NETHERLANDS লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
NETHERLANDS লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ১ আগস্ট, ২০১৫

আমস্টারডাম by মুহম্মদ জাফর ইকবাল


আমস্টারডাম শহরে প্রথম দিন ভোরবেলা বের হয়েছি, আমাদের সঙ্গে আমার ছেলে। ঝলমলে একটা শহরে হাসিখুশি সুখী মানুষের ভিড়, তার মাঝে হাঁটতে হাঁটতে আমার ছেলে আমাকে খুব মূল্যবান একটা তথ্য দিল। বলল, ‘যখন কফি খাবার ইচ্ছে করবে খবরদার কফি শপে ঢুকবে না।’ আমি এবং আমার স্ত্রী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেন? আমার ছেলে বলল, ‘কারণ কফি শপ হচ্ছে গাঁজা খাওয়ার দোকান। কফি খেতে হলে যাবে কাফে তে।’ আমার ছেলে তার পুরনো মডেলের বাবা-মাকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে কিনা সেটা সঙ্গে সঙ্গেই পরীক্ষা করে দেখার সুযোগ হলো। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় একটু পরে পরেই কফি শপ, সেই কফি শপে কেউ কফি খাচ্ছে না। ঢুলু ঢুলু চোখে গাঁজা টানছে। অতি বিচিত্র একটি দৃশ্য।
আমস্টারডামে অবিশ্য এটি মোটেও বিচিত্র নয়, এখানে গাঁজা খাওয়া আইনসম্মত ব্যাপার। যারাই দেশ-বিদেশ বিশেষ করে ইউরোপের খোঁজখবর রাখেন তারা সবাই জানেন হল্যান্ডে টিউলিপ ফুলের ছড়াছড়ি। ইউরোপের বড় বড় শিল্পীরা প্রায় সবাই উইন্ডমিলের সামনে বিশাল বিশাল টিউলিপ বাগানের ছবি এঁকেছেন। কাজেই আমস্টারডামে ফুলের বিশাল নার্সারি থাকবে এটি মোটেও অবাক হবার কিছু নয়, কিন্তু সেই অপূর্ব নার্সারির অসংখ্য ফুলের গাছ, গাছের চারা, ফুলের বীজের মাঝে বড় একটা জায়গা দখল করে আছে গাঁজার গাছ! সেখানে নানা ধরনের গাঁজার চারা বিক্রি হচ্ছে এবং মানুষজন আগ্রহ নিয়ে সেগুলো কিনছে!
আমস্টারডামের মতো এত সুন্দর একটা শহরের বর্ণনা দেয়ার সময় প্রথমেই গাঁজার গল্প দিয়ে শুরু করা মনে হয় ঠিক হলো না। কিন্তু কেউ যেন মনে না করে এই পুরো শহরটিকে অসংখ্য গাঁজাখোর মানুষ সারাক্ষণ ঢুলু ঢুলু লাল চোখে বিড়বিড় করে কথা বলতে ইতস্তত হাঁটাহাঁটি করছে। এটি খুবই আনন্দমুখর নিরাপদ একটি শহর। আমি এবং আমার স্ত্রী আমাদের ছেলেমেয়েদের নিয়ে সিনেমা দেখে গভীর রাতে নিশাচর শিল্পীর সুমধুর ট্রাম্পেট শুনতে শুনতে বাসায় ফিরে এসেছি একবারও মনে হয়নি পথে-ঘাটে কোথাও নিরাপত্তার কোনো অভাব আছে! আমস্টারডামে শুধু যে প্রকাশ্যে গাঁজা বিক্রি হয় তা নয়, গাঁজা ছাড়াও আরো নানা ধরনের নেশার জিনিসপত্র খোলা দোকানে কেনা যায়, খরিদ্দার অবিশ্য বেশিরভাগই পৃথিবীর নানা দেশ থেকে আসা ট্যুরিস্ট! আমস্টারডামের দেখাদেখি আমেরিকার অনেক শহরেও আজকাল গাঁজা বিক্রয় করা আইনসিদ্ধ করে দিয়েছে। আমি যে শহরে আমার পিএইচডি করেছি সেই সিয়াটল শহরটি এ রকম একটি শহর। তবে আমি একটি হিসেব মিলাতে পারি না। এখন আমেরিকার নানা শহরে এই মাদকগুলো আইনসিদ্ধভাবে কেনা যায়। কিন্তু আজ থেকে বিশ-পঁচিশ বছর আগে এগুলোসহ কাউকে ধরা হলে তাকে সারাজীবনের জন্য জেলে বন্দি করে রাখা হতো। নিশ্চয়ই এ রকম অসংখ্য মানুষ এখনো জেলে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছে। রোলান্ড রিগানের আমলে মাদকমুক্ত সমাজ তৈরি করার নামে বেছে বেছে কালো মানুষদের এই আইনগুলোর আওতায় শাস্তি দেয়া হয়েছে। যারা পৃথিবীর খবর রাখেন তারা নিশ্চয়ই জানেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এখনো কী অবলীলায় পথেঘাটে কালো মানুষদের গুলি করে মেরে ফেলা হয়!
২...
বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে একেকজনের একেক ধরনের শখ থাকে—আমার সে রকম কোনো শখ এখন আর নেই। শুধু একটি শখ এখনো রয়ে গেছে, সেটি হচ্ছে আর্ট মিউজিয়াম দেখা। আমস্টারডামে এসে আবিষ্কার করলাম এখানে খুব সুন্দর সুন্দর আর্ট মিউজিয়াম আছে। ছোট বাচ্চারা যেভাবে তাদের পছন্দের চকোলেট বা আইসক্রিম বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে একটু একটু করে খায় আমিও প্রায় সেভাবে এই মিউজিয়ামগুলো দেখেছি। প্রথমে দেখতে গিয়েছি মডার্ন আর্টের মিউজিয়াম। গিয়ে দেখি আমাদের কী সৌভাগ্য হেনরি মাতিসের একটা বিশেষ প্রদর্শন চলছে। সারা পৃথিবী থেকে হেনরি মাতিসের পেইন্টিং এনে জড়ো করা হয়েছে। হেনরি মাতিস শেষ বয়সে রঙিন কাগজ কেটে কেটে আঠা দিয়ে লাগিয়ে লাগিয়ে অনেক ছবি তৈরি করেছেন। উজ্জ্বল রঙের সেই ছবিগুলোর ছাপ অনেকবার বইপত্র ইন্টারনেটে দেখেছি। আমাদের দেশে কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদ তৈরি করতে প্রচ্ছদ শিল্পীরা উদারভাবে সেই ছবিগুলো ব্যবহার করেন! সেই বিখ্যাত ছবিগুলোর অনেকগুলো এখানে ছিল, দেখে অন্য এক ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছে।
যেহেতু মিউজিয়ামটি মর্ডান আর্টের মিউজিয়াম কাজেই সেখানে অতি বিচিত্র কিছু শিল্পকর্ম ছিল যেমন একটা ছোট টেবিলে একটা অত্যন্ত ময়লা চাদর ভাঁজ করে রাখা। দেয়ালে অনেক বড় করে এই শিল্পকর্মটি ব্যাখ্যা করা আছে এটাকে দেখে তুচ্ছ একটা ময়লা চাদর মনে হলেও শিল্পী যে অসংখ্য ময়লা চাদর দেখে দেখে শেষ পর্যন্ত এটা বেছে নিয়েছেন এবং এর ভাঁজ করার মাঝেও যে অন্য এক ধরনের শিল্প লুকিয়ে আছে সেটা গুরুত্ব দিয়ে লেখা আছে। তবে আশার কথা এই ধরনের শিল্পকর্মের গ্যালারিগুলো একেবারে ফাঁকা কেউ সেগুলো দেখতে যান না! সাধারণ দর্শকদের বোকা বানানো মোটেই সহজ না। তাদের কাছে যেটা ভালো লাগে তারা সেটা ভিড় করে দেখে, মন দিয়ে দেখে! মাঝে মাঝেই আমি পরিচিতদের একটা পেইন্টিং দেখে বলতে শুনি এটা কি ছবি! কিছুই তো বুঝি না। তাদেরকে জানিয়ে রাখি যারা ছবি বোঝার চেষ্টা করে তারা ছবি উপভোগ করতে পারে না। কাজেই কেউ যেন ছবি বোঝার চেষ্টা না করে ভালো লাগলে প্রাণভরে উপভোগ করুক, ভালো না লাগলে পাশের পেইন্টিংয়ে চলে যাক! ছবিটা বোঝাই যদি গুরুত্বপূর্ণ হতো তাহলে ফটোগ্রাফি আবিষ্কার হওয়ার পর পৃথিবী থেকে ছবি আঁকার ব্যাপারটা উঠে যেত!
মর্ডান আর্টের মিউজিয়াম দেখার কয়েক দিন পরে গিয়েছি জগদ্বিখ্যাত ভ্যানগয়ের মিউজিয়াম দেখতে। ভ্যানগয়ের নামের প্রকৃত উচ্চারণ বাংলা বর্ণমালা ব্যবহার করে লেখা সম্ভব না আমি তার চেষ্টাও করছি না! যারা পৃথিবীর বড় বড় শিল্পীর কথা পড়েছে তারা সবাই ভ্যানগয়ের নাম শুনেছে। আমিও শুনেছি এবং পৃথিবীর অনেক বড় বড় মিউজিয়ামে ভ্যানগয়ের পেইন্টিংও দেখেছি। তার ছবিগুলো দেখে দেখে মোটামুটিভাবে তার ছবি আঁকার ধরনের সঙ্গে পরিচিত ছিলাম। এই মিউজিয়ামে এসে অন্য ধরনের ছবিগুলো দেখে আমার নূতন এক ধরনের অভিজ্ঞতা হলো। এই জগদ্বিখ্যাত শিল্পীর কিন্তু শিল্পী হওয়ার কোনো পরিকল্পনা ছিল না। সাতাশ বছর বয়সে হঠাৎ করে ঠিক করলেন ছবি আঁকবেন। প্রথম কয়েক বছর ছবি আঁকা শিখলেন তারপর ছবি আঁকতে শুরু করলেন। বছর দশেক ছবি আঁকার পর এক ধরনের মানসিক সমস্যা হতে শুরু করল তখন একদিন গুলি করে আত্মহত্যা করে নিজের জীবনটি শেষ করে দিলেন। এখন তার একেকটা ছবি ষাট-পয়ষট্টি মিলিয়ন ডলারে বিক্রি হয় যখন তিনি বেঁচে ছিলেন তখন তার একটি ছবিও বিক্রি হয়েছে বলে জানা নেই। তার অর্থ কষ্টের নমুনাও এই মিউজিয়ামে আছে, নূতন ক্যানভাস কেনার পয়সা নেই বলে একই ক্যানভাসের দুই পাশে দুটি ভিন্ন ছবি এঁকে রেখেছেন। ভ্যানগয়ের মিউজিয়ামে এখন দুই পাশের দুটি ভিন্ন ছবি দর্শকদের দেখানোর জন্য অনেক রকম কায়দা-কানুন করতে হয়েছে। শুধু তাই নয়, মডেলকে দেয়ার মতো টাকা-পয়সা নেই বলে বারবার নিজের ছবি এঁকেছেন। আমরা যারা ভ্যান গ সম্পর্কে একটু আধটু খোঁজ-খবর রাখি তারা সবাই জানি তিনি নিজের কান কেটে ফেলেছিলেন। কেন কেটেছিলেন সেটা আমার কাছে একটা রহস্যের মতো ছিল। কোনো একজন বান্ধবীকে সেই কাটা কান উপহার দিয়ে এসেছিলেন সে রকম শুনেছিলাম। এই মিউজিয়ামে এসে প্রকৃত ঘটনা জানতে পারলাম। পল গগাঁ নামে আরেকজন বিখ্যাত শিল্পী একবার তার সঙ্গে দেখা করতে এলেন। দুজনে চমৎকার বন্ধুত্বপূর্ণ সময় কাটানোর কথা ছিল কিন্তু কীভাবে কীভাবে জানি দুজনের ভেতর ঝগড়া লেগে গেল এবং সেই ঝগড়া এমন পর্যায়ে চলে গেল যে ভ্যান গ রেগে মেগে এক সময় তার কানের এক টুকরো কেটে ফেললেন! কান কাটার পর তার অনেকগুলো আত্ম প্রতিকৃতিতে দেখা যায় তার কাটা কান ব্যান্ডেজ করে রাখা!
ভ্যান গ বেশিরভাগ সময় খুবই সাধারণ চাষি-শ্রমিকের ছবি এঁকেছেন। তাদের জীবনটা ভ্যানগয়ের কাছে খুবই আন্তরিক এবং খাঁটি মনে হতো। আমার এবার একই সঙ্গে মাতিস আর ভ্যানগয়ের ছবি দেখার সুযোগ হয়েছে। মাতিসের জীবনটি মনে হয়েছিল ভ্যানগয়ের উল্টো। তার একজন সহকারী মেয়ে একবার ছুটিতে গ্রামে সময় কাটিয়ে এসেছে। রোদে পুড়ে গায়ের রং তামাটে হয়ে এসেছে, তাকে দেখে মাতিস খুবই বিরক্ত হলেন। তার কারণ রোদে পোড়া মেয়েটিকে তখন ‘চাষা’মেয়ের মতো লাগছে! একজন ছবি আঁকার জন্য ‘চাষা’ মেয়েদের খুঁজে বেড়িয়েছেন, অন্যজন শুধু দেখতে চাষা মেয়েদের মতো লাগছে বলেই বিরক্ত হয়ে যাচ্ছেন! দুজন শিল্পীর মানসিকতায় কত পার্থক্য। আমস্টারডামের সবচেয়ে বড় আর্ট মিউজিয়াম হচ্ছে রাইকস মিউজিয়াম এটি দেখেছি সবার শেষে। মিউজিয়ামে ছোট ছোট গ্যালারি থাকে আমার সব সময়েই মনে হয় ভুলে বুঝি কোনো একটা গ্যালারি না দেখে চলে আসব, সেই গ্যালারিতেই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ছবিটা না দেখা থেকে যাবে! সেটা যেন না হয় তার চেষ্টা করতে গিয়ে ঘুরে ঘুরে সব কিছুই বারবার দেখা হয়ে যায়। এই মিউজিয়ামের শিল্পীরা তুলনামূলকভাবে একটু আগের। আমার দুজন প্রিয় শিল্পী র‌্যামব্রান্ট এবং ভারমিয়ারের অনেক ছবি এই মিউজিয়ামে আছে। যখন আমি ঢাকা কলেজে পড়তাম তখন ক্লাস ফাঁকি দিয়ে পাবলিক লাইব্রেরিতে এসে বই পড়তাম। পাবলিক লাইব্রেরির একটা কাচে ঢাকা সেলফে র‌্যামব্রান্টের আঁকা ছবির একটা খুব সুন্দর বই ছিল। আমি পাবলিক লাইব্রেরি এলেই সেই বইটি বের করে তার আঁকা ছবিগুলো দেখতাম। ছবিগুলো আমার স্মৃতির মাঝে গাঁথা হয়ে আছে, এতদিন পর রাইকস মিউজিয়ামে সেই ছবিগুলো দেখে আমার অন্য এক ধরনের আনন্দ হয়েছে।
রাইকস মিউজিয়ামের সবচেয়ে বড় ছবিটি র‌্যামব্রান্টের আঁকা। ছবির দুই পাশে দুইজন প্রহরী সব সময় ছবিটি পাহারা দিচ্ছে। সবচেয়ে বিচিত্র ব্যাপার হচ্ছে এই ছবিটি আরো বড় ছিল, কোনো একটা দেয়ালে ফিট করার জন্য ছবির একটা বড় অংশ কেটে ফেলে দিয়ে ছবিটি ছোট করা হয়েছে! কাটা অংশটি রক্ষা করা হয়নি, কিন্তু পুরো ছবিটা দেখতে কেমন ছিল তার একটা ছোট ছবি দর্শকদের জন্য রাখা আছে। দর্শকেরা সেই ছবি দেখে এবং দীর্ঘশ্বাস ফেলে!
পৃৃথিবীর সব বড় বড় শহরের আকর্ষণ হচ্ছে তার আর্ট মিউজিয়াম। ঢাকা শহর থেকে বড় শহর পৃথিবীতে আর কটা আছে? তাহলে আমাদের ঢাকা শহরে কেন অসাধারণ একটা আর্ট মিউজিয়াম তৈরি করতে পারি না? ইউরোপিয়ান ছবির একটা ধরন আছে, আমরা সেগুলো দেখে আহা উহু করি। কিন্তু আমাদের দেশের ছবিরও যে একটা নিজস্ব ধরন আছে সেগুলো নিয়েও যে গর্ব করা যায় সেটা কেন জানি মনে রাখি না।
যাই হোক আমস্টারডামের আর্ট মিউজিয়ামে অসংখ্য ছবি উপভোগ করতে গিয়ে সম্পূর্ণ নূতন একটি বিষয় দেখে এসেছি তার বর্ণনা না দিলে মিউজিয়াম দেখার অভিজ্ঞতা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ভ্যান গ মিউজিয়ামে ছবি দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা খোলা জায়গায় উপস্থিত হয়েছি যেখানে অনেকগুলো কফিনের মতো বাক্স দাঁড়া করে রাখা আছে এবং মানুষজন সেখানে ঢুকে তার দরজা বন্ধ করে বসে আছে। বিষয়টা কী বোঝার জন্য বাক্সগুলোর বর্ণনা পড়ে চমৎকৃত হলাম। মিউজিয়ামে ছবি দেখতে দেখতে যদি মানুষজন ক্লান্ত হয়ে যায় তাহলে এই কফিনের মতো বাক্সে ঢুকে দরজা বন্ধ করে অন্ধকার করে কিছুক্ষণ বসে থাকে এবং তারপর ছবি দেখার ক্লান্তি থেকে মুক্ত হয়ে আবার নতুন উদ্যমে ছবি দেখা শুরু করে। মানুষজন খুবই গুরুত্ব নিয়ে এভাবে নিজেদের ছবি দেখার ক্লান্তি থেকে মুক্ত করছিল। কিন্তু আমার কাছে পুরো প্রক্রিয়াটাকে একটা কৌতুক থেকে বেশি কিছু মনে হয়নি!
৩...
আমস্টারডাম শহরটি ছবির মতো সুন্দর, পুরো শহরটি অর্ধবৃত্তাকার খাল এবং কেন্দ্রমুখী রাস্তা দিয়ে নিখুঁত পরিকল্পনা করে তৈরি। শহরে প্রাচীন ইউরোপিয়ান বিল্ডিংগুলো দেখে মুগ্ধ হয়ে যেতে হয়, মানুষগুলো দীর্ঘদেহী, সারা শহরে ফুলের ছড়াছড়ি কিন্তু আমাকে মুগ্ধ করেছে অন্য একটি বিষয়। সেটি হচ্ছে এই শহরের মানুষের যাতায়াত করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম হচ্ছে বাইসাইকেল। ছোট বাচ্চা থেকে আশি বছরের বুড়োবুড়ি সবাই সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে আসছে। শহরের প্রত্যেকটি রাস্তার পাশে পায়ে হাঁটার জন্য ফুটপাথ তার পাশে সাইকেলের জন্য আলাদা রাস্তা এবং সেই রাস্তা ধরে শহরের সব মানুষ সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে! যেহেতু সবাই জন্ম থেকে সাইকেল চালায় তাই দেখে মনে হয় সবাই বুঝি সাইকেল চালানোয় এক্সপার্ট। এক হাতে নিজের সাইকেল ধরে অন্য হাতে আরেকটি সাইকেল চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, কিংবা এক হাতে নিজের সাইকেল এবং অন্য হাতে চাকা লাগানো স্যুটকেস টেনে নিয়ে যাচ্ছে কিংবা সাইকেলের হ্যান্ডেল ছেড়ে দিয়ে দুই হাতে স্মার্টফোনে ‘টেক্সটিং’ করতে করতে যাচ্ছে কিংবা হ্যান্ডেল ছেড়ে দিয়ে দুই হাতে নাচের মুদ্রা প্র্যাকটিস করতে করতে যাচ্ছে আমস্টারডাম শহরের সাইকেল চালকদের জন্য এগুলো খুবই নিয়মিত কিছু দৃশ্য। যেহেতু এই শহরের সব কিছুই সাইকেল চালিয়ে করা হয় তাই এখানে সাইকেলের নানা ধরনের বিবর্তন ঘটেছে। সবচেয়ে সুন্দরটি হচ্ছে ছোট শিশুদের নিয়ে সাইকেল চালানোর বিষয়টি। সাইকেলের সামনে ছোট বাচ্চাদের বসার মতো একটি ওয়াগন এবং মায়েরা তাদের বাচ্চাদের সেখানে আরামে এবং নিরাপদে বসিয়ে সাইকেল চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমস্টারডামে সাইকেলের এই বিশাল যজ্ঞ দেখে আমাদেরও সাইকেল চালানোর শখ হলো, তাই একদিন সাইকেল ভাড়া করে নিয়ে আমি, আমার স্ত্রী এবং পুত্র ও কন্যা মিলে একটা পার্কে সাইকেল চালিয়ে বেড়ালাম। পুত্র ও কন্যার আলাদা সাইকেল, আমার এবং আমার স্ত্রীর জন্য একটি ট্যানডেম বাইসাইকেল! একই সাইকেলে দুইজন, একজন সামনে এবং একজন পেছনে, দুজনে মিলে সেই সাইকেল চালানো হয় ভারী মজার ব্যাপার।
আমস্টারডামে সাইকেলের এই বিশাল আয়োজন দেখে আমি মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছি যে আমাদের দেশের ট্রাফিক জ্যাম থেকে শুরু করে যাতায়াতের সব সমস্যা এই সাইকেল দিয়ে সমাধান করে ফেলা সম্ভব। সরকার থেকে যদি ঢাকা শহরের সব গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার পাশে পাশে সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার জন্য একটু খানি জায়গা আলাদা করে রেখে দেয়ার একটা সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তাহলেই দেশে একটা বিপ্লব হয়ে যাবে। আমি লক্ষ্য করেছি আমাদের তরুণেরা আজকাল অনেক বেশি সাইকেলে চড়ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্র এবং ছাত্রীরা সমানভাবে সাইকেল চালিয়ে আসছে এর থেকে সুন্দর বিষয় আর কী হতে পারে? সাইকেলকে জনপ্রিয় করার জন্য বাংলাদেশে নিশ্চয়ই অনেক সংগঠন দাঁড়িয়ে গেছে। এবার আমস্টারডাম থেকে ঘুরে যাবার পর আমি ঠিক করেছি এই সংগঠনগুলোকে খুঁজে বের করে তাদের সঙ্গে একটু কাজ করতে হবে।
৪...
আমার এই লেখাটি পড়ে সবার নিশ্চয়ই ধারণা হতে পারে ইউরোপের চমৎকার একটি শহরকে নিয়ে আমার ভেতরে বুঝি শুধু এক ধরনের মুগ্ধ বিস্ময়! এটি পুরোপুরি সত্যি নয়, আমি যখন চারিদিকে তাকাই এই ইউরোপীয় শহরের সভ্যতার ইতিহাস কিংবা ঐশ্বর্যকে দেখি তখন সব সময়েই মনে পড়ে এই দেশগুলো আমাদের দেশগুলোকে কলোনি করে কয়েকশত বছর আগে আমাদের সকল সম্পদ লুণ্ঠন করে নিজেদের সম্পদ গড়ে তুলেছে! এখন আমাদের দেশগুলোর জন্য তাদের ভেতরে এক ধরনের প্রচ্ছন্ন অবহেলা এবং তাচ্ছিল্য। আমস্টারডামে থাকা অবস্থাতেই খোঁজ পেয়েছি আমার পরিচিত একজন এখানে কোনো একটা প্রশিক্ষণে আসার চেষ্টা করেছিল শেষ পর্যন্ত ভিসা পায়নি বলে আসতে পারেনি। আমি এবং আমার স্ত্রী যেদিন আমস্টারডামে প্লেন থেকে নেমেছি তখন বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক এখানকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে একটি কোর্স পড়াতে একই প্লেনে এসেছেন। যখন ইমিগ্রেশনের ভেতর দিয়ে যাচ্ছি তখন তিনি আমার পাশের কাউন্টারে দাঁড়িয়েছেন। আমার পাসপোর্টটিতে চোখ বুলিয়ে সেটি আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম পাশের কাউন্টারের মানুষটি চোখে একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস লাগিয়ে বাংলাদেশের অধ্যাপকের পাসপার্টের ভিসাটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছে। এই দেশের প্রখ্যাত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে তাদের ছাত্রছাত্রীদের একটি কোর্স পড়ানোর জন্য আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপককে যদি সন্দেহ করা হয় তিনি পাসপোর্টে একটা জাল ভিসা লাগিয়ে এই দেশে ঢুকে যাবার চেষ্টা করছেন তাহলে সেই অপমান আমরা কেমন করে সহ্য করব?
আমি স্বপ্ন দেখি ভবিষ্যতে কোনো একদিন আমার দেশ পৃথিবীর বুকে মাথা তুলে দাঁড়াবে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যখন আমাদের এই সবুজ পাসপোর্টটি হাতে নিয়ে বিদেশ যাবে তাদেরকে আমাদের মতো এই অপমান আর সহ্য করতে হবে না।
লেখক: কম্পিউটার বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ, শিশু ও কথাসাহিত্যিক, সমাজ বিশ্লেষক

বুধবার, ২৮ মে, ২০১৪

হটল্যান্ড থেকে ফ্রিজল্যান্ড ...নেদারল্যান্ড

লিখেছেন: হাসান রায়হান | এপ্রিল ২৭, ২০১১
প্রায় অর্ধযুগ হয়ে গেল বিদেশ ঘুরে আসার। কতবার ভাবছি এইটা নিয়ে লিখব কিন্তু আজ না কাল করে করে লেখা হয়ে উঠে না। দেড় মাসের জন্য হল্যান্ডের খুব খুবই ছোট এক শহরে থাকার আনন্দের স্মৃতি এতদিন না লেখার অন্যতম কারণ সেই চমৎকার সময়ের ভিজুয়াল স্মৃতি উপকরণ হারিয়ে ফেলা। সেখানে আমি আমার আশেপাশের যত ছবি তুলিছেলিাম একটা সিডিতে কপি করা ছিল। সেই সিডিটা হারিয়ে ফেলার দুঃখে লেখা আর হয়ে উঠেনা। এইবার ঠিক করেছি লিখেই ফেলব, নাহলে আর হয়ত আমার জীবনের প্রথম বিদেশ ভ্রমনের কথা লেখা হবে না।
আমি তখন একটা ডাচ-বাংলাদেশি কোম্পানিতে কাজ করতাম। কয়েকদিন ধরে কথা হচ্ছিল আমার ও আরেকজন সিনিওর কলিগের নেদারল্যান্ড যাওয়ার। তবে যাওয়া যে হবে নিশ্চিত ছিলনা। কিন্তু যখন নিশ্চিত হল তখন হাতে সময় নাই। এক সপ্তাহের মধ্যে যেতে হবে। এবং একা। এদিকে আমার কোনো প্রস্তুতি ছিলনা। এমনকি পাসপোর্টও ছিলনা।
নেদারল্যান্ড থেকে মেইলের পর মেইল আসতে থাকল। যাওয়ার জন্য কী কী কাগজ লাগবে, ঐখানে কী কাজ করতে হবে এই সব নিয়ে। এই প্রথম আমাদের বিগ বস কোম্পানির মালিক কেইস নেবারের(Cees Nieboer) সাথে যোগাযোগ হল। তবে সেক্রেটারি ইডা চমৎকার ভাবে গুছিয়ে সহজবোধ্য মেইল করত । আমি কিন্তু ভিতরে টেনশনে অস্থির। যে কাজের জন্য আমি যাব সেইটা কখনো করি নাই। বিদেশে গিয়ে শিখে কাজ করতে হবে। পারব কীনা সেই ভয়ে ঘুম আসেনা আমার। আমি আসলে যেতেই চাই নাই। কিন্তু উপায় নাই, চাকরি করতে হলে যেতেই হবে। তাছাড়া আমি ছাড়া অন্য লোক ছিলনা তেমন।
জরুরি পাসপোর্ট করার জন্য আবেদন করলাম। পুলিশ ভেরিফিকেশনে এসে ভাব বুঝে বজ্জাত পুলিশ টাকা নিল। পাসপোর্ট যথাসময়ে পাওয়ার জন্য পরিচিত লোক ধরা হল। কিন্তু তবুও পাসপোর্ট হাতে পেয়ে এম্বেসিতে জামা দিতে গিয়ে দেখা গেল দশ মিনিট দেরী হয়ে গেছে। সেদিন আর ভিসার জন্য দাঁড়ানো যাবেনা।
ফিরে আসছি অফিস থেকে ফোন আসছে অপেক্ষা করার জন্য। কেইস এম্বেসেডরকে ফোন করেছে যেন আজ আমার এপয়নমেন্ট হয়। এমন নাছোড়বান্দা মানুষ! যদিও সেদিন হয় নাই। পরের দুই দিন বন্ধের পর অফিস ডে তে আবার গেলাম। ভিসার পাওয়া নিয়ে আমার কোনো দুশ্চিন্তা ছিলনা। না পেলেই বেঁচে যাই। অফিসার বাদামী রং এর মহিলা। কোন দেশি বুঝলামনা, ভারতীয় বা বাঙালি বা এংলো হতে পারে। তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি ও সুরে জিজ্ঞেস করল কেন যাব, কী কাজ করব ইত্যাদি। আমি তাচ্ছিল্যের ভাব নিয়া উত্তর দিলাম। আমাকে ইনভাইট করা এডোয়ার্ড বিটোফেনের লম্বা চুলের ছবি দেখে বিশ্বাস করতে চায় না সে ছেলে। যাই হোক ভিসা পাওয়া গেল। আমি পাসপোর্ট হাতে নিয়ে ভাবি ভিসা নাদিলে কেইস নিশ্চয়ই পরের ফ্লাইটে বাংলাদেশে এসে এম্বেসেডরের কলার ধরত! দেড় মাসের ভিসা সাথে শর্ত দেড় মাস পর এম্বেসিতে গিয়ে দেখা করে প্রমান দিতে হবে আমি পালায় যাই নাই হল্যান্ডে।
তারপর দুইদিন গেল টিকিট, ইনসুরেন্স, গরম কাপড় কেনা ইত্যাদি করে। খুব সকালে ফ্লাইট। ভোররাতে মা, বউ আর আড়াইমাসের রিমঝিমের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে জীবনের প্রথম বিদেশ, প্রথম বিমানে ওঠা এবং পরবর্তীতে অজস্র প্রথমের অভিজ্ঞতা নিতে এয়ারপোর্টের দিকে যাত্রা করলাম।
রাতের ফাঁকা রাস্তায় একশ কিমিতে গাড়ি চালিয়ে মাইক্রোর ড্রাইভার বিশ মিনিটেই বিমানবন্দরে পৌছে দিল। এই প্রথম বিদেশ যাত্রা, মনের ভিতর টেনশন। বোর্ডিং এ ফরম পূরণ করে লাইনে দাঁড়াতেই এক যাত্রী অনুরোধ তার ফরম লিখে দেওয়ার। এই লোককে দেখে আমার মনের ভয় সবটাই নাই হয়ে গেল, সম্পূর্ণ নিরক্ষর একজন পাঁচ বছর সৌদিতে কাজ করতে পারে, যাওয়া আশা করতে পারে তবে আমার ভয় কী?
বোর্ডিং হওয়ার পর বিমানের জন্য অপেক্ষা। ঢাকা থেকে এ্যামিরেটসে দুবাই। সেখানে বারো ঘন্টা পর কেএলেমের আমাস্টারডাম ফ্লাইট ধরতে হবে। চাঁদপুরের একজনের সাথে পরিচয় হল। সাথে লাগেজ মাত্র একটা ব্রিফকেস। শুকনা পাউরুটি পানি দিয়ে খাচ্ছিলেন। ঐদিন ছিল হরতাল তাই রাতে হোটেলে ছিলেন। হোটেল থেকে এয়ারপোর্টে চলে এসেছেন। আমাকে পাউরুটি অফার করলেন। এই দরিদ্র প্রবাসীর আন্তরিকতায় মনটা খারাপ হয়ে গেল। পোষাকেই বোঝা যায় বিদেশে থেকেও উপার্জন বেশি না। মনে মনে কামনা করলাম তার যেন আরো ভালো রোজগারের সুযোগ হয়।
বিমানে শতকরা একশ ভাগ যাত্রী বাংলাদেশি। কিন্তু ভিডিও, অডিও চ্যানেল, সংবাদপত্র কোথাও বাংলাদেশি কিছু পেলামনা। হয় হিন্দি না হয় ইংরেজি। হায় কী সেলুকাস! খাবার সময় অবশ্য খিচুড়ি পাওয়া গেল। যাত্রীদের নিরানব্বই ভাগ মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিকের কাজ করে। আমার পাশের জন বয়স্ক। অবস্থা মনে হয় সাধারণ শ্রমিকদের থেকে ভালো। মুখে গাম্ভীর্য এনে শক্ত হে বসে আছে,অন্যদের সাথে কথা না বলে। অন্যরা কিন্তু গল্পগুজবে চিৎকারে বিমানকে লোকাল বাস বানিয়ে ফেলছে।
আমার সিট জানালার পাশে। বিমান যখন টেক-অফ করে উড়ে যায় নিচে সংসদ ভবন, পরিচিত সব স্থাপনা, বুড়িগঙ্গা নদী দ্রুত চোখের সামনে থেকে ছোট হতে হতে সরে যায়। অনিন্দ্য সুন্দরী ইওরোপিয়ান বিমান বালা খাবার দিয়ে যায়। পেছনের সিটে বসা যুবক বলে, মি লাভ ইউ। বিমান বালা বদমায়েশি বুঝতে পেরে বলে, স্যরি আই ডোন'ট গেট ইউ। বলে অন্যদিকে চলে যায়। এদিকে আর আসেনা।
কয়েক ঘন্টার যাত্রা বিরক্তিকর লাগে। সময় কাটাতে জানালা দিয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকি। দেশের সীমান্ত পার হয়ে ভারতের আকাশে বিমান। এই প্রথম অন্য দেশের উপর। রোমাঞ্চ লাগে। কোলকাতা তারপর ভুবনেশ্বর ইতা্যদি শহরের উপর দিয়ে উড়ে যায় বিমান। নাম না জানা কত জনপদ নদী বন পার হয়ে যায়। উপর থেকে নদী দেখতে সরু বাঁকা রেখার মত লাগে। একে বেকে সমূদ্রে গিয়ে মিশেছে।
দুবাইতে পৌছি সকালে, এগারোটায় মনে হয়। আমার কানেক্টিং ফ্লাইট কেএলএম বিমানের। আশা ছিল আমার সাথে কেএলএমএর আর যাত্রী থাকবে। যাদের সাথে সাথে আমি সেই ফ্লাইট ধরতে পারব। কিন্তু হায়, আমিই একমাত্র কেএলএমএর যাত্রী। কেউ দুবাইএর বেশিরভাগই সৌদি আরবের পথে অন্য বিমানে দিকে ছুটে গেল। আমার কোনো ধারণা ছিলনা কীভাবে কানেক্টিং ফ্লাইট ধরতে হবে। কাউন্টারে বসা আমীরাতি লোকজন জিজ্ঞেস করলে ঠিকমত উত্তর দেয়না। বলল কেএলএমএর কাউন্টারে যাও। সেই কাউন্টার খুঁজে পাই না। একবার উপরে উঠি একবার নীচে নামি বিশাল এই এয়ারপোর্টের। নিজেকে অসহায় লাগে। ক্লান্ত হয়ে চেয়ারে বসি, তখন দেখা হয় একই বিমানে ঢাকা থেকে আসা যুবকের সঙ্গে। আমার মতই অবস্থা তার। সে যাবে এলসালভেদর। সে ধরবে এুার ফ্রান্সের ফ্লাইট। এরকম আরো চারটা কানেক্টিং ফ্লাইট ধরে যেতে হবে এলসালভেদর। জানালো পাঁচ বছর ধরে সেখানে আছে। আমি অবাক হয়ে ভাবি, বাঙালি দুনিয়ার কোনো দেশ আর বাদ রাখে নাই।
অবশেষে বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া গেল। সম্ভবত জাপানি কোনো বিমানের ক্রু একজন কে জিজ্ঞেস করে সঠিক উপায় জানলাম। ভদ্রলোক জানালো ঐদিকে মারহাবার কাছে যাও সে আপনাকে সব ব্যাবস্থা করে দিবে। আমি বললাম, মারহাবাকে চিনব কীভাবে? মারহাবা কোনো লোক না, একটা প্রতিষ্ঠান। ওনাকে ধন্যবাদ দিয়ে মারহাবা খুঁজতে চললাম। পাওয়া গেল মারহাবা কাউন্টার। ওদের দায়িত্ব আমাকে হোটেলে রাখার ব্যাবস্থা করা। কাউন্টারের স্মার্ট শ্রিলংকান মেয়েটা দুবাইতে ঢোকার জন্য ভিসার ব্যাবস্থা হোটেলে ইনফর্ম করে বলে দিল কীভাবে যেতে হবে। এয়ারপোর্ট থেকে বের হওয়ার সময় আমিরাতি ইমিগ্রেশনের লোক বারবার পাসপোর্ট উল্টায় দেখে, চাপ দিয়া দেখে। হয়ত দুই নম্বরি কিনা চেক করে। একসময় ছেড়ে দেয়। এয়ারপোর্টের বাইরে মারহাবা মেয়েটার কথামত এস্টোরিয়া হোটেলের নামের প্ল্যাকার্ড হাতে একজনকে পাওয়া যায়। আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল। আমাকে নিয়ে হোটেলে যাওয়ার মাইক্রোতে নিয়ে উঠায়। সেখানে অপেক্ষা করছিল আরেকটা ভারতীয় দম্পত্তি। ঝকঝকে দুবাইয়ের রাস্তা দিয়ে মাইক্রো চলে। প্রথম বিদেশের মাটিতে পা রাখা।
হোটেলে রুমে গিয়েই বিছানায়। ঘুম থেকে উঠে গোসল করে থেকে বেরোই শহর দেখতে। রাস্তাঘাটে সর্বত্র সাব-কন্টিনেন্টের লোক ভরা। স্থানীয় লোকজন চোখেই পড়েনা। ফুটপাথ ধরে হোটের আশেপাশে হাটাহাটি করি। কিছু দূর গেলেই পাওয়া গেল খাবার দোকান। সবাই উপমহাদেশীয়। ফ্রাইড রাইস আর চিকেন ফ্রাই খাই। হোটেলে নানা লোকজন আসছে যাচ্ছে। টাইট টি সার্ট ও তার চেয়েও টাইট প্যান্ট পরে কয়েকজন আরবীয় মেয়ে ঘোরাফেরা করে। মুখে উৎকট সাজ। দোকানে এসে ড্রিংক কিনে খায়, দোকানদারের সাথে হাস্য মশকরা করে। আমার পাশে মলিন পোষাক পরা দুইজন নোয়াখালির ভাষায় কথা বলছে। দেশি পেয়ে আগ্রহ নিয়ে কথা বলতে যাই। পাত্তা দেয় না। রাস্তায় আরেকটু হাটাহাটি করতে সন্ধ্যা হয়ে আসে। হোটেলের দিকে ফিরি, এয়ারপোর্টে যেতে হবে আমাস্টারডামের বিমান ধরতে। হোটেলের গেটের কাছাকাছি এসেছি অন্ধকারে খাওয়ার হোটলে দেখা মেয়েদের মত একজন তার ভাষায় কিছু একটা বলে। আমি স্যরি বুঝিনা বলে তাড়াতাড়ি হোটেলে ঢুকে যাই।