মঙ্গলবার, ২৫ মার্চ, ২০১৪

একটুখানি হাঁটাহাঁটি ... ভুটানের পথে পথে...

এই লেখাটা লিখতে লিখতেই দেখলাম এর মধ্যেই ভুটান নিয়ে দুইটা লেখা হয়ে গিয়েছে। তারপরও অভিজ্ঞতা শেয়ার করার লোভ সামলাতে পারলামনা। গত মাসে আপুনি হঠাৎ একদিন ফোন দিয়ে বলল, “১ ঘন্টার মধ্যে ডিসিশন নাও, ভুটান যাব, তুমি যাবা কিনা।” আমি ব্যাপক দোনোমনায় পড়ে গেলাম। আপুনিকে বললাম, আমার টাকা নাই। যাই হোক, আমার ঘুরাঘুরির পাগলা মনের সাথে পারলামনা। রাজি হয়ে গেলাম। যাওয়ার আগের দিন সকাল পর্যন্ত আমাদের টিকেট কনফার্ম হয়নি। আগের দিন দুপুর ২টায় টিকেট কনফার্ম হল। সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখ সকাল ১০টায় আমি, আমার আপুনি, মুঈদ ভাইয়া আর অপু সহ ড্রুক রয়্যাল এয়ারওয়েজে রওনা দিলাম ভুটান। তখনও জানিনা পরবর্তী ৬ দিন কী কী অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য! ভুটানে বাংলাদেশীদের প্রবেশের জন্য পোর্ট এন্ট্রি ভিসা, তাই বিমানে যাবার সময় ভিসা করাবার প্রয়োজন নেই।
এয়ারপোর্টে নামার আগ পর্যন্ত আমরা জানতামনা ভুটানে তামাক জাতীয় জিনিস বহন করা এবং রাস্তাঘাটে খাওয়া নিষিদ্ধ। নেমেই সিগারেট বহন করার জন্য মুঈদ ভাইয়া আর অপুকে কাস্টমসে প্রায় ১২০০ নুল্ট্রাম (Ngultrum) ট্যাক্স দিতে হল। সেইসাথে ওদেরকে একটা সার্টিফিকেট দেয়া হল যেটা দেখিয়ে ওরা ভুটানের যে কোন দোকান থেকে লিগ্যালি সিগারেট কিনতে পারবে। পুরো ট্যুরের পরের সময়গুলোতে এরা স্মোক করার সময় এই মূল্যবান সার্টিফিকেট হাতে নিয়ে খুশিমনে স্মোক করত। আমরা কোন ট্র্যাভেল এজেন্টের সাথে যোগাযোগ করে যাইনি বলে আগে থেকে হোটেল ঠিক করা ছিলনা। এয়ারপোর্টে নেমে সিঙ্গাজি নামের ক্যাব চালকের সাথে আমরা রওনা দিলাম থিম্পুর পথে। এই সিঙ্গাজি পরের কয়টাদিন আমাদের জীবনটা ভাজা ভাজা করে দিয়েছে...সে গল্পে পরে আসছি। আমাদের প্ল্যান ছিল থিম্পু গিয়ে সেখান থেকে পারমিট নিয়ে সোজা পুনাখা চলে যাব। প্ল্যান অনুযায়ী থিম্পু গেলাম। দিনটা ছিল রবিবার। আমাদের কারোরই মাথায় ছিলনা ব্যাপারটা। যথারীতি সব অফিস বন্ধ। সো, ঐদিনের জন্য নো পারমিট, নো ডলার ভাঙ্গাভাঙ্গি। মোটামুটি ধরনের একটা হোটেলে উঠলাম ঐদিনের জন্য। দুপুরের পর সবাই বের হলাম হেঁটে হেঁটে থিম্পু শহর ঘুরে দেখতে। আসলে পুরো শহররের প্রতিটা জায়গাই ছবির মত সুন্দর। শহরে ঢোকার মুখেই চোখে পড়েছিল বিশালাকৃতির বুদ্ধাকে, যিনি ঐ উঁচু থেকে শহরের সবকিছু আর সবাইকে পর্যবেক্ষণ করছেন প্রতিমুহূর্তে। ঠিক হল হেঁটে হেঁটে আশপাশ দেখতে দেখতে আমরা বুদ্ধা পয়েন্ট যাব। হোটেল এর ম্যানেজারকে হেঁটে যেতে কতক্ষণ লাগবে জিজ্ঞেস করায় উনি বললেন, “এইতো কাছেই, চলে যান”। সেই ভরসায় হাঁটা দিলাম। কাছেইতো, এই ভেবে হাঁটি আর ছবি তুলি আশপাশের। মোটামুটি ঘণ্টাখানেক হাঁটার পরও দেখি লোকজন বলে এইতো কাছেই, আরেকটু! এর মধ্যে Dechen নাম্নী এক ভুটানি কন্যাও আমাদের সঙ্গী হল। সে তখন সারাদিনের ঘুম শেষে উঠে হাঁটতে বেরিয়েছে। আমরা ৫ জনের ছোট্ট দল হাঁটতে থাকি। থিম্পুর উঁচু ভ্যালি থেকে চারপাশের পাহাড়, পাহাড়ের বুকে ছোট ছোট বাড়ি আর পাহাড় চূড়ায় মেঘ...এত অদ্ভুত সুন্দর, যেন দেখে শেষ হচ্ছিলনা।

ছবিঃ বুদ্ধা পয়েন্টের পথে
এদিকে পথও আর শেষ হয়না! কিন্তু দিনের আলো ঠিকই শেষ হয়ে আসতে থাকে। প্রায় ঘন্টা তিনেক হাঁটার পর তেনার (বুদ্ধা) দেখা পেলাম। সন্ধ্যার আলো আঁধারিতে ১৬৭ ফিট এর বিশালাকৃতি বুদ্ধাকে দেখে নিজেকে তুচ্ছ মনে হচ্ছিল তখন। পুরো শহরটাকে চোখে পড়ে এখান থেকে। বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকলাম এখানে। এবার ফেরার পালা। কোন গাড়ি, ক্যাব কিচ্ছু নাই। আবার হাঁটা শুরু করলাম ৫ জন। মিনিট ১৫ হাঁটার পর একটা পিকআপ থামিয়ে তার পেছনে চড়ে চলে আসলাম রাতের থিম্পু শহরে। পৃথিবীতে একমাত্র এ শহরেই কোন ট্র্যাফিক লাইট নেই।

ছবিঃ বুদ্ধা পয়েন্ট
দ্বিতীয় দিনের গন্তব্য পুনাখা। নাস্তা খেতে নেমেই দেখি আমাদের আগের দিনের সেই সিঙ্গাজি এসে হাজির! ট্রেকিং পারমিট নিয়ে, ডলার ভাঙ্গিয়ে ১১টায় রওনা দিলাম থিম্পু থেকে পুনাখার পথে। ঘণ্টাখানেক পরেই আমাদের গাড়ি থামে দোচুলা পাসে। মেঘের ভিতর নেমে পড়ি আমরা। আমাদের চারপাশে মেঘ আর বাকি সব অস্পষ্ট। খুব আস্তে আস্তে মেঘ সরতে থাকে। ১০৮ chorten এর Druk Wangyal Chortens আমাদের সামনে। স্থানীয়দয়ের কাছে এ জায়গা আরও জনপ্রিয় The Druk Wangyal Lhakhang (temple) এর জন্য। মন্দিরের পুরোহিত কার্মা জানাল, চতুর্থ Druk Gyalpo, Jigme Singye Wangchuck এর সম্মানে ২০০৩ সালে এটা তৈরী হয়। বছরে অন্তত একবার রাজা এখানে ঘুরতে আসেন। মন্দিরের ভিতর-বাহিরের দেওয়াল জুড়ে বৌদ্ধ দেবতাদের ঐতিহাসিক কাহিনী ছবির মাধ্যমে বর্ণনা করা।

ছবিঃ The Druk Wangyal Lhakhang (temple)
প্রবল কুয়াশা আর বৃষ্টির জন্য দোচুলা ক্যাফের উপর থেকে হিমালয় দর্শন করতে না পারার কিঞ্চিত দুঃখ নিয়ে কেবল কফির স্বাদ নিয়েই আমাদের চলে আসতে হয়েছে। আরও ঘণ্টা দুয়েক পরে পৌঁছে যাই ভুটানের পুরনো রাজধানী পুনাখায়। আমাদের গাড়িটা যেখানে গিয়ে থামে, সেখানে নেমে বুকে ধাক্কার মত লাগল! চারপাশ পুরা দম বন্ধ করা সুন্দর...সবুজ পাহাড়, সবুজ গাছ, ছিমছাম রাস্তা-ঘাট, ছোট্ট শহর। হোটেল আর পরের দিনের ট্রেকিং এর জন্য গাইড ঠিক করে, রওনা দিলাম পুনাখা জং এর উদ্দেশ্য। সূর্য ডোবার আগেই পচু আর মচু নদীর সঙ্গম দেখার ইচ্ছা সবার। পচু (ছেলে নদী) আর মচু (মেয়ে নদী) নদীর ঠিক মাঝখানেই এই বিশাল সুদৃশ্য পুনাখা জং, শহরের মানুষের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উপাসনালয় আর প্রশাসনিক কাজের কেন্দ্র।

ছবিঃ পুনাখা জং
এই দুই নদীর ভিন্ন দুই স্রোত মিশে সৃষ্টি পুনাসাংচু নদীর। নদী আর জং ঘুরে রাতে পুনাখা শহরে ফিরে এসে পরের দুদিনের ট্রেকিং এর জন্য কেনাকাটা করলাম।
গাইড শ্রীং, পোর্টার গাসাজি সহ আমাদের ৬ জনের দল তৃতীয় দিন সকালে পুনাখা থেকে ট্রেকিং শুরু করলাম। গন্তব্য লিম্বুখা হয়ে সামতেঙ্গাং পর্যন্ত যাব। পুরো পাহাড়ী পথে আমরা এক এক করে ছোট ছোট গ্রাম, ধানক্ষেত, ওক আর পাইনের বন, সারি সারি রডোডেন্ড্রন এর ঝাড় পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলাম। অনেকদিনের অনভ্যাসে যদিও প্রথম দিকে পাহাড়ে উঠতে বেশ কষ্টই হচ্ছিল।

ছবিঃ ট্রেকিং
দুপুরে পথেই গ্রামের একটা বাসায় থেমে সাথে নেয়া ম্যাগী নুডুলস দিয়ে লাঞ্চ সেরে আবার রওনা দিলাম। মজার বিষয় হল হাঁটা শুরু করার কিছুক্ষণ পরেই আমরা টের পেয়েছিলাম যে আমদের গাইড শ্রীং আর পোর্টার গাসাজি দু’জনেই এই পথটা কিছুটা কম চিনে। তারা অনেক আগে এই রাস্তায় গিয়েছিল। আমরা এই ঘটনা টের পেয়ে গেছি বোঝার পর শ্রীং অবশ্য অভয় দিয়ে বলল, যে কোন সমস্যা নাই, তারা আমাদের ঠিকমত পৌঁছায় দিবে। যাই হোক, মোটামুটি এই তাপশিল্লা পাহাড়ের ভিতরের দিকে ঢোকার পর শুরু হল তুমুল বৃষ্টি। একেতো উপরের দিকে ওঠা, তার উপর গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত যুক্ত হল কাদা আর স্লিপি রাস্তা, সেইসাথে বৃষ্টির জন্য শুরু হল জোঁকের উপদ্রব। এর মাঝে আমি ২ বার আছাড়ও খেয়ে ফেললাম।

ছবিঃ যে ভ্যালি দিয়ে ট্রেকিং করে এসেছি (পাহাড়ের উপর থেকে তোলা ছবি)

ছবিঃ ট্রেকিং এর পথে দেখা ধানক্ষেত
বৃষ্টির জন্য বিরক্তিও লাগছিল, কিন্তু বৃষ্টির কারণে পুরো জঙ্গল ঘন সবুজ হয়েছিল দেখে মনটাও ভরে যাচ্ছিল। বিকাল ৪:৩০টার দিকে শ্রীং যখন বলল “আমরা এখন পাহাড়ের একদম চূড়ায়। নিচের দিকে দেখিয়ে বলল তোমরা মেইন ল্যান্ড থেকে প্রায় ৭,৫০০ ফিট উপরে”, তখন নিজের কাছেই বিশ্বাস হচ্ছিলনা যে দুইবারের ভাঙ্গা পা নিয়ে এতখানি উঠে আসছি! এরপর আমরা পাহাড় থেকে নিচের দিকে নামা শুরু করলাম। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই এই জঙ্গল থেকে বের হতে হবে এই পরিকল্পনা নিয়ে। কারন। পুরো হাঁটার সময়টাতে আমরা কোন পাখির ডাক শুনিনি। শ্রীং ব্যাপক চিন্তিত! ঘণ্টা দেড়েকের মাঝেই আমরা জঙ্গল ছেড়ে খোলা জায়গায় বের হয়ে আসলাম। তখনও জানতামনা যে সামনে আরও একটা জঙ্গল আমাদের জন্য আপেক্ষা করে আছে! ওই খোলা জায়গা থেকেই শ্রীং হাত দিয়ে দূরে দেখিয়ে বলল, “ঐ বড় গাছওয়ালা বাসাটায় আমরা রাতে থাকব। ঠিক ১ ঘণ্টার মাঝে পৌঁছে যাব।” গ্রামের নাম Kajhi। শ্রীংই ওদের সাথে কথা বলে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। আবার হাঁটতে শুরু করলাম। যতই হাঁটি মনে হচ্ছিল বাসাটা আরও দূরে সরে যাচ্ছে। একটু পরেই বুঝলাম যে শ্রীং এবং গাসাজি আবার রাস্তা হারিয়ে ফেলেছে! চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকার, নিচে প্যাচপ্যাচে কাদায় পা মাখামাখি হয়ে যাচ্ছে, আশপাশে বন্য শূকরের শব্দ, সব ছেলেগুলোর হাতে সিগারেট, মোবাইলে ভুটানি গান বাজছে, আর ওয়াটার চ্যানেলের পাশ দিয়ে যাওয়া চিকন রাস্তায় আমরা ৬ জন লাইন ধরে হাঁটছি। সবাই খুব টেন্সড। বন্য কোন প্রাণী আশপাশে থাকলে যেন টের পাওয়া যায় তাই গাসাজি আর শ্রীং একটু পরপর মুখ দিয়ে আওয়াজ করছে। এবড়ো-থেবড়ো রাস্তা আর ঝোপঝাড়ের মাঝখান দিয়ে ডালপালা সরিয়ে সরিয়ে আমরা হাঁটছি আর হাঁটছি। একটু পরপর কেউ না কেউ উঁচু নিচু পাথরে উশটা খাচ্ছি। একটা সময় ব্যথা, ক্লান্তি কোন অনুভূতিই আর কাজ করছিলনা। কেউ কারও সাথে কোন কথা পর্যন্ত বলছিলামনা। ঐ বাসায় পৌঁছাতে আর কতক্ষণ লাগবে জিজ্ঞেস করলেই শ্রীং বলছে, “এইতো আর ১ ঘণ্টা!” অবশেষে পথ হারিয়ে আবার খুঁজে খুঁজে প্রায় ৪ ঘণ্টার মাথায় যখন আমরা খান্দু ইয়াঙ্কার বাসায় পৌঁছলাম ঘড়িতে তখন রাত পৌনে দশটা। সবাই বিধ্বস্ত। গোসল সেরে রাতে যখন ডিম ভর্তা আর এমাদাতশি [ভুটানের জাতীয় খাবার। মরিচ (এমা) আর স্থানীয় পনির (দাতশি) দিয়ে মাখানো ভর্তা] দিয়ে লাল মোটা চালের ভাত খেলাম, মনে হচ্ছিল স্বর্গীয় খাবার খাচ্ছি। রাতে সবাই গল্প করতে বসে সারাদিন ধরে চেপে রাখা সব তথ্য একে একে বের হতে লাগল। প্রথম জঙ্গলে যখন কোন পাখির ডাক শুনতে পায়নি, তখনই শ্রীং আর গাসাজির সন্দেহ হয় যে এখানে বাঘ থাকতে পারে। জঙ্গল থেকে বের হয়ে আসার পর স্থানীয় একজন বলে, এলাকায় যে অল্প কিছু ঘর সেগুলোর লোক বেশিরভাগই বাঘের ভয়ে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে। দ্বিতীয় জঙ্গলটায় হাঁটার সময় আমি ছাড়া বাকি সবাই এক মুহূর্তের জন্য অন্ধকারে এক জোড়া চোখ দেখতে পেয়েছে। ঐ সময় বাকিরা ভয় পাবে ভেবে কেউ কারো সাথে এ কথা শেয়ার করেনি। প্রত্যেকে যার যার মত করে ইনিশিয়েটিভ নিয়েছে। শ্রীং, মুঈদ ভাইয়া আর অপু আগুন জ্বালিয়ে রাখার জন্য ক্রমাগত সিগারেট খেয়েছে, আওয়াজ হলে বন্য প্রাণীরা দূরে থাকে এজন্য মোবাইলে গান বাজিয়েছে। হিংস্র প্রাণী আক্রমণ করলে দলের মধ্যে ছোটখাটো আর দুর্বল মানুষকে আগে ধরে, তাই সেভ করার জন্য আমাকে সামনের দিক থেকে মাঝখানে নিয়ে আসা হয়েছিল (যদিও এটা তখন আমি বুঝতে পারিনি)! বিশাল দুইটা ছুরি হাতে গাসাজি আমাদের সবার সামনে আর শ্রীং সবার পেছনে প্রহরীর মত নিরাপত্তা দিয়ে গিয়েছে। আমরা যেই ওয়াটার চ্যানেলের পাশ ধরে হেঁটেছিলাম সন্ধ্যার পর থেকে বন্য প্রাণীরা এখানে পানি খেতে আসে। শ্রীং আর গাসাজি বলে যে, গন্ধ শুকেই উনারা মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল... কিছু ঘটলেই আগে আমাদের সেভ করার চেষ্টা করবে। এই ছিল মোটামুটি আমাদের দ্বিতীয় দিনের অভিজ্ঞতা!

ছবিঃ প্রেয়ার হুইল
ট্রেকিং শুরু করার একদম শুরুতেই আমরা একটা প্রেয়ার হুইল ক্রস করি। শ্রীং এর কথামত সবাই ওটার চারপাশে ৩ বার চক্কর দেই। বৌদ্ধরা বিশ্বাস করে, প্রেয়ার হুইলকে ঘিরে ৩ বার চক্কর দিয়ে অথবা প্রেয়ার হুইল ৩ বার ঘুরিয়ে কিছু চাইলে সেই ইচ্ছা পূরণ হয়। শ্রীং এর অবশ্য ধারণা তখন ও চেয়েছিল আমাদের যেন ঠিকমত পৌঁছে দিতে পারে, এজন্যই আমরা বিপদ মাথায় নিয়েও সুস্থভাবে পৌঁছাতে পেরেছি!

ছবিঃ সকালের Kajhi গ্রাম
আগের দিনের ক্লান্তির কারণে চতুর্থ দিন একটু আয়েশ করে ঘুমিয়ে বেলা করে উঠে আবার হাঁটা শুরু করি সামতেঙ্গাং এর উদ্দেশ্যে। গিল্লেখা গ্রামের মাঝ দিয়ে আড়াই ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাই সামতেঙ্গাং লেকের পাশে। সামতেঙ্গাং অংদি জেলার ছোট্ট একটা গ্রাম। পুরোটা হেঁটেই ঘুরে ফেলা যায়। গ্রামের রাস্তার দুইপাশে শান্ত, ঘন পাইন বন। এখানে আমরা সেগেই এর বাসায় উঠি রাত কাটানোর জন্য। আগেরবারের মতই শ্রীং ওদের সাথে কথা বলে এই ব্যাবস্থা করে নেয়। সামতেঙ্গাং এর আরেকটা দেখার মত জায়গা হল ওদের মিডল সেকেন্ডারি স্কুল। পুরাই একটা ফাইভ স্টার স্কুল। মনে হল এত সুন্দর, পরিষ্কার, শান্ত, স্নিগ্ধ স্কুল হলে জগতের সব বাচ্চা-কাচ্চা প্রতিদিন স্কুলেই আসতে চাইবে, থাকতেও চাইবে।

ছবিঃ সামতেঙ্গাং এর পাইনবন
পঞ্চম দিন সকাল নাস্তা খেয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম আমরা চুযমসা (অংদির ছোট্ট একটা শহর) এর পথে। এবার পুরোটা ছিল পাহাড় থেকে নামার রাস্তা। যথারীতি হাঁটার শুরুতেই শ্রীং বলল মাত্র আধা ঘণ্টার মাঝেই চুযমসা পৌঁছে যাব। সেখানে সিঙ্গাজী (ইনি সেই সিঙ্গাজী যিনি ভুটানে নামার পর থেকে আমাদের পিছু কোন ভাবেই ছাড়েনি। আমরা তাকে খসানোর অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু সে ফোন দিয়ে নানাভাবে আমাদের ধরে ফেলেছে) অপেক্ষা করবে আমাদের জন্য। যাই হোক, ঘটনা একটু পরেই বোঝা গেল, তারা দুইজন আবার রাস্তা গুলিয়ে ফেলেছে! পাইনের বনের মাঝ দিয়ে, ঝোপঝাড় সরিয়ে অবশেষে আড়াই ঘণ্টা পর আমরা দাংচু নদীর পাড়ের চুযমসায় পৌঁছলাম। এটাই ছিল আমাদের ট্রেকিং এর শেষ পয়েন্ট।

ছবিঃ দাংচু নদী, চুযমসা, অংদি
এই দুই দিনে আমরা প্রায় ৫০ কিলোমিটার রাস্তা খালি হেঁটেছিই। ঐদিনই অংদি থেকে ট্যাক্সি করে সরাসরি চলে আসলাম পারো। পারো পৌঁছাতে সন্ধ্যা হয়ে গেল। জানালা দিয়ে পারো নদী দেখা যায় এমন হোটেল ঠিক করেই বের হয়ে পরলাম রাতের পারো শহর হেঁটে হেঁটে ঘুরতে।
ষষ্ঠ দিন সকালে সবাই এত্ত ক্লান্ত যে আর হাঁটাহাঁটির শক্তি নাই। যাই হোক তবুও গেলাম বিখ্যাত টাইগার্স নেস্ট (Taktsang monastery) দেখতে। ভুটানিদের মতে, বৌদ্ধ গুরু রিনপোচে তিব্বত থেকে বাঘের পিঠে চড়ে এই পাহাড়ের চূড়ায় আসে। তার নামেই এই নামকরণ। এখানে যেতে হলে ঠিক কতদূর হাঁটতে হয় এ ব্যাপারে আমাদের কারোরই আগে থেকে কোন ধারনা ছিলনা। আমাদের ট্যাক্সি ড্রাইভার বলল ১ ঘণ্টা লাগবে উঠতে। হাঁটতে শুরু করে দেখি পথ আর শেষ হয়না! আপুনি এক সময় ঘোষণা দিল সে আর হাঁটতে পারবেনা, যাবেওনা ঐখানে। যাইহোক ঘণ্টা তিনেক হেঁটে গিয়ে monastery দেখে সব ক্লান্তি চলে গেল। পারো ভ্যালি থেকে ৩,০০০ ফিট উপরে অবস্থিত এই monastery ভুটানিদের কাছে অন্যতম পবিত্র স্থান হিসেবে পরিচিত। টাইগার্স নেস্ট এ ওঠার পথেই পাহাড়ের খাঁজে একটা ছোটখাট ধরনের লায়ন্স কেভও আছে। এটা তেমনভাবে চোখে পরেনা বললেই চলে।

ছবিঃ টাইগার্স নেস্ট

ছবিঃ লায়ন্স কেভ
সন্ধ্যায় ওখান থেকে নেমে আবার শেষবারের মত পারো শহর হেঁটে হেঁটে ঘুরে নিলাম। পরের দিন সকালে ফিরতি পথ ধরে চলে আসি আমার দেশে। ও আচ্ছা, এয়ারপোর্ট আসার পথে র্যা ন্ডমলি একটা ট্যাক্সি দেখে থামার জন্য হাত দেখাই। থামতেই দেখি সেই সিঙ্গাজী আবার!
খরচাপাতিঃ
প্লেন ফেয়ার রাউন্ড ট্রিপঃ জনপ্রতি ২২০০০ টাকা। ৬ দিন ঘোরাঘুরি, খাওয়া, ট্যাক্সি ভাড়া, হোটেলের রুম ভাড়া, গাইড, কেনাকাটা সবসহ জন প্রতি ২০০ ডলার।
শেষ কথাঃ
• যদিও আমাদের গাইড আর পোর্টার রাস্তা গুলিয়ে ফেলেছিল, তবুও বলতে বাধ্য হচ্ছি এরা দুইজনই খুবই ভালো ধরনের, কেয়ারিং আর দায়িত্বশীল টাইপ মানুষ ছিল।
• কোন মানুষকে রাস্তা পার হতে দেখলে এখানকার রাস্তায় গাড়ি নিজে থেকেই গতি কমিয়ে ফেলে।
• হাঁটার সময় রাস্তা...সে শহর, গ্রাম বা জঙ্গল যাই হোকনা কেন কোনভাবেই নোংরা করা যাবেনা।
• ভুটানিরা ক্ষুদ্র জোঁক থেকে শুরু করে কুকুর যে কোন প্রাণীই না মারার চেষ্টা করে। কারণ ওরা মনে করে জীব হত্যা পাপ।
• ওদের ভাষায় “কুসুজাংপো” মানে হ্যালো; আর “কাদিনচে” মানে ধন্যবাদ। Smile
Bonne Voyagelink

অপেক্ষা: সৌন্দর্যের রাজ্য

খুব যে ঘুরেছি এক জীবনে তা নয়। তবে স্বপ্ন দেখতে বাধা কোথায়? কখনো হাতে টাকা হলে এবং সামর্থ্য থাকলে কোথায় কোথায় যাবো, অনেক ভেবেছি। এ ভাবনা যেন শেষ হবার নয়! হিমালয়ের বরফের রাজ্য থেকে ইউরোপের অপরূপ মধ্যযুগীয় স্থাপত্য ঘুরে গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন বা আমাজনের গভীর অরণ্য-কোন কিছুই স্বপ্ন থেকে বাদ পড়ে না। এমন কিছু জায়গার কথাই আসবে এ পোস্টে, যেখানে একবার অন্তত যেতে চাই।
গ্রেট ব্যারিয়ার রীফ:

এক যে ছিল কোরাল। সেই প্রাণী, তার সমস্ত বংশধর মিলে ছয় লাখ বছর ধরে বুনে চললো এক বিশাল স্থাপনা। তারা হয়তো কোনদিন দেখলো না, কী অপরূপ সৃষ্টি গড়েছে,কিন্তু, আমার মতো মানুষেরা এর সৌন্দর্যে ছুটে যেতে চায় পৃথিবীর দূর প্রান্ত থেকে।
২৬০০ কি.মি. এই রীফের উপর নির্ভর করে বাঁচে ১০০০০ প্রজাতির জীব।
একটা প্রাণী ও তার সমস্ত বংশধরেরা লাখ বছর ধরে গড়ে চললো এই রীফ, আমি এই মহান সৃষ্টি না দেখে থাকবো, ভাবতে পারি না।
গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন:

পাথুরে প্রাচীরে শো শো করে বয়ে চলা বাতাস আর বহু নিচে বয়ে চলা কলোরাডো নদী যেন মনে করিয়ে দেবে পৃথিবীটা কত্ত পুরনো। ১৭ মিলিয়ন বছর ধরে বয়ে চলা নদী পৃথিবীর বুক চিরে বসে গেছে মাইল-খানেক গভীরে।
গ্র্যান্ড ক্যানিয়নের কোটি বছর পুরনো নদী, বয়ে চলা বাতাস আর নিস্তব্ধতা যেন একাকীত্বকে করে তুলতে পারে অনেক বেশি আপন।
ভেনিস:


১১৮ টা ছোট্ট দ্বীপের মাঝে দিয়ে বয়ে চলা অসংখ্য খাল আর দ্বীপগুলোকে সংযোগ করা অসংখ্য ব্রিজ: একটাই অসাধারণ শহর, ভেনিস। আমি কল্পনায় দেখতে পাই, একটা নৌকায় করে শহরের খালগুলোতে ঘুরে বেড়ানো, গভীর রাতে ঘরের পেছনে পানিতে পা ডুবিয়ে বসে থাকা, স্রোতধারায় ভেসে যাওয়া সমগ্র ভাবনা।
বাড়তে থাকা জলরাশি শহরটাকে ডুবিয়ে দেয়ার আগেই যেতে চাই ভেনিস-এ।
মাচু পিচু:

প্রায় আড়াই হাজার মিটার পর্বতের উপরে অবস্থিত এক অপূর্ব শহর, চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য, বিস্ময়কর স্থাপনা, কৃষিকাজের মানানসই ব্যবস্থা-প্রতিটি জিনিসে যেন ইনকা সভ্যতার বুদ্ধিমত্তার প্রগাঢ় ছাপ। ছয়শ বছর আগে এমন উঁচু স্থানে এমন অসাধারণ স্থাপনা যারা নির্মাণ করেছেন, তাদের সভ্যতা হিংসা করার মতো এগিয়ে ছিল বাকী পৃথিবী থেকে।
চারদিকে ঘুরতে থাকা ধোঁয়াটে কুয়াশার মাঝে হারিয়ে যেতে চাই হারানো সভ্যতার অপরূপ শহরের অলিগলিতে।
কাশ্মীর:


কাশ্মীর নামের সাথে সাথে চোখে ভেসে ওঠে যুদ্ধে আহত এক বিশাল এলাকার কথা। পৃথিবীর বুকে তাকে নিয়ে টানাটানি করা তিন দেশের যুদ্ধের দামামার মাঝে হারিয়ে যায় তার সৌন্দর্যের গল্পগাথা।
যতদূর চোখ যায় পাহাড়-সারি, টলটলে পানির লেক, রঙিন ফুলের বাগান, সবুজের সমারোহ, শীতের তুষারশুভ্র প্রান্তর-পৃথিবীর সব সৌন্দর্য যেন জমা হয়েছে এখানে এসে।
পৃথিবীর মাঝে “এক টুকরো স্বর্গ” কাশ্মীর দেখে চোখ জুড়ানোর বড্ড ইচ্ছে হয়।
আমি জানি না, এর মাঝে কোথাও যেতে পারবো কি না। কিন্তু, স্বপ্ন দেখে যাই, নিশ্চয়ই যাবো। মন ভরিয়ে, চোখ জুড়িয়ে উপভোগ করবো প্রকৃতির সৌন্দর্য।
ছবি: ইন্টারনেট
[পরবর্তী পর্বে আরো কিছু এমন আরো জায়গার কথা বলতে চাই, যদি পাঠক পড়তে চায়।]
এই পোস্টটি ব্লগারের ৫০তম পোস্ট। প্রত্যেক পাঠককে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, যাদের কারণে ব্লগিং এর উৎসাহ পাই।
পোস্টটি টুইটার কিংবা ফেইসবুকে শেয়ার করার জন্য শর্টলিঙ্ক: http://shorob.com/?p=7582

রবিবার, ৯ মার্চ, ২০১৪

অরুণাচলের তাওয়াং, মেঘের শহর

91-IMG_7953
অরুণাচলের আঁকা বাঁকা পাহাড়ি পথ। হেলিকপ্টার থেকে তোলা ছবি।
উত্তর-পূর্ব ভারতের নাম আগেই শুনেছি কিন্তু এত কিছু জানা ছিল না। অরুণাচল, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা, মনিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ এই ৯ রাজ্য নিয়ে উত্তর-পূর্ব ভারত। বাংলাদেশের সীমানা পেরুলে উত্তর-পূর্ব ভারতের এই রাজ্যগুলি আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। অন্য দেশের সীমান্তবর্তী রাজ্য হওয়ায় এবং নানা রাজনৈতিক ও নৃ-তাত্ত্বিক কারণে এক সময় এই রাজ্যগুলিতে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত ছিলো। এখন সিকিম ছাড়া সবগুলি রাজ্যে ভ্রমণ করা যায়।
অরুণাচলের তিন পাশে ভুটান, মায়ানমার আর চীন। সবুজ বনরাজি নিয়ে উঁচু উঁচু পাহাড় ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। হাজার বছর ধরে এখানে বাস করছে অনেক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী।
অরুণাচল সম্পর্কে চটজলদি কিছু তথ্য
বলা হয় ভারতে প্রথম সূর্য উদয় হয় অরুণাচল প্রদেশে। যেহেতু অরুণাচল ভারতের সবচেয়ে পুবের রাজ্য সেহেতু এটি একটি ভৌগলিক সত্য।
তাওয়াং হেলিপ্যাডে লেখক। মাত্র পৌঁছেছেন।  পেছনে রুশ হেলিকপ্টার-এমআই ৭৭।
তাওয়াং হেলিপ্যাডে লেখক। মাত্র পৌঁছেছেন। পেছনে রুশ হেলিকপ্টার-এমআই ৭৭।
আয়তনে প্রায় ৮৪ হাজার বর্গকিলোমিটার। বাংলাদেশের অর্ধেকের চেয়ে কিছুটা বেশি। এর শতকরা ৮২ ভাগ এলাকা চিরহরিৎ বনে ঢাকা। অনেক বৃষ্টিপাত হয়। বছরে গড়ে তিন হাজার মিলিমিটারেরও বেশি। আবহাওয়া সমতলে মৌসুমি হলেও যত উত্তরের দিকে গেছে ততই আলপাইন হয়ে উঠেছে অর্থাৎ পাহাড়ি ঠাণ্ডা। পাহাড়ি এলাকাই বেশি। উঁচু উঁচু। সোজা মেঘের ওপর উঠে গেছে পাহাড়ের চূড়া।
শীত বাড়লে চূড়াগুলি ঢেকে যায় সাদা সাদা বরফের আস্তরে। বিশেষ করে সেলাপাস অঞ্চল। ১৭টি জেলা নিয়ে অরুণাচল। ২০১১ সালের জরিপে জনসংখ্যা প্রায় ১৪ লাখ। ২৬টি প্রধান গোত্র আর শতাধিক ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠি। জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৩১ ভাগ এই সব বিবিধ ধর্মের মানুষ ছাড়াও অরুণাচলে বাসকারীদের প্রায় ৩৫ ভাগ হিন্দু, ১৯ ভাগ খ্রিষ্টান আর ১৩ ভাগ বৌদ্ধ। শিক্ষিতের হার শতকরা ৬৭ ভাগ।
রাজধানী ইটানগর। অবশ্য ভ্রমণের গল্প অরুণাচলের ১৭ জেলার সবচেয়ে সুন্দর জেলা-শহর, তাওয়াং নিয়ে। সমুদ্রসীমা থেকে যার উচ্চতা প্রায় ১৩ হাজার ফুট। মেঘের দেশের এক অনিন্দ্য সুন্দর শহর তাওয়াং।
যেভাবে ভ্রমণের শুরু
ভারত ভ্রমণের কথা মাথায় এলে বাংলাদেশী হিসেবে প্রথমেই কোলকাতা তারপর একে একে দার্জিলিং, দিল্লী, আগ্রা, আজমির শরিফ এই নামগুলি তালিকায় উঠে আসতে থাকে। ভারত সরকারের পর্যটন বিভাগের নিমন্ত্রণপত্র হাতে না পাওয়া পর্যন্ত ‘তাওয়াং’ বলে যে কোন জায়গা আছে তা জানা ছিল না।
‘তাওয়াং’ অরুণাচল প্রদেশের একটি শহরের নাম। একদিন সকালে পর্যটন প্রতিষ্ঠান জার্নি প্লাস-এর প্রধান নির্বাহী তৌফিক ভাইয়ের ফোন পেলাম, “আখতার, আপনি কোথায়?”
'বাংলাদেশ ডেলিগেট টিম। বা দিক থেকে, যুগান্তরের রবিউল ভাই, পর্যটন বিচিত্রার সম্পাদক মহিউদ্দিন হেলাল ভাই, বিশ্বভ্রমণকারী বাংলাদেশের সেরা সাইক্লিস্ট আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল ভাই, আমি, ফোর হুইলস্ ট্যুরিজমের প্রধান নির্বাহী কাজী জিয়াউদ্দীন বাপ্পী ভাই, এটিএস নিউজের বার্তা সম্পাদক প্রণবদা।' - লেখক
‘বাংলাদেশ ডেলিগেট টিম। বা দিক থেকে, যুগান্তরের রবিউল ভাই, পর্যটন বিচিত্রার সম্পাদক মহিউদ্দিন হেলাল ভাই, বিশ্বভ্রমণকারী বাংলাদেশের সেরা সাইক্লিস্ট আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বল ভাই, আমি, ফোর হুইলস্ ট্যুরিজমের প্রধান নির্বাহী কাজী জিয়াউদ্দীন বাপ্পী ভাই, এটিএস নিউজের বার্তা সম্পাদক প্রণবদা।’ – লেখক
বিছানায় শুয়ে ফোন ধরলাম। গায়ে ভীষণ জ্বর।
“বাসায়। আপনি কেমন আছেন?”
“শরীর খারাপ নাকি? কণ্ঠ যেন কেমন লাগছে?”
“না, সব ঠিকঠাক। বলেন।” অসুখের ব্যাপারটা বেমালুম চেপে গেলাম।
তৌফিক ভাইয়ের কণ্ঠে তাড়া, “শোনেন, দাওয়াত আসছে। তাওয়াং ঘুরতে যাবেন?”
“তাওয়াং? সেটা আবার কোথায়?” আমি অজ্ঞতা প্রকাশ করলাম।
“অরুণাচলের একটি শহর, ভারতে। ৪ দিনের প্রোগ্রাম। সাথে আরো দিন তিনেকের ফ্যাম ট্রিপ। দিন সাতেক ম্যানেজ করতে পারবেন না? নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, আসাম যা খুশি বেছে নিতে পারেন। যাবেন?”
“অবশ্যই যাবো। তার আগে একটু পুরো বিষয়টা খুলে বলেন না!”
তৌফিক ভাই ভারতীয় হাইকমিশন থেকে আসা এই নিমন্ত্রণের ব্যাপারে বিস্তারিত জানালেন। নতুন জায়গায় ঘুরতে যাওয়ার নেশায় অসুখের কথা যদিও চেপে গেলাম, তবুও দুশ্চিন্তা একটু রয়েই গেলো।
তাওয়াং মনাস্ট্রির ঠিক সামনে স্থানীয় অলংকার বিক্রি করছেন একজন মনপা।
তাওয়াং মনাস্ট্রির ঠিক সামনে স্থানীয় অলংকার বিক্রি করছেন একজন মনপা।
মনে মনে ভাবলাম, দিন তারিখ হিসাবে রওয়ানা হতে তখনো দিন সাতেক বাকি। সুতরাং আশা রাখি, এর মধ্যে সুস্থ্য হয়ে যাবো। কিন্তু আমার কপাল খারাপ। ডাক্তারি অনুসন্ধানে টাইফয়েড, সাথে ডেঙ্গু ধরা পড়ল। মরার ওপর খাড়ার ঘা। ডাক্তার ঠাণ্ডা চোখে বললেন, আপনার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া উচিত।
আমি রাজি হলাম না। আমার হাসপাতালে ভর্তির খবর জানাজানি হলে ভ্রমণ বাতিল হয়ে যাবে। চিকিৎসা ব্যবস্থা বাসায় নেয়ার ব্যবস্থা করলাম। দিনে দুটো করে ১৪টি অ্যান্টিবায়োটিক ইনজেকশন নিতে হবে। লোক ঠিক করলাম, যে বাসায় এসে ইনজেকশন দিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ থেকে দুজন সাংবাদিকসহ আমরা পর্যটন-সংশ্লিষ্ট চার জন। মোট ছয় জনের বাংলাদেশ টিম ভ্রমণের জন্য তৈরি। তাদের বিবরণ একটু পরে দিচ্ছি।
কিছু জটিলতা সত্ত্বেও ভিসা শেষ পর্যন্ত ঠিক মতোই পেয়ে গেলাম। ৬ মাসের মাল্টিপল ভিসা, তার ওপর বাস, ট্রেন, আকাশ তিন পথেই যাতায়াত করতে পারবো। খুবই ব্যাতিক্রমী ঘটনা। কিন্তু অসুস্থতার ক্ষেত্রে আমার শেষরক্ষা হলো না। আমি চিকিৎসা সম্পূর্ণ করতে পারলাম না। রওনা হওয়ার তারিখ এসে গেল।
১৭ অক্টোবর (২০১৩) দশম ইনজেকশনটা নেয়ার আধা ঘণ্টা পরেই এয়ারপোর্টে রওনা হতে হলো। টুনি গাড়ি ড্রাইভ করলো। টুনি আমার স্ত্রী। যানজটের কোন বিড়ম্বনা ছাড়াই সবার আগে এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেলাম। আমরা সঙ্গীরা তখনও অন দ্য ওয়ে। তবে বেশি দেরি হলো না। একে একে সবাই এসে গেলো। সঙ্গীদের হাতে আমাকে সঁপে দিয়ে টুনি বিদায় নিলো।
দলের মধ্যে একটা ছোট্ট ইনফর্মাল মিটিং হয়ে গেলো। প্রথমে এয়ার ইন্ডিয়ার ফ্লাইটে কোলকাতা যাওয়া। সেখানে পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন সংস্থা কর্তৃপক্ষ আমাদের স্বাগত জানাবেন। তারপর ভোর পাঁচটার কানেক্টিং ফ্লাইটে গৌহাটি পৌঁছব। মোট সাত দিনের সফর।
১৭ অক্টোবর, ২০১৩
সিকিউরিটি চেকিং, ইমিগ্রেশন সব শেষ হয়ে গেলো নির্বিঘ্নে। আমরা সবাই যে যার মতো চুপচাপ বসে রইলাম এয়ার ইন্ডিয়ার বোর্ডিং লাউঞ্জে। যাত্রী খুব বেশি মনে হলো না।
ঢাকা থেকে রাত সোয়া নয়টায় বিমান আকাশে উড়লো। আপাত গন্তব্য কোলকাতা হলেও আমরা চলেছি অরুণাচলের জেলা শহর তাওয়াং-এর উদ্দেশ্যে।
বিমান, সড়ক বা রেল যে পথেই হোক না কেন তাওয়াং যেতে হলে আপনাকে আসামের রাজধানী গৌহাটি আসতেই হবে। গৌহাটিকে উত্তর-পূর্ব ভারতের গেটওয়ে বলা হয়। কারণ উত্তর-ভারতের অধিকাংশ রাজ্যে যেতে হলে গৌহাটি হয়ে যেতে হয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা এভাবেই সাজানো। ঢাকা থেকে সড়ক পথে তামাবিল বা আখাউড়া সীমান্ত থেকে শিলং হয়ে গৌহাটি যাওয়া যায়। কিন্তু হয়ত সময়, শ্রম আর সম্মান এই তিনের বিবেচনায় ভারত সরকার আমাদের কোলকাতা হয়ে প্লেনে গৌহাটি পৌঁছানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ঢাকা থেকে কোলকাতা এয়ার ইন্ডিয়ায় এবং কোলকাতা থেকে গৌহাটি স্পাইস জেট-এ।
তাওয়াং মনাস্ট্রির প্রধান ফটক পেরিয়ে মন্দিরের চত্বরে পৌঁছার সিঁড়িপথ
তাওয়াং মনাস্ট্রির প্রধান ফটক পেরিয়ে মন্দিরের চত্বরে পৌঁছার সিঁড়িপথ
পয়ত্রিশ মিনিট পর আমরা কোলকাতায় ল্যান্ড করলাম। এয়ারপোর্টের ফরমালিটিজ আর লাগেজ কালেকশন করতে করতে আরো চল্লিশ মিনিটের মতো সময় লেগে গেলো। ইমিগ্রেশন পার হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন সংস্থার কর্মকর্তারা যারপরনাই আতিথেয়তায় আমাদের গ্রহণ করলেন। রাত তখন প্রায় ১১টা। আমাদের রাতের থাকা ও ডিনারের ব্যবস্থা হলো মনোটেল হোটেলে। হোটেলে থাকা বলতে ঘণ্টা দুয়েকের বিশ্রাম। কারণ রাত সাড়ে তিনটায় আবার ছুটতে হবে কানেক্টিং ফ্লাইট ধরতে। স্পাইস জেট-এর এক ঘণ্টা দশ মিনিটের ফ্লাইট আমাদের পৌঁছে দেবে গৌহাটি এয়ারপোর্টে।
সকালের উদ্ভাসিত সোনালি আলোয় সমস্ত চরাচর মোহময় হয়ে উঠেছিলো। সকাল সাতটা নাগাদ আমরা গৌহাটি এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করলাম। আমাদের উত্তরীয় পরিয়ে, মালা পরিয়ে বরণ করা হলো। সৌজন্য বিনিময় হলো। সবাই একসাথে ছবি তুললাম।
ব্রেকফাস্ট সেরে নিলাম এয়ারপোর্টে। এবার তাওয়াং-এ পৌঁছার জন্য হেলিকপ্টারে সোয়া এক ঘণ্টার যাত্রা। নটা নাগাদ হেলিকপ্টার উড়বে। এই প্রথম হেলিকপ্টারে চড়ব। গতরাতে কোন ঘুম হয়নি। শরীর পুরোপুরি সুস্থ নয়। ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে আছি। সবাই নিজেদের মধ্যেও কম কথা বলছি। সবাই-ই বেশ ক্লান্ত মনে হলো।
খবর এলো তাওয়াং-এর আবহাওয়া খুব স্থিতিশীল নয়। সুতরাং দেরি হবে। দশটা নাগাদ রওনা হওয়া যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বুঝে নিলাম হেলিকপ্টারকে প্রতিনিয়ত বাতাসের অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নিতে হয়। গন্তব্য থেকে সবুজ সংকেত না পেলে তার উড়ান নাই।
পবন হান্স হেলিকপ্টার সার্ভিস সংস্থা গৌহাটি থেকে নানা গন্তব্যে এই হেলিকপ্টার সার্ভিস দিয়ে থাকে। খরচও খুব বেশি নয়। গৌহাটি থেকে তাওয়াং জনপ্রতি সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার রুপি মাত্র। দুই তিন রকমের হেলিকপ্টার আছে। ৩ আসনের হেলিকপ্টারের সংখ্যাই বেশি। এছাড়া ১৬ এবং ২৩ আসনের হেলিকপ্টারও আছে। আমার উচ্চতাভীতি আছে। আকাশে উঠলেই মনে হয় সবকিছু নিয়ে এই বুঝি ভেঙে পড়ল। আর ভ্রমণে ঠাসাঠাসি পছন্দ করি না। তিন আসনের ফড়িং-এর মতো হেলিকপ্টার দেখেই ভয় হলো, তাই কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করতে আমাকে একটা বড়সর রাশান এমআই ৭৭ হেলিকপ্টারে চড়ানোর ব্যবস্থা করা হলো। ২৩ আসন বিশিষ্ট হেলিকপ্টার হলেও যেহেতু এটি তাওয়াং যাবে এবং বারো হাজার ফুট উপর থেকে উড়বে তাই এতে ১৬ জনের বেশি উঠতে পারবে না। ভালোই হলো। ভেতরে অনেক সিট খালি ছিলো, ফাঁকা ফাঁকা। সমস্যা শুধু একটাই হলো আমি দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম।
27-IMG_5882
সকালের তাওয়াং শহর। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে মাত্র সূর্য উঠেছে।
হেলিকপ্টার আকাশে উঠলো। প্লেনের মতো কোন দৌড়াদৌড়ির বালাই নেই। সোজা উপরে ওঠা, তারপর নাকটা নিচের দিকে রেখে সোজা চলতে থাকা। সারাটা পথ জুড়ে নিচে তাকিয়ে দেখলাম শুধু পাহাড় আর পাহাড়। পাহাড়ের গা বেয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা। বাড়ি-ঘর, স্কুল, মন্দির, বাজার-ঘাট আরো কত কী! বিস্তর মেঘ ছোটাছুটি করছে। ঘড়ির কাঁটার সাথে মিল রেখে ঠিক সোয়া এক ঘণ্টা পর হেলিকপ্টার তাওয়াং-এর মাটি স্পর্শ করলো।
পাহাড়ের ওপর খোলা চত্বরে আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলার জন্য তৈরি করা অস্থায়ী অডিটোরিয়াম। হেলিকপ্টারের দরজা খোলামাত্র বাতাস এসে সোজা হাড়ের মধ্যে ঢুকে গেলো। ভাবতেই পারিনি এই একটু আগের গরম আবহাওয়ার পর এত ঠাণ্ডা সইতে হবে। হাতের কাছে জ্যাকেট ছিলো। কিন্তু জ্যাকেট-মাফলার কোন কিছুকেই তখন আর যথেষ্ট মনে হচ্ছিল না। ঠাণ্ডায় জমে যাচ্ছিলাম। তাপমাত্রা মনে হল শূন্যে নেমে গেছে।
অরুণাচল পর্যটন কর্তৃপক্ষ আমাকে স্বাগত জানালেন। এগিয়ে এসে পরিচয় দিয়ে হাত মেলালেন, গাইড লবসং টাসি। আবার সেই উত্তরীয় গলায় জড়িয়ে দিলেন। আসামের উত্তরীয় আর অরুণাচলের উত্তরীয়ের তফাত নজরে এলো। সাথে পরিবেশন করলেন উত্তপ্ত এক কাপ রাইস ওয়াইন। এক চুমুক রাইস ওয়াইন গলা দিয়ে নামিয়ে দিতেই পানীয় পানের রহস্য চোখের সামনে পানির মতো সরল হয়ে গেল। শরীরের প্রতিটি শিরায় কে যেন আগুনের শিখা প্রবাহিত করে দিলো। ভেল্কিবাজির মতো নিমেষে শীত উধাও। সারা শরীরে নেমে এলো ওমের উত্তাপ। বুঝলাম, কতটা জরুরী ছিলো এই পানীয়টুকু।
"অভিনেতা বিবেক ওবেরয়কে নিয়ে মঞ্চে এন্তার মাতামাতি। আদিবাসী নৃত্যশিল্পী, সরকারি কর্মকর্তা, বিদেশী অতিথি সব এক মঞ্চে।" - লেখক
“অভিনেতা বিবেক ওবেরয়কে নিয়ে মঞ্চে এন্তার মাতামাতি। আদিবাসী নৃত্যশিল্পী, সরকারি কর্মকর্তা, বিদেশী অতিথি সব এক মঞ্চে।” – লেখক
বলে রাখা ভালো, আমার ছবি তোলার বাতিক আছে। ঘোরাঘুরি আর ছবি তোলা আমার পেশার একটা বড় অংশ। ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য যে অংশটুকু দখল করেছে তার পরিমাণ মামুলি। সুতরাং তাওয়াং নেমেই ক্যানন সিক্সটি ডি ক্যামেরার ৫০ মিলিমিটার প্রাইম লেন্স পাল্টে ১৮-১৩৫ মিলিমিটার জুম লেন্স লাগিয়ে নিলাম। বেশ কিছু ল্যান্ডস্কেপ তুললাম। হেলিকপ্টার আর মানুষের মুখ বাদ গেল না। একটা ফোর হুইলার স্করপিয়ন গাড়ি তৈরি ছিলো। দ্রুত গাড়িতে উঠলাম। আমার একার জন্যেই অপেক্ষা। অন্যদের গাড়ি আলাদা। গাড়ি রওয়ানা হলো হোটেলের উদ্দেশ্যে। মনের মধ্যে হাজার হাজার প্রশ্নের মাছ ভেসে উঠছে, সাঁতার কাটছে, ডুব দিচ্ছে আবার ভেসে উঠছে।
টাসির কাছে জানতে চাইলাম, আজকের তাপমাত্রা কতো?
টাসির বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। সুঠাম দেহ, হাস্যোজ্জ্বল। কিছুক্ষণ পরপর ঘড়ি দেখছে টাসি। “৭/৮ ডিগ্রী হবে। ডিসেম্বরে মাইনাসে নেমে যাবে।” বলেই পাহাড়ের চূড়ায় জমাট বাঁধা মেঘের কুণ্ডলীর দিকে চোখ ফেরালো।
“তাওয়াং পৌঁছতে দেরি করে ফেললাম। সরি। ছোট হেলিকপ্টারে চড়তে ভয় করে। আর ঠাসাঠাসি হলে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।” নিজের সমস্যাগুলির কথা গাইডকে জানিয়ে রাখা ভাল। আর আমার কারণে আসলেই দেরি হয়ে গেছে।
টাসি শব্দ করে হেসে উঠলো, “নো, ইউ আর অন টাইম। তবে বিশ্রামের জন্য সময় পাবে না। হোটেলে চেক ইন করেই লাঞ্চের জন্য বেরুতে হবে। তোমার বন্ধুরা তোমার জন্য অপেক্ষা করছে। ওরা ধরে নিয়েছিলো, তুমি হয়ত আসতে পারবে না।”
আমি আগের প্রসঙ্গেই রয়ে গেলাম, “এখানে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনা হয়?”
“নাহ! কখনো হয়নি। আবহাওয়া খারাপ থাকলে হেলিকপ্টার সার্ভিস বন্ধ থাকে। নো রিস্ক! তোমার কি কোন রকম শরীর খারাপ লাগছে?”
“কই না তো? কেন?” একটু বিস্মিত হলাম।
অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আর বিবেক ওবেরয়।
অরুণাচল প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আর বিবেক ওবেরয়।
“উচ্চতাজনিত কারণে হয়ত একটু খারাপ লাগতে পারে। বাট ডোন্ট ওরি। ঠিক হয়ে যাবে। হাঁটার সময় আস্তে আস্তে হাঁটবে। মাঝে মাঝে সুযোগ পেলেই একটু একটু করে গরম পানি খেয়ে নেবে। বড় বড় করে নিঃশ্বাস নেবে। বমি আসলে চেপে রাখার দরকার নেই। আমাকে বলবে।” কথাগুলো মুখস্ত। গড়গড় করে বলে গেল টাসি।
জানতে চাইলাম, তাওয়াং কত ফুট উঁচুতে?
“তাওয়াং-এ সব জায়গা এক রকম নয়।” টাসির চোখেমুখে রহস্যের হাসি। “মূল শহরের উচ্চতা সাড়ে দশ থেকে এগারো হাজার ফুট হবে। তবে ওই যে পাহাড়গুলি দেখতে পাচ্ছো, সেগুলি তের হাজার ফুট উপরে চলে গেছে। জাং ফলস্ দেখতে যাওয়ার সময় আমরা ওখানে উঠবো।”
টাসির কথায় আমি ক্লান্তির ভেতরেও ভ্রমণের আনন্দে উত্তেজিত বোধ করতে লাগলাম। দলের অন্যরা আগেই পৌঁছে গেছে। হোটেলে পৌঁছতে ৩০ মিনিটের মতো সময় লাগলো। রাস্তার দুপাশে বিশালাকৃতির সারি সারি গগনচুম্বী সবুজ পাইন গাছের নিস্তব্ধ বনানী চোখে পড়লো।
জ্যাক্স হোটেলে চেক ইন করে লাগেজগুলি রুমে রেখে সবার সাথে বেরিয়ে পড়লাম।
স্থানীয় এক রেস্টেুরেন্টে লাঞ্চ করবো সবাই। বাইরে তাপমাত্রা ৬/৭ ডিগ্রীর বেশি মনে হলো না। পথের দিকে তাকিয়ে মনে হলো তাওয়াং-এ কোন উৎসবের আয়োজন হয়েছে আর সেজেগুঁজে সবাই সেই উৎসবে যোগ দিতে রওয়ানা হয়েছে। আসলেই তো উৎসব। ভারতের এই অঞ্চলের ট্যুরিজম সম্ভাবনাকে তুলে ধরার জন্য পৃথিবীর বহু দেশের অতিথিকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ট্রাভেল মার্ট, আইটিমএম ২০১৩।
স্থানীয় অধিবাসী তরুণীদল
স্থানীয় অধিবাসী তরুণীদল
অনেক বিদেশীর আনাগোনা চোখে পড়লো। তবে স্থানীয়রা পোশাকের কারণে আলাদা করে নজরে পড়ছিল। সকলের গায়ে শীতপোশাক। কিছুটা তিব্বতি স্টাইল। পরে অবশ্য জেনেছিলাম তাওয়াংয়ের কাছেই তিব্বত বর্ডার। এক সময় তাওয়াং তিব্বতেরই অংশ ছিল। আর নজড়ে পড়ল প্রচুর আর্মি অফিসার ও সৈন্য। ভারতীয় উপমহাদেশের সব পাহাড়ি এলাকার মতো পাহাড় আর সমতলের দ্বন্দ্ব এখানেও আছে অনুমান করলাম। এই ধরনের আন্তর্জাতিক আয়োজনে নিরাপত্তা সব সময়ই একটা বড় বিষয়।
পর্যটন কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে প্রত্যেক গাড়ির সাথে একজন করে অফিসার দেয়া হলো। যারা ভ্রমণ পরিকল্পনা অনুযায়ী আমাদের সাথে সার্বক্ষণিক ছিলেন। সকালের নাস্তা থেকে শুরু করে রাতের ডিনার শেষ করা পর্যন্ত, হেলিপ্যাডে গ্রহণ করা থেকে শুরু করে ৪ দিন পর আবার বিদায় জানানো পর্যন্ত তারা আমাদের সাথে সাথেই ছিলেন।
আমাদের গাড়ির সাথে যে অফিসার ছিলেন তার নাম আগেই বলেছি লবসং টাসি। পরবর্তীতে তাওয়াং-এ এই একই নামে আরো জনাপাঁচেকের সাথে আমার পরিচয় হয়েছে। ‘টাসি’ হয়ত তাওয়াং-এর কমন নাম। ইন্দোনেশিয়ায় এই রকম আরেকটা কমন নাম পেয়েছিলাম – আদে। জাকার্তা, বালি, লম্বক যেখানেই যাই, নাম জিজ্ঞেস করলেই বলে, আদে। ট্যাক্সি ড্রাইভার থেকে শুরু করে প্লেনের ক্রু, সবার নাম আদে। অদ্ভুত ব্যাপার!
স্থানীয় অধিবাসী তরুণীদল
স্থানীয় অধিবাসী তরুণীদল
আমরা প্রথম দিনের লাঞ্চে স্থানীয় খাবারের দিকে গেলাম না। স্যুপ, সালাদ, ফ্রাইড রাইস, এসব খেয়েই তৃপ্ত থাকলাম। খাওয়া শেষে রওয়ানা হলাম তাওয়াংয়ের বিখ্যাত বুড্ডিস্ট মনাস্ট্রি দেখতে। গাড়ি থেকে নেমে আর গাড়িতে ওঠার আগে অল্প কিছু পথ হাঁটতে হচ্ছিল আর এতেই আমরা ভীষণ হাঁপিয়ে উঠছিলাম। এত উচ্চতায় অক্সিজেনের স্তর তুলনামূলক পাতলা বলে হঠাৎ করে খাপ খাওয়াতে পারছিলাম না। মাঝে মাঝে বমি পাচ্ছিল, মাথা ঝিম ঝিম করছিল। টাসির নির্দেশনা মনে রেখে চলার চেষ্টা করছিলাম। সাধারণ পানি অর্থাৎ রেস্টেুরেন্টের পানি বা মিনারাল ওয়াটারের বোতলের পানি এতই ঠাণ্ডা যে প্রাণভরে তৃষ্ণা মেটানো যাচ্ছিল না। শুধু চুমুক দেয়া আর দু’এক ঢোক গেলা।
অক্সিজেনজনিত এই সমস্যা কাটানোর একটা বড় উপায় ঘন ঘন পানি খাওয়া আর আরো একটু বেশি উচ্চতায় উঠে কিছুক্ষণ থেকে আবার নেমে আসা। পর্বতারোহীদের ভাষায় ‘এক্লাইমেটাইজেশন’।
কোথাও কোথাও আমাদের জন্য গরম পানির ব্যবস্থা ছিল। এসব ব্যবস্থা কাজে লাগিয়ে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করছিলাম। গৌহাটি থেকে হেলিকপ্টারে ওঠার আগে পবন হান্সের কর্মকর্তারাও সতর্ক করে দিয়েছিলেন, তাওয়াং পৌঁছার পরে একটু শ্বাসকষ্ট হতে পারে। বমি বমি বা মাথা ঝিমঝিম করতে পারে। খাপ খাওয়াতে একটু সময় লাগবে। তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, আস্তে আস্তে ঠিক হয়ে যাবে।
আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই তাওয়াং মনাস্ট্রি এলাকায় পৌঁছে গেলাম। সেখানে আমাদের জন্য যে ভিআইপি আয়োজন অপেক্ষা করছিলো কে জানত! কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই টাসি মুখ খুললো, “তাওয়াং মনাস্ট্রি ৪০০ বছরের পুরানো। আর এই তাওয়াং মনাস্ট্রি ভারতের সবচেয়ে বড় এবং পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বুড্ডিস্ট মনাস্ট্রি । যেহেতু এটি ভারতের সবচেয়ে বড়, তাই ভারতে বসবাসকারী বৌদ্ধদের কাছে এই মনাস্ট্রি তীর্থস্থান হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।”
“অন্যান্য দেশের বৌদ্ধরা এখানে আসে?” জানতে চাইলাম।
“পার্শ্ববর্তী দেশ নেপাল আর ভুটান থেকেও প্রচুর বৌদ্ধরা এখানে আসেন। তবে ২০০৯ সালে যখন দালাই লামা এখানে পরিদর্শনে এলেন তখন তার ধর্মীয় প্রার্থনায় প্রায় ৩০ হাজার বৌদ্ধ অংশ নিয়েছিল। তাই এই মনাস্ট্রি কী করে, কবে, কে তৈরি করলো সে কাহিনি বেশ পরিচিত এবং ভক্তদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”
বিশাল আকৃতির শিঙ্গায় ফুঁ দিয়ে, কাশার বাদ্যযন্ত্রে ঝংকার তুলে মন্দিরে চলছে প্রার্থনা।

বিশাল আকৃতির শিঙ্গায় ফুঁ দিয়ে, কাশার বাদ্যযন্ত্রে ঝংকার তুলে মন্দিরে চলছে প্রার্থনা।
নানা আলোচলনার প্রসঙ্গে এক সময় টাসি বলল, বৌদ্ধদের প্রধান পুরোহিতকে দালাই লামা বলা হয়। ততক্ষণে আমাদের গল্পে আরো কয়েকজন গাইড জড়ো হয়েছে। কেউ শুনছে, কেউ দু’এক লাইন যোগ করছে। আমি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলি টুকে নিচ্ছি। একজন বললেন, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস দালাই লামা একজনই, যিনি বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন চেহারায় পুনর্জন্ম নেন। তাই প্রধান পুরোহিতের নাম সব সময় দালাই লামা। আর সময় হিসেব অনুসারে তাদেরকে দালাই লামা ১, ২, ৩ এভাবে সম্বোধন করা হয়। বর্তমানে দালাই লামা ১৪-এর সময় চলছে।
এই মনাস্ট্রি তৈরির ইতিহাস বলতে গিয়ে একজন গাইড বললেন, দালাই লামা পঞ্চম ‘নাগওয়াং লোবসাং গায়াতসো’-এর ইচ্ছা অনুযায়ী ১৬৮০-৮১ সালে তাওয়াং মনাস্ট্রি প্রতিষ্ঠা করেন ‘মেরাগ লামা লোতে গায়াতসো’।
প্রচলিত আছে, এই মনাস্ট্রি প্রতিষ্ঠার জন্য স্থান নির্বাচন করতে গিয়ে মেরাগ লামা তার ঘোড়া ছেড়ে দেন। ঘোড়া যে স্থানে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সে স্থান মনাস্ট্রি প্রতিষ্ঠার জন্য নির্বাচিত হয়। হয়ত সে কারণেই এই স্থানের নামকরণও করা হয়েছে ‘তাওয়াং’ – যার অর্থ হচ্ছে ‘চুজেন হর্স বা পছন্দের ঘোড়া’।
"নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মতো।" - লেখক
“নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীর উপস্থিতি ছিলো চোখে পড়ার মতো।” – লেখক
প্রধান গেট দিয়ে ঢোকার পর কিছুটা পাহাড়ি রাস্তা হেঁটে আমরা মনাস্ট্রি চত্ত্বরে প্রবেশ করতেই আমাদের অভ্যর্থনা জানানো হলো। নিয়ে যাওয়া হলো মন্দিরের ভেতরে। মন্দিরের ভেতরে তখন প্রায় শ’তিনেক সন্ন্যাসী একসাথে মন্ত্র পাঠ করে প্রার্থনা শুরু করলেন। আমরা বিদেশী দর্শনার্থীও প্রায় শ দেড়েক উপস্থিত ছিলাম। মন্দিরের ফ্লোর মজবুত কাঠের তৈরি। সবাই কাঠের পাটাতনের ওপর আসন গেড়ে সারিবদ্ধ হয়ে বসলাম। প্রায় ঘণ্টাখানেক প্রার্থনা চলল। তারপর মন্দিরের ভেতর থেকে সবাই বেরিয়ে এলাম মন্দির চত্বরে।
চত্বর বলতে বিশাল উঠানের মতো খোলা জায়গা। চারপাশ দিয়ে সব দর্শনার্থীরা গোল হয়ে দাঁড়ালো আর মাঝখানের খোলা জায়গায় শুরু হলো একে একে নৃত্য পরিবেশন।
বিচিত্র পোশাক পরা নৃত্যশিল্পীদের থেকে চোখ ফেরানো যাচ্ছিল না। বারান্দার এক পাশে লম্বা শিঙ্গায় ফুঁ দিয়ে চলেছেন দুই সন্ন্যাসী। বাজছে ঢাক। ঘুঙুর পায়ে শিল্পীরা তালে তালে গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে লাফিয়ে লাফিয়ে নানা ভঙ্গিমায় নেচে চলেছেন। পাহাড়ের চূড়ায় শেষ সূর্যের আলো চোখে পড়ল। দ্রুত অন্ধকার নেমে এলো। নৃত্যের উদ্দাম ছন্দ যেন রক্তে ছড়িয়ে পড়ছে। মনে হল তিন লক্ষ বছর আগের কোন বিলুপ্ত সভ্যতার পূর্ণিমা-বরণ আসরে এসে পড়েছি। আকাশের গায়ে লটকে থাকা ভয়ঙ্কর পাহাড়গুলোর অন্ধকার পাইন জঙ্গলের ভেতর আরো লুকিয়ে আছে কতো ইতিহাস! কত অন্ধকার গুহার গায়ে কত সুখ, কত দুখ আর কত কত শিকারের গল্প! কত শিশুর হাতের আঙুল গাছের শেকড়ের মতো মাটি আকড়ে আকড়ে বেড়ে উঠেছে মেঘের দেশে, এই উপত্যকার গাঢ় সবুজ ছায়ায়। কত অজানা জাতি গোষ্ঠির কত অব্যক্ত গল্প ঐসব ঝর্ণার ¯্রােতে ¯œাত সাদা সাদা পাথরের গায়ে খোদাই হয়ে আছে। সে এক অবর্ণনীয় অভিজ্ঞতা! আমার কী সাধ্য যে ভাষায় প্রকাশ করি! এক সময় আসর ভাঙলো। অন্ধকার পুরোপুরি আমাদের ঢেকে ফেলেছে। আমরা নৈশভোজের জন্য তৈরি হতে হোটেলে চলে এলাম।
হোটেলে এসে দ্রুত পোশাক পাল্টে তৈরি হয়ে নিলাম। পাহাড়ি রাস্তায় আলো অন্ধকারের এক অদ্ভুত পরিবেশ। রাস্তার ওপর জমে থাকা ঘন মেঘের ভেতর থেকে হেডলাইটের আলো জ্বালিয়ে গাড়ি চলল সরকারি নৈশভোজের আয়োজনে। সাথে আছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পাহাড়ি সংস্কৃতির প্রদর্শন হবে বিশ্বের কাছে।
তাওয়াং এ প্যারাগ্লাইডিং
তাওয়াং এ প্যারাগ্লাইডিং
গাড়ি থেকে নামলাম পাহাড়ের ওপরের এক খোলা চাতালে। ডানে তাকাতেই বিশাল আকারের অস্থায়ী অডিটোরিয়াম চোখে পড়ল। স্টিলের ফ্রেম জোড়া লাগিয়ে আর সাদা সামিয়ানা দিয়ে ঢেকে বানানো হয়েছে বিশালাকৃতির অডিটোরিয়াম। সামনে দাঁড় করানো সারি সারি পতাকা। কনকনে ঠাণ্ডা বাতাসে পত্পত্ করে উড়ছে।
ঢোকার মুখে লম্বা রেড কার্পেট। গেটের কাছে আসতেই অপূর্ব সাজে সজ্জিত তরুণী দল স্থানীয় পানীয় সহযোগে স্বাগত জানালো। রাজকীয় অভ্যর্থনা! এক তাঁবুর মধ্যে সব মিলিয়ে অন্তত পাঁচশ লোকের আয়োজন। এক হাজারেরও বেশি নৃত্যশিল্পী আর কলাকুশলী এসেছেন পুরো উত্তর-পূর্ব ভারত থেকে। চার দিনের প্রত্যেক রাতে চলবে এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নৃত্য, সংগীত। উত্তর-পূর্ব ভারতের পর্যটনের নানা দিক বিশ্বের কাছে তুলে ধরাই এ আয়োজনের উদ্দেশ্য। পৃথিবীর ৬০টি দেশ থেকে এসেছেন অতিথিরা। মুম্বাই থেকে এসেছেন বিবেক ওবেরয়। রাতে দারুণ পার্টি হলো। কৃষ থ্রি মুক্তি পাওয়ার পর বিবেকের ক্রেজ আরো এক ধাপ বেড়ে গেছে বলেই মনে হলো।
মঞ্চে পাহাড়ি শিল্পীদের নৃত্য পরিবেশনা চলছে। বাংলাদেশ থেকে আসা আমাদের ৬ জনের জন্য আলাদা একটা টেবিল দেয়া হলো। আমরা আসন গ্রহণ করতেই নানা রকম খাবার আর পানীয় আসতে লাগলো।
নৈশভোজে পরিচয় হলো নানা দেশের মানুষের সাথে। গল্প হলো ঢের। রাত বেড়ে চলল। বাইরে বেরিয়ে দেখি আকাশে বিশাল একটা চাঁদ। থমকে দাঁড়িয়ে আছে সাদা সাদা মেঘ। অডিটোরিয়ামের ভেতর থেকে অনুষ্ঠানের আওয়াজ ভেসে আসছে। দরাজ গলার গান আর বাদ্যযন্ত্রের মূর্ছণায় সবকিছু অপার্থিব লাগতে শুরু করলো।
মাথা ঝিমঝিম করাটা কমে গেছে। স্থানীয় পানীয়ের নামটা জানা হলো না। মারাত্মক তার ক্ষমতা। টাসি সবাইকে হোটেলে ফেরার সময় স্মরণ করিয়ে দিলো। ফুরফুরে মেজাজে সবাই হোটেলে ফিরে এলাম। যে যার রুমে ঢুকে গেলাম। পরদিন সকালে সেমিনার আছে। এই অঞ্চলের পর্যটনের নানা দিক তুলে ধরা হবে সে সেমিনারে।
তাওয়াং শহর।
তাওয়াং শহর।
আমার তখনই শুতে ইচ্ছে হলো না। আমি ক্যামেরা নিয়ে উঠে আসলাম হোটেলের ছাদে। হু হু করা বাতাস আর হিম শীতল ঠাণ্ডায় লং এক্সপোযারে অপূর্ব তাওয়াং শহরের রাতের ছবি তুলতে থাকি। ঘণ্টা খানেক পর রুমে ঢুকে বিছানায় শুয়ে পড়লাম।
তাওয়াং সম্পর্কে চট করে কিছু তথ্য জানিয়ে রাখি। ২ হাজার বর্গকিলোমিটারের তাওয়াং জেলায় জনসংখ্যা হাজার পঞ্চাশেকের মতো। মনপা জনগোষ্ঠির মানুষরাই এখানকার প্রধান অধিবাসী। এই মনপাদের মধ্যেও আছে ৬টি শ্রেনী – তাওয়াং মনপা, দিরাং মনপা, লীশ মনপা, ভাট মনপা, কালাকতাং মনপা এবং পানচেন মনপা। শিক্ষিতের হার শতকরা ৬০ ভাগেরও বেশি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য তাওয়াং ভ্রমণবিলাসীদের কাছে খুবই প্রিয়।
১৯ অক্টোবর, ২০১৩
আগেই বলেছি, তাওয়াং-এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনন্য। তের হাজার ফুট উচুঁতে এই শহর। রাস্তায় রাস্তায় মেঘ ঘুরে বেড়ায়। যে দিকে তাকাবেন চিরহরিৎ বনাঞ্চল ঢাকা পাহাড়ের সারি। সকালের সোনারঙা সূর্যের আলো পাহাড়ের চূড়ায় পড়েছে। বেশ কিছু ছবি তুললাম। ম্যাজিক লাইটের বদৌলতে সকাল আর সন্ধ্যায় ল্যান্ডস্কেপ ছবি দারুণ হয়। আমাদের দলের সবাই তৈরি। একসাথে চললাম নাস্তা করতে। হোটেলের তিন তলায় রেস্টুরেন্টে। গাড়ি এসে গেছে আগেই।
বিকেল পর্যন্ত সভা সেমিনার চলল। সন্ধ্যা নামার ঘণ্টা তিনেক আগে আমরা তাওয়াং শহরটা ঘুরতে বেরুলাম। কেউ কেউ কিছু শীতবস্ত্র কিনলো। আমি কিছু ওষুধ কিনলাম, তাওয়াং-এর স্থানীয় গানের একটা সিডি কিনলাম। সবাই মিলে নাম না জানা কিছু স্ট্রিট ফুড কিনে খেলাম। পাহাড়ের ওপারে সূর্য হারিয়ে যেতেই শহরে ঝুপ করে নেমে এলো অন্ধকার।
শহর ছড়িয়ে আছে পাহাড়ের ঢালে। আঁকাবাঁকা রাস্তা চলে গেছে পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে। কোন পাহাড়ের চূড়ায় স্কুল, কোন পাহাড়ের চূড়ায় মন্দির, কোথায় ঢালের গা কেটে তৈরি করা হয়েছে আধুনিক মার্কেট, শপিংমল, কুটিরশিল্পের প্রদর্শনী কেন্দ্র।
হেলিকপ্টার থেকে তোলা তাওয়াং শহর।
হেলিকপ্টার থেকে তোলা তাওয়াং শহর।
অন্ধকার পাহাড়ের গায়ে সন্ধ্যা হতেই নক্ষত্রের মতো জ্বলে ওঠে বৈদ্যুতিক বাতি। শহরের হোটেলগুলি পর্যটকে ভরা। রাত বাড়তে থাকে শীতেরও প্রকোপ বাড়ে। রাতে আবার সেই নৈশভোজ। আমরা ডিনার সেরে হোটেলে ফিরে এলাম। সবাই একরুমে জড়ো হয়ে অনেক গল্প হলো। মাঝরাত পেরিয়ে যাওয়ার পর যে যার রুমে ফিরে এলাম। আজকে অনেক ক্লান্ত লাগছে। রুম হিটার জ্বলছে। বাতি নিভিয়ে শুয়ে পড়লাম। হোটেলের জানালার গায়ে অস্বচ্ছ জমাট কুয়াশা।
২০ অক্টোবর, ২০১৩
আজকে তাওয়াং-এ দুইদিনব্যাপী এক দারুণ উৎসব শুরু হতে যাচ্ছে। সকালে অফিসিয়াল কিছু কাজকর্ম সেরে দুপুরের পরপর আমরা মেলা প্রাঙ্গনে পৌঁছে গেলাম।
সব মিলিয়ে হাজার খানেক মানুষের আয়োজন। উৎসবে প্রায় অর্ধশতাধিক স্টল আছে। এই স্টলগুলিতে তাওয়াং-এর শিল্প, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষি, কুটির শিল্প, জীবন-যাপনের বৈচিত্র্য তুলে ধরা হলো। কিছু কিছু কটেজ ছিলো যেখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির মানুষরা কীভাবে বসবাস করে তা তুলে ধরা হয়েছে।
তাদের পোশাক, রান্নাঘর, অতিথিশালা, ব্যবহার্য নানা দ্রব্যাদি সাজানো, তৈরি করা হচ্ছে নানা খাবার। মাঝখানে গনগনে আগুনের চুল্লী, চারপাশে উৎসুক দর্শনার্থীরা বসে গরম গরম তৈরি করা খাবার কিনে খাচ্ছে। ছবি তুলছে, ফেসবুকে আপডেট করছে।
মেলা প্রাঙ্গণের চারপাশ উঁচু উঁচু পাহাড় ঘেরা। বিকাল হতেই পাহাড়ের চূড়া থেকে শুরু হলো প্যারাগ্লাইডিং। একে একে প্যারাগ্লাইডাররা নেমে আসছিলো মেলার খোলা চত্ত্বরে। এক সময় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। চারপাশে আলোর মশাল জ্বলে উঠলো। মনে হচ্ছিল হাজার বছর আগের কোন জনপদের বাসিন্দা হয়ে আছি।
তাওয়াং-এর পাহাড়ি পথ।
তাওয়াং-এর পাহাড়ি পথ।
চাঁদের ভৌতিক আলোয় তাদেরই একজন হয়ে এই উপত্যকার আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছি। অধিবাসীদের রঙবেরঙের নানা ডিজাইনের বিচিত্র পোশাক। তাদের ঘিরে ছবি তোলার হিড়িক। আকাশে বিশাল চাঁদ উঠেছে। চারপাশের স্টলের মাঝখানের খোলা জায়গায় স্টেজ বানানো হয়েছে। সেখানে চলছে নাচ-গান, উপস্থাপকের মজার মজার উপস্থাপনা আর দর্শকদের হৈ-হল্লা। রাত বেড়ে চলল। আমরা বিদেশী ডেলিগেটরা এক ফাঁকে নৈশভোজ সেরে নিলাম। তারপর আরো গান, আরো নৃত্য, আরো পানাহার, আরো ছবি তোলা, আরো হারিয়ে যাওয়ার গল্প। হোটেলে ফিরে এসেও এই আনন্দ শেষ হয় না।
আমাদের হোটেলে আরো অনেক দেশের ডেলিগেটরা থাকছেন। গত দুদিনে তাদের সাথেও একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। অনেক রাত পর্যন্ত তাদের সাথেও আড্ডা দেয়া হলো। হলো অনেক মত বিনিময়। তাদের পর্যটন, রাজনীতি, ধর্ম, দর্শন, চলচ্চিত্র, ফটোগ্রাফি কিছুই বাদ গেল না। আমাদের আসরে সবচেয়ে বেশি হলো জোকস। পরিব্রাজক আশরাফুজ্জামান উজ্জ্বলের ভাণ্ডার যেন অফুরন্ত। পর্যটন বিচিত্রার সম্পাদক মহিউদ্দিন হেলালেরও গল্পের রসদ সমৃদ্ধ। এটিএন নিউজের প্রণবদা প্রসঙ্গক্রমে রাজনীতি আর ইতিহাস তুলে ধরে আমাদের সমৃদ্ধ করে চলেছেন। ফোর হুইলস ট্যুরিজম-এর বাপ্পী ভাই নিপাট ভদ্রলোক। সাতেপাঁচে নাই। আমার ভালোমন্দে তার কড়া নজর, যেন অভিভাবক। দৈনিক যুগান্তর-এর রাকিব ভাই চুপচাপ মানুষ। আমি সব সময়ই ভালো শ্রোতা। ছবি তুলেই সময় কাটাই বেশি।
শুকরের মাংস পোড়াতে দিচ্ছেন শেফ হংসং টাসি।
শুকরের মাংস পোড়াতে দিচ্ছেন শেফ হংসং টাসি।
২১ অক্টোবর, ২০১৩
আজকে আমরা তাওয়াং শহর থেকে বাইরে বেড়াতে যাব। দুটি জায়গা দেখার আছে। একটি হচ্ছে মাধুরী লেক। যার আসল নাম শাংগেতসার লেক। রাকেশ রোশন পরিচালিত কোয়েলা ছায়াছবির ‘তানহাই তানহাই তানহাই… দোনোকো পাস লে আই…’ গানটির শুটিং এই লেকে হয়েছিলো। এরপর থেকেই লেকটির আসল নাম হারিয়ে ধীরে ধীরে মাধুরী লেক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে।
ভূমি জরিপ অনুসারে ১৯৫০ সালে এক ভূমিকম্পের ফলে উদ্ভূত বন্যা থেকে এই লেকের উৎপত্তি। এই লেক দেখার জন্য আপনার তাওয়াং আসার দরকার নেই হয়ত কিন্তু আপনি তাওয়াং এলে শাংগেতসার লেকটিকে এক নজর দেখে যাবেন।
তাওয়াং শহর থেকে ঘণ্টা দুয়েকের পথ। লেকটি যেমন সুন্দর দেখতে যাওয়ার পথটিও তেমন সুন্দর। আমরা চললাম আরো দূরের পথে। জাং ফলস দেখতে। জাং জলপ্রপাতের আসল নাম ছিলো নুরানাং ফলস। এখন জাং ফলস নামেই পরিচিত। অপূর্ব সুন্দর এই জলপ্রপাত। পাহাড়ের গা বেয়ে, এঁকেবেঁকে চলা পথের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে আমরা যখন জাং ফলসের কাছে পৌঁছলাম তখন যেন ভাষা হারিয়ে ফেললাম। এত সুন্দর ঝর্না এর আগে কোথায় দেখেছি মনে পড়ে না। প্রায় ঘণ্টা খানেক সময় কাটালাম সেখানে।
কত রকম ছবিই না তুললাম। এই ঝর্নার কাছেই একটি রিসোর্ট আছে। পাহাড়ের চূড়ায়। সে রিসোর্টের বারান্দা থেকে পুরো ঝর্না আর খরস্রোতা ঝিরি নজরে আসে। অপূর্ব! এই বারান্দায় বসে আমরা সবাই কফি খেলাম। কিছুটা সময় জিরিয়ে ভ্রমণের ক্লান্তি একটু দূর হতেই ফেরার পথ ধরলাম।
পথে স্থানীয় এক রেস্টেুরেন্ট থেকে ভর্তা, সবজি, পাহাড়ি মুরগীর মাংস দিয়ে দুপুরের আহার করে নিলাম। আহা কী তার স্বাদ! তাওয়াং-এ ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। তবুও কিছুটা সময় চাইলে তখনও বেড়ানো যায়।
সবাই হোটেলে ঢুকে গেলো। টাসি বলল, চলুন আপনাকে তাওয়াং-এর ওয়ার মেমোরিয়ালটা দেখিয়ে আনি। বেশ, তাই চলুন। গিয়ে বুঝলাম, এই ওয়ার মেমোরিয়াল না দেখলে আমার একটা বড় অতৃপ্তি থেকে যেত। সুবেদার জুগেন্দার সিং-এর নাম যারা জানেন তারা ইতিমধ্যেই বুঝে গেছেন আমার বক্তব্য। ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধে সুবেদার জুগেন্দার সিং এক পাহাড়ের উপত্যকায় মাত্র ১৩ জন সৈন্য নিয়ে প্রায় ৬০০ জন চীনা সৈন্যকে আটকে রেখেছিলেন। জুগেন্দার সিং প্রথম দিনেই গুলিবিদ্ধ হন। এবং সেই গুলিবিদ্ধ অবস্থায় যুদ্ধ পরিচালনা করেন। টানা তিনদিন যুদ্ধ চলার পর পুরো ১৩ জনের দলটিই শহীদ হন এবং তারপর চীনা সৈন্যরা সেই উপত্যকা অতিক্রম করে ভারতের আরো ভেতরে প্রবেশ করে।
পাহাড়ের ওপর খোলা চত্ত্বরে আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলার জন্য তৈরি করা অস্থায়ী অডিটোরিয়াম।
পাহাড়ের ওপর খোলা চত্ত্বরে আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলার জন্য তৈরি করা অস্থায়ী অডিটোরিয়াম।

এই যুদ্ধকাহিনী দেশের জন্য আত্মত্যাগের নিদর্শন হিসেবে ভারতের ইতিহাসে খোদাই হয়ে গেছে। সুবেদার জুগিন্দার সিংকে ইন্ডিয়ান আর্মির সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘পরম বীরচক্র’ খেতাবে ভূষিত করা হয়েছে। এই ওয়ার মেমোরিয়ালে যুদ্ধে শহীদ হওয়া আরো সকল সৈন্যদের নাম লেখা আছে। স্থাপত্য শৈলীর বিবেচনায়ও ওয়ার মেমোরিয়ালটি অন্যন্য। একজন আর্মি অফিসার পরম যত্নে আর শ্রদ্ধায় মেমোরিয়ালটি ঘুরিয়ে দেখালেন। অনেক রাত পর্যন্ত জেগে রইলাম। হোটেলে ছাদে দাঁড়িয়ে শেষ বারের মতো রাতের তাওয়াং শহর দেখে নিলাম। পরদিন সকালেই আমরা তাওয়াং ছেড়ে যাচ্ছি। ৪টি দিন স্বপ্নের মতো কেটে গেল। সকাল ৯টায় আমাদের হেলিকপ্টার। রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগেই লাগেজ গুছিয়ে নিলাম।
২২ অক্টোবর, ২০১৩
ঘুম ভাঙলো দরজায় লবসং টাসির টোকা শুনে। দ্রুত নাস্তা সেরে নিলাম। গাড়ি তৈরি। সবাই অন্যান্যদের কাছ থেকে বিদায় নিলাম। হেলিপ্যাডে পৌঁছে গেলাম নির্ধারিত সময়ের আগেই। বিদায় ভারাক্রান্ত চোখে আরো অনেকের সাথে হেলিপ্যাডে দেখা হলো। তারপর একসময় বিশাল হেলিকপটারটি আমাদের নিয়ে উড়াল দিলো। তাওয়াং শহরের ছোট ছোট বাড়িগুলি আরো ছোট হতে থাকলো। বিখ্যাত সেলা পাসের ওপর দিয়ে হেলিকপ্টার উড়ে চললো গৌহাটি এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে। পেছনে পরে রইলো হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার এক অজানা উপাখ্যান।
মেঘের মধ্যে ডুবে আছে রাতের তাওয়াং। হালকা বাতাস আর হাড় জমাট করা কনকনে ঠাণ্ডা।
মেঘের মধ্যে ডুবে আছে রাতের তাওয়াং। হালকা বাতাস আর হাড় জমাট করা কনকনে ঠাণ্ডা।
তাওয়াং-এ যা যা দেখার
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তো আছেই। এছাড়া দেখতে পারেন তাওয়াং মনাস্ট্রি, তাওয়াং শহর, মাধুরী লেক (শাংগেতসার লেক), জাং বা নুরানাং ফলস, ওয়ার মেমোরিয়াল, স্থানীয় হস্তশিল্প প্রদর্শনী ইত্যাদি।
যেভাবে যাবেন
নানা পথ আছে। বেছে নিন আপনার পছন্দ মতো একটি।
এক. ঢাকা-কোলকাতা-গৌহাটি-তাওয়াং
আপনি বাসে (১৪/১৫ ঘণ্টা) ১৫০০ টাকায়, ট্রেনে (১২/১৩ ঘণ্টা) ন্যূনতম ৯৬০ টাকায় বা বিমানে (৪০ মিনিট) আনুমানিক ৬ হাজার টাকায় ঢাকা থেকে কোলকাতা যেতে পারেন।
কোলকাতা থেকে গৌহাটি যেতেও বাস (২০/২২ ঘণ্টা), ট্রেন (২২/২৩ ঘণ্টা) এবং বিমান (সোয়া ১ ঘণ্টা) আছে। এসি বাসে ১ হাজার টাকা, ট্রেনে ৮শ টাকা, বিমানে আনুমানিক ১০ হাজার টাকা খরচ হবে।
ঢাকা থেকে গৌহাটি সরাসরি কোন ফ্লাইট নেই। জেট এয়ারের কানেক্টিং ফ্লাইটে যেতে পারেন। রিটার্ন টিকেটে খরচ পড়বে আনুমানিক ২১ হাজার টাকা। গৌহাটি থেকে বমডিলা হয়ে বাসে (প্রায় ২ দিন) বা হেলিকপ্টারে (সোয়া ১ ঘণ্টায়) তাওয়াং পৌঁছা যায়।
বাসা ভাড়া আনুমানিক ১৫শ থেকে ২ হাজার টাকা। হেলিকপ্টার ভাড়া জনপ্রতি সাড়ে ৪ থেকে সাড়ে ৫ হাজার টাকা।
দুই. ঢাকা-তামাবিল-শিলং-গৌহাটি-তাওয়াং
ঢাকা থেকে সিলেট হয়ে তামাবিল যেতে ৬শ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। তামাবিল থেকে বর্ডার পেরিয়ে বাস বা জিপ পাওয়া যায়। শিলং হয়ে গৌহাটি যেতে খরচ পরবে জনপ্রতি দেড় থেকে ২ হাজার টাকা। গৌহাটি থেকে তাওয়াং যাওয়ার খরচ আগেই বলেছি।
যেখানে থাকবেন
আপনার যাত্রাপথের ওপর নির্ভর করে আপনাকে তাওয়াং যাওয়ার পথে কোলকাতা,শিলং বা গৌহাটিতে রাত্রি যাপন করতে হতে পারে। অনলাইনে অনেক হোটেলের তথ্য পাবেন। তবে কয়েকটি হোটেলে নাম বলে রাখি। বাজেট অনুযায়ী হোটেল বেছে নিতে পারবেন।
আসামের রাজধানী গৌহাটি এয়ারপোর্ট। হেলিকপ্টারের জানালা থেকে তোলা।
আসামের রাজধানী গৌহাটি এয়ারপোর্ট। হেলিকপ্টারের জানালা থেকে তোলা।
কোলকাতায় গ্র্যান্ড হায়াত, পিয়ারলেস ইন, মনোটেল, কর্পোরেট, ডি. কে. ইন্টারন্যাশনাল, গোল্ডেন অ্যাপল, আফরিন ইন্টারন্যাশনাল ইত্যাদি।
গৌহাটিতে হোটেল ব্রহ্মপুত্র অশোক, গেটওয়ে, ডাইনেস্টি, রেইনস ইন এগুলোও ভালো মানের হোটেল।
শিলং-এ থাকতে পারেন সেন্টার পয়েন্ট, পোলো টাওয়ার, অ্যালপাইন কন্টিনেন্টাল, মি কাসা, পাইনউড, পেগাসাস ক্রাউন, এসেম্বলি ইত্যাদি হোটেলে।
তাওয়াং-এ থাকতে পারেন সংগার লজ, তাওয়াং লজ, তাওয়াং ইন, জ্যাক্স ইত্যাদি হোটেলে। মাঝারি মানের হোটেলে থাকলে রাতপ্রতি ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা খরচ পড়বে।
খরচ
যদি ৪জন বা ৮জন বা ১২ জনের গ্রুপ হয় তাহলে ভ্রমণে সবচেয়ে কম খরচ পড়বে। থাকা, খাওয়া এবং যাতায়াতে ন্যূনতম আনুমানিক ২০ হাজার টাকা বাজেট ধরলে আপনি তাওয়াং ভ্রমণ করে আসতে পারবেন। কোন ট্যুর অপারেটরের সাহায্য নিলে সবচেয়ে ভালো করবেন।
: : : : ফেব্রু ১৫, ২০১৪  source link

নেপালের ভ্রমনলিপি

প্রথমেই বলে নিচ্ছি আমার পিসিতে বাংলা লেখাতে সমস্যার কারনে যুক্তাক্ষরে সমস্যা হবে দয়া করে আপনারা বুঝে নিয়েন কি বোঝাতে চাইছি । আর না বুঝলে কমেন্টস করবেন । আমি আমার নেপালের ভ্রমনলিপি এক টানা লিখবো না পয়েন্ট অনুসারে লিখবো যাতে করে পরবরতিতে যারা ভ্রমন করবেন তাদের কাজে লাগে ।
************************************************
সময়টা ছিল অক্টোবর ২০১৩ , দিনটা ছিল ১৯ শে অক্টোবর । সবে মাত্র নেপালে টুরিস্ট সিজন শুরু চলবে ফেব্রুয়ারী পরযন্ত । আমরা ২ জন, যাচ্ছি ইউনাইটেড এয়ারওয়েজে । বিকেল ৪ টা ফ্লাইট । ২ ঘন্টা আগেই এয়ারপোরটে পোউছলাম । আমার মতে বাংলাদেশ থেকে কোন প্যকেজ এ যাওয়া লস , ওই জায়গাটা পুরোই টুরিস্ট প্রধান সুতরাং যারা ১ম যাবেন তাদের জন্য কোন ভয় নেই শুধু নিজের সচেতনতাই যথেস্ট । আমরা ও কোন প্যকেজে যাইনি নিজেরা নিজেদের প্যকেজ তৈরী করে নিয়েছি আমার মতে সেটাই ভাল হবে ।
ভিসা
ভিসা সংক্রান্ত তথ্যের জন্য আমার প্রকাশিত ব্লগটি দেখুন ।
নেপাল ভ্রমণ - বাংলাদেশীদের জন্য তথ্য -
Click Here
এয়ারটিকিট
বাংলাদেশ থেকে বরতমানে ২ টি বিমানই নেপালে যায় সেটি হলো - বাংলাদেশ বিমান এবং ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ । ভাড়া বেশী ডিফারেন্স না তবে বাংলাদেশ বিমানই ভাল এবং বড়। ইউনাইটেড ও খারাপ না । সময় লাগে ছাড়ার পর ১ ঘন্টা । এয়ার টিকিট কাটার সময় ২ -১ টি ট্রাভেল এজেন্সী দেখে টিকিটের দাম যাচাই করে নিলে দামে ৫০০-১০০০ টাকা কমে পাওয়া যাবে যা সরাসরি অফিস থেকে নিলে সম্ভব না । আমরা টিকিট কেটেছি ট্রাভেল এজেন্সী থেকে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ থেকে ভাড়া – ১৬,৮৮৮/= টাকা আপ – ডাউন । টুরিস্ট রা সরবোচ্চ ২০০ ডলার এনডোস করাতে পারবে আর বাকি ডলার লুকিয়ে নিতে হবে তাতে কোথাও কোন সমস্যা হবে না ।
ঢাকা টু কাঠমুন্ডু যাত্রা
সময় মত বিমান ছাড়লে ১ ঘন্টায় কাঠমুন্ডু এয়ারপোরট । প্লেন থেকে নেমে আমাদেরকে একটি এয়ার বাস এসে এয়ারপোরটের ভেতর নিয়ে গেল । তাদের এয়ারপোরট দেখতে খুবই বাজে সেই তুলনায় বাংলাদেশের এয়ারপোরট অনেক অনেক বেশী সুন্দর। ইমিগ্রেশনের কাছাকাছি যেতেই পড়ে গেল হুড়হুড়ি । বাংলাদেশীদের জন্য “ অন এরাইভেল ভিসা” সুতরাং সেখানে কিছু ফরমালিটিজ আছে । বড় একটা আর ছোট একটা ফরম পুরন করতে হবে। এই সময়টিতে যা লাগবেই সেটি অবশ্যই সাথে নিয়ে যাবেন তা না হলে প্রথম খরচ শুরু হয়ে যাবে । ফরমালিটিজ শেষ করতে ১ ঘন্টার ও বেশী সময় লাগবে । পাশেই মানি একচেঞ্জ আছে ১০০ ডলার ভাঙ্গিয়ে নিবেন অবশ্যই । আমাদের ডলার রেট দিয়েছে –
১০০ ডলার = ৯৬৬০ নেপালী রুপী ।
১। কলম ২। আপনার এক কপি ছবি ৩। পারলে ছোট স্টেপ্লার ।
ওখানে ছবি তোলা যায় সেক্ষেত্রে ২০০ রুপি জরিমানা দিতে হবে । তারপর লাইনে দাঁড়িয়ে সেই ফরম জমা দেবার পর পেয়ে যাবেন ৩০ দিনের ভিসা । তারপর শুধু ঘুরা আর ঘুরা ।
* এটা হচ্ছে এয়ারবাস এতে করেই আমাদেরকে প্লেনের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ।

* এইটা হচ্ছে আমাদের বিমান যেটাতে করে কাঠমুন্ডু এয়ারপোরটে গিয়েছিলাম ।
* নেপালের এয়ারপোরট ( বাইরে ফিট ফাট ভিতরে সদরঘাট :D )

* এসে পড়লাম নেপাল
* এয়ারপোরট এসেই শুরু করতে হবে লেখা পড়া X(

* তারপর সোজা যাদের ভিসা নেই তাদের লাইনে দাঁড়িয়ে যেতে হবে

এয়ারপোরট থেকে হোটেল
এয়ারপোরট থেকে মুক্তি পাবার পর এয়ারপরটের সামনে দেখি অনেক টেক্সি ওয়ালাদের হাক ডাক আর গেইটেই আছে বিশাল এক টেক্সি ভাড়া দেওয়ার বুথ ফিক্সড প্রাইজ !! কিন্ত বাইরের তুলনায় অনেক বেশী ভাড়া চায় । আমাদেরকে ও ঘিরে ধরলো টেক্সিওয়ালারা কিন্তু তারা জানে না আমরা কি জিনিস !! সবাই ভাড়া চায় ডলারে । আমরা যাব কাঠমুন্ডুর টুরিস্টদের প্রধান এলাকা “থামেল” এ । সবাই ১ম এ এখানেই যাবেন যদি হোটেলে ওঠেন। আমি সবার উদ্দেশ্যে চিতকার করে বল্লাম “ ৩০০ রুপি মে কহি যায়েঙ্গে থামেল ?” কথা শোনা মাত্রই আমাদের পাশ থেকে সবাই চলে গেল । আমরা ও সাইডে দাঁড়িয়ে মনের সুখে বিড়ি টানছি । আমার ইনফরমেশন অনুযায়ী এয়ারপোরট থেকে থামেল ভাড়া ৩০০ রুপি এর বেশী নয় সুতরাং আমি ৩০০ বলে দাঁড়িয়ে রইলাম , মোটামোটি প্লেনের সব যাত্রী চলে গেছে আমারা ২ জন ছাড়া । আমাদের কথা হলো এখন বাজে ৭ টা রাতে তো কোথাও ঘুরতে যাবো না সুতরাং অপেক্ষা করতে দোষ কি ? অবশেষে একজন ড্রাইভার এগিয়ে এসে বলল ৩০০ রুপির বেশী দিবেন না ? আমি বললাম , ‘না” সে বলল চলেন তাহলে যাই । তারপর আমরা গাড়িতে করে সোজা থামেল গেলাম এবং স্টেট ব্যংক এর সামনে নামলাম ।
হোটেল ইন কাঠমুন্ডু ঃ
কাঠমুন্ডুতে হোটেল এবং খাবার খরচ অনেক বেশী । আমরা মোটামুটি মানের একটি হোটেলে উঠলাম, পার নাইট ভাড়া ডাবল রুম – ১৫ ডলার = ১৪৫০ রুপি ইনক্লুডিং ভ্যট । এটা সিজনের প্রাইজ অফ সিজনে ১০ ডলারে পাওয়া যাবে ।
আমাদের এই হোটেলের পরিবেশ ভাল এবং নিরিবিলি । কেউ চাইলে সেখানে থাকতে পারেন আমি ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি ।
Choice Hotel P. Ltd.
Tridevi Marg, Thamel , Kathmundu.
Tel – 4423530 , Cell – 9841450976
Attn : Mr. Karan. ( Director) Mail- shresthakaran2009@hotmail.com ( for pre-booking)
আগে বুকিং এর চেয়ে ভাল বুদ্ধি হলো – কাঠমুন্ডু এয়ারপোরটে নেমে দেখবেন ফোন বুথ আছে তাদের দেশে লোকাল কল ফ্রি !! সেখান থেকে হোটেলে ফোন করে দর দাম করে বলবেন আমরা এয়ারপরটে আছি গাড়ি পাঠান তারা গাড়ী পাঠিয়ে দিবে। জানিয়ে রাখা ভাল – নেপালে প্রত্যেক হোটেলে তাদের নিজস্ব গাড়ী রয়েছে । সাথে সাথে এয়ারপোরট থেকে হোটেল পরজন্ত ফ্রি!
* আমাদের হোটেলে ম্যনেজার সহ

খাবার দাবার –
কাঠমুন্ডুতে যে হোটেলে থাকবেন সেই হো্টেলে খাবার খাওয়াই আমি মনে করি উত্তম আর দাম বাইরের চেয়ে কম হবে । খাবার খাওয়াতে কিছু টিপস অবলম্বন করলে ভাল খাওয়া যাবে নতুবা টাকায় টাকা যাবে কিন্তু পেট ভরবে না । স্পেশাল টিপস ফর ফুড – খাবার অরডারের সময় ওয়েটারকে আমরা বলে দিয়েছি - শোন ১ম এ ভাত এর ব্যপারে – ভাত একটু নরম হবে , তাদের অধিকাংশ জায়গায় ভাত অনেক শক্ত । ২য় ডাল – ডালে শুধু পেয়াজ , কাচা মরিচ , হলুদ , লবন দিবা অন্য কিছু দিবা না । ৩য় – মাংশ , মাছ ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে একই টিপস আর কিছু না বললে এমন জঘন্য কিছু উগ্র গন্ধ ওয়ালা মসলা দিবে খানা খাওয়ার ইচ্ছাই চলে যাবে ।
শুরু করলাম নেপাল ভ্রমন –
কাঠমুন্ডু হোটেলে কথা বলে হোটেল ম্যনেজারের সাথে আলোচনা করে একটা পুরো সময়ের একটা ট্যুর প্লান নিয়ে নিলে খুব বেশী ভাল হবে , নো চিন্তা শুধু ঘুরা আর ঘুরা । আমরা ও তার ব্যতিক্রম করিনি । যাদের হাতে সময় ৫ দিন আছে তারা আমাদের এই ট্যুর প্লানটি নিতে পারেন অনেক মজা হবে এবং পুরা নেপাল ভ্রমন ও শেষ ক রতে পারবেন ।

১ম দিন – কাঠমুন্ডূ টু পোখরা – ( যাওয়ার বাস ভাড়া সহ ) – সকাল – ৭।৩০ এ গাড়ী ছাড়বে দুপুর ৩ টায় পোউছবে । থাকার হোটেল সহ । খাবার নিজের ।
২য় দিন – পোখরা সাইট সিয়িং
৩য় দিন – সকালে – পোখরা টু চিতওয়ান ( বাস + হোটেল + রাতে খাবার + সকালের নাস্তা ) সময় – ৬ ঘন্টা
৪থ দিন – সকাল ১০ টায় চিতওয়ান টু কাঠমুন্ডু ( বাস + হোটেল ভাড়া , খাবার নিজের )
৫ম দিন – কাঠমুন্ডু সাইট সিয়িং + নাগরকোট সুরযাস্ত দেখা ( সকাল ৮ টা থেকে রাত ৮ টা ) জিপ + হোটেল ভাড়া সহ । ( খাওয়া নিজের )

এই প্যকেজের মুল্য পড়েছে – ১৬০ ডলার / পারসন । তবে একা গেলে অনেক বেশী ঝামেলা হতো এবং খরচ ও বেশী পড়তো ।

পরের পরবে- নেপালের রানী পোখরা ভ্রমনের বিস্তারিত লিখবো ।

সকলকে অনেক ধন্যবাদ ।।
চ ল বে ( তবে কতকাল সেটা জানি না !! ) link

নেপাল ভ্রমণ - বাংলাদেশীদের জন্য তথ্য

ঢাকায় অবস্থিত নেপালি দূতাবাসে বাংলাদেশী ও অন্যান্য দেশের নাগরিকদের নেপালের ভিসা প্রসেসিং সম্পন্ন হয়। এখানে শুধুমাত্র ভিজিট ভিসা দেওয়া হয়।

অবস্থান
বারিধারা মোড় থেকে কানাডা এ্যাম্বাসির পেছনের রাস্তা দিয়ে ১০০ গজ গিয়ে বাঁয়ে টার্ন নিলেই ডান পাশে অবস্থান মিলবে।

ঠিকানা
জাতিসংঘ সড়ক (UN road) # 2,
বারিধারা, ডিপ্লোমেটিক জোন, ঢাকা।
ফোন- ৯৮৯২৪৯০, ৯৮৯২৫৬৮
ফ্যাক্স- (০০-৮৮-০২) ৮৮২৬৪০১
ই-মেইল- eondhaka@dhaka.net
ওয়েবসাইট: http://www.nepembassy-dhaka.org

সময়সূচী
রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত খোলা থাকে।
সকাল ৯.৩০ মিনিট থেকে ১০.৩০ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকে।
শুক্রবার ও শনিবার সাপ্তাহিক বন্ধ।

ভিসা প্রসেসিং
ভিসা আবেদনপত্র বিনামূল্যে প্রতিদিন সকাল ৯ টা থেকে ১০ টা পর্যন্ত সংগ্রহ করতে হয়।
ভিসা আবেদনপত্র জমা নেওয়া হয় প্রতি রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৯.৩০ মিনিট থেকে ১০.৩০ মিনিট পর্যন্ত।
সদ্যতোলা পাসপোর্ট সাইজ ছবি এবং আবেদনকারীর স্বাক্ষরসহ শুধুমাত্র বৈধ পাসপোর্টধারী এবং সম্পূর্ন রূপে আবেদনপত্র পূরণকারীদের নিকট থেকে পাসপোর্ট জমা নেয়া হয়।
বাংলাদেশের সরকারী কর্মকর্তা, কূটনৈতিক সংস্থার কর্মকর্তা/ কর্মচারী এবং বৈদেশিক পর্যটনকগণ সরাসরি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ভিসা পেয়ে থাকেন।
সার্কভূক্ত দেশের নাগরিকদের জন্য একই বছরে প্রথম ভিসার জন্য কোন প্রকার ফি প্রদান করতে হবে না। একই বছরে দ্বিতীয় ভিসার জন্য ভিসা ফি প্রদান করতে হবে।
সার্কভূক্ত দেশ ব্যতিত অন্যান্য সকল বিদেশী নাগরিকদের ভিসা ফি প্রদান করতে হয়।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

ক) সদ্যতোলা পাসপোর্ট সাইজের ১ কপি ছবি এবং পাসপোর্টের ফটোকপি।

খ) ‘ব্যবসায়ীক’ পাসপোর্টধারীদের জন্য কাগজপত্রঃ

ট্রেড লাইসেন্স এর ইংরেজী অনুবাদ এবং নোটারীকৃত কপির মূলকপি।
বাংলা ট্রেড লাইসেন্স এর ফটোকপি।
বিজনেস কার্ড।
বাংলা ফটোকপি সাথে আনতে হবে।

গ) ‘চাকুরীজীবি’ পাসপোর্টধারীদের জন্যঃ
অফিসিয়াল প্রত্যয়নপত্র/ ট্রেড লাইসেন্স এর ইংরেজী অনুবাদ ও নোটারীকৃত কপির মূলকপি।
বাংলা ট্রেড লাইসেন্স এর ফটোকপি।
বিজনেস কার্ড
পরিচয়পত্র

ঘ) ‘ছাত্র’ পাসপোর্টধারীদের জন্যঃ

বৈধ পরিচয়পত্রের এবং সর্বশেষ প্রাপ্ত সনদের সত্যায়িত কপি অথবা কলেজ/ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যয়নপত্র / সুপারিশ পত্র।

ঙ) গ্রুপ ভিসার কাগজপত্র
বিশ্ববিদ্যালয়/ কলেজ/ অফিসের লেটার প্যাডে পাসপোর্ট নম্বর সহ নামের তালিকা লিখতে হবে। লেটার প্যাডে বিভাগীয় প্রধানের অফিসিয়াল সিল স্বাক্ষরসহ সুপারিশ থাকতে হবে।
আবেদন পত্র জমাদানের পূর্বে লেটারটি এই নম্বরে ০০৮৮-০২-৮৮২৬৪০১ ফ্যাক্স করতে হবে।

ভিসা ফি
১৫ দিনের মাল্টিপল ভিসার জন্য ২,০০০ টাকা ফি প্রদান করতে হয়।
৩০ দিনের মাল্টিপল ভিসার জন্য ৩,০০০ টাকা ফি প্রদান করতে হয়।
৯০ দিনের মাল্টিপল ভিসার জন্য ৭,৫০০ টাকা ফি প্রদান করতে হয়।
বিবিধ
টেলিফোনে কোন ভিসা তথ্য প্রদান করা হয় না। অন্যান্য তথ্যের জন্য প্রতি রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৯ টা থেকে ১০ টার মধ্যে ভিসার ডেস্কে যোগাযোগ করতে হয়।
link 

মেঘের রাজ্য মেঘালয়!!

ঘোরাঘুরির নেশাটা আমার ছোট্টবেলা থেকেই প্রবল। স্কুল ছুটি হলেই বাবা মাকে পটিয়ে ঢাকা থেকে বের করার গুরুদায়িত্বটা আমারই ছিল। কলেজে ওঠার পর পড়াশোনার সাথে সাথে ঘোরাঘুরিটা বেড়েছে বৈ কমেনি। কিন্তু সেই অর্থে বড়সড় একটা কোন ট্রিপ দেয়া হয় নি। তাই সামনে পরীক্ষা থাকা সত্ত্বেও বাবা মাকে পটাতে লাগলাম রোজার ঈদের ছুটিতে কোথাও ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার জন্য এবং আমার “বেশি জোস” বাবা মা দিব্যি রাজিও হয়ে গেল :D তাই যেই না কলেজ ছুটি হল তল্পিতল্পা নিয়ে বের হয়ে পড়লাম প্রতিবেশী দেশ ভারতের মেঘালয় রাজ্যের উদ্দেশ্যে। মূল গন্তব্য – শিলং, যার গল্প ছোটবেলা থেকেই সবার কাছে শুনে আসছি।
আমাদের সাথে মেঘও রাস্তা দিয়ে যায়! :D
আমাদের সাথে মেঘও রাস্তা দিয়ে যায়! :D
যাওয়ার সময় বারবার শুধু মনে হচ্ছিল – “কত আর সুন্দর হবে”। কিন্তু সীমান্তের কাছাকাছি পৌঁছতেই আস্তে আস্তে বুঝতে শুরু করলাম যে কত সুন্দর হতে পারে। সিলেটের তামাবিল বর্ডার থেকে শিলং ২/৩ ঘন্টার পথ। গাড়িতে যেতে যেতে এপাশ থেকেই ওপারের পাহাড় আর সেই সাথে পাহাডি জলপ্রপাতগুলো চোখে পড়তে লাগল। বেশ কিছু দূরে হলেও সেগুলো বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। ওহ! বলতে তো ভুলেই গিয়েছিলাম, মেঘালয় জলপ্রপাতের জন্য বিখ্যাত। ৫ মিনিট পরপরই ছোট, মাঝারি, বড় ইত্যাদি নানা আকার আকৃতির ঝর্ণা চোখে পড়তে থাকে। তো বর্ডার পার হয়ে ওপাশ থেকে গাড়ি ভাড়া করে রওনা হলাম।
সেভেন সিস্টার ফলস :)
সেভেন সিস্টার ফলস :)
পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে কিছুদূর যেতেই চোখে পড়ল সেই বিখ্যাত ঝুলন্ত ব্রিজ যেটি জাফলং থেকে দেখা যায়। দুই পাশে পাহাড় আর ব্রিজের নিচ দিয়ে বয়ে চলছে পাহাড়ি নদী। আর রাস্তার পাশের পাহাড় থেকে ছোট ছোট ঝর্ণা পড়ছে। চারদিকে সবুজ আর সবুজ। গাড়ি যত উপরে উঠতে লাগল আস্তে আস্তে কুয়াশাও বাড়তে লাগল। শেষমেশ এমন দশা যে রাস্তাই ঠিকমত দেখা যায় না। কে বলবে, এটা আগস্ট মাস!একটু একটু ভয় লাগলেও মজাই লাগছিল ভাবতে যে আমরা মেঘের উপরে আছি! ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে আর থতমত খেয়ে যাওয়ার মত সুন্দর প্রকৃতি দেখতে দেখতে শিলং পৌছে গেলাম।
DSCN4654
আকাশে হেলান দিয়ে, পাহাড় ঘুমায় ঐ!
পরবর্তী ৪/৫ দিন মহানন্দে শিলং, চেরাপুঞ্জি, ডাওকি ঘুরলাম। ভয়ঙ্কর সুন্দর জলপ্রপাত, পাহাড়ী রাস্তা আরও কত কি! কিন্তু যত সুন্দর জলপ্রপাত ততই আজগুবি সেগুলোর নাম। আমার তো মনে হচ্ছিল, খাসি ভাষা = চাইনিজ ভাষা + জাপানিজ ভাষা!! ওয়াকাবা ফলস, সেভেন সিস্টার ফলস, এলিফেন্ট ফলস, বড়পানি লেক, সুইট ফলস, ইকো পার্ক, মাওস্মাই কেভ, লিভিং রুট ব্রিজ, ব্যালেন্সিং রক, ক্যাথড্রাল, ক্যাথলিক চার্চ, ডন বস্কো মিউজিয়াম ইত্যাদি মেঘালয়ের অন্যতম টুরিস্ট স্পট। এছাড়াও আরো কত যে নাম না জানা (আসলে নামগুলো উচ্চারণঅযোগ্য) ফলস রয়েছে!!
DSCN4991
ডাওকির সবচেয়ে বড় জলপ্রপাত যাতে সারা বছরই জল থাকে :)
তবে আমার মন বেশ খারাপ হয়ে গিয়েছিল যখন শুনলাম বর্তমানে নিরাপত্তার কারণে প্রসিদ্ধ বিডন এবং বিশপ ফলস পর্যটকদের জন্য নিশিদ্ধ। সবচেয়ে মজার ব্যাপার ছিল যে চেরাপুঞ্জি প্রসিদ্ধ সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতের জন্য, আমরা যেদিন গেলাম সেদিন ঝকঝকে রোদ আর চমৎকার আবহাওয়া !! ফলস ছাড়াও কিছু মজার মজার টুরিস্ট স্পটও আছে মেঘালয়ে। যেমন -  মাওস্মাই কেভ একটি প্রাকৃতিক পাহাড়ি গুহা যার একপাশ দিয়ে ঢুকে আর একদিক দিয়ে বের হওয়া যায়, বলা হয় যে সে গুহার একটা রাস্তা দিয়ে বাংলাদেশে বের হওয়া যায়! কিন্তু রাস্তাটা এখন বন্ধ। অবশ্য এটি অসম্ভব কিছু না, পাহাড়টি সীমান্তের পাশেই অবস্থিত।
লিভিং রুট ব্রিজ!
লিভিং রুট ব্রিজ!
লিভিং রুট ব্রিজটি একটি স্রোতস্বিনী পাহাড়ি নদীর উপর গাছের জীবন্ত শিকড় দিয়ে তৈরী, খুব সম্ভবত প্রাকৃতিকভাবের শিকড় বেড়ে ব্রিজটির সৃষ্টি হয়। ব্যালেন্সিং রক একটি বিশালাকৃতির পাথর যা একটি খুব ছোট্ট পাথরের উপর মাটির সাথে সমান্তরালে অবস্থিত। এটি নড়েও না চড়েও না…মাটির স্পর্শ ছাড়াই বেশ ভালো ভারসাম্য রক্ষা করে আছে। এই মেঘালয়েই এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মাওলিন্নং অবস্থিত। তবে সবচেয়ে ভালো লাগছিল যখনই পাহাড়গুলো থেকে বাংলাদেশের অপূর্ব ভূমি দেখতে পাচ্ছিলাম :)
মেঘালয়ে ঘোরাঘুরির জন্য জায়গার অভাব নেই এবং মেঘালয় রাজ্য সরকার পর্যটকদের সুবিধার জন্য নানা সুব্যবস্থা করেছে। হোটেল, যাতায়ত প্রভৃতি বেশ সহজলভ্য। তাই বাংলাদেশ থেকে যাওয়া যেমন সহজ তেমনি সস্তাও। খুব কম খরচে বেশ আরামে মেঘালয় ঘুরে আসা যায়। সিলেট থেকে গাড়ি ভাড়া করে তামাবিল বর্ডার পর্যন্ত গিয়ে বর্ডার পার হয়ে ওপার থেকে ট্যাক্সি বা জিপ ভাড়া করে শিলং যাওয়া যায়। তামাবিলে ভালো বাস সার্ভিস বা অন্য ব্যবস্থা না থাকায় গাড়িতে যাওয়াই নিরাপদ। বর্ডারের ওপার থেকে শিলঙে যেতে ২০০০ রুপি খরচ হয়।
ব্রিজের নিচে পাহাড়ি নদী
ব্রিজের নিচে পাহাড়ি নদী
শিলঙে ভালো মানের হোটেলের ভাড়া ১৫০০-২০০০ রুপি/দিন। আর পুলিশ বাজারে অবস্থিত মেঘালয় টুরিজ্যমের অফিস থেকেই পর্যটনের জন্য বিশেষ গাড়ি ভাড়া নেয়া যায়। এছাড়া প্রাইভেট ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসগুলো থেকেও গাড়ি ভাড়া করা যায়। শিলং থেকে  চেরাপুঞ্জি  যাওয়া-আসা এবং সব জায়গা ঘুরতে ২০০০ রুপি এবং শিলং শহর ও তার সাথে বড়পানি লেক, সুইট ফলসে যেতে ১৫০০ রুপি খরচ পড়ে। শিলং থেকে ফেরত আসার পথে ডাওকির ফলস, লিভিং রুট ব্রিজ, ব্যালেন্সিং রক, ক্লিন ভিলেজ ইত্যাদি দেখে আসা যায়, তাতে ২৫০০ রুপির মত খরচ হয়। সব মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য জায়গাগুলো ৪০০০ রুপির মধ্যেই আরামে ঘুরে আসা যায়। তবে পেট্রোলের দামের ওপর নির্ভর করে ১০০/২০০ রুপি এদিক ওদিক হতে পারে। পর্যটনের জন্য বাসের ব্যবস্থাও আছে তাতে খরচ কম পড়ে।
এভাবে মেঘালয় খুব সহজেই ঘুরে আসা যায়। খুব বেশি সময়েরও প্রয়োজন হয় না, ১ সপ্তাহের মধ্যেই সব ঘুরে নেয়া যায়। আউটডোর এক্টিভিটিস, যেমন – রাফটিং, মাউন্টেইন ক্লাইম্বিং এসবের জন্য শীতকালে মেঘালয় যাওয়া সুবিধার হলেও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জলপ্রপাতগুলোকে দেখার জন্য বর্ষাকালই সবচেয়ে ভালো সময়। মেঘালয় সত্যিই অতুলনীয় :)