাম সেলভার, যিনি দ্বীপে এসে প্রথম আগুন জ্বালিয়ে ছিলেন। আগুনের আলো পেয়ে দ্বীপটি আর অদৃশ্য হয়ে যায়নি। সেলভারের কবর এখনো আছে। দ্বীপের পূর্ব উপকুলে বোগে নামক জায়গায় প্রাচীন কবরটি পাথর দিয়ে সীমানাবদ্ধ করে সাজানো। কিন্তু কিংবদন্তী যাই বলুক জোয়ার ভাটার জন্যই দ্বীপটি সাগরে তলিয়ে যেতো আবার ভেসে উঠতো তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। গোতল্যান্ডে এসে হুবুর্গেনে যাননি এমন ভ্রমণপিয়াসী খুঁজে পাওয়া মুশকিল। হুবুর্গেন জায়গাটির সমুদ্রতীরে প্রকৃতির তৈরী মানুষের মুখটি এক আশ্চর্য। পাহারের মাথার বিশেষ অংশটি বিশেষ একটি কোন থেকে দেখলে মনে হয় যুগ যুগ ধরে সাগরের দিকে তাকিয়ে আছে মাথায় কালো টুপি পড়া একটি মুখ। এই পাহাড়ের চূড়ায় সমুদ্রের দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়ালে মনে হয় সাগরের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি। সে এক অব্যাক্ত অনুভূতি। গোতল্যান্ড দেখতে এসে দ্বীপটির মাথায় লেগে থাকা ছোট ভূখন্ডটিকে অবহেলা করা যায়না। সমুদ্রে ভেসে থাকা খন্ডটির নাম ‘ফোরও’। অর্থাৎ ভেড়ার দ্বীপ। দ্বীপে প্রচুর ভেড়া পাহাড়ের কোলে সবুজ উপত্যকায় চড়ে বেড়ায়। ভেড়ার সংখ্যাধিক্ষেই দ্বীপটির নাম ‘ফোরও’ বা ভেড়ার দ্বীপ। অবশ্য নাম নিয়ে মতান্তরও আছে, অনেকে বলেন ইংরেজি শব্দ ‘ফারওয়ে’ বা বহুদূর শব্দ থেকেই ‘ফোরও’ শব্দটি এসেছে। কিন্তু সুইডিশ ভাষায় ঋভ্রৎ (‘ফোর) শব্দের অর্থ ভেড়া আর ্র (ও) শব্দের অর্থ দ্বীপ। তাই মনে হয় নামকরণের দিক থেকে দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটিই ঠিক। দ্বীপটির মাঝে এমনও জায়গা আছে যেখানের গাছপালা মাটি থেকে মাত্র এক বিঘৎ উঁচু, ছোট ছোট গাছগুলো কাদাময়। দেখে মনে হয় দ্বীপের এই অংশটি এই মাত্র সমুদ্রতল থেকে উঠে এসেছে। ফোরও’র আয়তন মাত্র ১১১.৩৫ স্ক্যয়ার কিলোমিটার, জনসংখ্যা ছয় শতেরও কম। দ্বীপটিতে কোন ব্যাংক, পোস্টঅপিস, মেডিক্যাল সার্ভিস বা পুলিশ স্টেশান নেই। তবে দ্বীপটির রয়েছে নিজস্ব বাচনভঙ্গী- যা সুইডিশ ভাষায় প্রাচীনতম। ‘ফোরও’র সমুদ্র সৈকতে প্রাচীনকাল থেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পাথর আর পাথর। পাথরের উপর পা ফেলে ফেলে চলে যাওয়া যায় সমুদ্রের বেশ গভীরে। মৃদুমন্দ হাওয়ায় নীল স্বচ্ছ জলে পা ডুবিয়ে বসা যায় পাথরের উপর। হ্যাঁ, ডুবন্ত পায়ের পাতায় সাগরের ছোট ছোট মাছেরা আলতো চুমু দিয়ে যাবে বইকি! স্টকহোম হতে গোতল্যান্ডে মাত্র দুটি পথে যাওয়া যায়। হেলিকপ্টার অথবা বিমানে আর জাহাজে। হাতে সময় থাকলে দু’চার দিন গোতল্যান্ডে বেড়িয়ে আসতে পারেন। সময় চোখের নিমিশে ফুরিয়ে যাবে। গোতল্যাল্ডে বেশ কিছু ভাল হোটেল, বাড়ি ও ভান্দ্রাহেম ওয়েছে। ইন্টার নেটে আগে হতেই বুকিং দিয়ে রাখা ভাল। website : www.gothland.net
নিশিত সূর্যের দেশ
সুইডেন কে বলা হয় ‘দি ল্যান্ড অব দ্যা মিডনাইট সান’। মিডনাইট বা মধ্যরাতে যদি আপনি সূর্য দেখতে চান তবে অবশ্যই আপনাকে সুইডেনে আসতে হবে। জুন-জুলাই মাসে এমনিতেই স্টকহোমে রাত দশটা সাড়ে দশটার আগে সূর্য ডোবেনা। সূর্য ডোবার পর আঁধার নামতে না মানতেই পুব আকাশে সূর্য এসে উদয় হয়। আর নিশুতি রাতে যদি সূর্য দেখতে চান তবে আপনাকে যেতে হবে সুইডেনের উত্তরে । সে ক্ষেত্রে কিরুনা দর্শনীয় স্থান। স্টকহোম হতে কিরুনার দূরত্ব ১২৬০ কিলোমিটার। আপনি ট্রেন, বাস, বিমান অথবা প্রাইভেট কার নিয়েও যেতে পারেন। যদি লং ড্রাইভ পছন্দ করেন তবে এই পথের জুড়ি নেই। প্রশস্ত, পাহাড়ি কংক্রিটের হাইওয়ে। গাড়ি চালিয়ে আরাম ও আনন্দ দুটিই পাবেন। কিরুনায় অনেক হোটেল রেস্তেরা আছে, স্থানীয়রা অতিথিপরায়ণ, কিরুনাবাসীদের বলা no problem people কাজেই নির্ভাবনায় ঘুরে ফিরে দেখতে পারেন। কিরুনার প্রায় অর্ধেক জুড়ে আছে অভ্র খনি। বর্তমান শহরটি বলা যায় খনির উপর। তাই খনির প্রয়োজনে রেলওয়ে, হাইওয়ে ও প্রায় ৪৫০টি পরিবারকে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। ধীরে ধীরে পুরো শহরটিকেই সরিয়ে ফেলা হবে। বিশেষ অনুমতি নিয়ে খনিটিও দেখতে পারেন। উপরন্ত বিশাল পাহাড় শ্রেণী ‘কিবনেকায়সা’র উপর মধ্যরাতের সূর্য দেখার প্রোগ্রামতো আছেই। কিরুনায় মে মাসের ২৮-২৯ হতে জুন মাসের ১১-১২ পর্যন্ত মধ্যরাতের সূর্য দেখা যায়। কিরুনায় বেশ কয়েকটি ভাল হোটেল রয়েছে যেমন, হোটেল আর্ট্রিক ইডেন, ক্যাম্প রীপন, হোটেল উইন্টার প্লেস ইত্যাদি।
আইস হোটেল
শীতকালে কিরুনায় এলে দেখতে পারেন আইস হোটেল। এটি এক বিশাল শিল্পকর্ম। সুইডেন ও ফিনল্যান্ডের সীমান্ত দিয়ে বয়ে যাওয়া থর্ন নদী থেকে নিয়ে আসা বিরাট বিরাট বরফের চাঁই কেটে তৈরী হয় বরফের ইট। ঐ ইট দিয়ে তৈরী হয় বিশাল আইস হোটেল। প্রর্দশনী হলসহ হোটেল কক্ষগুলো তৈরী করতে প্রয়োজন হয় দশ হাজার টন আইস ও ত্রিশ হাজার টন স্নো। আইস হোটেলে রাত্রী যাপন করা যায় বইকি। ডবল রুমের ভাড়া জনপ্রতি প্রতিরাত চৌদ্দশ ক্রোণার, সিঙ্গেল রুম ছাব্বিশ শ ক্রোণার। আপনি ডিলুক্স রুমেও থাকতে পারেন, ডবল রুমের প্রতিরাতের জনপ্রতি ভাড়া তিনহাজার পাঁচশত ক্রোণার আর সিঙ্গেল রুম সাত হাজার ক্রোণার। এক ক্রোণারকে প্রায় দশ দিয়ে গুন করলেই টাকার মান পাওয়া যাবে। তবে অতিথিদের কিরুনা বিমানবন্দর থেকে হোটেল অবধি হোটেলের স্নোস্কুটারে যাতায়াতের ব্যবস্থা আছে, এরজন্য অবশ্য অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হবে। তবে হ্যাঁ, আপনি যদি এক বছর আগে থেকে হোটেল বুকিং না দিয়ে থাকেন তবে রুম পাওয়া কষ্টকর। জেমসবন্ডের ‘ডাই এনাদার ডে’ ফিল্মটা বোধ হয় অনেকেই দেখেছেন। আইস হোটেলে চিত্রগ্রহণ করা হয়েছিল ছবিটির। আপনি কি আইস হোটেলে একবারের জন্য হলেও আসবেন? খরচটা একটু বেশি হলেও এমন শিল্পকর্ম থেকে নিজেকে দূরে রাখা কি ঠিক?
হোটেল
স্টকহোমের প্রায় সব স্টেশান ও সাবওয়ের কাছাকাছি ছোট বড় মিলিয়ে অনেক হোটেল রেস্তোরা রয়েছে। আপনার বাজেটানুযায়ী বেছে নিতে পারেন। গ্রেন্ডহোটেল, রাইভাল হোটেল, কলম্বাস হোটেল, হোটেল হেলস্টেন, নরডিক সী হোটেল, ক্লেরিয়ন হোটেল সাইন, রেক্স হোটেল। সুইডেনের প্রায় সব হোটেলেই সুস্বাদু সুইডিশ খাবারই পরিবেশন করা হয়। তবে আপনি যদি দেশী মুখরোচক খাবার পছন্দ করেন তবে যে কোন বাঙালি হোটেলে আসতে পারেন। স্টকহোমে প্রায় ৬০ হতে ৭০ টি বাঙালি হোটেল রয়েছে। হোটেলের নামগুলো ভারতীয় হলেও মালিকানা ষোলআনা বাংলাদেশীয় বাঙালি। আগ্রা টান্দুরী, ইন্ডিয়ান গার্ডেন, ইন্ডিয়ান কিং, ইন্ডিয়া ইন, হেপী ইন্ডিয়া, লিল্লা ইন্ডিয়া, সম্রাট অব ইন্ডিয়া, ইন্দিরা, গান্ধী, নিরভানা, ইলোরা, বেঙ্গল। এছাড়া কিছু বাঙালি ক্যাটারিং সার্ভিস রয়েছে যারা সুস্বাদু গরম দেশীয় খাবার ঘরে পৌঁছে দিয়ে যায়। এদের কাছে নির্ভেজাল গরুর দুধের মিষ্টান্ন পাবেন, যে স্বাদ আপনি ঢাকার ভেজাল মিষ্টান্নে পাবেন না। সুইডেনের যে কোন হোটেলে লাঞ্চের চেয়ে ডিনারের মূল্য বেশী। বাঙ্গলি হোটেল কিম্বা ফুটকোর্টগুলোয় লাঞ্চ ৭০ হতে ৮০ ক্রোণারের মধ্যেই পাওয়া যাবে।
সময়
ভ্রমণে সময় বেশ তাৎপর্য বহন করে। বিভিন্ন দেশের ভৌগলিক অবস্থান ও আবহাওয়া অনুযায়ী ভ্রমণ সময়ের তারতম্য হতে পারে। সুইডেন ভ্রমণের উল্লেখযোগ্য সময় যে কোন বছরের জুন, জুলাই ও আগস্ট মাস। এই সময়ের আবহাওয়া আমাদের দেশের শীতকালের মত। দিনের দীর্ঘতা বেশী, সূর্য আকাশে থাকে অনেকক্ষণ। জুন-জুলাইয়ে দু’এক পশলা বৃষ্টি হতে পারে তবে তা কিছু নয়।
টিপসঃ
আপনি যদি সুইডেন তথা স্কেন্ডিনেভীয়া ভ্রমণের পরিকল্পনা নিয়ে থাকেন তবে অবশ্যই বেশ আগে হতেই প্রস্তুতি গ্রহণ করা ভালো। কারণ ভ্রমণ ভিসা পেতে সময় নিতে পারে। স্যানজেন ভিসা হলে ভাল। বৃটিশ, আমেরিকান কিম্বা স্কেন্ডিনেভীয়ন পাসপোর্ট ধারীদের ভিসার প্রয়োজন নেই। হোটেল বুকিং বা প্যাকেজ ট্যুর ইন্টারনেটের মাধ্যমেই করা যায়। কিম্বা সরাসরি টেলিফোন অথবা ই-মেইলের মাধ্যমেই সেরে নিতে পারেন। আর যাত্রার আগে অবশ্যই স্বাস্থ্যবীমা করাতে ভুলবেন না। কারণ স্কেন্ডিনেভীয়ায় ওষুধ, ডাক্তার, হাসপাতাল এই সবের খরচ বিদেশী নাগরিকদের জন্য আকাশচুম্বী। সুইডিশ তথ্যমতে আগামী বছর সুইডেন হবে পৃথিবীর তৃতীয় বৃহৎ ভ্রমণকারী দেশ, আপনিও এই বৃহত্বে অংশ নিতে পারেন।

লিয়াকত হোসেন, সুইডেন থেকে