SLOVENIA লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
SLOVENIA লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

শনিবার, ৫ জুলাই, ২০১৪

স্লোভেনিয়ায় দিন-রাত্রি

Slovenia
যুব সংগঠন ‘ইয়ুথ নেটওয়ার্ক মামা’র এর আমন্ত্রনে গত ২০ থেকে ২৬ মে ২০১৪ তে স্লভেনিয়ায় জমায়েত হয়েছিলো বিভিন্ন দেশের তরুন মানবাধিকার কর্মীরা। ছিলো বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক কর্মীও এই নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ, নেপাল ও ফিনল্যান্ড অর্থাত প্রতিটি দেশ থেকে পাঁচজন প্রতিনিধিকে আমন্ত্রন জানিয়েছিল। এই সফর এর মুল উদ্দেশ্য ছিল স্লভেনিয়ার তরুণদের হন্য কি ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে তা জানানো ও এই দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, শ্রমিক, বিশেষত কয়লা শ্রমিকদের পরিস্থিতিসহ এই দেশ সম্পর্কে জানানো।
মনটা খারাপ লাগছিল, কারন আমার সহকর্মী আরও চারজন বাংলাদেশি মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীর যাওয়ার কথা থাকলেও ভিসা সংক্রান্ত অদ্ভুত জটিলতার কারণে তাঁদের হাতে পাসপোর্ট এসে পৌঁছেনি যাওয়ার আগের দিন পর্যন্ত ।তাই আমাকে একাই রওনা হতে হল ।
যাহোক ১৯ মে সকালে রওনা হলাম শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর এর উদ্দেশে। সকাল ১০টা ২০ এ ফ্লাইট। স্লোভেনিয়ার রাজধানী লুব্লিয়ানার জোসে পুকনিক এয়ারপোর্ট এ পৌঁছে গেলাম ২০ তারিখ স্থানীয় সময় দুপুর দেড়টা নাগাদ । বড় লম্বা ছিল ফ্লাইটটি! নেপালের বন্ধুরাও এসে পৌঁছেছে। এয়ারপোর্ট এ অপেক্ষা করছিল ইয়ুথ নেটওয়ার্ক মামা’র ডিরেক্টর মায়া। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে দেখি চারদিকে ঝলমলে আবহাওয়া! মায়া হেসে বলল, গতকালও ঠাণ্ডা ছিল , আর আজ আপনারা দক্ষিন এশিয়ার ঝলমলে রোদ নিয়ে আসলেন! আমাদের থাকাকালিন সাতটি দিনই ছিল আলোকিত ও উষ্ণ । এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে মায়া আমাদের পরতরয (Portorož) এ নিয়ে সমুদ্র দেখিয়ে আনবে বলে জানাল। পরতরয এ বাসে যেতে লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা । সমস্ত পথ স্লভেনিয়ার অপূর্ব প্রাকৃতিক দৃশ্য আমাকে মোহাবিষ্ট করে ফেলল। লম্বা ফ্লাইট এর সমস্ত ক্লান্তি দূর হয়ে গেল! সবুজ পাহাড় , মালভূমি , পাহাড়ের পাদদেশে সাজানো ঘরবাড়ী , কোথাওবা ঘন জঙ্গল – এত সবুজ , আর নীল আকাশ- প্রকৃতি যেন অকৃপণ হাতে ঢেলে দিয়েছে এই ছোট্ট দেশটিকে। স্লভেনিয়ার আয়তন মোটে ২০২৭৩ বর্গ কিলোমিটার , জনসংখ্যা ২০ লক্ষ । ১৯৯১ সনে দেশটি প্রাক্তন ইয়ুগস্লাভিয়া থেকে স্বাধীন হয়। এই দেশে ২১২ টি মিউনিসিপালটি রয়েছে যা জেলা ও লোকাল কমিউনিটি দ্বারা বিভক্ত । এই দেশের প্রধান ভাষা স্লভেন ।
পরতরয পিরান(piran) মিউনিসিপালটি অন্তর্ভুক্ত। পিরান পুরনো শহর, তাই একে সংরক্ষনের জন্য এর ভেতরে ব্যক্তিগত গাড়ি প্রবেশ নিষেধ । আমাদের বহনকারী বাসটি তাই আমাদের শহর এর বাইরে নামিয়ে দিল। ট্যুরিস্টরা গাড়ি বাইরে রেখে হেঁটে বা সংরক্ষিত বাসে চড়ে শহরটি প্রদক্ষিন করতে পারবে। সমুদ্র আর পাহাড় পরতরযকে অপূর্ব সৌন্দর্যময় করে তুলেছে। আমি এমনিতে প্রকৃতি প্রেমিক ধরনের মানুষ। এই সৌন্দর্য আমাকে একেবার সম্মোহিত করে ফেলল । অ্যাড্রিয়াটিক সমুদ্র পাড়ের রেস্টুরেন্টে সামুদ্রিক মাছ দিয়ে আমরা রাতের খাবার সারলাম। রাত মানে ৮ টা বেজেছিল, যদিও সূর্য আকাশেই ছিল!
ডিনার করে আমরা ছোট্ট শহর আইজশিনার (ajdovscina) উদ্দেশে রওনা হলাম। সেখানে আজশিনার ইয়ুথ হোস্টেল এ অবস্থান করলাম। কিশোর- যুবকদের উদ্দেশ্য সব রকমের সুযোগ সুবিধা বজায় রেখে হোস্টেল তৈরি করা হয়েছে। মায়া বলল স্লভেনিয়ার বিভিন্ন মিউনিসিপালটিতে এই ধরনের ইয়ুথ সেন্টার বা হোস্টেল রয়েছে। মূলত ১১ বছর বয়সী থেকে ২৯ বছর বয়সীরা এইসব ইয়ুথ সেন্টার এ এসে বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশ গ্রহণ করে। এই সেন্টার গুলো কিশোর – যুবকদের শিক্ষা, বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহণ ও কর্মসংস্থান এর সুযোগ সৃষ্টি করে। ২১ মে সকালে একসঙ্গে পরিচিত হলাম ফিনল্যান্ড, স্লোভেনিয়া ও নেপালের বন্ধুদের সঙ্গে, এঁদের বেশীরভাগই তাঁদের নিজ নিজ দেশের যুব রাজনীতির সাথে জড়িত রয়েছেন। তাঁদের নিজ নিজ পড়ালেখার পাশাপাশি তাঁরা তাঁদের রাজনীতিতে স্বেচ্ছাশ্রম দিচ্ছেন। আইজশিনার ইয়ুথ কাউন্সিল এর প্রতিনিধি আমাদের জানালেন ৭টি যুব সংগঠন মিলে এই ইয়ুথ কাউন্সিল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাঁরা যুববান্ধব মিউনিসিপালটি গুলোকে উতসাহিত করার জন্য পুরস্কৃত করে থাকেন । ফলে বিভিন্ন মিউনিসিপালটির মধ্যে যুব উন্নয়ন করার প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
২২ মে ভোরে নাস্তা খেয়েই আমরা সবাই স্লভেনিয়ার পশ্চিমে অবস্থিত নোভা গরিসা (Nova Gorica ) শহরের উদ্দেশে রওনা হলাম। পথিমধ্যে স্লভেনিয়া ও ইটালির সীমারেখায় দাঁড়িয়ে ছবি তুললাম । এখানে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ- ভারতের রক্তাক্ত সীমান্তের কথা মনে পড়ছিল বারবার; যেখানে প্রতিনিয়ত বাংলাদেশিরা ভারতীয় বিএসএফ বাহিনির গুলিতে নিহত, আহত হচ্ছেন। স্লভেনিয়া- ইতালির খোলা সীমান্তে কোন সীমান্ত রক্ষীবাহিনী চোখে পড়লো না!
নোভা গরিসাতে প্রথমে আমরা সেখানকার ইয়ুথ সেন্টার পরিদর্শন করলাম। সেখানে বিনা মূল্যে যন্ত্রসংগীত শেখার, ছবি আঁকার, লেখাপড়ায় সহযোগিতা করার জন্য শিক্ষক ও সব ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে। বিভিন্ন ভাবে যুব সমাজ কে সাহায্য সহযোগিতা করে চলেছে এই ইয়ুথ সেন্টার গুলো ।এরপর আমরা গেলাম ই হাউজ অফ এক্সপেরিমেন্ট (E House of Experiment) এ। অল্প বয়সী ছেলে মেয়েরা এখানে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরিক্ষা নিরিক্ষা করে। রোবট থেকে শুরু করে তাদের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড দেখলাম।
এখান থেকে স্লভেনিয়ার রাজধানী ও এই দেশের সবচে বড় শহর উউব্লিয়ানার (Ljubljana) উদ্দেশ্য রওনা হলাম। সেখানে পিস ইন্সটিটিউট (peace Institute) এ ডঃ নেযা কগভসেক(Dr. Neža Kogovšek ) এর সাথে স্লভেনিয়ার পঁচিশ হাজার ছয়শ একাত্তর জন ‘মুছে ফেলা মানুষ’ দের কথা জানলাম । তিনি জানালেন সাবেক যুগোস্লাভিয়ার আর্মি ও স্লভেনিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনীর মধ্যে ১০ দিনের গৃহযুদ্ধের পর ২৫ জুন ১৯৯১ এ স্লভেনিয়া স্বাধীনতা লাভ করে। এই সময় ও পরবর্তীতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ এই দেশের সব রেকর্ড থেকে মুছে যায় ।এদের মধ্যে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার আর্মি ও তাঁদের পরিবার যাঁদের স্থায়ী ঠিকানা স্লভেনিয়ায় ছিল; তাঁরা স্লভেনিয়ার প্রতি অনুগত নন; এই বলে সে সময় তাঁদেরকে রেকর্ডভুক্ত করা হয়নি। এছাড়া অন্যান্যদের মধ্যে সাবেক যুগোস্লাভিয়ার অন্যান্য প্রদেশে বসবাসকারী অথচ যাঁদের স্থায়ী ঠিকানা ছিল স্লভেনিয়ায় তাঁদের নাগরিকত্বের আবেদনের জন্য মাত্র ছয় মাস সময় দেওয়া হয় । যাঁরা এই সময়ের ভেতর আবেদন করতে পারেননি তাঁরা রেকর্ড ভুক্ত হবার অধিকার হারান। এই সব ‘মুছে ফেলা‘ মানুষ গুলো শিক্ষা, চাকরী, কাজ পাবার সুবিধা হতে বঞ্চিত হচ্ছে ; এমনকি এঁদের শিশুরাও ‘ মুছে’ গেছে। এদের সব অস্তিত্ব অস্বীকার করা হয়েছে । ফলে এঁদের মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। বর্তমা্নে যদিও এঁদের সমস্যা সমাধান করার চেষ্টা করা হচ্ছে , তবে গতি অত্যন্ত ধীর । তিনি আমাদের ‘The Scars of the Erasure’ বইটি উপহার দিলেন ; যার মধ্যে এঁদের সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করা হয়েছে। মাথায় ঘুরছিল ‘মুছে ফেলা মানুষ’ গুলোর কথা! এরপর গেলাম হিউম্যান রাইট্‌স অম্বুডসমান (Human Rights Ombudsman) অফিস এ। এখানে জেনে ভাল লাগল যে স্লভেনিয়া অপশোনাল প্রটকল অফ কনভেনশন এগেইনস্ট টর্চার অনুসাক্ষর করেছে। আমি প্রশ্ন করলাম স্লভেনিয়াতে আইন প্রয়োগ কারী সংস্থার হাতে গড়ে বছরে কতজন নির্যাতন এর শিকার হচ্ছেন? তাঁরা জানালেন একজনও নন! বাংলাদেশের আইন প্রয়োগ কারী সংস্থা ও রাবের হাতে ক্রমাগত নির্যাতিত আহত -নিহত মানুষদের ঘটনা আমার মানসপটে ভাসছিল। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার নির্যাতন বন্ধের জন্য সরকারকে দায়বদ্ধ করার জন্য ক্রমাগত জাতিসঙ্ঘের অপশোনাল প্রটকল অফ কনভেনসশন এগেইনস্ট টর্চার অনুসাক্ষর করার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে, যদিও সরকার এখন পর্যন্ত তা অনুসাক্ষর করেনি! তবে স্লভেনিয়াতে পারিবারিক সহিংসতার অনেক ঘটনা ঘটছে।
বিকেল বেলা শহরটা ঘুরতে বেরুলাম। হাঁটতে হাঁটতে খাড়া পাহাড়ের উপরে উউব্লিয়ানার দূর্গ দেখতে গেলাম। পঞ্চদশ শতাব্দীতে তৈরি এই দূর্গটি মূলত তুর্কি আক্রমণ কারীদের মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে এটি জেলখানা হিসাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে এই দূর্গটি পর্যটকদের দর্শনীয় স্থান হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে।এরপর গেলাম প্রেসেরেন স্কোয়ার (Prešeren Square ) এ। স্লভেনিয়ার বিখ্যাত কবি প্রেসেরেন এর নামে এই স্কোয়ারটি তৈরি হয়েছে। এখানে তাঁর ও তাঁর প্রেমিকার ভাস্কর্য রয়েছে।কাছেই বুচার্স ব্রিজে বিভিন্ন দেশের প্রেমিক- প্রেমিকারা তাদের ভালবাসার প্রতীক চিহ্ন হিসাবে তাদের নাম খোদাইকৃত তালা (love padlock) ঝুলিয়ে রেখেছে!

২৩ মে সকাল নয়টাতে স্লভেনিয়ান সংসদে সংসদ সদস্য মার্কো পাভ্লিসিক (Marko Pavlišič) সাথে মিটিং হল। তিনি স্লভেনিয়ান তরুণদের বেকারত্বের হার, অর্থনীতি, রাজনীতি ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করলেন। এরপর উউব্লিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্লভেনিয়ার ইতিহাস ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে মুগ্ধ করা আলোচনা করলেন সোশ্যাল সাইন্স এর অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ডঃ টমাজ দেযেলেয়ান ( Dr. Tomaz Dezelan) । তাঁর সঙ্গে কথা বলেই আমরা ছুটলাম ট্রেন ধরতে। যেতে হবে আরেক শহর মারিবর। মারিবর স্লভেনিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এই তো কিছুদিন আগেই মারিবর এর জনতার প্রতিরোধে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত প্রাক্তন মেয়র ফ্রাঙ্ক ক্যাংগ্লার (Franc Kangler) অপসারিত হন। ২ নভেম্বর ২০১২ তে শুরু হওয়া ফ্রাঙ্ক ক্যাংগ্লার এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করে এবং ২০১৩ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ গঠন করা হয়।এই শহরে সুশীল সমাজের বিশিষ্ট নাগরিকদের সাথে কথা হল।
মারিবর এ একরাত থেকে ভেলেনি (velenje) তে আসলাম। ভেলেনির কয়লা খনি যাদুঘর বিখ্যাত । এই যাদুঘর ১৯৫৭ সনে প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৬৬ সনে সর্ব সাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয়। কয়লা শ্রমিকদের বেশে টুপি, আপ্রন পড়ে মাটি থেকে ১৬০ মিটার নিচে খটখটে লিফট দিয়ে আমরা সবাই নেমে গেলাম খনির ভেতর!অন্ধকাররাচ্ছন্ন পরিবেশে টর্চ নিয়ে আমাদের গাইড এই কয়লা খনির ইতিহাস থেকে শুরু করে বর্তমান অবস্থা বর্ণনা করছিলেন। প্রথম দিকে শ্রমিকদের অবস্থা মোটেই ভাল ছিলনা।১৮৯৩ সালে খনির মিথেন গ্যাস এ দম বন্ধ হয়ে মারা যায় ২৮ জন শ্রমিক। ধীরে ধীরে খনির ও শ্রমিকদের সার্বিক ব্যবস্থা উন্নত করা হয়েছে। ভেলেনি কয়লা খনি নিরাপত্তা ও আধুনিক সুযোগ সুবিধার দিক দিয়ে বিবেচনা করে ইউরোপের প্রথম সারির কয়লা খনির মর্যাদা লাভ করেছে।এইসব দেখতে দেখতে আমাদের দিনাজপুরের বরপুকুরিয়া কয়লা খনি ও সেখানকার শ্রমিকদের কঠিন , বঞ্চিত জীবনের কথা মাথায় ঘুরছিল ।
২৫ মে সকালে ভেলেনিতে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এর ইউরোপিয়ান সংসদীয় নির্বাচন দেখতে ছুটলাম। ভাবছিলাম ভোটকেন্দ্র গুলোতে ভোটারদের উপচে পড়া ভিড় দেখব। কিন্তু ভোটকেন্দ্র গুলোর সুমসাম পরিবেশ আমাকে অবাক করল! এদিকে আমরা এশিয়ানরা সকাল থেকে প্রায় মনুষ্যবিহীন বিভিন্ন ভোট কেন্দ্র ঘুরে বেড়ালাম আর আমাদের ইউরোপিয়ান বন্ধুরা বিকাল থেকে এর ফলাফল গুলো পর্যবেক্ষণ করতে থাকল।বিভিন্ন সংগঠনের ক্রমাগত সচেতনামুলক প্রচারণা থাকা সত্ত্বেও ইউরোপিয়ান সংসদীয় নির্বাচনে অনেক কম ভোটার ভোট দিয়েছে। স্লভেনিয়াতে ২০.৯৬% ভোটার এবার ভোট দিয়েছে।
সাত দিন আমরা সবাই সবার কাছ থেকে কত কিছু জানলাম, শিখলা্ম । মনে হচ্ছিল বাংলাদেশের তরুণদের জন্য এরকম সংগঠন যদি গড়ে উঠত – তবে আমাদের তরুণদের হানাহানি, খুনাখুনির রাজনীতি অথবা নেশার থাবা থেকে মুক্ত করে সৃজনশীল ভাবে গড়ে তুলতে পারতাম! এবার দেশে ফেরার পালা। বিদায় বলতে সবারি কষ্ট হচ্ছিল। বিমানবন্দর যাবার পথে তুমুল বৃষ্টি নেমেছে। মায়া বলল, “আপনারা চলে যাচ্ছেন, তাই আকাশ কাঁদছে”, আমারও মনটা হু হু করে উঠল সাত দিনের অথচ মনে হয় কতদিনের পরিচিত বন্ধুদের জন্য। বললাম “বিদায় বন্ধুরা, বিদায় স্লভেনিয়া”।

শনিবার, ১৭ মে, ২০১৪

নিয়েন্ডারথালের দেশে ... স্লোভেনিয়া

“কি করা হয়?” শুধোলেন মার্টিন, স্টীয়ারিং থেকে হাতটা তুলে চুল ব্যাকব্রাশ করতে করতে।
আমি একটু অন্যমনস্ক ছিলাম, কোনো এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েই রাস্তার দু’পাশে এত গভীর অন্ধকার আগে কখনো দেখিনি – টিমটিমে হলুদ আলোও দেখা যাচ্ছে না, সূচীভেদ্য অন্ধকার যাকে বলে এ হল তাই। ঘন্টা খানেক আগে যখন প্লেন বেলগ্রেড এয়ারপোর্টে নামছিল, লক্ষ্য করলাম এয়ারপোর্টটা আক্ষরিক অর্থেই চাষের জমি কেটে বানানো – নেহাত টারম্যাক নজরে আসছিল, না হলে ভাবার বিলক্ষণ কারণ ছিল ইমার্জেন্সি ল্যান্ডিং হতে চলেছে। কিন্তু সার্বিয়া বলুন কি স্লোভেনিয়া, সবই তো সেই আদি য়ুগোস্লাভিয়া থেকেই বেরিয়েছে। ইস্টার্ন ব্লক-ইস্টার্ন ব্লক গন্ধটা সহজে গা থেকে মোছার নয়, তাই লুবলানিয়ার এয়ারপোর্টে প্লেন ল্যান্ড করার সময় মনে হতেই পারে সারা শহরটা লোডশেডিং-এ ডুবে।
মার্টিনের প্রশ্নের উত্তর দিতে যাচ্ছি, অন্ধকার রাস্তায় ক্যাঁআআআআচ শব্দ করে ট্যাক্সি থামল।  দেখি দশ-পনের ফুট দূরে এক ঝাঁকড়াচুলো মূর্তি হাইওয়ের ওপরে উঠে এসেছে। মার্টিন অস্ফূটে একটা গালাগালি দিলেন কিন্তু মার্কিনী বা ব্রিটিশ ইংলিশের তাবৎ গালাগালির থেকে একটু আলাদা শোনালো। ঝাঁকড়াচুল ধীরে ধীরে হাইওয়ে ক্রস করছে, মার্টিন পেছনে ফিরে একগাল হেসে বললেন ‘নিয়েন্ডারথাল’। পিচব্ল্যাক অন্ধকারের সিল্যুয়েটে ঝাঁকড়াচুলের পোষাকপরিচ্ছদের ব্যাপারটা ইগনোর করে গেলে একটা নিয়েন্ডারথাল লুক আসে বটে কিন্তু আমি এহেন অ্যানথ্রোপলজিক্যাল গালি শুনে বিলক্ষণ ইম্প্রেসড। দূরে তাকিয়ে দেখি পাহাড়ের মাথায় একাকী এক গির্জা; মনে হল নিয়েন্ডারথালটি যেন গির্জার তালাটি লাগিয়ে, শেষবারের মতন ঘন্টাটি বাজিয়ে ধীরে ধীরে বাড়িমুখো হয়েছেন। কবেকার গির্জা সেটা শুধিয়ে অবশ্য লাভ হল না, আমার ট্যাক্সিচালকটি পরিচয় পেয়ে মহা উৎসাহে ততক্ষণে জানাচ্ছেন ট্যাক্সি চালানোটা নেহাতই তাঁর পার্টটাইম জব, রিয়াল এস্টেটের বিজনেসটাই আসল সুতরাং অর্থনীতি নিয়ে পেশার খাতিরেই তাঁকেও ওয়াকিফহাল থাকতে হয়। নিয়েন্ডারথালকে নিয়ে যে রোমাঞ্চ জেগে উঠেছিল, ইনফ্লেশন এবং রিসেশনের তাড়নায় সেটাকে আপাতত মুলতুবি রাখতে হল।
ইউনিভার্সিটি অফ লুবলানিয়া (এ দেশের রাজধানী) থেকে স্লোভেনিয়ার ন্যাশনাল মিউজিয়ম  ট্যাক্সিতে সাকুল্যে দশ  মিনিটের রাস্তা (অবশ্য রেল স্টেশন-ও দশ মিনিট, সিটি সেন্টার-ও দশ মিনিট, শহরের যে কোনো প্রান্ত থেকে যে কোনো প্রান্তে যেতে ওই দশ মিনিটই লাগে) – রিসার্চ সেমিনার দেওয়ার কথা দুপুর একটায়, মিউজিয়ম খোলে সকাল দশটায় সুতরাং ঢুঁ মারাই যায়। গিয়ে চমৎকৃত হলাম, ন্যাশনাল মিউজিয়মে আমি একমাত্র দর্শনার্থী কিন্তু টিকিট যিনি দেবেন তাঁর সন্ধান নেই। প্যালেশিয়াল বিল্ডিং-এর ভেতরে সিঁড়ি দেখেই  মনে হয় এই বুঝি কমল মিত্র গাউন পরে পাইপ চিবোতে চিবোতে নেমে আসবেন। কমল মিত্রের বদলে তড়িঘড়ি নেমে এলেন এক স্বর্ণকেশিনী, সকাল দশটাতেই দর্শনার্থীর আগমনের খবরে একটু বিস্মিত। দিলেন দু’খান টিকেট, সিঁড়িতে উঠে বাঁদিকে বেকে গেলেই ন্যাশনাল মিউজিয়ম আর ডানদিকে ঘুরলে ন্যাচারাল মিউজিয়ম। জাতীয় জাদুঘরটি নিজেই জাদুঘরে স্থান পাওয়ার যোগ্য কারণ কিছু প্রাগৈতিহাসিক ছোরাছুরি, থালাবাটি ছাড়া দেখার কিছু নেই; সব নাকি শহরের অন্যান্য মিউজিয়মে দান করা হয়েছে। কিন্তু তাক লাগিয়ে দিল ন্যাচারাল মিউজিয়ম। ট্যাক্সিডার্মি নিয়ে হরর স্টোরি কম পড়িনি কিন্তু সকাল সাড়ে দশটার সময়েও প্রায়ান্ধকার ঘরের চতুর্দিক থেকে অপলকে তাকিয়ে থাকা হরেক কিসিমের প্রাণীদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকার অনুভূতি সে সব ভয়াল গল্প পড়েও পাইনি।
taxidermy 2
কথায় বলে ‘মরা মাছের চোখ’ – নিষ্প্রাণ, নির্জীব, অনুভূতিশূন্য। কখনোসখনো মানুষের চোখ দেখেও মনে পড়েছে সেকথা কিন্তু এই বিভুঁই-এ মরা মাছের চোখও কথা বলে, দুটো গভীর কালো কোটর মনে করিয়ে দেয় গভীর জলের রহস্য আমাদের এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
Taxidermy 3
কিন্তু না,  শ্বদন্ত বার করে থাকা নেকড়ে কি সারি সারি বয়ামে ডুবে থাকা বিষাক্ত সরীসৃপ কিম্বা জলশূন্য জলাধারে রাখা গভীর সমুদ্রের বিস্ময় নয়,  গা শিউরে ওঠানোর জন্য আপনাকে যেতে হবে মিউজিয়মের বাইরে। লুবলানিয়া থেকে আরো দক্ষিণে পোস্তায়না গুহায়, পাঁচশ হাজার বছরের পুরনো অগুন্তি স্ট্যালাগমাইটের থামের নীচে সেখানে অপেক্ষা করছে লর্ড অফ দ্য রিংসের স্মিগোল। পোশাকি নাম ওম, ইংরেজিভাষীদের সুবিধার্থে ডাকা হয় ‘হিউম্যান ফিশ’ নামে। গোলাপী মসৃণতার এই হিলহিলে শরীরে চোখের কোনো জায়গা নেই, মাছের থেকে সাপের সঙ্গেই মিল বেশী হয়ত। পাখনার জায়গায় পা,  জলজ উদ্ভিদের মত কানকো বেরিয়ে রয়েছে মাথার দুদিকে থেকে।  স্লোভেনিয়া, বসনিয়া কশ্চিৎ ইটালির কোনো গুহার অতলে দেখা পেয়ে যেতে পারেন এই প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর।
Human Fish
ওহ, প্রাগৈতিহাসিক বললাম কি? সেই অ্যানথ্রোপলজিক্যাল গালির-ও রহস্যভেদ হল যে। চারশ হাজার বছর আগে এই স্লোভেনিয়াতেই ঘাঁটি ছিল সেই আদিম মানুষের। এ দেশ থেকেই শুরু করেই ধীরে ধীরে বাকি ইয়োরোপ হয়ে মধ্য এশিয়া অবধি ছড়িয়ে পড়ে এদের বিস্তার।  স্লোভেনিয়ার ন্যাশনাল মিউজিয়মে দেখা পাওয়া যাবে নিয়েন্ডারথাল ফ্লুটের।  প্রায় পঞ্চাশ হাজার বছর আগেও ইয়োরোপের গুহায় বাঁশি বেজেছে ভাবলেই অবাক হতে হয়, তাই না? নিয়েন্ডারথাল আর নেহাত তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শব্দ নয় তাহলে, স্পষ্টতই  দেখা যাচ্ছে তারাও সংবেদনশীল মানুষ ছিল, কে জানে ওই প্রিমিটিভ বাঁশির মধ্যেই হয়ত লুকিয়ে আছে আদি ভাষাবিস্তারের রহস্য।
Neanderthan Flute
গুহার সঙ্গে স্লোভেনিয়ার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন। না মানুষী হিউম্যান ফিশ কি আদি মানব নিয়েন্ডারথালরাই নয়, এ দেশের গুহার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক শিভ্যালরাস গল্পও – পরের দিন জানাবো সেই স্থানীয় রবিন হুডের কথা।
আলপাইন পাদদেশ এখান থেকেই শুরু, রাত্রের অন্ধকারে সুউচ্চ পাহাড়গুলোকে ঘুমন্ত দৈত্যের মতন দেখতে লাগছে। ঘোড়সওয়ার তাঁর বাহনের বল্গা ধরে থামালেন,  তাঁর পেছনে সার দিয়ে যারা আসছিল নেতার হাতের ইশারায় থেমে  গেছে তারাও। বাঁদিকে একটা চড়াই রাস্তা উঠে গেছে পাহাড়ী গ্রামের দিকে, কয়েক ঘর মাত্র চাষীর বাস সেখানে, বিকাল-সন্ধ্যার মুখেই সে গ্রাম নিস্তেজ হয়ে গুটিয়ে নেয় নিজেকে। সে রাস্তা ধরে নেমে আসছিল আর এক সারি ঘোড়সওয়ারের দল।  মশালের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে অপেক্ষমান  যোদ্ধাদের মুখ, উত্তেজনায় সুস্পষ্ট প্রায় প্রত্যেকটি মুখাবয়ব। নেমে আসা ঘোড়সওয়ারদের কাছেও শুধু ব্যর্থতা সংবাদ, পাওয়া যায় নি তাকে কোথাও। ফেলে আসা গ্রামের সব কটিতেই শোনা গেছে তার নাম কিন্তু কেউই জানে না সে কোথায় থাকে, সংখ্যাগুরু গ্রাম্য চাষীদের কথা ধরলে মেনে নিতে হয় অতিলৌকিক কোনো অস্তিত্বের কথা। কিন্তু অতিলৌকিক সে মোটেই নয়, ভিয়েনার রাজদরবারে খোদ রোমান সম্রাটের আত্মীয়কে খুন করে এসেছে। দূর দূরান্তের জমিদাররাও হলফ করে বলবেন যে অশরীরী আত্মা নয়, যে দস্যুর হাতে বারংবার লুন্ঠিত হয়েছে তাঁদের ধনসম্পত্তি সে দস্তুরমতন মানুষ – রাগী, একগুঁয়ে এবং নিষ্ঠুর। শোনা যায় এই অঞ্চলেই তার দুর্গ কিন্তু কেউ চাক্ষুষ দেখেনি।
শেষবারের মতন চোখ বুলিয়ে পিছু হটলেন সেনাধ্যক্ষ, সম্রাট ফ্রেডেরিকের দরবারে ফিরে যাওয়ার আগে এখনো খানতল্লাশ নেওয়া বাকি আরো কিছু গ্রামের। যেমন অকস্মাৎ ঢুকে এসেছিল ঘোড়সওয়ারের দল, প্রায় ততটাই তাড়াতাড়ি মিলিয়ে গেল তারা। জানতেও পারল না, কাছেই সেই আলপাইন পাহাড়ের মধ্যের একটি গুহা থেকে সারি সারি চোখ নজর রাখছিল তাদের। সারি সারি চোখের পাশেই প্রস্তুত ছিল সারি সারি কামান। স্যাঁতস্যাঁতে ঘরের ছোট্ট ঘুলঘুলি থেকে নজর সরিয়ে শুরু হল সাময়িক উল্লাস, ইতিউতি স্বস্তির নিঃশ্বাস। গুহার মধ্যেই লুকিয়ে থাকা প্রায় পাঁচতলা সমান কেল্লার এক তলা থেকে আরেক তলায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগল খবর, শেষ তলার-ও শেষে যেখানে গুহার নীচে শীতের রাত্রে ঘুমিয়ে আছে হাজার হাজার বাদুড়, সেখানেই কোনো ঘরে অস্থির পায়চারি করছেন দস্যুনেতা এরাজেম, কেল্লার মধ্যে অবশ্য তিনি ব্যারন।
প্রেডযামা কেল্লার মধ্যে সুখ, স্বাচ্ছন্দ্য বা বৈভব, ছিল না কোনোটাই কিন্তু সুরক্ষার দিক থেকে এ কেল্লা অতুলনীয়।  প্রেডযামার আক্ষরিক অর্থই হল গুহার সম্মুখবর্তী, অবশ্য বহু বছর ধরে অনেকেই জানতে পারেননি ওই গুহার মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটি কেল্লা। সম্রাট ফ্রেডেরিকের সৈন্যরাও ব্যতিক্রম নয়। ব্যারন এরাজেম কে বলাই যেতে পারে স্থানীয় রবিনহুড। গোটা অস্ট্রিয়ার বহু ভূস্বামীর কাছে তিনি অতিপরামক্রমী এক দস্যু, স্থানীয় কৃষকদের কাছে মূর্তিমান ভগবান। যদিও আক্ষরিক অর্থে রবিন হুডের যে রোম্যান্টিক ইমেজ ছিল সেজাতীয় কিছু শোনা যায় না এনার ক্ষেত্রে, এবং কেল্লার মধ্যে অবস্থিত টর্চার চেম্বারটি যে শুধু  অপহৃত  ধনী ভূস্বামী বা বিশ্বাসঘাতক সৈন্যদের জন্যই খোলা  থাকত, এমনটাও হলফ করে বলা যায় না। আশ্চর্যের কথা এই যে এরাজেমের তিনশ বছর আগেই তৈরী হয়েছে এ দুর্গ, কিন্তু এ দুর্গের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত ছিলেন খুব কম লোকেই। তাই পনেরশ শতকেও এরাজেমের কেল্লা বার করতে নাজেহাল হয়ে গেছিল ফ্রেডেরিকের সৈন্যরা। অবশ্য খোদ রোমান সম্রাটে যেখানে আদেশ দিয়েছেন, ধরা একদিন না একদিন পড়তেই হত। কিন্তু এক বছর ধরে সেই কেল্লায় ঢুকতে পারেনি রোমান সম্রাটের সৈন্যবাহিনী। আশা ছিল কেল্লা অবরোধ করে বসে থাকলে না খেয়ে মরবে ডাকাতগুলো কিন্তু দিনের পর দিন ধরে এগোতে গেলেই গর্জে উঠেছে কামান। পরে জানা যায় ওই গুহার নিচেই গুপ্তপথে টাটকা খাবার এবং অন্যান্য রসদ যুগিয়ে যেত এরাজেমের সহযোগী হাঙ্গারিয়ান রাজা মাথিয়াস করভিনাসের লোকেরা। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক বীরগাথাই যেভাবে শেষ হয়, এটিও শেষ হয়েছে সেভাবেই – বিশ্বাসঘাতকের ছলনায় মৃত্যু হয় এরাজেমের, শত্রুপক্ষের কামানের গোলায় পতন হয় দস্যু ব্যারন এবং তাঁর গুপ্ত সাম্রাজ্যের।
Cave 2
প্রেডযামা ক্যাসল অবশ্য টিঁকে যায়, ১৫৮৩ তে কাউন্ট ইভান কবেনজল আরো বাড়ান কেল্লাটিকে – তৈরী করেন একটি টাওয়ার সদৃশ প্রবেশপথ। কাউন্টের পছন্দের স্থাপত্যই রয়ে গেছে এখনো, তবে যে অ্যাডভেঞ্চারাস ব্যাপারস্যাপারের সঙ্গে প্রেডযামা প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছিল সেসবে ইতি পড়ে। শেষ শ’তিনেক বছর ধরেই দুর্গের মালিকানা বদলাতে থাকলেও প্রায় সবাই কেল্লাটিকে হান্টিং লজ হিসাবেই ব্যবহার করে এসেছেন। তার সাক্ষী কেল্লার প্রায় প্রতিটি প্রাঙ্গণ।
Cave 3
যদি কখনো ব্যাকপ্যাকিং করতে করতে একা একাই পৌঁছে যান স্লোভেনিয়া, পোস্তায়না গুহায় যেতে ভুলবেন না – যে গুহার কথা লিখেছিলাম আগের কিস্তিতে। সেখানে আপনার জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে স্ট্যালাকটাইট আর স্ট্যালাগমাইটের অবিস্মরণীয় স্থাপত্য সৌন্দর্য, প্রাগৈতিহাসিক ‘হিউম্যান ফিশ’ আর বাস ভর্তি চাইনীজ এবং কোরিয়ান সহপর্যটক। সে ভিড় থেকে বেরিয়ে একটু একা হতে চাইলে অবশ্যই যেতে হবে প্রেডযামা ক্যাসলে। ভরসা একটিমাত্র ট্যাক্সিই কারণ আপনার মতন ইম্প্রম্পটু ঘুরতে বেরনো পর্যটকের সংখ্যা হাতে গোণা, খরচ-ও একটু আছে কিন্তু তারপরেও কার্পণ্য না করে চলে যাবেন। আটশ বছরের ইতিহাসকে একটা নিভৃত দুপুরে নিজের কল্পনায় বর্তমান করে তুলতে পঁচিশ ইউরো নাহয় বেশী পড়ল; ভেবে নিতে পারেন ও আপনার প্রায়শ্চিত্তের খরচ। কিসের প্রাচিত্তির? বাহ, যে অনর্থক, অচেতন, অবিবেচক ইতিহাস পড়ে এসেছেন স্কুলের সাত-আটটা বছর ধরে, সেটার গুনাগার গুনে দিতে হবে না?
Cave 4
তবে সব ক্যাসলে গিয়েই ইতিহাসের সঙ্গে রোম্যান্স করবেন ভাবলে কিন্তু স্লোভেনিয়ানরা আবার অ্যানথ্রোপলজিক্যাল গালি দিতে পারে, মনে আছে তো? যেমন ধরুন ব্লেড ক্যাসলের কথা। লোনলি প্ল্যানেট থেকে শুরু করে অমরেন্দ্র চক্রবর্তী (আমি পড়িনি কিন্তু ধারণা করছি ভ্রমণের কোনো একটা সংখ্যায় নিশ্চয় লেখা আছে) অবধি বলছেন লেক ব্লেডের নীল রঙ দেখে না থাকলে আপনার জীবন বৃথা, এমনকি অরেগনের পৃথিবীবিখ্যাত ক্রেটার লেক দেখে প্রক্সি দিলেও চলবে না। তো লুবলিয়ানা থেকে ঘন্টাখানেকের ট্রেনজার্নি  করে পৌঁছলেন ব্লেড স্টেশনে (আগের দিন লিখেছিলাম লুবলিয়ানার মধ্যে সব জায়গা যেতে লাগে দশ মিনিট, আর আজকে জানিয়ে রাখি লুবলিয়ানা থেকে স্লোভেনিয়ার বাকি যে কোনো জায়গা যেতে মোটামুটি এক ঘন্টা) – ট্যাক্সি ড্রাইভারের সঙ্গে খেজুরে করতে করতে আরো মিনিট পনেরো পরে পৌঁছে  তো গেলেন লেকে। কিন্তু মন তো কিছুতেই ভরছে না; মনে হচ্ছে এ আর কি লেক, এমনটা তো হামেশাই দেখে থাকি – জলের রংটাও খাস কিছু লাগছে না । একবার মনে পড়ে গেল ট্যাক্সি ড্রাইভার বলছিল য়ুগোস্লাভিয়া হয়ে থাকার সময় এ চত্বর অত বিখ্যাত হয়নি অথচ ইনকাম ইনইকুয়ালিটি ছিল বিস্তর কম – তাহলে কি সবই ক্যাপিটালিস্ট চক্রান্ত? জার্মান  ব্যাটারা ইউরোপীয়ান ইউনিয়নে ঢুকিয়ে দিয়ে মার্কিনী কায়দায় আউট্রাম ঘাটকে হর কি পৌরী বলে চালিয়ে দিচ্ছে? সবুর, সবুর।
ওই দেখুন, পাহাড়ের ওপরে দেখা যাচ্ছে ব্লেড ক্যাসল। কোনো সিদ্ধান্তে আসার আগে খাড়াই রাস্তা ধরে একটু কষ্ট করে ঘুরতে ঘুরতে উঠে পড়ুন। ক্যাসলের ভেতরে ঢুকে আদ্যিকালের ছাপাখানা পাবেন, ওয়াইনারি পাবেন, একটা মিউজিয়ম-ও পাবেন। কিন্তু কোন টুয়েলফথ সেঞ্চুরিতে কোন জর্মন রাজা প্রথমবারের জন্য ব্লেড ক্যাসলের কথা বহির্বিশ্বকে জানান সেসব জানতে আপনি এত ক্যালরি খরচ করেননি, ওসব উপলক্ষ্য মাত্র।  আপনি এসেছেন প্রেমেন্দ্র মিত্রকে ঝালিয়ে নিতে, সুধীন দাশগপ্তের সুর মনে না থাকলেও চলবে।
“নীল, নীল!
সবুজের ছোঁয়া কিনা তা বুঝিনা
ফিকে গাঢ় হরেকরকম কম-বেশী নীল“
তবে লেক কিনা, শূন্যে আনমনা গাঙচিলদের দেখতে পেলে অবাকই হবেন।
Lake Bled
তাই বলছিলাম, সব দুর্গপ্রাকারেই কি আর কামান গর্জন করবে ? কিছু প্রাকার থেকে জয়মালা-ও ফেলা যায়, হাতে  হাতে তালি মেরে উড়ে যাওয়ার আগে কিছু প্রাকারে দেখা দিয়ে যায় কম পড়ে যাওয়া রাজকন্যারা আবার কিছু প্রাকারের পাশে হাতে গড়া রুটির মতন ফুলকো এবং গরম পাউরুটি ছিঁড়ে হরিণের মাংস খেতে খেতে মনে হয় গলা ছেড়ে বলে উঠি “অগর ফিরদৌস বারুয়ে জমীন অস্ত/ হামিনস্তো, হামিনস্তো, হামিন অস্ত্”।