শনিবার, ২৮ জুন, ২০১৪

চীনের কুনমিং : প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের হাতছানি

পৃথিবীর নানা দেশ নানা সৌন্দর্যে ভরপুর করে তৈরী করেছে প্রকৃতি। ভ্রমণ পিপাসুদের হাতছানি দিয়ে যায় প্রকৃতির এই অপার সৌন্দর্য।  চীনের কুনমিং শহর পরিচিত ‘চির বসন্তের শহর’ নামে। শহরটিকে বলা যায় প্রাকৃতিক স্থাপত্যশিল্পের এক অনুপম নিদর্শন।
কুনমিং বাংলাদেশ থেকে বেশ কাছের একটি জায়গা। তবে পরিচয়ের হিসেবে তা বেশ দূরেরই বটে। গণচীন এক সময় বাংলাদেশের মানুষের কাছে প্রায় অপরিচিত একটি দেশ ছিল। অনেকদিন পর্যন্ত দেশটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় ছিল কেবল কিছু চীনপন্থী নেতার মাধ্যমে। তারা মাও সে তুং-এর লাল বই পকেটে নিয়ে ঘুরতেন আর পিকিং থেকে ঘুরে এসে নানা কথা বলতেন। আর চীন থেকে সুন্দর সুন্দর পত্রিকা আসত বাংলাদেশের অনেকের কাছে।
ইদানিং অবশ্য পরিচয় বাড়ছে। বাংলাদেশ থেকে সরাসরি চীনের বিভিন্ন শহরে ফ্লাইট যাচ্ছে। সে রকমই একটা ফ্লাইটে চড়ে আমরা কজন চীনের কুনমিং যাচ্ছি। চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী এই কুনমিং শহর। শহরটি পরিচিত ‘চির বসন্তের শহর’ নামে।
কুনমিং এর তিন দিকে পাহাড়, একদিকে ডায়ানচি হ্রদ। শহরটি সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে ৬,১৮৯ ফুট (১,৮৮৬.৫ মিটার) উচ্চতায় অবস্থিত। প্রায় ২,৪০০ বছরের পুরনো এ শহরটিকে বলা যায় প্রাকৃতিক স্থাপত্যশিল্পের এক অনুপম নিদর্শন।
   
চায়না ইস্টার্ন-এর এই বৈকালিক ফ্লাইটটি চীন সীমান্ত পেরুতে না পেরুতেই দিনের আলো নিভে এল, সুয্যি ডুবে ডুবে। সন্ধের পরপর আমরা কুনমিং এয়ারপোর্টে নামলাম। সেখানে খাইরুল আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। আমরা খাইরুলের নিয়ে আসা গাড়িতে চড়ে চীনে প্রবেশ করলাম।
চীনে আমি এই প্রথম এসেছি। এর আগে বিশ্বের যে দেশেই গিয়েছি, সেখানেই চীনের পর্যটক দেখেছি। চীনের নানা জিনিস দেখেছি এবং কিনেছিও। অস্ট্রেলিয়ার পার্থে, রাশিয়ার ক্রেমলিন ভবনের সামনে, কানাডার নায়াগ্রা জলপ্রপাতের কাছে বিক্রি হয় চীনের তৈরি নানা পণ্য। ওরা সুই থেকে উড়োজাহাজ পর্যন্ত সবই বানায়। শুনেছিলাম ওদের অর্থনীতি সাঁই সাঁই করে উপরের দিকে ছুটছে। এর কিছুটা লক্ষণ দেখতে পেলাম বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পরই। রাস্তাগুলো ঝকঝকে, প্রশস্থ, দোতলা-তিনতলা। লাইনের পর লাইনে গাড়িগুলো বিরামহীন ছুটছে। কারও যেন ব্যস্ততার শেষ নেই।
সন্ধে উতরে যাওয়ার পর আমরা পৌঁছুলাম একটি ছোট্ট শহরে। এটাকে বরং উপশহর বলাই ভালো। এখানে বাংলাদেশের কিছু যুবক বিভিন্ন ভবন ভাড়া করে হোটেল বানিয়েছেন। খুবই কম পয়সায় এরা বাংলাদেশিদের এ সব হোটেলে থাকতে ও খেতে দেন। থাকা এবং দুবেলা বাংলাদেশি ঘরানার খাবারসহ খরচ হয় ১০০ আরএমবি (রেনমিনবি) বা ইউয়ান। (আরএমবি বা ইউয়ান হচ্ছে চীনা মুদ্রার নাম। ১০০ আরএমবি  এর সমান হচ্ছে ১ হাজার ৩৩৩ বাংলাদেশি টাকা।) বাংলাদেশিদের এসব হোটেলে থাকা-খাওয়ার সঙ্গে বোনাস– এয়ারপোর্ট থেকে আনা-নেওয়া ফ্রি। আবার কেউ যদি এসব হোটেলে থাকতে না চান, কাছাকাছি অন্য কোনো হোটেলেও থাকতে পারবেন। আর চৈনিক খাবারে অরুচি হলে, তারা এ সব বাংলাদেশিদের রেস্টুরেন্টে মাত্র ৩০ আরএমবি দিয়ে সকালের নাস্তা ও রাতের খাবার খেতে পারবেন।
আমরা সানন্দে খাইরুলের এই সরাইখানায় উঠে গেলাম। বাড়িটি বেশ সুন্দর। মূল রাস্তা থেকে একটুখানি ভেতরে, দু-তিনটা মোড় ঘুরলেই পাওয়া যায়। তবে রাস্তাগুলো একবারেই চিনে রাখতে হয়। কারণ মহল্লার সবগুলো বাড়িই প্রায় এক রকম। বাইরের লেখাজোখা সবই চীনা ভাষায়, ইংরেজি বা বাংলার কোনো চিহ্নও নেই। আবার কোনো লোককে কোনো কথা জিজ্ঞেস করারও কোনো উপায় নেই। ইংরেজিও কেউ বোঝে না, বাংলা তো দূর অস্ত।
  
আমরা চটপট রাতের খাবার খেয়ে ঘুরতে বের হলাম। খাইরুলও আমাদের সঙ্গে গেলেন। উদ্দেশ্য– শহর দেখা। একটা নাইট মার্কেট আছে বলে শুনেছি। সেখান থেকে যদি কিছু কেনাকাটা করা যায়, তাও হবে। এখানে বেশ কজন ড্রাইভার বাংলা বলতে পারেন। যাত্রীদের প্রয়োজন অনুসারে খাইরুল এদের ডাকেন। আমাদের সঙ্গে যেহেতু খাইরুল আছেন, সুতরাং দোভাষী ড্রাইভারের দরকার হল না।
প্রায় আধা ঘণ্টা চলার পর আমরা একটা চমৎকার মার্কেটে এসে নামলাম। এটা কুনমিং শহরের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত এক বিরাট এলাকাজুড়ে খোলা বাজার। পুরো এলাকায় কেবল হৈচৈ হচ্ছে। সবাই কেনাকাটায় ব্যস্ত। ছোট ছোট খোলা দোকানে দোকানিরা নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে। পণ্যগুলোর মধ্যে বই, কাপড়, জুতা, খেলনা, মোবাইল ফোন, সিডি ইত্যাদি আছে। আর আছে অনেক অনেক খাবারের দোকান। সব দোকানেই গরম গরম খাবার তৈরি হচ্ছে। এসব খাবারের মধ্যে আছে মাছ, মাংস, পিঠা, নুডুলস। সঙ্গে আরও এমন সব খাবার আছে, যেগুলো আমাদের দেশের মানুষের পাতে উঠিয়ে দিলে তারা কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে পালাবে।
আমরা ঘণ্টা দুয়েক মার্কেটে ঘুরলাম। টুকটাক অনেক জিনিসও কিনলাম। পরে রাত সাড়ে বারটার দিকে আমরা আবার হোটেলে ফিরে এলাম।
পরদিন একটু সকাল সকাল আমাদের বেরোতে হল। আজ আমরা জিওক্সিয়াং গুহা ও পাথুরে জঙ্গল বা স্টোন ফরেস্ট দেখতে যাব। এ দুটো ইউয়ান প্রদেশে পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ।
  
কুনমিং হতে জিওক্সিয়াং গুহার দূরত্ব প্রায় ৯০ কিমি। আমরা একটি মাইক্রোবাসে চড়ে রওনা হলাম। ড্রাইভারের নাম ও ছ লুং। খাইরুলসহ বাংলাদেশের অন্যান্যরা মিলে তাকে বাংলা ভাষা শিখিয়ে দিয়েছে। তার একটা বাংলা নামও দিয়েছে– ‘বিল্লু’। নাম জিজ্ঞেস করলে সে হাসিমুখে বলে, “আমার নাম বিল।”
বিল্লু নামটিই সে সংক্ষেপ করে বলে ‘বিল’।
বিল্লু এই এলাকারই ছেলে। বয়স ত্রিশের বেশি হবে না। বেশ ভালো বাংলা বলতে পারে। চলার পথে আমি রাস্তায় ছবি তুলব বলে বিল্লুর পাশের সিটে বসলাম। ঘোরাঘুরির ক্ষেত্রে এ সিটটাই আমার বেশি পছন্দ; কারণ এখানে বসলে সব কিছু ভালোভাবে দেখা যায়।
গাড়িতে আমার সহযাত্রী আবদুর রহমান খান, রফিক, জাফর, মামুন ও রব। সবাই মিলে হৈচৈ করতে করতে যাচ্ছি। চমৎকার মসৃণ হাইওয়ে, গাড়ি ছুটে চলেছে ১২০ কিমি কখনও কখনও তারও বেশি বেগে। পথে এক জায়গায় গাড়ি থামানো হল পেট্রোল কেনার জন্য। এ সময় সবাই পাশের ছোট্ট দোকানে গিয়ে ভিড় জমালো। রব সবার জন্য পানি কিনে আনল, আবদুর রহমান খান নিয়ে এলেন চকলেট আর বিস্কুট। দ্রুত কেনাকাটা সেরে সবাই গাড়িতে এসে বসেছেন, কিন্তু রফিককে পাওয়া যাচ্ছে না।
অনেকক্ষণ পর তিনি হাতে করে কী একটা প্যাকেট নিয়ে এলেন। আমরা সবাই অস্থির হয়ে ছিলাম তাড়াতাড়ি যাব বলে। তাই সবাই এক যোগে রফিককে ধরে বসলাম, “কোথায় ছিলেন এতক্ষণ? এটা কী এনেছেন?”
রফিক একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেলেন। তিনি একটা ঢোক গিলে বললেন, “ক্ষিধে পেলে খাবেন কী? আপনাদের কথা ভেবে অনেক খুঁজে মজার একটা খাবার এনেছি।”
“কী এনেছেন?”
“কেক। মনে হয় খুব মজার হবে। একদম তাজা, হয়তো আজই বানিয়েছে।”
রফিকের কথা শুনে বিল্লু হিহি করে হাসতে শুরু করল।
আমি বললাম, “কী হয়েছে? তুমি হাসছ কেন?”
গাড়ি চালাতে চালাতে বিল্লু বলল, “এটা খেতে পারবেন না। এটা হল কুকুরের খাবার। সঙ্গে করে নিয়ে চলেন, দেশে গিয়ে কুকুরকে খাওয়াবেন।”
ড্রাইভারের কথা শুনে সবাই হোহো করে হেসে দিল। রফিক এবার খুবই বিব্রত। মানুষের খাবার ভেবে সে নিয়ে এসেছে কুকুরের খাবার। প্যাকেটের গায়ে চীনা ভাষার লেখা দেখে সে কিছুই বুঝতে পারেনি। প্যাকেটের বাইরেটা দেখে, একটু টিপেটুপে জিনিসটা তার পছন্দ হয়েছে। তাই খুশি মনে এটা সে কিনে এনেছে। সবাই রফিককে ক্ষ্যাপাতে শুরু করলে, সে শেষ পর্যন্ত প্যাকেটটা বাইরে ছুড়ে ফেলে দিল।
বেলা এগারটার মধ্যে আমরা জিওক্সিয়াং গুহায় পৌঁছে গেলাম। এটি একটি বিশাল পর্যটন কেন্দ্র। নির্ধারিত আন্ডারগ্রাউন্ড পার্কিং প্লেসে গাড়ি রেখে আমরা উঠে এলাম উপরে। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকলাম। এতটা ঐশ্বর্যমণ্ডিত, চমকপ্রদ, বৃহদাকৃতিসম্পন্ন এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ কোনো গুহা পৃথিবীতে থাকতে পারে, এমন ধারণাও আমাদের আগে ছিল না।
কর্তৃপক্ষ পুরো গুহাটি ঘুরে ঘুরে দেখার জন্যে প্রয়োজনীয় সিঁড়ি, পাটাতন, রেলিং ইত্যাদি অত্যন্ত মনোমুগ্ধকরভাবে বানিয়েছেন। সেখানকার দুই পাহাড়ের মাঝে একটি মনোরম সরোবরও রয়েছে। নৌকায় চড়ে এই সরোবরে ঘুরে বেড়ানো যায়।
আমরা প্রথমেই নৌকায় চড়ার জন্যে টিকিট কেটে নিলাম। সবাইকে লাইফ জ্যাকেট পরে নৌকায় লাইন দিয়ে উঠতে হল। সরোবরের বিভিন্ন স্থানে রং-বেরংয়ের নৌকা আর সেগুলোতে রং-বেরংয়ের যাত্রী। সবাই বিভিন্ন রংয়ের লাইফ জ্যাকেট পরে নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। প্রত্যেকের মুখে হাসি, মনে আনন্দ আর চোখে পর্যটকের চিরন্তন ঔৎসুক্য। আমরা ক্যামেরা নিয়ে বিভিন্ন নৌকার যাত্রীদের ছবি তুলছি। আর আমাদের ছবি তুলতে দেখে সবাই হৈহৈ করে হাত নাড়ছে।
নৌকা সরোবরের পুবসীমা পর্যন্ত গিয়ে আবার ঘুরে আসে। প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা সরোবরে ঘুরে ঘুরে আমাদের ভ্রমণক্লান্তি কমে গেল। আমরা এবার তীরে এসে নামলাম। এখানে কজন মেয়েকে একটু জমকালো সাজে বসে থাকতে দেখলাম। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সেজেগুজে বসে থাকাই ওদের পেশা। মাঝেমধ্যে দু-একজন পর্যটক ওদের সঙ্গে ছবি তোলে, তার বিনিময়ে ওরা দুপয়সা পায়।
সরোবর থেকে বের হয়ে আমরা একটা লিফট-এ চড়ে চলে গেলাম পাহাড়ের চূড়ায়। সেখান থেকেই গুহাপথে যাত্রা শুরু। গুহাভ্রমণকে রঙিন করার জন্য বিভিন্ন রংয়ের বাতি লাগানো হয়েছে। তবে বাতিগুলো দেখা যায় না। অর্থাৎ বাতিগুলো চোখের আড়ালে থেকে, শুধু রঙ্গিন আলোকচ্ছটা বিচ্ছুরিত করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। গুহার প্রতিটি পরতে যেন রংয়ের উৎসব। সবাই চোখ বিস্ফারিত করে দেখছে। আমরা ভেতরের দিকে যতই এগিয়ে যাচ্ছি, ততই মোহিত হয়ে যাচ্ছি। কোনো কোনো স্থানে গুহার সুউচ্চ ছাদের একটুখানি ফুটো দিয়ে সূর্যের আলো ভেতরে এসে পড়ছে। গাছের ডালপালার ফোকর গলিয়ে গুহার ভেতর ছড়িয়ে পড়া আলো আর ছায়া পৃথকভাবে চিলতে হয়ে নিচে ছড়িয়ে পড়ছে।
গুহার ভেতর প্রাকৃতিক নানা ডিজাইন দেখে মন নেচে ওঠে। আকাশের মেঘ দেখে আমরা যেমন মনে মনে ভাবি, এটা ঘোড়া, এটা বুড়ো মানুষ, এটা মুরগি, ঠিক তেমনি নানা আকার আর ডিজাইনের চিত্র যেন কোনো শিল্পী অতি যত্নে গুহার ভেতর এঁকে রেখেছেন। যুগ যুগ ধরে এসব প্রাকৃতিক চিত্রকর্ম ঝুলে আছে গুহার ভেতরে। আমরা সিঁড়ি বেয়ে কখনও নিচে নেমে যাচ্ছি, কখনও-বা উপরে উঠছি।
ঘুরতে ঘুরতে আমরা এক জায়গায় এসে দেখি, উপরের দিকে অনেকটা খাড়াভাবে সিঁড়ি উঠে গেছে। সেখানে কিছু লোক আরাম কেদারার মতো এক ধরনের বাহন নিয়ে অপেক্ষা করছে। এতে চড়ে উপরে ওঠা যেতে পারে। এর জন্য খরচ হবে ৬০ আরএমবি। আমাদের সহযাত্রীদের মাঝে রব একটু অলস প্রকৃতির। সে এই ইজিচেয়ারে ওঠার জন্য এগিয়ে গেলে সবাই হৈচৈ শুরু করে দিল। সবার ভেতর একটা জেদ, ইজিচেয়ারে চড়ে উপরে ওঠা মানে হচ্ছে সারেন্ডার করা। সুতরাং অভিযাত্রী দলকে হেঁটেই উপরে উঠতে হবে। অগত্যা রবকে তার ইচ্ছে ত্যাগ করতে হল।
উপরে এসে আমরা একটা সমতল অংশ পেলাম। এখানে অনেকটা মার্কেটের মতো করা হয়েছে। চারপাশে হালকা খাবার, আইসক্রিম, স্যুভেনির ইত্যাদির দোকান। একপাশে ছোট্ট একটি মঞ্চ বানানো হয়েছে। সেখানে একটি সংগীতদল মনের সুখে গান গাইছে। আমরা কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে গান শুনলাম, কিছু ছবিও তুললাম। গুহার ভেতরে উঁচুনিচু পথে চলতে চলতে আমরা সবাই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। সেই ক্লান্তিও দূর হল। আমরা সবাই আইসক্রিম কিনে একটা জায়গায় বসে খেলাম। শেষে বেরিয়ে এলাম বাইরে।
এখানে অনেকটা জায়গা জুড়ে একটা বাগান করা হয়েছে। ফুলের গাছের ফাঁকে ফাঁকে বসে বিশ্রাম নেওয়ার ব্যবস্থা। আমরা এখানে বসে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিলাম। এতক্ষণে শরীরে বেশ গরম অনুভূত হচ্ছে। আমি জ্যাকেটটা খুলে হাতে নিলাম। আমার হাতে আইপ্যাড আর ক্যামেরা। একটা দিয়ে ছবি তুলতে গেলে অন্যটাকে সামলানো বেশ কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। এর মধ্যে যোগ হয়েছে জ্যাকেট। ছবি তুলতে গেলেই জ্যাকেটটা মাটিতে পড়ে যাচ্ছে। একটা চরম বিরক্তিকর অবস্থা। আমার এই হযবরল অবস্থা দেখে মামুন সম্ভবত মনে মনে অস্বস্তি বোধ করছিল। এবার সে আমার সাহায্যার্থে এগিয়ে এল। মামুন আমার কাছ থেকে রীতিমতো জোর করে জ্যাকেটটা নিয়ে গেল। আমিও জ্যাকেটটা হস্তান্তর করতে পেরে বেশ স্বচ্ছন্দ বোধ করলাম।
আমরা এই জায়গাটায় আরও কিছু সময় ঘোরাঘুরি করে অন্যদিকে যেতে উদ্যোগী হলাম। এখান থেকে ক্যাবলকারে প্রায় এক কিলোমিটার পথ যেতে হবে। ক্যাবলকারের গমনপথের নিচে গভীর খাদ আর গহীন জঙ্গল। বিশাল আকারের গাছগুলোর উপর দিয়ে পুরো বনভূমির শীর্ষদেশ দেখতে দেখতে যাওয়া যায় ক্যাবলকারে। এখানকার ক্যাবলকারে কোনো বক্স নেই। খোলামেলা পাশাপাশি দুটো সিট; দুই সিটে যাত্রী বসে সামনের দিকের পাইপটা টেনে দিতে হয়। এতেই যাত্রীদের চারদিকে মোটামুটি একটা নিরাপত্তা বলয় তৈরি হয়। কিন্তু এ ধরনের ব্যবস্থায় ক্যামেরা বা অন্য কোন মূল্যবান জিনিস টুপ করে গহীন অরণ্যে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। যা হোক, আমি সবাইকে রেখে বিল্লুকে নিয়ে ক্যাবলকারে উঠে গেলাম। যাওয়ার সময় বলে গেলাম, তারা যেন দশ মিনিট পরে ক্যাবলকারে চড়ে। কারণ আমি ওপাড়ে গিয়ে ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়াব, সবার ছবি তুলতে।
ক্যাবলকারে উঠে আমি প্রথমে ক্যামেরা দিয়ে বনভূমির বেশ কটি ছবি তুললাম। এক পর্যায়ে হাত লম্বা করে বাড়িয়ে আইপ্যাড দিয়ে আমার আর বিল্লুর ছবি তুলতে শুরু করলাম। বিল্লু আমাকে সাবধান করে বলল, “দেখ, এটা হাত থেকে পড়ে গেলে আর পাওয়া যাবে না।”
বিল্লুর সঙ্গে গল্প করতে করতে আমি বনভূমির চমৎকার এই পথটুকু পার হয়ে এলাম। আমরা যখন যাত্রাপথের শেষ প্রান্তে এলাম, তখন বুঝতে পারলাম যে এখানে দাঁড়ানও যাবে না, কারও ছবিও তোলা যাবে না। এখানকার আয়োজনটাই এমনভাবে করা হয়েছে। কিন্তু নেমে যাবার পূর্ব মুহূর্তে বামদিকের কোণায় একটা ক্যামেরা বসানো আছে, ওটা সমানে ক্লিক ক্লিক করে যাচ্ছে। আমি নেমে গিয়ে পেছনের শপে ছবি অর্ডার দিলাম। একেকটা ছবির দাম ২৫ আরএমবি।
আমি আর বিল্লু হাসি হাসি মুখ নিয়ে তাকিয়ে আছি, এমন একটা ছবি আমার হাতে এসে পৌঁছার আগেই ওপারে রেখে আসা আমার সহযাত্রীরা চলে এলেন। মামুনের মুখ একেবারেই শুকনো। সবার মাঝেই কেমন একটা উৎকণ্ঠা। আমার কাছ থেকে এক রকম জোর করে কেড়ে নেওয়া সেই জ্যাকেটটা গহীন জঙ্গলে পড়ে গেছে। ক্যাবলকারে উঠে মামুন অতি যত্নের সঙ্গে সেটি তার কোলে রেখেছিল। কিন্তু জ্যাকেটটি ছিল অতিরিক্ত পিচ্ছিল, হঠাৎ করেই নিচে পড়ে গেছে। সবাই এক যোগে উৎকণ্ঠিত হওয়ার কারণ, এই জ্যাকেটের পকেটেই আমার পাসপোর্ট আছে কি না, বা ওতে আমি ডলার রেখেছিলাম কি না। আমি এ রকম কোনো বস্তু ওই জ্যাকেটে রাখিনি, এটা নিশ্চিত করার পর সবাই কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেলেন বটে, কিন্তু তাও অতি সামান্য। এবার সবার প্রশ্ন, “জ্যাকেটটা তো ছিল ব্র্যান্ডের। কোত্থেকে কিনেছিলেন? কত ডলার দিয়ে?”
  
প্রশ্নকর্তারা ধরেই নিয়েছেন, জ্যাকেটটি বিদেশ থেকে ডলারে কেনা। আমি মামুনকে আশ্বস্ত করলাম যে, ওতে কোনো পাসপোর্ট ছিল না। বৈদেশিক মুদ্রা বলতে ছিল কেবল দুটো ইউরোর কয়েন। সুতরাং, জ্যাকেটের এই অধঃপতন মেনে নিতে তেমন কষ্ট পাওয়ার কিচ্ছু নেই। বিষয়টা অন্যরাও বুঝলেন। কিন্তু মামুনের মুখে কী আর সহজে হাসি ফোটে!
কিন্তু পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তা এ আর খান সহজে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নন। তিনি শেষ অবধি আরও প্রশ্ন করতে শুরু করলেন। আমি তার প্রশ্নের জবাব দেওয়ায় সবাই জানতে পারল যে, জ্যাকেটটি লন্ডন থেকে কেনা হয়েছিল। একটা স্যুটের দোকানে শতকরা ৬০ ভাগ মূল্যহ্রাস লেখা দেখেই কিনেছিলাম। ব্র্যান্ড আইটেম বটে।
জ্যাকেটের শোকে আমি ছাড়া সবাই যখন কাতর, তখন বিল্লু এগিয়ে এসে বলল, “তোমরা ভেব না। আমি দেখি কী করা যায়।”
বিল্লু এগিয়ে গেল ক্যাবলকারের কাউন্টারের দিকে। ফিরে এসে বলল, “তোমার জ্যাকেট পাওয়া যাবে। তবে সে জন্য আরও কিছুক্ষণ দাঁড়াতে হবে।”
আমরা রীতিমতো আশ্চর্য হলাম, যখন দেখতে পেলাম পরের পাঁচ মিনিটের মধ্যে একটা খোলা বাক্সে করে আমার পড়ে যাওয়া জ্যাকেটটি চলে এল। কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ দিয়ে আমরা বেরিয়ে এলাম। ইতোমধ্যে দুপুর গড়িয়ে গেছে। সবাই খিদেয় অস্থির। কিন্তু আমরা এখানে কী খাব? বিল্লু আমাদের গাইড হয়ে নিয়ে চলল ফুড কোর্টের দিকে। এখানে সারিবদ্ধভাবে অনেক অনেক খাবারের দোকান আছে। এ সব দোকানে নানা ধরনের খাবার পাওয়া যায়।
আমরা এই প্রথম খাবার নিয়ে ঝুঁকির মধ্যে আছি। শুনেছি, চীনের মানুষ সবই খায়। আমরা কেবল বাছাই করা হালাল খাবার খেতেই অভ্যস্ত। তাই এই দোকান সেই দোকান করতে শুরু করলাম। একটা দোকানে বিশাল সাইজের কটি হাঁস হালকা ভাজি করে ঝুলিয়ে রাখতে দেখলাম। আস্ত পশুও ঝুলে আছে কোনো কোনো দোকানে। তবে কোথাও সাপ-ব্যাঙ দেখলাম না। প্রতিটি রেস্টুরেন্টে বসেই লোকজন তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে। অধিকাংশ লোকেরা নুডুলস খাচ্ছে। কেউ কেউ খাবার মুখে নেওয়ার জন্য কাঠি ব্যবহার করছে। আমাদের জন্য কাঠি দিয়ে খাওয়া মানে, খাবার নিয়ে যুদ্ধ করা। আমাদের দোদুল্যমানতা দেখে বিল্লু বলল, “ওকে, চিন্তা করো না। আমার সঙ্গে চল।”
আমরা বিল্লুকে অনুসরণ করে এগিয়ে গেলাম। কিছুদূর গিয়ে আমরা একটা মুসলিম ফুডের দোকান দেখতে পেলাম। দোকানের দেয়ালে ইংরেজিতে লেখা আছে– এখানকার সকল খাবারই হালাল। দেয়ালে আরবিতে কুরআন শরিফের আয়াতও লেখা আছে। আমরা ভাত, আলু ভর্তা, শাক, ডিমভাজি, সবজি-মুরগি, গরুর মাংসের ঝোল ইত্যাদি অর্ডার দিলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের খাবার এসে গেল।
এ দোকানের সব মেয়েরাই হিজাব পরে। আমরা খেতে শুরু করলাম। খাবার বেশ ভালো লাগল। মামুন বেশ কিছুক্ষণ কাঠি দিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করে মোটামুটি ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল চামুচ পদ্ধতিতে। সবাই বেশ তৃপ্তি নিয়ে খেলাম। খাওয়া শেষ করে বেরিয়ে এলাম। এবার আমাদের বেরোতে হবে।
বেরনোর পথে বামদিকে আছে মিউজিয়াম অব জিওলজিক্যাল পার্ক। আমরা সবাই ঢুকে গেলাম পার্কটিতে। এখানে হাজার বছরের জিওলজিক্যাল পরিবর্তন প্রদর্শিত হচ্ছে। আমরা কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে এগুলো দেখলাম। তারপর বেরিয়ে এলাম জিওক্সিয়াং গুহা ছেড়ে, স্টোন ফরেস্টে যাব বলে।
ঠিক সেই মুহূর্তে দেখা হয়ে গেল পুলিশের ডিআইজি মোহাম্মদ মঞ্জুর কাদের খানের সঙ্গে। ইনি সম্পর্কে আমার বিয়াই। বছর খানেক আগে আমাদের সঙ্গে মঞ্জুর সাহেবদের পরিবার আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। তিনি আমাদের সঙ্গে একই প্লেনে কুনমিং এসেছেন, একটা অফিসিয়াল কাজে। বাংলাদেশিদের একটি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তিনি। আজ ছুটির দিন বলে, আমাদের মতোই এ এলাকায় বেড়াতে এসেছেন। এখন এখানে খাবারের সমস্যা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আমরা তাকে সেই মুসলিম দোকানে যাওয়ার পরামর্শ দিলাম। আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে তারা এগিয়ে গেলেন খাবারের দোকানের দিকে।
পার্কিং এলাকা থেকে বের হয়ে আমাদের গাড়ি দ্রুতবেগে ছুটে চলল স্টোন ফরেস্টের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম পৃথিবীর অন্যতম বিস্ময় ‘স্টোন ফরেস্টে’।
স্টোন ফরেস্ট কুনমিং শহর থেকে ১২০ কিমি দক্ষিণে অবস্থিত। মিং রাজবংশের (১৩৬৮-১৬৪৪ খ্রিস্ট পূর্বাব্দ) শাসনামল থেকেই এটি পৃথিবীর প্রথম বিস্ময় হিসেবে পরিচিত। প্রকৃতির আপন হাতে তৈরি পাথরের এক অভূতপূর্ব কারুকার্য এই স্টোন ফরেস্ট। এর বিস্তার প্রায় ৪০০ বর্গ কিলোমিটার (৯৬,০০০ একর)। এখানে বিভিন্ন উচ্চতার ও বিভিন্ন আকারের অসংখ্য পাথরের স্তম্ভ বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে আছে। এসব পাথরের কোনোটি জীবজন্তুর, কোনোটি বৃক্ষের, কোনোটি মানুষের আকৃতির। এদের কোনোটি খাড়াভাবে, কোনোটি হেলানোভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
‘স্টোন ফরেস্ট’ সাতটি অঞ্চলে বিভক্ত–
লিজিজিং স্টোন ফরেস্ট (Lizijing Stone Forest)
নাইগু স্টোন ফরেস্ট (Naigu Stone Forest)
ঝিয়ুন গুহা (Zhiyun Cave)
চ্যাং হ্রদ (Lake Chang)
ইউ হ্রদ (Lake Yue)
ডাডি জলপ্রপাত (Dadie Waterfall)
কিফেং গুহা (Qifeng Cave)
    
২০০৭ সাল থেকে এই ফরেস্টের দুইটি অংশকে– ‘নাইগু স্টোন ফরেস্ট’ (Naigu Stone Forest) এবং ‘সুজেগি ভিলেজ’ (Suogeyi Village) ইউনেস্কো ঘোষণা করেছে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে।
ভূতত্ত্ববিদদের মতে ২৭০ মিলিয়ন বছর আগে সমুদ্রের তলদেশে থাকা চুনাপাথরের স্তর ক্রমাগত বিবর্তিত হয়ে এই স্টোন ফরেস্টের রূপ নেয়। এখন স্থানটি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণপিপাসুদের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।
স্টোন ফরেস্টে এসে আমাদের গাড়ি যথাস্থানে পার্ক করল। আমরা এগুলাম টিকিট কাউন্টারের দিকে। এ ব্যাপারে বিল্লু আমাদের সাহায্য করল। এখানে অনেকগুলো খোলাগাড়ি লাইন করে দাঁড়িয়েছিল। এগুলোর প্রায় সবগুলোর ড্রাইভারই মহিলা, চমৎকার রঙ্গিন পোশাকে সজ্জিত।
টিকিট কাটা হয়ে গেলে আমরা লাইনের প্রথম গাড়িতে চড়ে বসলাম। গাড়ি চলতে শুরু করল। আমরা অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে দুধারে পাথরের বন দেখছি। আমাদের চারদিকেই ছোটবড় পাহাড়, বিভিন্ন আকৃতির। আমরা চারদিক থেকে ছবি তুলছি। স্টোন ফরেস্টের মাঝে মাঝে সুন্দর সুন্দর জলাধার আছে, আবার খোলা মাঠের মতো জায়গাও আছে। মাঝে মাঝে আছে ফুলের বাগান। সে সব বাগান চমৎকার রং-বেরংয়ের ফুল দিয়ে সাজানো। আমরা যখন হেঁটে হেঁটে একেবারে ক্লান্ত হয়ে গেছি, ঠিক তখনই চোখে পড়ল একটি খোলা ফলের দোকান। ফলগুলো আমরা চিনতে পারলাম না, তবে স্থানীয় পর্যটকদের ভিড় এবং তাদের খাওয়ার নমুনা দেখে বুঝতে পারলাম যে, খেতে সুমিষ্টই হবে। আমরাও প্যাকেট ভর্তি ফল কিনলাম। বরফের সঙ্গে রাখা ছিল বলে বেশ ঠাণ্ডা। আমরা ফলগুলো মুখে দিয়েই বুঝতে পারলাম, আরও এক ব্যাগ কিনতে হবে। ফলের তৃপ্তি নিয়ে আমরা আবার এগোলাম বনের দিকে।
কথিত আছে, এ বনটি ‘আশিমা’র জন্মস্থান। কিংবদন্তী অনুযায়ী, আশিমা ছিল ‘ইই’ (ণর) বা ‘লোলো’ (খড়ষড়) সম্প্রদায়ের সুন্দরী কন্যা। সেই আশিমা এক যুবকের প্রেমে পড়ে। সে ঐ ছেলেটিকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, কিন্তু তার অভিভাবকরা বাধা হয়ে দাঁড়ান। আশিমা অভিভাবকদের এ সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি। সে কেবল কাঁদত। রাগে অভিভবাবকরা মন্ত্র দিয়ে আশিমাকে পাথরে রূপান্তরিত করেন।
বনে এখনও আশিমার নামে একটি পাথরস্তম্ভ আছে। একপাশ থেকে ঐ পাথর স্তম্ভ দেখে মনে হয় যে, একজন তরুণী মাথায় রুমাল আর পিঠে বাঁশের ঝুড়ি নিয়ে খাড়াভাবে দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেক বছর ষষ্ঠ চান্দ্র মাসের ২৪ তারিখে ‘ইই’ সম্প্রদায়ের মানুষরা আশিমার স্মৃতির উদ্দেশ্যে টর্চ উৎসব পালন করে। লোক নৃত্য, কুস্তি প্রতিযোগিতা, ষাড়ের যুদ্ধ ও সিংহের নাচ এ উৎসবের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
আমরা গাড়িতে চড়ে আরও অনেকগুলো পাহাড় দেখলাম। এক সময় দিনের আলো নিভে এলে আমরা বিল্লুর সঙ্গে ছুটলাম কুনমিংয়ের উদ্দেশে। তবে বিমোহিত নয়নে স্টোন ফরেস্টের যে রূপ আমরা দেখলাম, তা সত্যিই অপূর্ব।
পরদিন আমরা দিনের বেলা শহরের বিভিন্ন মার্কেটে ঘুরে বেড়ালাম। এ সব মার্কেটে আছে হাজারও জিনিস, বিভিন্ন মানের। এগুলোর দামও খুব কম। আমাদের মাঝে কেউ কেউ কিছু কেনাকাটা করে নিল।
বিকেলে আমরা একটা নদীর পাড়ে ঘুরতে গেলাম। নদীর পাড় কয়েক মাইল অবধি বাঁধানো। এখানে বিকেলে বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ জড়ো হয়ে সুনির্মল পরিবেশ উপভোগ করেন। কেউ কেউ হাঁটেন, কেউ শিশুদের নিয়ে নানা খেলায় মেতে ওঠেন। কেউ-বা ঘুড়ি ওড়ান। আকাশে বিভিন্ন ডিজাইনের আর বিভিন্ন সাইজের ঘুড়ি উড়ছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন আকাশে ঘুড়ির মেলা বসেছে। যেন বা এখানে আজ ঘুড়ি উৎসব। আমরাও এখানকার দোকান থেকে কিছু ঘুড়ি আর সুতাসহ নাটাই কিনে কিছুক্ষণ ঘুড়ি উড়ালাম। পরে প্রত্যেকে দশটা করে বিভিন্ন ডিজাইনের ছোট ছোট ঘুড়ি কিনে নিলাম, বাংলাদেশে নিয়ে আসব বলে। মনে পড়ে গেল, আমরাও এক সময় কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায় ঘুড়ি উৎসবের আয়োজন করতাম। তখন দূরদূরান্ত থেকে নানা বয়েসি মানুষ বিভিন্ন ডিজাইনের ঘুড়ি নিয়ে আসতেন। মনের সুখে তারা ঘুড়ি উড়াতেন। আমরাও আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেতাম এ সব ঘুড়ি দেখে।
আমরা হঠাৎ করেই দেখলাম, নিচের রাস্তা থেকে সিঁড়ি বেয়ে তিনজন মানুষ উপরে উঠে আসছে। এদের মাঝে একজন পুরুষ, দুজন মহিলা। ভদ্রমহিলাদের একজন সাদা পোশাকে খুব সেজেগুঁজে এসেছেন। শ্রীলঙ্কা, মঙ্গোলিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে বিয়ের পরদিন এ রকম সেজেগুজে নবদম্পতিদের আমি ঘুরতে দেখেছি। তারা শহরের বিভিন্ন পার্কে বা সুন্দর সুন্দর স্থানে ঘুরে বেড়ান। আর ছবি তোলেন। এখানেও মনে হয় তাই হচ্ছে। কিন্তু ভদ্রমহিলার বয়স কিছুটা বেশি। মনে হয় একটু বেশি বয়সে বিয়ে হয়েছে। সাজুগুজু করা ভদ্রমহিলা হাইহিলের চাপে সহজভাবে হাঁটতে পারছেন না। সম্ভবত সে জন্যই তার পাশে থেকে পুরুষ ভদ্রলোকটি অতি সাবধানে ভদ্রমহিলার হাত ধরে হাঁটছেন। আর ভদ্রলোকের হাত ধরে সাজুগুজু করা ভদ্রমহিলা অনেকটা এঁকেবেঁকে হাঁটছেন। প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছে, এই বুঝি তিনি পড়ে যাচ্ছেন।
এ আর খান সাহেব পুলিশ। একটু বেশি সাহস থাকারই কথা। তিনি এগিয়ে গিয়ে ভদ্রমহিলার সঙ্গে কথা বললেন। জানা গেল, আজ তাদের বিবাহবার্ষিকী। পাশে হাত ধরে আছেন ভদ্রমহিলার স্বামী। অন্যদিকে তার কন্যা। বার্ষিকী উদযাপন করার জন্যই তারা এখানে এসেছেন। অনুমতি নিয়ে আমরা প্রথমে তাদের ছবি তুললাম। পরে ছবি তোলার জন্য আমরাও তাদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেলাম।
ক্রমে সন্ধ্যা হয়ে আসছে। পশ্চিমাকাশ রাঙ্গিয়ে দূর পাহাড়ের আড়ালে ডুব দিচ্ছে সূর্য। এর প্রতিফলন এসে পড়েছে নদীতে। আকাশ এবং নদীর জলে লাল-নীলের মাখামাখিতে অপূর্ব সুন্দর এক দৃশ্যের অবতারণা করেছে। ডুবন্ত সূর্যের সঙ্গে মিলেমিশে, কেউ-বা বল আকারের লাল সূর্যকে হাতের তালুতে নিয়ে ছবি তুলছে। একটু একটু শীত অনুভূত হচ্ছে। আমরা নদীর পাড় ধরে আবারও কিছুক্ষণ হাঁটলাম। সন্ধ্যা উৎড়ে যাওয়ার পর আমরা গাড়িতে উঠলাম। উদ্দেশ্য– হোটেল।
পরদিন আমরা উড়ে গেলাম অন্য শহরে, অন্য কিছুর আশায়। পেছনে পড়ে রইল মনমাতানো পর্যটন শহর কুনমিং।
বিদায় জিওক্সিয়াং গুহা, বিদায় স্টোন ফরেস্ট, বিদায় বিল্লু নামের চৈনিক ছেলে।

নয়নাভিরাম দার্জিলিং

প্রচন্ড ঠান্ডা আর বরফ দেখতে চাইলে যেতে পারেন দার্জিলিং। বাংলাদেশে যখন শীত পড়তে শুরু করে তখন দার্জিলিংয়ে বরফ পড়ে। যেকোন ছুটিতে ঘুরে আসতে পারেন দার্জিলিং। কিন্তু এখনও দার্জিলিং যেতে পারেন কারণ দার্জিলিং পুরো শহরটি পাহাড়ের মধ্যে। নিজের চোখে না দেখে অনুভব করতে পারবেন না যে জায়গাটি কতো সুন্দর। কাজেই দেরি না করে দেখে আসুন দার্জিলিং। সড়কপথে ঘুরে আসুন এক অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য।

কিভাবে যাবেন
প্রথমেই আপনাকে ভারতের ভিসা করতে হবে। এবার টাকা ডলার করে নিন। দার্জিলিং যেতে হলে বাংলাদেশের বর্ডার বুড়িমারি হয়ে যেতে হবে। সড়ক পথে যেতে বাসের টিকেট করে নিন ঢাকার শ্যামলী অথবা গাবতলী থেকে। এই দুই জায়গা থেকে বুড়িমারির গাড়ি পাবেন। ভাড়া পরবে ২৮০-৩৩০ টাকার মধ্যে। বাস ছাড়ে রাত ৮টার পর থেকে। ভোরে গিয়ে নামবেন বুড়িমারি বর্ডারে। নেমে হালকা নাস্তা করে নিতে পারেন। নাস্তা করার পর বাংলাদেশ বর্ডারে অফিসিয়াল কাজ সেরে ইন্ডিয়া চেংরাবান্ধা বর্ডারে গিয়ে একই ভাবে অফিসিয়াল কাজ সম্পন্ন করুন এবং আপনার সাথে থাকা লাগেজগুলো চেক করার জন্য দিন।
তারপর অফিসিয়াল কাজ শেষ হওয়ার পরে ডলার ভাঙ্গিয়ে ভারতীয় রুপি করে নিন কারণ ভারতে আপনার রুপি লাগবে। ডলার ভাঙ্গানোর পরে আপনার গন্তব্য দার্জিলিং । ইচ্ছা করলে প্রথমে শিলিগুড়ি ঘুরে তারপর দার্জিলিং যেতে পারেন। দার্জিলিং যাওয়ার জন্য আপনাকে জিপে অথবা বাসে যেতে হবে। ৫-৭ জন হলে জিপে যাওয়াটাই ভালো, জিপে শিলিগুড়ির ভাড়া নেবে ২০০-৩০০শ রুপির মধ্যে। আর বাসে যেতে চাইলে চেংরাবান্ধা মেইন রোডে যেতে হবে ভ্যান দিয়ে। ভাড়া নেবে ১০ রুপি। মেইন রোডে গিয়ে বাসে করে ময়নাগুড়ি যেতে হবে যার ভাড়া পড়বে ১০ রুপি। ময়নাগুড়ি থেকে বাসে শিলিগুড়ির ভাড়া পড়বে ২০ রুপি। শিলিগুড়ি নেমে চাইলে কিছু খেয়ে নিতে পারেন। ১১-১২ টার মধ্যে শিলিগুড়ি পৌঁেছ যেতে পারবেন। আপনি চাইলে দু’এক দিন শিলিগুড়িতে থেকেও যেতে পারেন। কেনাকাটা করার জন্যে ভালো জায়গা শিলিগুড়ি। শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যেতে হলে জিপে অথবা টয়ট্রেনে যেতে পারেন। ৫-৭ জন হলে জিপে যাওয়াটাই ভালো। জিপে ভাড়া নেবে ৪০০-৫০০ রুপির মধ্যে। আর টয়ট্রেনে প্রতি এক জনের ভাড়া নিবে ৫০-৬০ রুপির মধ্যে। জিপে জনপ্রতি ভাড়া পরবে ৭০ রুপি।
দার্জিলিং গিয়ে পৌঁছতে সময় লাগবে জিপে ৩ ঘন্টা, ট্রেনে ৫ ঘন্টা।

কোথায় থাকবেন
দার্জিলিং গিয়ে অনেক হোটেল পাবেন। পছন্দমত হোটেলে উঠে পড়–ন। ভাড়া পড়বে
১৫০ রুপি থেকে ১০০০ রুপি। হোটেলের মধ্যে এবং বাইরে- দু’জায়গাতেই খাবার পাবেন।

দার্জিলিংয়ে কি কি দেখবেন
প্রতিটি হোটেলেই দার্জিলিংয়ের বিভিন্ন জায়গা দেখার জন্য প্যাকেজের ব্যবস্থা রয়েছে। দার্জিলিংয়ের দেখার মত স্থানগুলো হলো- টাইগার হিল, কাঞ্চনজঙ্ঘা, রক গার্ডেন, গংগামায়া পার্ক, মিরিক লেক, এবং মেল। মেল হচ্ছে আমাদের টি এস সি এর মত, চমৎকার একটি জায়গা। দেখার মত আরও অনেক জায়গা আছে যা আপনি আপনার হোটেল থেকে অথবা দার্জিলিং সরকারি পর্যটন কেন্দ্র থেকে জেনে নিতে পারবেন।
দার্জিলিং সরকারি পর্যটন কেন্দ্র থেকে অনেক প্যাকেজ আছে ঘুরে দেখার মত। খুবই কম খরচে প্যাকেজগুলো উপভোগ করতে পারেন অতিথিরা। ছবি তোলা আর শপিং করার কথা কিন্তু ভুলবেন না। অনেক সুন্দর সুন্দর জিনিস কিনতে পারবেন অনেক কম দামে। কিন্তু দামাদামিটা আপনাকেই করতে হবে। প্রচন্ড সুন্দর এই দার্জিলিং যেনো একটি স্বপ্ন। দার্জিলিংয়ের সৌন্দর্য্যকে উপভোগ করে বিদায় জানিয়ে চলে আসুন নিজের মাতৃভুমিতে। SOURCE LINK

বেড়িয়ে আসুন চীনের চুংকিং

Chongqing-Tourism-101.jpg
মেঘের সাদা পালক ভেদ করে যখন মাটি ছুঁই ছুঁই করছিলাম তখনই ভাবছিলাম কী এক বিষ্ময়ের মুখোমুখি হতে যাচ্ছি। আকাশ থেকেই কৌতুহলী চোখ যখন মাও সেতুং এর দেশ খুঁজে পেলো, তখন এক অজানা উচ্ছ্বাস বেরিয়ে আসছিল। দক্ষিণ চীনের কুনমিং থেকে আকাশ পথে আমরা যাচ্ছিলাম শিল্প শহর চুংকিং। চীনারা অবশ্য একে চোংচিং বলে। সাংহাই বা বেইজিং এর মতো বিশালতা না থাকলেও, একদিকে চুংকিং এর আছে তিন হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অন্যদিকে আধুনিক নগরকেন্দ্র। প্রদেশের বাইরে চীনে যে চারটি স্বশাসিত মিউনিসিপালিটি আছে চুংকিং তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। ১৯৪৫ এ জাপানের আত্মসমর্পণের পর মাও সেতুং আর চিয়াঙ কাই সেক-এর মধ্যে চুক্তি হয় চুংকিং শহরে। লম্বাটে আয়তনের একফালি শহরকে এফোঁড়-ওফোড় করেছে চীনের দুঃখ ইয়াং সি কিয়াং। যতদূর মনে পড়ে চীনের দীর্ঘতম এ নদীর কথা আমরা ছোটবেলায় স্কুলের বইয়ে পড়েছিলাম। আমাদের চেয়া ইয়াং সি কিয়াং চীনাদের কাছে ইয়াংজি। যাবো জেনেই এক ধরনের রোমাঞ্চকর অনুভূতি ছিলই। এবার সৌভাগ্য হলো দুঃখ নদী ইয়াংজির বুকে ঘুরে বেড়ানোর। এক সময়ের দুঃখ নদী ইয়াংজিকে কীভাবে তারা সম্ভাবনার নদীতে রূপ দিয়েছে দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। কেবল ইয়াংজি নয়, চুংকিংকে জড়িয়ে আছে তিন উপনদী উজিয়াং ফুজিয়াং আর কিজিয়াং।
ইয়াংজিকে কেউ আর দুঃখ নদী বলে না- এখন এর নাম সোনালী নদী। সোনা রঙ বালির কারণে ইয়াংজির পানি সত্যিই কিছুটা চকচকে হলুদ বা সোনালী। নদীর বাঁকে ধাপে ধাপে সাজানো চুংকিং বন্দরকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বিশাল ব্যবসা কেন্দ্র। দক্ষিণ চীনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯০ ভাগই হয় এ বন্দর থেকে। গত পাঁচ বছরে এই বন্দরের প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৭০ ভাগের মতো। অথচ মাত্র পঞ্চাশ বছর আগেও এখানে নাকি ছিল নিবিড় বন। ছিল কেবল নদীর ধারে গড়ে ওঠা ছোট্ট এক জনপদ। নদীর বাঁকে গড়ে ওঠা বাড়িঘরগুলো এখনও সে সাক্ষ্য বহন করে। চুংকিং-এ একদিকে অরণ্যে মোড়ানো সারি সারি পাহাড়, আঁকা হাইওয়েতে কারণে অকারণে তৈরি অসংখ্য ফ্লাইওভার আর নিয়ন সাইন। পশ্চিম দিকে পাহাড়ে গা বেয়ে পুরোনো নস্টালজিক নগরী। সুনসান রিবতায় দাঁড়িয়ে থাকা আঁকা ছবির মতো। পাহাড়ের গায়ে ঢুকে থাকা ছোট্ট সব কটেজ, মাথায় টুপি লাগানো চিম্নি, সামনে বাগান সব মিলে মধ্যযুগের স্থাপত্য শৈলীর এক চমৎকার দৃষ্টান্ত যেন। চুংকিং এর গ্রেট হল যেন আর এক বিস্ময়। বয়সে নতুন হলেও এর নির্মাণ শৈলীতে আছে ভাং সাম্রাজ্যের ধ্র“পদী ভাব।
অন্যদিকে নদী পেরিয়ে সমতল উপত্যকায় গড়ে ওঠা নতুন নগরী। পাশ্চাত্যের অনুকরণে যেন এখানকার সবকিছু। ১৯ শতকের স্মৃতি স্মারক ঘিরে এখানে গড়ে উঠেছে ছোট্ট একটি নিউইয়র্ক। আকারে আকৃতিতে এখানকার আধুনিক সব স্থাপত্য ভুলিয়ে দেয় চুংকিং এর ঐতিহ্যকে। স্থাপত্য যেন এখানকার সংস্কৃতিকে বদলে দিয়েছে। অথবা বদলে যাওয়া সংস্কৃতির জাদুতেই হয়তো এখানকার এই নতুন করে জেগে ওঠা। ওয়ালমার্ট কেয়ার ফোরের মতো চেইন সুপার মার্কেট এখানে সেখানে ছড়ানো। যার একেকটিতে আমাদের দশ-বিশটা সুপার শপ্ আস্ত ঢুকিয়ে দেয়া যাবে অনায়াসে। শহরের একদিকে আবহমান চীনা পরম্পরার দোকান-বাজার আর একদিকে দিক হারানো চোখ ধাঁধানো বাণিজ্যিক নগর সভ্যতা। একদিকে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে চীনারা অন্যদিকে ঐতিহ্য ভাঙার রীতি। স্বল্প বসন নারী পুরুষ।
চীনের এক মহাবিস্ময় যদি প্রাচীর হয়, আমার মনে হয়েছে আর এক মহাবিস্ময় ভাষা। ব্যবসা বাণিজ্য আর অর্থনীতিতে বিশ্ব শাসন করতে যাওয়া এই দেশটির মানুষের মধ্যে অসম্ভব দেশপ্রেম যে কাউকে মুগ্ধ করবে। চীনা ভাষার প্রতি বিশেষ দুর্বলতা থেকে যে দু’ একটা শব্দ পড়তে শিখেছিলাম, উচ্চারণে গিয়ে পড়তে হয়েছে মহা মুস্কিলে। বলে রাখা ভালো আমাদের সাথে একজন ইন্টারপ্রেটর কাজ করতো তার কাছেই কিছুটা তালিম নেয়া।
http://www.topchinatravel.com/pic/china-travel-seluppic/2011-2/201121515424454362.jpg
নিজেদের ভাষার প্রতি ওদের প্রচ- ভালোবাসার কারণেই হয়তো ইংরেজি চর্চা তেমন একটা নেই। এটা অবশ্য সারা চীনেই। আর আমাদের সাথে থাকা ইন্টারপ্রেটর ইউনা তো আমাদের ইংরেজি শুনেই প্রশংসায় পঞ্চমুখ। শুনে আমরা কিছুটা লজ্জাই পেয়েছি। বরং ইউনাকেই আমাদের ইংরেজি শেখাতে হয়েছে। একই সাথে চান্স পেয়ে শিখিয়ে দিয়েছি বাংলা কথাও। এমনকি এয়ারপোর্টে বিদায় জানাতে এসে শেষ পর্যন্ত তার মুখে বাংলায় বিদায় সম্ভাষণ শুনেছি। সপ্তাখানেকের মধ্যে নিজে থেকেই বেশকিছু বাংলা শব্দ বলতো সে। ভাঙা ভাঙা উচ্চারণে বাংলা শুনতে ভালই লাগতো।
চীনের বিস্ময়ের আর এক নাম খাবার। আর চুংকিং এর রসনায় আছে আলাদা এক ঐতিহ্য। সেখানে গেলে হটপটের স্বাদ নিয়ে না এলে চীনাদের অতিথি সেবাই যেন বৃথা যায়। ঝটপট জেনে নিন হটপটের রেসিপি। একই সাথে মাছ মাংস সবজি দই আর নানা রকম মসলার এই মেনু খেয়ে গলায় ঝাল স্বাদ লেগে থাকবে দেশে ফেরার পরও কয়েকদিন। খাবার টেবিলে বসে মনে হলো পৃথিবীর এমন কিছু নেই যা তারা খায়না। ছোটবেলা থেকে তারা দুটো জিনিসই শেখে কাজ আর খাওয়া। খাওয়া তাদের কাছে এক শিল্প বিশেষ।
নিতান্ত গরীব ঘরে হলেও একবেলায় মেনুতে অন্তত গোটা বিশেষ আইটেম তো থাকেই। বেশিও থাকে। আর আতিথেয়তার বিষয় থাকলে তো কথাই নাই। দুই আঙুলের চাপে ধরা কাঠিতে কি ওঠেনা পারলে পানিও খায় তারা। একসাথে বসে খাওয়ার পারিবারিক ঐতিহ্য ভোলে না চীনারা। ঘুরতে থাকা টেবিলে একের পর এক গোল করে সাজানো থাকে খাবার। যার যার রুচিমতো খায় তারা। কোন ব্যাকরণ নেই। আইটেম বিশ তিরিশ যাই হোক পরিমাণ কিন্তু কমই খায় তারা। আর কাঁচা মাছ, শাক সবজি, শামুক ঝিনুক কেঁচো বা সাপ। সাথে মোটামুটি তিন চার হাত লম্বা মোটা নুডুলস। ঐতিহ্যবাহী খাবার একটু বেশি মশলাদার। নাচ গান বা বাদ্য বাজনাও চলে রান্নার অংশ হিসেবে। সন্ধ্যার আলো ফোটার আগেই রাতের খাবারে বসে তারা। চলে ঘণ্টা দুয়েক।
সূর্য আর চীনাদের ঘুম ভাঙার প্রতিযোগিতা হয় প্রতিদিন। সকাল ৭টার মধ্যে আমরা যখন ঘুমের ঘোর কাটাতে ব্যস্ত তখন ওদের কাজে যাওয়ার কথা কেউ বলেনা। সকাল ৮টার পর রাস্তাঘাট বেশ ফাঁকা। কাজের বেলায় ছেলে মেয়ে কোন পার্থক্য নেই। আমরা গিয়েছিলাম দক্ষিণ চীনের সবচেয়ে ব্যস্ত অটোমোবাইল শিল্প কারখানা ইউটোং-এ। সেখানে কম্পিউটার ল্যাবে অত্যাধুনিক হাইটেক ডিজাইনিং থেকে শুরু করে স্টিল কাটিং বডি তৈরির মতো ভারি কাজে মেয়েদের দক্ষতা নিয়ে কেউ ভাবেনা। পাবলিক বাসের ড্রাইভিং এ একটা বড় অংশই মেয়ে। নিরাপত্তা কাজে সশস্ত্র নারীরা অনেক সাবলীল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে কারখানার কোথাও একটু কাজে ব্যত্যয় দেখলাম না। কখনো শৃঙ্খলা ভাঙার কথা ভাবেনা কেউই। আর এ জন্যই বোধহয় উৎপাদনে বিশ্বসেরা হয়ে উঠছে চীন। অটোমোবাইল, স্টিল, কেমিক্যাল এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পে কত কম সময়ে সেরাদের সেরা হয়ে উঠেছে চুংকিং ভাবলে অবাক হতে হয়।
নিয়ম ভাঙা কাকে বলে জানেনা চীনারা। একবার গভীর রাতে ঘুরতে বেরিয়েছিলাম। সান্ধ্যভোজের পর পরই চীনারা ঘুমায়, তবে ইয়াংজির বুকে অসংখ্য নিয়ন রেস্তোরা সারারাত জেগে থাকে। জেগে থাকে পর্যটকরা। রাত সাড়ে তিনটা চারটাতেও সেবা দিতে দাড়িয়ে থাকে ট্যাক্সি। ওঠার সাথে সাথে ইশারায় বলে দেয় সিট বেল্ট বেধে নিতে। জরিমানার ভয় নেই, নিয়ম মানার তাগিদ। বিশাল চওড়া রাস্তায় ট্রাফিক সিগনালে একা। সিগনাল শেষের জন্য মিনিটের পর মিনিট অপেক্ষায় থাকে ড্রাইভার। ইশারায় ভাড়া চাইতে হয়না, মিটার থেকে বেরিয়ে আসা বিলই কথা বলে। ক্যাব ড্রাইভাররা শেষে বিদায় জানায় খুব আন্তরিকভাবেই। রাত দুপুর যখনই হোক বলে ওঠে সি সিয়ে। চীনে ১০ দিনে অন্তত কয়েকশো বার সি সিয়ে শুনতে হয়েছে। হোটেল, দোকান, বাজার, বাস স্টপ যেখানে সেখানে অসংখ্য বার। ওদের সৌজন্যবোধ দেখেই মুগ্ধ হতে হয়। হঠাৎ খেয়াল না করলে মনে হবে সি সিয়ে যেন ওদের প্রত্যেকের মুদ্রা দোষে পরিণত হয়েছে। শেষ কথায় বলতেই হয় সি সিয়ে মানে চীনা ভাষায় ধন্যবাদ। SOURCE LINK

শুক্রবার, ২৭ জুন, ২০১৪

সৌন্দর্যময় পাহাড়ের দেশ নেপাল

মাহফুজুর রহমানবিমান যখন কাঠমান্ডু ত্রিভুবন বিমান বন্দরে ঝাঁপিয়ে পড়ল তখন দুপুর ১টা। নেপালে ভ্রমণ করার জন্য বাংলাদেশের মানুষকে ভিসা নিয়ে যেতে হয় না। অতি সহজে এয়ারপোর্টেই ভিসা মেলে। এ জন্য কেবল একটি ছোট্ট ফরম পূরণ করতে হয়, আর এক কপি ফটো জমা দিতে হয়।
পোর্ট ভবনে ঢুকেই মিতুল ঝটপট ফরম পূরণ করতে শুরু করে দিল। এবারের ভ্রমণে আমার পরিবারের সকল সদস্য– অর্থাৎ বেবী, কীর্তি, অর্থী আর শ্রেয়া আছে। দলটির নেতৃত্ব দিচ্ছে মিতুল; সে কীর্তির সূত্রে গত ডিসেম্বরে আমাদের পরিবারের সদস্যপদ পেয়েছে। তাছাড়া বন্যা, টুটুল আর জয়িতাও এসেছে। জয়িতা এই প্রথমবারের মতো মাটির মায়া কাটিয়ে আকাশে উড়ছে, প্রথম বিদেশের মাটিতে পা রাখছে। ওর চোখ একেবারেই স্বপ্নমাখা। সব কিছুই ও দেখছে অন্যভাবে। আর জয়িতার উপর একটু পািন্ডত্য খাটাবার চেষ্টা করছে অর্থী আর শ্রেয়া। কারণ ওরা আরও দু-একবার উড়োজাহাজের সিটবেল্ট পেটে বেঁধেছে।
বিমানবন্দরের আয়োজন খুব একটা জোরদার আর গোছানো নয়। বিদেশি পর্যটকদের কীভাবে সন্দেহের চোখে দেখতে হয়, তা যেন এখনও রপ্ত করে উঠতে পারেননি এখানকার লোকেরা। অন্যদের পাসপোর্টে সিল পড়ার আগে আমি আর শ্রেয়া বাইরে বের হয়ে এলাম। একটু দূরে একটা ছাউনির নিচে নেপালি টুপি পরে এক শীর্ণকায় ভদ্রলোক আমার নাম ছাপা একটা কাগজ ধরে দাঁড়িয়ে আছেন।
আমি তাকে ইশারা দিতেই তিনি এগিয়ে এসে বললেন, “নমস্তে।”
বিমানবন্দরের বাইরে বেশ গরম। পাহাড়ি দেশ নেপালে এতটা গরম থাকবে, এটা আমরা আশা করিনি। আমাদের সঙ্গে শীতবস্ত্রও আছে। এগুলোর যে কী গতি হবে কে জানে! আমরা বুকিং দিয়েছি পার্ক ভিলেজ হোটেলে। মূল শহর থেকে এটির দূরত্ব প্রায় ১২ কিমি।
আমাদের মাইক্রোবাস শহরের ভেতর দিয়ে ছুটে চলেছে। শহরময় নানা ধরনের নির্মাণ কাজ চলছে। ধুলোময় রাস্তাঘাট। সবকিছু পেরিয়ে প্রায় ৪৫ মিনিট পর আমরা হোটেলে এসে পৌঁছুলাম।
নেপালে হোটেল আর রেস্টুরেন্টে সকল বিলের উপর ২৩% ভ্যাট আর সার্ভিস চার্জ যোগ হয়। এ হোটেলের প্রতিটি রুমের ভাড়া ১২০ থেকে ১৭০ মার্কিন ডলার। তার উপর ভ্যাট আর সার্ভিস চার্জ যোগ হবে। তবে এখানে দামাদামি করা চলে। আমরা টেলিফোনে দামাদামি করে ১৫০ ডলার মূল্যের রুম ভ্যাট-সার্ভিস চার্জসহ ৭৫ ডলারে চুক্তি করেছি।
চট করে রিসেপশন কাউন্টারের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমরা রুমের দিকে রওনা হলাম। অবশ্য তার আগে আমাদের জন্য দুপুরের খাবার তৈরি করার আদেশ দিতে ভুললাম না। কারণ আমরা সবাই ততক্ষণে বেশ ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছি।
হোটেলের পরিবেশটি এক কথায় চমৎকার। চারদিকে অনেক বাগান, গাছপালা; নিরিবিলি পরিবেশে পাখির কলকাকলি আমাদের মুগ্ধ করে দিচ্ছে। হোটেলটির পেছনদিক পাহাড় দিয়ে ঘেরা। অবশ্য নেপালের সর্বত্রই পাহাড় আর পাহাড়। এখানে সূর্য ওঠে পাহাড় ডিঙিয়ে, আবার অস্ত যায় পাহাড়ের আড়ালে।
রুমে গিয়ে এর সাজগোজ দেখেও আমরা মুগ্ধ হয়েছি। চমৎকার সব আয়োজন। রাতে বাইরে বসে চাঁদের আলোতে আড্ডা দেওয়া যাবে। অবশ্য আকাশে এখন চাঁদ ওঠে কিনা, এখন পূর্ণিমার সময় কিনা কে জানে? পূর্ণিমার সময় এখানে এলে ভালো হত। তাড়াতাড়ি গোসল করে আমরা রেস্টুরেন্টে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। বেবী চট করে নামাজ পড়ে নিচ্ছে।
সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, “কেবলা কোন দিকে হতে পারে?”
  
আমি ঘরের ভেতর কোনো নির্দেশনা আছে কিনা পরীক্ষা করে দেখলাম। এর কোনো চিহ্ন পেলাম না। অগত্যা ঘরের বাইরে এসে সূর্য কোনদিকে যাচ্ছে তা পরীক্ষার চেষ্টা করলাম। কিন্তু অনেকক্ষণ সূর্যদেবীর সঙ্গে যুদ্ধ করেও তার গতিপথ সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে পারলাম না।
এ সময় একজন মালিকে এদিকে আসতে দেখে এগিয়ে গিয়ে বললাম, “গুড আফটারনুন। ভাইসাহেব, বলেন তো কেবলা কোনদিকে?”
ভদ্রলোক আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কী বললেন আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না।
আবার তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা ভাই, ওয়েস্ট কোনদিকে? সূর্য কোনদিকে ওঠে আর কোনদিকে ডোবে?”
ভদ্রলোক দুর্বোধ্য ভাষায় কিছু একটা বললেন এবং চলে গেলেন। অগত্যা আবার সূর্যের দিকে তাকিয়ে একটা দিক নির্ধারণ করলাম এবং বেবীকে সেই দিকটি দেখিয়ে দিলাম।
চটপট আমরা চলে গেলাম রেস্টুরেন্টে। ইতোমধ্যে আমাদের খাবার তৈরি হয়ে গেছে। খাবারের দাম কিছুটা বেশি হলেও ভালোই লাগল। আমাদের সঙ্গে বিভিন্ন বয়সের এবং বিভিন্ন রুচির পর্যটক আছে। কেউ দেশি মুরগি আর রুই মাছের চচ্চরি ছাড়া কিছুই খেতে চায় না। আবার কেউ কাঁকড়া-বিছে কড়কড়ে ভাজি পেলে খুশি হয়। তৃপ্তির সঙ্গে খাওয়া শেষ করে আমরা সবাই রুমে গেলাম। উদ্দেশ্য, কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়া।
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আবার সবাই একত্র হয়ে গেল।
সবার বক্তব্য, এখানে তো আমরা বিশ্রাম নিতে আসিনি। এক্ষুনি বেরোতে হবে, থামেলে যেতে হবে। কাঠমান্ডু শহরের প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে থামেল। আমরা সবাই রেডি হয়ে গাড়ি খুঁজতে শুরু করলাম। কিন্তু এখান থেকে কোনো গাড়ি পাওয়া মনে হয় সৌভাগ্যের ব্যাপার। কারণ কেবল যাত্রী পেলেই ট্যাক্সিগুলো এখানে আসে। আমরা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে দুটো ট্যাক্সি জোগাড় করলাম। প্রতিটি ট্যাক্সি ৬০০ রুপি করে মোট ১ হাজার ২০০ রুপি ভাড়া নেবে।
প্রথমে আমরা গেলাম দরবার এলাকায়। সেখানে অনেক অনেক পুরনো মন্দির আছে। কারুকার্যখচিত এসব মন্দির দেখতে দেখতে আমাদের বিকেল কাটল চমৎকারভাবে। আমি আর টুটুল দুটো নেপালি টুপি কিনে মাথায় পরে অনেক ছবি তুললাম। একটা মন্দিরে বয়েসী মানুষেরা একসঙ্গে বসে কীর্তন গাইছিলেন। আমরা পাশে দাঁড়িয়ে কীর্তন শুনলাম এবং তাদের ছবি নিলাম। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে আমরা আবারও ট্যাক্সি নিয়ে থামেল এলাকার দিকে রওনা হলাম। থামেল হচ্ছে কাঠমান্ডুর মূল পর্যটন কেন্দ্র।
আমরা যখন থামেলে পৌঁছলাম, তখন সবাই একবাক্যে জানাল যে তারা সবাই এখানে চলে আসতে আগ্রহী। পার্ক ভিলেজ হোটেলটি সুন্দর হলেও সেখানে কেমন যেন একা একা লাগে। ভালো লাগে না। তাই সবাই এই থামেল এলাকার যে কোনো হোটেলে থাকবে। এখানে আশপাশে শপিং সেন্টার আছে, ঘোরাফেরার জায়গা আছে। গভীর রাত পর্যন্ত এলাকাটি জেগে থাকে। আর এলাকাকে জাগিয়ে রাখার ক্ষেত্রে মূখ্য ভূমিকা আমাদের পালন করতে হবে না। কিন্তু পার্ক ভিলেজ হোটেলে আমরা ঘুমিয়ে গেলে সবই শেষ।
আমরা তখন একই গ্রুপের হোটেল কাঠমান্ডু রেস্ট হাউজে গেলাম। এখানকার রুম দেখে আমাদের খুব পছন্দ হল। তবে এখানে রুমের ভাড়া ১৫০ হতে ২২০ মার্কিন ডলার; সেই সঙ্গে ভ্যাট আর সার্ভিস চার্জ মিলে আরও ২৩%। কিন্তু আমি তো ইতোমধ্যে দরকষাকষি শিখে ফেলেছি। ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলে বলে শেষে সবকিছুসহ ৮০ ডলারে রুম ঠিক করে ফেললাম।
কাল ১১টায় ওদের গাড়ি গিয়ে আমাদের নিয়ে আসবে। আমরা আবারও কিছুক্ষণ শপিংমলে ঘোরাঘুরি করে ক্লান্তির বোঝা বাড়ালাম। তারপর পার্ক ভিলেজে যাওয়ার জন্য ট্যাক্সি খোঁজা শুরু করলাম। কিন্তু কোনো ট্যাক্সিই ওদিকে যেতে চায় না। তাদের একটাই কথা, ওখানে গেলে শূন্য অবস্থায় ফিরে আসতে হবে।
যাহোক, শেষ পর্যন্ত দুটো ট্যাক্সিকে রাজি করানো গেল। আমরা পার্ক ভিলেজে পৌঁছে রাতের খাবার খেয়ে যার যার ঘরে চলে গেলাম। আমাদের পরিকল্পনা ছিল, রাতে বাইরে বসে জম্পেস আড্ডা হবে। কিন্তু বাইরে ততক্ষণে শীত শুরু হয়ে গেছে। নিরিবিলি পরিবেশে শীত যেন পাহাড় থেকে উড়ে উড়ে আসছে।
সকালে আমরা ঘুম থেকে উঠলাম অনেকটা বেলা করে। কারণ আজ আমাদের কোনো প্রোগ্রাম নেই। সকাল ১১টার মধ্যে রেডি হয়ে চেক আউট করে নিলেই হল। আমরা নাস্তা সেরে কিছুক্ষণ পর ব্যাগ নিয়ে রিসেপশন কাউন্টারে এসে দেখি কাঠমান্ডু গেস্ট হাউজের গাড়ি আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা চেকআউট করে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে গাড়িতে বসলাম।
কাঠমান্ডু গেস্ট হাউজে আমাদের দেওয়া রুমগুলো খুবই সুন্দর। জানালা দিয়ে একটা সবুজ মাঠ দেখা যায়। মাঠের পাশে ওদের নানা ঐতিহ্য লালিত সরঞ্জামাদি রাখা আছে। একপাশে একটি ছোট্ট লাইব্রেরি। এখান থেকে বই নিয়ে পাশে থাকা খোলা বিছানায় শুয়ে আরাম করে পড়া যায়। আমি জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, একটা মেয়ে সেখানে শুয়ে বই পড়ছে। ভালো করে তাকিয়ে দেখি এই পাঠিকা হচ্ছে আমাদের অর্থী। সে বেশ পড়ুয়া। কিন্তু এ হোটেলে পৌঁছার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে লাইব্রেরি আর আয়েশি ভঙ্গিমায় পড়ার স্থানটা চিনে ফেলেছে, এটাই আশ্চর্যের বিষয়। আমি ক্যামেরা বের করে অর্থীর কটি ছবি তুলে নিলাম।
দুপুরে আমরা কাঠমান্ডু গেস্ট হাউজের পাশে থার্ড আই রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম। রেস্টুরেন্টটি বাইরে থেকে অনেকটা সাদামাটা মনে হলেও ভেতরটা বেশ অন্যরকম। এখানে প্রত্যেক রুমে স্তরে স্তরে উপরে-নিচে টেবিল পাতা হয়েছে। সব টেবিলের সঙ্গেই বসার জন্য তাকিয়া দেওয়া আছে। জুতো বাইরে খুলে এসে আসন পেতে বসতে হয়। আমরা একটা রুম দখল করে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে গেলাম। রাজদরবারের চাপরাশিদের পোশাকে সজ্জিত বেয়ারাগণ বেশ ভাঁজ মেরে মেরে মেন্যু হাজির করলেন।
আমরা অনেক গবেষণা করে দুই ধরনের খাবারের অর্ডার দিলাম।
   
এখানে আমাদের টেবিলে প্রাধান্য পেল সাদা ভাত আর সাধারণ তরকারি। অন্যদিকে ছোটদের টেবিলে দেখা গেল ফ্রায়েড রাইসের সঙ্গে নানা ধরনের উদ্ভট নামের কারি। খাওয়া শেষ করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম শহরে ঘুরতে। অনেকক্ষণ এদিক-সেদিক ঘুরে আমরা চলে এলাম সিভিল মলে। এটি কাঠমান্ডুর অতি আধুনিক শপিং সেন্টার। এখানকার মডার্ণ ছেলেমেয়েদের পদচারণায় সিভিল মল তাদের আঁটোসাঁটো কোটের সঙ্গে রংবেরংয়ের টুপি পরার সংস্কৃতি ছাড়িয়ে এগিয়ে গেছে অনেকদূর, পশ্চিমে। তবে পুরোপুরি পশ্চিমা সংস্কৃতির ঢল এখানে এখনও নামেনি।
সিভিল মলের প্রবেশ পথের দুধারে অনেক খোলামেলা খাবারের দোকান। এগুলোর মধ্যে চটপটি, ফুচকা, আইসক্রিম, মমো ইত্যাদির দোকান উল্লেখযোগ্য। সিঁড়ি দিয়ে ওঠেই একটা কাউন্টার থেকে টাকা দিয়ে খাবারের জন্য টিকিট কিনতে হয়। তারপর নির্দিষ্ট দোকানে গিয়ে লাইন দিয়ে খাবার নিতে হয়।
শ্রেয়া এ সিস্টেম না বুঝে ফুচকার দোকানে গিয়ে দাঁড়াতেই যে মেয়েটি ফুচকা তৈরি করে ক্রেতাদের দিচ্ছিল সে শ্রেয়াকে একটা ফুচকা দিল। শ্রেয়া সেটি খেয়ে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকেও আর কোনো ফুচকা পেল না। শেষ পর্যন্ত আমি এগিয়ে গিয়ে ওকে ফুচকা দিতে বলায় সে টিকিট ঘরের দিকে দেখিয়ে দিল এবং টিকিট কিনে আনতে বলল।
আমি দেখলাম, টিকিট কেটে এনে লাইনে দাঁড়ালে ও আর সিনেমা দেখতে পারবে না। কীর্তি এরই মধ্যে ওদের জন্য সিনেমার টিকেট কেনে এনেছে। সিনেমা শুরু হতে আর মিনিট দশেক বাকি আছে। অগত্যা মেয়েটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে সবাই আইসক্রিম খেয়ে ওঠে পড়লাম।
এখানে টুটুল আর বন্যা একটা হিন্দি সিনেমা দেখবে। বাকিরা দেখবে থ্রি-ডি ইংলিশ কার্টুন। আমি আর বেবী সিনেমা দেখার বদলে রুমে ফিরে বিশ্রাম নেব। ওরা সিনেমা হলে ঢুকে গেলে আমি আর বেবী একটা ট্যাক্সি নিয়ে হোটেলে ফিরে এলাম।
হোটেলে ফিরে আসার পরপরই একটা টেলিফোন পেলাম। কাঠমান্ডু গেস্ট হাউজের একজন কর্মকর্তা আমাকে ফোন করে তার পরিচয় দিলেন। ভদ্রলোকের নাম সতীশ। বাংলাদেশ থেকে আসার আগে তার সঙ্গেই আমার কথা হয়েছিল। আমি তাড়াতাড়ি নিচে নেমে এসে ভদ্রলোকের সঙ্গে রেস্টুরেন্টে বসলাম। কমদামে হোটেল বুক করার ব্যবস্থা করার জন্য ধন্যবাদ জানালাম। এরপর বললাম, “আমরা এ গ্রুপের হোটেলেই থাকতে চাই। আমরা যেহেতু পোখরা যাচ্ছি সেখানেও তোমাদের হোটেলেই থাকব। তবে আমাদের কাছ থেকে কম ভাড়া নিতে হবে।
বেশ দামাদামি করে এবার প্রতি রুম ৬০ ডলারে ঠিক করে ফেললাম। ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিয়ে আমি আবার রুমে ফিরে এলাম। বেবী তখন একা একা শুয়ে আছে। বহুদিন পর যেন আমি ওকে একা খুব কাছে পেয়েছি। অনেকক্ষণ ধরে আমরা জম্পেস আড্ডা দিলাম। ব্যস্ততাহীন, দুঃশ্চিন্তাহীন নিখাদ এই আড্ডায় আকাশ-পাতাল অনেক কিছুই উঠে এল। আমাদের শেষ জীবন কীভাবে কাটবে তাও আলোচিত হয়ে গেল। হঠাৎ লক্ষ করলাম রাত দশটা বেজে গেছে। আশপাশের রেস্টুরেন্টগুলো কয়টা পর্যন্ত খোলা থাকে জানি না। তড়িঘড়ি করে আমরা খাবারের সন্ধানে বের হলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয়, অনেক রেস্টুরেন্ট দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। কাঠমান্ডু গেস্ট হাউজের রেস্টুরেন্টে তো কোনো লোকই পাওয়া গেল না। থার্ড আই রেস্টুরেন্ট এইমাত্র দরজা বন্ধ করল। আমরা অনেক খুঁজে নিউ অর্লিন্স ক্যাফে নামক একটি রেস্টুরেন্ট পেলাম। এখানে বিদেশি পর্যটকদের ভিড় লেগে আছে। আমরা ভেতরে ঢুকে মেন্যু দেখলাম, খাবার পছন্দ হল না। অগত্যা আমরা রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এসে আরও কোনো রেস্টুরেন্ট পাওয়া যায় কি না খুঁজতে গেলাম।
   
ঠিক এমনি সময়ে মিতুল আর কীর্তিকে দেখি– ওরা হন্যে হয়ে রেস্টুরেন্ট খুঁজছে। এছাড়া অন্যরা কাঠমান্ডু গেস্ট হাউজের সামনের লনে হাঁ করে দাঁড়িয়ে আছে। খাবার পাওয়া যাবে কি না কে জানে? ওদের বেশ উদগ্রীব দেখাচ্ছিল। আমি জানালাম যে, ওখানে একটি রেস্টুরেন্ট খোলা আছে। তবে ওটাতে রুটি আর ডাল ছাড়া আপাতত আর কিছু পাওয়া যাবে না। মিতুলের পরামর্শ অনুসারে আমরা আবার ওই রেস্টুরেন্টে ফিরে গিয়ে একই স্থানে আবার বসলাম। ভাবটা এমন, যেন আমরা ওদের আনতে গিয়েছিলাম। আমরা এখানে রুটি আর ডালের অর্ডার দিয়ে অপেক্ষা করছি। আর ওদিকে মিতুল, কীর্তি আর টুটুল হেঁটে হেঁটে দূরের একটি ফাস্ট-ফুড রেস্টুরেন্ট থেকে বার্গার খেয়ে এল।
ব্যাগ গুছিয়ে রেখে আমরা বেশ সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়লাম। পরদিন সকালেই আমাদের রওনা হতে হবে পোখরার উদ্দেশে। নেপালের অত্যন্ত আকর্ষণীয় স্থানগুলোর মধ্যে পোখরা অন্যতম। কাঠমান্ডু হতে পোখরার দূরত্ব ২০৮ কিমি; কিন্তু সড়কপথে সময় লাগে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা; কখনও কখনও তার চেয়েও বেশি। পাহাড়ি রাস্তা, পাশে নানারকম মৃত্যুখাদ। এর মধ্যেই গাড়ি চালিয়ে যেতে হয়।
সকালে ওঠে আমরা হোটেলের সৌজন্য নাশতা খেতে গিয়ে দেখি গুণে গুণে কটি পাউরুটির টুকরো, এক বাটি জেলি, আর কিছু পাহাড়ি কলা রাখা আছে। বিশ্বের অন্য কোনো হোটেলেই এর চেয়ে নিম্নমানের নাস্তা পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। রেস্টুরেন্টের বেয়ারাদের আচরণও নাস্তার মানের মতোই।
নাস্তা খেয়ে আমরা ব্যাগ নিয়ে এসে গাড়িতে উঠলাম। এটি ১৪ সিটের একটি মাইক্রোবাস। চাররাত আর পাঁচদিনের জন্য আমরা এটি ভাড়া করেছি ৩৫ হাজার রুপি দিয়ে। পাঁচদিনে আমরা কোথায় কোথায় যাব, তা আগেই জানিয়ে রাখা হয়েছে। গাড়িতে ওঠার পর গাড়ি বেদমগতিতে ছুটে চলছে।
কাঠমান্ডু শহর ছেড়ে আমরা শহরের উপকণ্ঠ থেকে শুরু হওয়া পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে এগুচ্ছি। গাড়ির ভেতর প্রচ- গরম লাগছে। কারণ এর এসি চলছে না। গাড়িতে কেবল ড্রাইভারের পাশের জানালা খোলা যায়, অন্যগুলো আটকানো। এসির বিষয়ে ড্রাইভারকে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানালেন, গাড়ির এসি ভালোই আছে, তবে এসি চালু করা হবে না। কারণ গাড়ি ভাড়া করার সময় এসি চালানোর কথা বলা হয়নি। এখন এসি চালাতে হলে ২০% বেশি দিতে হবে। আমাদের তো মাথায় হাত। এসি যদি চালানো না হয় তাহলে গরমে আমরা অতীষ্ঠ হয়ে যাব। ট্যুর ম্যানেজার মিতুল তো বেশ বিব্রতই হয়ে গেল। এখন কী করা যায়! আরও ঘণ্টাদেড়েক পথ চলার পর নদীর পাড়ে একটা ছোট্ট রেস্টুরেন্ট দেখা গেল। পাশে একটা টং টাইপের মুদির দোকান। আমরা চা খাবার জন্য এখানে গাড়ি থামাতে বললাম। এরই মধ্যে সবাই গরমে অতীষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। আমরা লাফিয়ে নেমে রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসলাম।
এটি একটি খোলা রেস্টুরেন্ট। নদীর পাড়ে অনেকটা জায়গাজুড়ে টেবিল-চেয়ারগুলো ছড়ানো আছে। চারদিকে বেড়া নেই। নদীর দিক থেকে হুহু করে উত্তুরে বাতাস বইছে। মুহূর্তে যেন আমাদের শরীর জুড়িয়ে গেল। অল্পক্ষণের মধ্যে আবিষ্কার করলাম, অর্থী আমাদের কাছে নেই। ও ঢালু পাহাড়ি রাস্তা বেয়ে এক্কেবারে নিচে নেমে নদীর পানিতে হাতমুখ ধুয়ে নিচ্ছে। অর্থীকে এ অবস্থায় দেখে নিচে নামার চ্যালেঞ্জ নিল জয়িতা আর শ্রেয়া। কারণ ওরা যদি এই ঢালু রাস্তাটি বেয়ে না নামতে পারে তাহলে তাদের ইজ্জত একেবারেই নষ্ট হয়ে যায়। তাই ওরা অনেক কষ্টে ঢালু পথ বেয়ে বেয়ে নিচে নেমে গেল। আমরা মজা করে চা খেলাম। এখানে প্রায় ঘণ্টাখানেক সময় কাটালাম। টুটুল মুদি দোকান থেকে কলা কিনে আনল। আমাদের দেশে বান্দরবানে এ ধরনের কলা পাওয়া যায়। চা-কলা খাবার পর আমরা আবার গাড়িতে চড়ে পোখরার দিকে রওনা হলাম। এরমধ্যে গাড়ি বেশ ঠান্ডা হয়ে আছে, সাঁ-সাঁ করে এসি চলছে। আমরা খুব আশ্চর্য হলাম। মিতুলকে জিজ্ঞেস করলাম, “বিষয় কী? ঠান্ডা আসে কোত্থেকে?”
মিতুল জানাল, তাকে ফিট করা হয়েছে। পাঁচদিনের ডিউটি শেষে একটু বখশিস দিলেই চলবে।
   
দুপুর দেড়টার দিকে আমরা একটি কালচার ভিলেজ রেস্টুরেন্টে থামলাম। এটি পোখরা যাওয়ার পথে তানাহুন নামক স্থানে একটি আবদ্ধ ও খোলামেলা রেস্টুরেন্ট। মানে এর একাংশ দেয়াল দিয়ে আবদ্ধ করা, আর অন্য অংশ চারদিকের দেয়ালহীন, খোলামেলা। রেস্টুরেন্টের বাইরেটা বেশ সুন্দর। আমরা খোলামেলা অংশে গিয়ে নদী আর পাহাড়ের মুখোমুখি হয়ে বসলাম।
এ রেস্টুরেন্টের মেন্যু একেবারেই বাংলাদেশি খাবারের মতো। সাদা ভাত, পাতলা ডাল থেকে শুরু করে ডিম ভাজা পর্যন্ত সবই আছে। আমরা খাবারের অর্ডার দিয়ে আড্ডাবাজিতে মেতে উঠলাম। অল্পক্ষণ পরেই খাবার আসতে লাগল। খাবার যে ভালো ছিল এর প্রমাণ হচ্ছে সব টেবিল থেকেই আবারও নতুন নতুন অর্ডার দেওয়া হল। গাড়িতে এসি দেওয়া বা না দেওয়ার মালিক ড্রাইভার সাহেবকে আমরা যা ইচ্ছা তাই দিয়ে পেট ভরে খাওয়ার জন্য অনুরোধ জানালাম।
খাওয়া শেষ হওয়ার পরও আমরা এখানে কিছুক্ষণ বসে রইলাম। জায়গাটা সবার কাছেই ভালো লাগছিল। তারপর এক সময় আবার আমাদের ছুটে চলা শুরু হল। আমরা পোখরা পৌঁছুলাম দুপুর গড়িয়ে যাওয়ার পর। আমাদের গাড়ি পোখরা শহর পেরিয়ে শহরের উল্টোদিকে এগিয়ে চলল। পাকা রাস্তা ছেড়ে শুরু হল ভাঙা রাস্তা দিয়ে যাওয়া। এবার আমার মনে ভয় ঢুকে গেল, এটাও তাহলে পার্ক ভিলেজের মতোই শহর থেকে বিচ্ছিন্ন একটা রিসোর্ট। ওখানে গেলে বাইরে আসার নিশ্চয়ই খুব অসুবিধা। গাড়ি আরও কিছুদূর এসে বামে ঘোরার পর দেখলাম, আমাদের চোখের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে এ এলাকার সুন্দরতম রিসোর্ট ওয়াটারফ্রন্ট। সামনে বিশাল সুইমিংপুল, তারও সামনে এক টুকরো সবুজ মাঠ পেরিয়ে আবার বেশ বড় লেক। আর ওপারে বিশাল পাহাড় আকাশের অনেকটা ঢেকে রেখেছে। পাহাড়ের শীর্ষে একটা সাদা মন্দির। রিসোর্টটা দেখে কেন জানি আমাদের মনটা নেচে উঠল। আহা, তিন তিনটে দিন আমরা এই সুন্দর রিসোর্টে কাটাব। কতই না মজা হবে!
রিসেপশন কাউন্টারের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমরা রুমে চলে গেলাম। আমাদের পাশাপাশি চারটা রুম, দক্ষিণের বারান্দায় এসে দাঁড়ালে অন্য রুমের বারান্দাগুলোও দেখা যায়। চটপট হাতমুখ ধুয়ে একটু বিশ্রাম নিয়েই আমরা কজন বেরিয়ে পড়লাম। এ দলের মধ্যে আমার সঙ্গে বেবী, বন্যা আর টুটুল আছে। বাকিরা রুমেই সিনেমা ইত্যাদি দেখায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
আমরা হোটেলের সামনের লন পার হয়ে সুইমিং পুলের পাশ দিয়ে ছোট্ট দরজাটি দিয়ে বাইরে চলে এলাম। এখানে চমৎকার একটি সবুজ মাঠ। আমরা মাঠটি পেরিয়ে লেকের পাশে এসে দেখি নিচে বসে অনেকেই বড়শি দিয়ে মাছ ধরছে। আমরা আরও একটু দূরে এসে ঘাসের উপর পা ছড়িয়ে বসলাম।
পড়ন্ত বিকেলে পাহাড়ি ফুরফুরে বাতাস আমাদের মনকে যেন কোন সুদূরে উড়িয়ে নিয়ে গেল। আমরা অনেকক্ষণ বসে গল্প করলাম, অনেকগুলো ছবি তুললাম। সন্ধ্যার আগে আগে হঠাৎ ঝপ করে ঠান্ডা বাতাস বইতে শুরু করল আর বৃষ্টির ফোঁটা পড়তে লাগল। আমরা দৌড়ে হোটেলে চলে এলাম। হোটেলে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টি থেমে গেল।
আমরা রুমে আসার পর অর্থী আর জয়িতা এসে জানাল যে ওদের ক্ষিধে পেয়েছে। আমি নিচে ওদের রেস্টুরেন্টে গিয়ে মেন্যু দেখতে দেখতে আমার মাথা গরম হয়ে গেল। প্রতিটি জিনিসের দামই আকাশছোঁয়া। ওরা নিশ্চয়ই দাম বেশি রেখে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের একটা কৌশল নিয়েছে। কারণ এখান থেকে শহরে খেতে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। এখান থেকে ট্যাক্সি জোগাড় করা সম্ভব নয় বললেই চলে। আমাদের বিষয়টা অবশ্য অন্যরকম। কারণ আমরা পাঁচদিনের জন্য গাড়ি নিয়েই এসেছি।
আমি রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে পাশের গ্রামের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। পাহাড়ের পাশ দিয়ে একটি রাস্তা এঁকেবেঁকে গ্রামের দিকে এগিয়ে গেছে। এদিকটায় লোক চলাচল খুব কম, গাড়ি-ঘোড়া একদম নেই বললেই চলে। মাঝে মাঝে দু-একটা মোটর সাইকেল এ পথে চলে। কিছুদূর যাওয়ার পর একটা দোতলা পাকাবাড়িতে ‘হোটেল ও রেস্টুরেন্ট’ লেখা সাইনবোর্ড দেখে এগিয়ে গেলাম। নিচে একটা রুমে একটা কম্পিউটার সামনে নিয়ে একটা মেয়ে বসে কাজ করছে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, “এখানে রেস্টুরেন্টটি কোথায়?”
সে আমাকে সিঁড়ি দেখিয়ে বলে দিল, “দোতলায়।”
আমি দোতলায় গিয়ে দেখি সেখানে কেউ নেই। একটা রুমে গোটাতিনেক টেবিল আর তার সঙ্গে বেশ কটি চেয়ার রাখা আছে। বাইরের খোলা ছাদেও একটি টেবিল আর চারটি চেয়ার পাতা। আমি জোরে জোরে ডাকলাম, “এখানে কেউ আছেন?”
  
পাশের একটি রুম থেকে দরজা ঠেলে একটি মেয়ে আমার সামনে এসে হাসিমুখে দাঁড়াল। তার পরনে থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট ও নীল টি-শার্ট। বিনয়ের সঙ্গে কুর্নিশ করে মেয়েটি বলল, “নমস্তে।”
আমি ধন্যবাদ দিয়ে বললাম “তুমি কি এই রেস্টুরেন্টে কাজ কর?”
“হ্যাঁ।”
“তোমার নাম কী?”
“কুসুম।”
“কুসুম মানে কী?”
“আমি জানি না।”
“আমাদের দেশে কুসুম মানে ফুল।”
কুসুম আমাকে একটা ছাপানো মেন্যু এনে দিল।
তাদের মেন্যু দেখে আমি খুবই খুশি হলাম। এখানে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই থেকে শুরু করে সকল ফার্স্ট ফুড, ভাত, পোলাও এবং ডাল পর্যন্ত আছে। আর এগুলোর দাম অবিশ্বাস্য রকম কম। রেস্টুরেন্টটি ওদের পারিবারিক এবং খুব পরিচ্ছন্ন। ওর বাবা একটা বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকুরি করেন। কুসুমের মা আর ওদের দুবোন মিলে এই পারিবারিক ব্যবসা চালায়। বাড়ির দোতলায় রেস্টুরেন্ট আর তাদের থাকার ঘর। অন্যদিকে নিচতলায় রয়েছে হোটেল, অর্থাৎ ভাড়ায় থাকার ব্যবস্থা। এখানে প্রধানত রাশিয়া বা অন্যান্য দেশের পর্যটকরা অতি অল্প ভাড়ায় থাকেন।
আমি কুসুমের রেস্টুরেন্টে অনেক ধরনের ফার্স্ট ফুডজাতীয় খাবারের অর্ডার দিলাম। এর মধ্যে ফ্র্যাঞ্চ ফ্রাই, মুরগি ভাজি, সব্জি ভাজি, কপি ভাজি ইত্যাদি আছে। আমার খাবার বানাতে কিছুটা সময় লাগবে বলে কুসুম আমাকে একটা চা দিয়ে গেল। এরই মাঝে ওর মা চলে এসেছেন। তিনিও খাবার বানাবার কাজে হাত লাগালেন। আমি যাতে একা বসে বসে অস্থির না হয়ে পড়ি সে জন্য কাজের ফাঁকে ফাঁকে ওরা মা-মেয়ে পর্যায়ক্রমে রান্নাঘর থেকে বাইরে আসছে আর দু-একটা কথা বলে চমৎকার একটা করে হাসি উপহার দিয়ে আবার রান্নাঘরে ঢুকে পড়ছে। কিছুক্ষণ পর কুসুমের মা আমার হাতে খাবারের প্যাকেটটি তুলে দিলেন। খাবারের প্যাকেট দেখে আমি মুগ্ধ হলাম। খাবার যাতে ঠান্ডা না হয়ে যায় সে জন্য সেগুলো ফয়েল পেপার দিয়ে আলাদা আলাদাভাবে মুড়িয়ে দিয়েছেন ভদ্রমহিলা। দাম চুকিয়ে দিয়ে হোটেলে এসে সবার সামনে আমি খাবার খুলতে লাগলাম। এ সময় সবাই এগিয়ে এসে আমাকে সাহায্য করল। কিছুক্ষণের মধ্যেই এতগুলো খাবার হাওয়া হয়ে গেল। আমার খুব ভালো লাগল এই খাবারগুলো সবাই পছন্দ করেছে বলে।
রাতে আমরা গাড়ি নিয়ে শহরে খেতে গেলাম। প্রথমে সবাই দোকানপাটে ঘুরে বেড়াল। টুকটাক নেপালি জিনিসপত্র কেনাও হল। ভারতীয় সিনেমা দেখে দেখে জয়িতা কিছু কিছু হিন্দি বলা শিখেছে। ওর নিজের কাছে কিছু টাকাও আছে। ও যা দেখছে, তাই কিনে ফেলতে চাইছে। দোকানদারের সঙ্গে হিন্দি ভাষায় কথা বলছে সে। দামাদামি করছে।
শহরের শেষ দিকে একটা রেষ্টুরেন্টে আমরা খেতে বসলাম। রেস্টুরেন্টটি মোটামুটি মানের। খাবার তেমন একটা ভালো লাগল না। রাতে আমরা যার যার বারান্দায় বসে অনেকক্ষণ আড্ডা দিয়ে গভীর রাতে ঘুমালাম। সকালে ওয়াটারফ্রন্ট রেস্টুরেন্টে নাস্তা সৌজন্য হিসেবে দেওয়া হবে। আমরা একটু দেরি করে সেখানে গেলাম এবং পরিচিত নানা ধরনের খাবার দিয়ে নাস্তা করে নিলাম। এখানকার বেয়ারাগুলো খুব ভালো। তারা হাসিমুখে নানা ধরনের খাবার এনে দেয়। দুপুরের আগে আগে আমরা গাড়ি নিয়ে শহরে চলে এলাম। ঘুরে ঘুরে শহরটা দেখে নিলাম আমরা। চমৎকার ঐতিহাসিক একটি শহর। বহু পুরনো আমল হতেই এটি একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত। দুপুরে আমরা একটি ভেজিটারিয়ান রেস্টুরেন্টে খেতে গেলাম। আর মিতুলের নেতৃত্বে ছোটরা গেল ইকিরি বিকিরি মার্কা কী যেন একটা রেস্টুরেন্টে। সেখানে গিয়ে তারা আজব কিছু খাবার খেয়ে খুশিতে লাফাতে লাফাতে ফিরে এল। আর আমি সেই চিরদিনের বন্ধু ডিম ভাজি দিয়ে খেয়ে নিলাম।
বিকেলটা আমাদের কাটল কাছের একটা নদীতে বোটিং করে। চমৎকার লেইক টাইপের একটা শান্ত নদী। এর দুদিকে উঁচু পাহাড় ভর্তি সবুজ গাছ। বিকেলের হালকা হিমেল বাতাস আমাদের আনন্দকে আরও সমৃদ্ধ করলো। সন্ধ্যার পর আমরা নদীর তীরে বসে আড্ডা দিলাম। রাতে শহর থেকে রাতের খাবার খেয়ে আমরা ওয়াটারফ্রন্টে ফিরলাম। আজ একটু সকাল সকাল ঘুমুতে হবে। কারণ কাল খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে সবাই সারাংকোট পাহাড়ে সূর্যোদয় দেখতে যাবে। আমি অবশ্য ঘুমুতে যাওয়ার আগে পরিষ্কারভাবে বলে দিয়েছি, জীবনে বহু স্থান থেকেই সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখেছি। এটা দেখার জন্য ঘুম বাদ দিয়ে শেষ রাতে পাহাড়ে চড়তে পারব না।
শেষ রাতে সকলের হৈচৈ শব্দে আমারও ঘুম ভাঙল। খুব আড়ম্বরপূর্ণ সাজুগুজু করে ওরা বেরুতে যাচ্ছে। আমার আর ঘুম হবে বলে মনে হচ্ছে না। এখন আমার ‘আবার সাধিলেই খাইব’ এমন অবস্থা। বেরুতে যাওয়ার আগ মুহূর্তে বেবী কেন জানি দয়া করে বলল, “চল না, তুমিও চল। একা একা শুয়ে থাকতে তোমার ভালো লাগবে?”
এর জবাবে আমি যদি বলি, “হ্যাঁ, খুবই ভালো লাগবে।”
তাহলে একটা দাম্পত্য কলহের সূচনা হতে পারে। তাছাড়া আমারও ভালো লাগছিল না। সূর্য বেচারা তো উঠবেই, এটা তার কপালের লিখন। সে না উঠে পারবে না। আমি সূর্য দেখি বা না দেখি, সবার সঙ্গে হৈচৈ তো করতে পারব! আমি যাব বলে পাঁচ মিনিটের সময় নিয়ে মোটামুটি সাড়ে এগারো মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে ওদের সঙ্গে নেমে গেলাম। গাড়ি শহর পার হয়ে অনেক ডান-বাম করে পাহাড়ে আরোহন করার পাঁয়তারা করছে। এদিকে পুব আকাশ ফর্সা হতে শুরু করেছে। আমরা পৌঁছার আগেই সূর্য উঠে যেতে পারে এমন আশংকায় এখন সবাই কাতর। এ মুহূর্তে বন্যা আবার একটু বিটলেমি বুদ্ধি খাটিয়ে দিল।
সে বলল, “আমরা ঠিক সময়েই পৌঁছুতে পারতাম, মাহফুজ ভাই সাড়ে এগার মিনিট দেরি করায় এখন সূর্যোদয় দেখতে পাব না।”
ওর কথা শুনে সবাই এখন একটা যেন সহি কারণ পেয়ে গেল। আলোচনা শুরু হয়ে গেল আমার দেরি করা নিয়ে। আমি দেখলাম মহাবিপদ।
আমি তাড়াতাড়ি কথাটা ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য বললাম, “আগামী ১৫ তারিখ নাকি হেফাজতে ইসলামির সম্মেলন, মতিঝিল শাপলা চত্বরে। আল্লাহ জানেন কী হয়।”
এটা বলার সঙ্গে সঙ্গে আলোচনার মোড় ঘুরে গেল। বন্যা এবার হুজুরদের প্রসঙ্গে কথা বলতে শুরু করে দিল। ততক্ষণে আমরা সারাংকোটের একটি পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছে গেলাম। ভাগ্য অতি সুপ্রসন্ন, সূর্য কেবল ভাব দেখাচ্ছে, এখনও সারিবদ্ধ পাহাড় ডিঙিয়ে উঁকি দেয়নি। আমরা তাড়াতাড়ি হেঁটে পাহাড়ের শীর্ষে চলে এলাম। এখানে ইতোমধ্যে বহু মানুষের সমাবেশ ঘটেছে। চীন, ইউরোপ, ভারতসহ অনেক দেশের মানুষের চেহারা দেখা যাচ্ছে এখানে, দেখা যাচ্ছে না শুধু সুরুজ মিয়াকে। সে কুয়াশার চাদর গায়ে জড়িয়ে ঘাপটি মেরে বসে আছে। আর এই পাহাড়ের শীর্ষে লাল চাদর গায়ে জড়িয়ে বসে আছে বেবী, জ্যাকেট গায়ে থিরথির করে কাঁপছে বন্যা, ড্যাবড্যাবে চোখে পুবের দিকে তাকিয়ে আছে অর্থী, শ্রেয়া আর জয়িতা। ওদিকে মিতুল আর কীর্তি ছবি তোলায় ব্যস্ত। ওদের মনে প্যারাগ্লাইডিং নিয়ে বিপুল উৎসাহ। আশপাশের পাহাড় থেকে কিছু লোক প্যারাগ্লাইডিং করছে, অর্থাৎ একটা প্যারাস্যুট নিয়ে পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ছে, নিচে এসে বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে।
আজ সকাল ১০টার দিকে ওরাও প্যারাগ্লাইডিং করবে; গতকালই টিকিট কিনে এনেছে। সেই থেকে আমার মনে ভয় ঢুকে গেছে, আল্লাহ না করুক, ঠিক ওদের প্যারাস্যুটটাই যদি ফুটো হয়ে যায়!
টুটুল পাশের দোকান থেকে চার কাপ চা নিয়ে এল। এই ঠান্ডা আবহাওয়াতে গরম চা পেয়ে সবাই খুব খুশি। যারা চা পেল না তারা অন্তত দোকানের খোঁজ পেল, ওদিকে গেলে চা খাওয়া যাবে।
আমিও জ্যেষ্ঠতার সূত্রে জায়গায় বসেই আওয়াজ দিয়ে এক কাপ চা পেয়ে গেলাম। টুটুলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে আমরা চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিলাম। এখন ধীরে ধীরে দর্শক কমতে শুরু করেছে। আরও কিছুক্ষণ পর সবাইকে হতাশ করে দিয়ে ঝপাৎ করে সূর্য অনেকটা উপরে চড়ে বসল। এটা দুপুরের সূর্যের মতোই কড়া। পাশের বাড়ির মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হলে যেমন নতুন কোমলমতি বউয়ের ইমেজটা পাওয়া যায় না, তেমনি আমরা লাল আভা ছড়িয়ে সেজেগুঁজে ধীরে ধীরে প্রবীণ হওয়া সূর্যের স্বাদটা পেলাম না। অগত্যা আমাদের চলে আসতে হল।
আমরা হোটেলে ফিরে এসে নাস্তা খেয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। আমার মনের গহীনে একটা চাপা ভয় রয়ে গেল যে কীর্তি আর মিতুল আকাশে উড়তে যাবে। ওদের যাওয়া দেখলে আমি হয়তো আরও অশান্তিতে পড়তে পারি, এ ভয় থেকে আমি আরও তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেলাম। হোটেলের সামনের সুইমিং পুলে ডুবসাঁতার দেওয়ার জন্য বেবী আমাকে ডেকে উঠাল সাড়ে দশটায়। আমরা তাড়াতাড়ি সুইমিং-এর পোশাক আর হোটেলের টাওয়েল নিয়ে নিচে নেমে এলাম। আমি আর টুটুল চেঞ্জ রুমে গিয়ে হাফপ্যান্ট পরে চলে এলাম পুলসাইডে। তারপর চটপট নেমে পড়লাম চমৎকার পানিতে।
আমি তো নরসুন্দা পাড়ের ছেলে, ছোটবেলাতেই সাঁতার রপ্ত করেছি। অবলীলায় আমি সুইমিং পুলের এপাড় থেকে ওপাড়ে সাঁতার কাটতে লাগলাম। ওদিকে টুটুল ছোটবেলা থেকেই শহরে মানুষ। সে একটা গোল টিউব বুকের নিচে নিয়ে অনেক কষ্টে সাঁতার কাটতে শুরু করল। এদিকে বেবী আর বন্যা চেঞ্জ রুম থেকে মুখ আঁধার করে বেরুচ্ছে দেখে আমরা ঘাবড়ে গেলাম। হঠাৎ গৃহশান্তি বিঘ্নত হচ্ছে কেন? ওরাই তো সুইমিং পুলে নামার ব্যাপারে বেশি আগ্রহী ছিল। এখন মুখ গোমরা করে পুলসাইড চেয়ারে বসতে যাচ্ছে কেন? ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে?”
   
 বেবী মুখটাকে একটু গাব্বু বানিয়ে বলল, “সুইমিং কস্টিউম না পরলে নামতে দেবে না। সালোয়ার কামিজে হবে না।”
“তাহলে ওদের কাছ থেকে ধার নিয়ে পরে ফেল।”
“চুপ কর। দুনিয়ার কত জায়গায় সালোয়ার কামিজ পরে সুইমিং পুলে নেমেছি। এখন নেপাল এসে এসব পরতে হবে?”
আমরা মনের আনন্দে সাঁতার কাটছি আর ওরা তীরে বসে গল্প করছে। এমন সময় মিতুল আর কীর্তি এল আমাদের মাঝে। ওরা এইমাত্র প্যারাগ্লাইডিং করে ভূপৃষ্ঠে অবতরণ করেছে। আনন্দে ঝিকঝিক করছে ওরা।
ওদের আনন্দ দেখে অর্থী বায়না ধরে বসল, সেও প্যারাগ্লাইডিং করবে। ওর এই আব্দারের সঙ্গে একমত হয়ে গেল বেবী আর বন্যা। ওদের সামনে আমি তো অসহায়। অগত্যা রাজি হতে হল। ভাগ্য ভালো, সেদিন আর টিকিট পাওয়া গেল না।
আমাদের হোটেলটি এমন জায়গায় যে সারাদিন ধরে প্যারাগ্লাইডারগণ এর আশপাশে এসে ল্যান্ড করেন। দেখতে অদ্ভুত লাগে। আমরা সারাজীবন আকাশ থেকে এভাবে শকুনদের ল্যান্ড করতে দেখেছি। আর আমাদের চোখের সামনে ধুপধাপ মানুষ নেমে আসছে আকাশ থেকে। আকাশে যেন অনেকগুলো ফুল ফুটে আছে। রংবেরংয়ের প্যারাস্যুট নিয়ে আকাশে উড়ছে বহু মানুষ। দূর থেকে দেখে মনে হয় না কেউ ভয় পাচ্ছে। মনে মনে দু-একবার ভেবেছি, আহা, অর্থীকে একটিবার উড়তে দিলে ভালোই হত! ও একটু মজা করতে পারত। আবার কবে ও নেপাল আসতে পারে, কে জানে!
দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে বিকেলের দিকে। আমি আর বেবী হোটেরের বারান্দায় বসে আছি। কিছুক্ষণ পর পর চিলের মতো উড়তে উড়তে প্যারাগ্লাইডারগণ আশপাশে এসে ল্যান্ড করছে। এসব দেখতে খুবই ভালো লাগছে। আগামীকাল আমাদের নাগরকোট যাওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে আমরা কোনো হোটেল বুক করিনি। সপরিবারে এ রকম একটা অনিশ্চিত স্থানে বেশ অসহায় লাগে।
মিতুল অবশ্য বেশ দৃঢ়তার সঙ্গেই বলছে, “কোনো অসুবিধা হবে না। আমরা কোনো না কোনো হোটেল পেয়ে যাব। আমি একটু ট্রাই করে দেখি– এমন ভাব নিয়ে সতীশকে একটা ফোন করলাম। তাঁর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করে ওয়াটারফ্রন্ট এর মতো একটা চমৎকার হোটেলে বুকিং দিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানালাম। তিনি খুব খুশি হলেন। এবার তাকে নাগরকোটে একটা হোটেল বুক করে দেবার জন্য অনুরোধ জানালাম। রুমের ভাড়া হিসেবে প্রতিরুম ৪০ ডলারে বেঁধে দিলাম। প্রথমে তিনি একটু আমতা আমতা করলেও শেষে আমার জন্য চেষ্টা করছেন বলে জানালেন। এরও আধা ঘণ্টা পর তিনি আমাকে বুকিং নিশ্চিত করে দিলেন। নাম ভাংগেরি হোটেল। চারটি রুমের জন্য এক রাতের ভাড়া ১৬০ ডলার। আর সকালের নাস্তা ফ্রি। আমি তাঁকে আবার ধন্যবাদ জানিয়ে মনে মনে ভাবলাম, এভাবে চালিয়ে গেলে তো আর দুই দফা পরে বিনামূল্যে রুম পাওয়া যাবে।
বিকেলে আমরা আবার মূল শহরে গিয়ে বেশকিছু শপিং করে নিলাম। শপিং এর ক্ষেত্রে জয়িতা বেশ উৎসাহ দেখাল। যেহেতু সে প্রথম বিদেশে এসেছে তাই সবাই তাকে দশটা বিশটা ডলার দিচ্ছে। এগুলো ভাঙিয়ে সে যা দেখছে তাই কিনে নিতে চাচ্ছে। আমি শ’খানেক নেপালি টুপি কিনে নিলাম সবাইকে দেব বলে। রাতে আমরা আবার সেই ভেজিটারিয়ান রেস্টুরেন্টে ঢুকে গেলাম। আর মিতুলরা আবার সেই ব্যতিক্রমী খাবার খাওয়ার জন্য কোথায় যেন হারিয়ে গেল।
পরদিন সকালে নাস্তা সেরেই আমরা হোটেল ছেড়ে মাইক্রোবাসে উঠে বসলাম। আমাদের আজ অনেক দূর যেতে হবে। সেই কাঠমান্ডু পেরিয়ে ভক্তপুর ছেড়ে আমরা যাব নাগরকোট। আবার সেই পাহাড়ি রাস্তা, আবার সেই পাহাড়ি নদী, আবার সেই ঝরনাধারা।
এসব দেখতে দেখতে আমরা দুপুর নাগাদ পৌঁছে গেলাম রাস্তার পাশে একটা হোটেলে। একটা রেস্টুরেন্টের এতগুলো শাখাপ্রশাখা আমি আগে আর কোথাও দেখিনি। অনেকটা জায়গাজুড়ে ছায়া সুনিবিড় এই রেস্টুরেন্টে বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন রকম খাবার পাওয়া যায়। সবখানেই পেটচুক্তি পদ্ধতি বা বুফে সিস্টেম। মূল হাইওয়ে থেকে উপরে উঠেই একটা ইউনিট।
এখানে ভারতীয় সাধারণ খাবার পাওয়া যায়। যেমন ভাত, পোলাও, মুরগি, মাছ, ভাজি, ডাল ইত্যাদি। আবার পাহাড়ি রাস্তা ধরে কিছুটা উপরে উঠে গেলে আবার অন্য একটি ইউনিটে নেপালি খাবার। এর বামদিকে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলে সেখানে আবার চাইনিজ টাইপ খাবারের আরও একটা ইউনিট। আমরা ভারতীয় টাইপের সাধারণ খাবারের দোকানের পাশে একটি বড় বড় ঘন পাতাওয়ালা একটি গাছের নিচে রাখা টেবিল চেয়ারে বসে গেলাম। গরমের মাঝেও ঝিরিঝিরি বাতাস গায়ে একটা আরামের প্রলেপ দিয়ে যাচ্ছে যেন। আমরা কিছুক্ষণ বসে বিশ্রাম নেওয়ার পর খাবার আনতে গেলাম। এখানে যে মানুষটি ডিউটি করছেন তিনি খুবই আন্তরিকভাবে খাবার পরিবেশন করলেন। তিনি আমাদের চাহিদা অনুসারে ভেতর থেকে সালাদ-লেবু ইত্যাদিও এনে দিলেন। আমরা খুব তৃপ্তির সঙ্গে দুপুরের খাবার শেষ করে আবার রওনা হলাম।
আনুমানিক সাড়ে তিনটার দিকে আমরা কাঠমান্ডু পৌঁছে গেলাম। আমাদের গন্তব্য নাগরকোট। তাই আমরা কাঠমান্ডু না ঢুকে সরাসরি নাগরকোটের দিকে এগিয়ে চললাম। ঘন্টাখানেকের মধ্যেই আমরা নাগরকোট পৌঁছে গেলাম। এখানে রাস্তাগুলো ক্রমে উপরের দিকে উঠে গেছে। পাহাড়ের চূড়াগুলোতে এক একটা হোটেল। সবগুলো হোটেলই মেঘের রাজ্যে। শহরের মাঝখানে শীর্ষ চূড়ায় উঠে একটু থামল গাড়িটা। ড্রাইভার জিজ্ঞেস করল, “তোমাদের হোটেলের নাম কী?”
“ভাংগেরী হোটেল।” মিতুল ওকে বলল।
“ভাংগেরী? ওকে।”
এটা শহরের শেষ হোটেল। আমাদের আরও পাঁচ কিলোমিটার যেতে হবে।
ড্রাইভার এবার গাড়িটাকে সামনের দিকে নিয়ে চলল। আমরা বেশ ক্লান্ত, কোনোমতে হোটেলে পৌঁছুতে পারলে যেন বাঁচি। আর এ রকম পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে চলতেও ভয় লাগে। গাড়ি একটু সটকে গেলে কয়েকশ’ ফুট নিচে পড়ে যেতে হবে। যাক, গাড়ি যতই এগুচ্ছে রাস্তা ততই সরু হয়ে আসছে। আর সেই সঙ্গে আমার মনের ভেতর শংকা যেন ডংকা বাজাচ্ছে। একা একা ভ্রমণ করলেও এক কথা, আমি তো সপরিবারে এসেছি। কোনোমতে এই ঝুঁকিপূর্ণ রাস্তা ডিঙিয়ে একবার দেশে যেতে পারলে আর জীবনে নেপাল আসব না। মাইলখানেক যাওয়ার পর ড্রাইভার গাড়িটাকে একটা পাহাড়ের পাশ দিয়ে ঢালু একটা কাঁচা রাস্তায় নামিয়ে আনল। খাড়া পাহাড়ের কিছুটা অংশ কেটে সম্প্রতি এই রাস্তা বানানো হয়েছে। এখানে উল্টোদিক থেকে একটা গাড়ি এলে ভাগ্যে কী আছে কে জানে?
এখানে দুটো গাড়ি ক্রস করতে হলে আমাদের গাড়িকে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে যেতে হবে। ভয়ে আমার আত্মা উড়ে গেল। আমি কেবলই আল্লাহ আল্লাহ করছি। ড্রাইভারকে সাবধানে চালাবার জন্য বলছি, আমার কথা সে শুনতে পাচ্ছে কিনা বুঝতে পারছি না। কোন কোন স্থানে রাস্তা এতটাই সরু যে ভয়ে আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, আমাদের কি নেমে বাকি রাস্তা হেঁটে যাওয়া উচিত কি না। আরও কিছুদূর গিয়ে একটা সমতল ভূমিতে আমাদের গাড়িটা থামল। ভালো করে তাকিয়ে দেখলাম, এর উপরে অনেকদূর পর্যন্ত পাহাড়। আর পাহাড়ের উপর একটা হোটেল। আবার আমরা যেখানে গাড়ি থেকে নেমেছি তা থেকে নিচের দিকেও একটা হোটেল। নাম দেখে বুঝতে পারলাম নিচেরটাই আমাদের হোটেল। আমাদের নামতে দেখে হোটেলের কর্মচারীদের একটা দল উপরে চলে এল আমাদের স্বাগত জানাবার জন্য।
তারা আমাদের মালপত্র বহন করে নিচে নিয়ে গেল। আমরাও হোটেলের লবিতে গিয়ে বসলাম। হোটেলের কর্মকর্তাগণ খুব স্মার্ট আর ভদ্র। আমরা লবিতে বসার পর একজন ভদ্রলোক এসে পরিচয় দিলেন। এ হোটেলে কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে সব বর্ণনা দিলেন। ততক্ষণে আর একজন বেয়ারা ওয়েলকাম ড্রিংকস নিয়ে এলেন। হোটেলের প্রত্যেক কর্মচারীই সুন্দর পরিপাটি পোশাকে সজ্জ্বিত এবং কাস্টমারের মন গলাতে সদাব্যস্ত। আমরা ওয়েলকাম ড্রিংকস শেষ করার আগেই ওয়েস্টার্ন পোশাকে সজ্জিত কেতাদুরস্ত প্রকৃতির একজন ভদ্রলোক এসে নিজ নাম বললেন এবং পরিচয় দিলেন যে তিনি এই হোটেলের প্রধান বাবুর্চি। তিনি খাতা-কলম নিয়েই এসেছেন। আমরা এখন বিকেলে কী খাব, রাতে কী খাব এবং কখন খাব, সকালে কী খাব ইত্যাদি তিনি নোট করে নেবেন। নিরিবিলি পাহাড়ি এলাকায় এসে পড়েছি, খাবারের দাম কত হবে কে জানে? হোটেলওয়ালাদের জন্য এটাই সুযোগ, প্রতি রুমের ভাড়া ৪০ ডলার দেওয়ার বদলা নেওয়ার। আমি মেন্যু হাতে নিয়ে দেখলাম দাম মোটামুটি কমই। তখন মনে পড়ল, বেবী ফার্মের মুরগি খায় না। থাইল্যান্ড গিয়ে সে দেশি মুরগি খাবার আগ্রহ দেখিয়েছিল। সেখানে তা পাওয়া যায়নি। কিন্তু এই নেপালে তো দেশি মুরগি পেতে কোন অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আমি প্রধান বাবুর্চি সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, “ভাই, এখানে কি লোকাল চিকেন পাওয়া যাবে?”
“নিশ্চয়ই যাবে স্যার।
“কোথায় পাওয়া যাবে? বাজারে?
“জি না। এখানে কোনো বাজার নেই। আপনি চাইলে পাহাড়ের পাদদেশে ঐ যে বাড়িঘর দেখা যাচ্ছে, ওখানে গিয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে জোগাড় করা সম্ভব। তবে এক্ষুনি লোক পাঠাতে হবে। অন্ধকার হয়ে গেলে আর পাওয়া যাবে না।
“এভাবে কিনতে গেলে একটা মুরগির দাম কত হতে পারে?
“আড়াই হাজার টাকা থেকে তিন হাজার টাকা।
তিনবেলা খাবারের অর্ডার দিতে দিতে আমাদের রুম বরাদ্দ হয়ে গেল। আমরা যার যার রুমে ঢুকে গেলাম। সুসজ্জিত বড় বড় রুম। সব রুমেই পুবদিকে বড় বারান্দা। এখানে দাঁড়িয়ে সকালে সূর্যোদয় দেখার ব্যবস্থা। হোটেল কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগেই জানিয়েছে যে তারা ভোর পৌণে পাঁচটায় টেলিফোনে জাগরণি কল দেবেন।
আমরা রুমে ঢুকে হাতমুখ ধুয়ে ছোটবড় গ্রুপে ভাগ হয়ে আড্ডায় নিমগ্ন হয়ে গেলাম। আমাদের বিকেলের নাস্তা ঘরেই চলে এল। স্প্রিং রোল, ফ্র্যাঞ্চ ফ্রাই, চিকেন ফ্রাই আর কফি। চমৎকার মুখরোচক নাস্তা। সারাদিনের ক্ষিধে আর ক্লান্তি যেন মুহূর্তেই দূর হয়ে গেল। সন্ধ্যার পর ধীরে ধীরে শীত বাড়তে শুরু করল। আমাদের ঘরের পুবদিকের দরজায় ছোট্ট একটা ফুটো ছিল। সে ফুটো দিয়ে শোঁ শোঁ শব্দে ঠান্ডা কনকনে বাতাস ঢুকতে শুরু করল। সবারই প্রথমে পা এবং ধীরে ধীরে সমস্ত শরীর কম্বলের নিচে চলে যাচ্ছে। আড্ডা তেমন জমছে না। টুটুল টেলিফোনে সবার জন্য চা আর কফির অর্ডার দিল। ঠান্ডার দৌরাত্ম্য এমন যে কফি আনতে আনতে অর্ধেক ঠান্ডা হয়ে গেছে। সেই কফি খেয়ে আমরা কিছুটা গরম হলাম।
রাত নয়টা নাগাদ রাতের খাবার খাওয়ার জন্য ডাক এল। আমরা স্যুয়েটার-টুয়েটার পরে নিচে নেমে এলাম। ডাইনিং রুমে এসে দেখি এলাহী কা-। আমাদের জন্য পৃথক একটি টেবিল সাজানো হয়েছে। খাবারগুলো এত সুন্দরভাবে সাজানো যে দেখেই আমরা মুগ্ধ হয়ে গেলাম। সবাই অত্যন্ত তৃপ্তি নিয়ে খেতে পারলাম। নেপালে আসার পর এই প্রথম সবাই আনন্দ নিয়ে তৃপ্তির সঙ্গে খেল।
বাবুর্চি সাহেবকে আন্তরিক ধন্যবাদ দিয়ে তাড়াতাড়ি করে রুমে ঘুমাতে গেলাম। আমরা খুব দ্রুতই কম্বলের নিচে ঢুকে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম বলতে পারব না।
সকালে যখন ঘুম থেকে অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে জেগে উঠলাম তখন ভোর পৌণে পাঁচটা। হোটেল কর্তৃপক্ষ রুমে রুমে ফোন দিয়ে সবাইকে জাগিয়ে দিচ্ছেন সূর্যোদয় দেখার জন্য। সারাংকোটে সূর্যোদয় দেখার বিড়ম্বনা আমি এখনও ভুলিনি। এখানে আবার সূর্য দেখার জন্য ঘুম জলাঞ্জলি দেওয়ার কোনো মানেই হয় না। বেবীকে আমি চোখ বন্ধ করেই বোঝানোর চেষ্টা করলাম।
কিন্তু কে শোনে কার কথা? বেবী চোখ কচলাতে কচলাতে উঠে পড়ল। দরজা খুলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। আশপাশের সকল রুমের বারান্দা থেকেই আওয়াজ আসছে। অনেকেই ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আমি এদের কলকাকলিতে বেশ বিরক্ত। ঘুমের ব্যাঘাত হচ্ছে। হঠাৎ কী জানি ঘটল, সব রুমের বারান্দা থেকে বহু লোক এক সঙ্গে চিৎকার দিয়ে উঠল।
এর মধ্যে উচ্চস্বরে কেউ বাংলায় বলছে, “মাগো, কী সুন্দর!”
আবার কেউ-বা চাইনিজ ভাষায় বলছে, “চিং মিং টিং মিং।”
এক সময় লক্ষ করলাম আমিও বারান্দায় চলে এসেছি। পুবের আকাশের দিকে চেয়ে আমি নির্বাক হয়ে রইলাম অনেকক্ষণ। পৃথিবীতে এমন সুন্দর কিছুও থাকতে পারে! পাহাড়ের ভাঁজকে ভিত্তি করে ঢেউ খেলানো রংয়ের বাহার ছড়িয়ে আছে পুবদিকে। আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি অনেকক্ষণ ধরে। মনে হচ্ছে, আমাদের নেপাল আসা সার্থক হয়েছে। পৃথিবীতে জন্ম নিয়ে এমন সুন্দর দৃশ্য কোনোদিন দেখিনি। আমি মনপ্রাণ ভরে উপভোগ করলাম এ দৃশ্য, ছবি নিলাম, ভিডিও করলাম।
পুবের আকাশ খুব দ্রুত রং বদলাচ্ছে, পরিবর্তিত হচ্ছে। সূর্য যেন লাফিয়ে লাফিয়ে উপরে উঠে আসছে। খুব স্বল্পসময়ের ব্যবধানে সূর্য পাহাড় ডিঙিয়ে উঠে এল। আকাশে রং এর খেলা কমে আসতে শুরু করল এবং এক সময় তা অতি সাধারণ দৃশ্যে পরিণত হল।
আমরা আবার ঘুমুতে গেলাম।
সকাল সাড়ে আটটার দিকে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা খেতে গেলাম। বিশ্বের অনেক বড় বড় হোটেলেও এ রকম মজার নাস্তা পাওয়া যায় না। অথচ নেপালের এই গহিন বনে পাহাড়ের কোলে একাকী বসে থাকা ভাংগেরি হোটেলের নাস্তা দেখে আমরা খুবই আপ্লুত হয়ে গেলাম।
আমরা আমাদের পছন্দমতো খাবার বেছে নিলাম। এতেও আমাদের নিস্তার হল না। বয় থেকে শুরু করে বাবুর্চি পর্যন্ত নানা ধরনের খাবার নিয়ে আসতে শুরু করল এবং জোর করেই পাতে তুলে দিতে লাগল। এ ক্ষেত্রে যার যা পছন্দ সে রকম খাবার পরিবেশনের বিষয়েও ওরা সচেতন ছিল। আমরা তৃপ্তির সঙ্গে নাস্তা সেরে রুমে গেলাম এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই সেখান থেকে বিদায় নিয়ে ব্যাগসহ গাড়িতে এসে বসলাম।
পাহাড়ের কোলে তৈরি অতি সরু রাস্তা ধরে গাড়িটি এগিয়ে চলল। কেন জানি গতকালের চেয়ে আজ একটু কম ভয় লাগছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ি বড় রাস্তায় এল এবং পাহাড়ের সুউচ্চ পিঠ থেকে ধীরে ধীরে নামতে শুরু করল। আধা ঘণ্টাখানেক পর আমরা ভক্তপুর এসে পৌঁছলাম। এখানে অনেক অনেক মন্দির। চমৎকার কারুকাজখচিত মন্দিরগুলো দেখতে খুব চমৎকার। এসব মন্দিরগুলো বর্তমানে ইউনেস্কোর ঘোষণা অনুযায়ী ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইট।
ভক্তপুর কাঠমান্ডু শহরের পুবদিকে অবস্থিত। পঞ্চদশ শতাব্দীর মাঝমাঝি পর্যন্ত এটি নেপালের রাজধানী ছিল। তখন ছিল মালা বংশের রাজত্বকাল। সে আমলে ভক্তপুর ‘জো জো ধাও’ নামে এক বিশেষ ধরনের দই এর জন্য বিখ্যাত ছিল। এ ধরনের দই নেপালের অন্য কোনো এলাকায় তৈরি হত না। বর্তমান সময়েও ‘জো জো ধাও’ নেপালে একটি আকর্ষণীয় খাবার। আবার এ এলাকা দেবদেবীর নানা মুখোশ পরে করা নৃত্যের জন্যও বিখ্যাত ছিল।
  
এখানকার ঐতিহ্যবাহী শিল্পকলা, স্থাপনা, ঐতিহাসিক ভাস্কর্য ও কাঠের কাজ, কারুকার্যময় দরজা-জানালা, মৃৎপাত্র, বুনন শিল্প, সুন্দর মন্দির, রংবেরংয়ের স্থানীয় পোশাক, সংস্কৃতি, উৎসব, বাদ্য ও সংগীত– এসব জনপ্রিয় এবং ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করে। আমরা এখানে ঘুরে ঘুরে স্থাপনাগুলো দেখার সুযোগ পেলাম। দরবার স্কয়ারের লায়ন গেইট, গোল্ডেন গেইট, ৫৫ জানালাবিশিষ্ট প্যালেস, পিকচার গ্যালারি, রাজা ভূপতীন্দ্র মালার ভাস্কর্য, বাতশালা মন্দির পুষ্পপতি মন্দির দেখতে মনোরম। এসব একা একা মন দিয়ে দেখা যায়। আবার একজন গাইড নিলে সেও ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে প্রতিটি স্থাপনার ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য বুঝিয়ে দিতে পারে।
ভেতরে ঢুকে আমরা মন্দিরগুলোর কারুকাজ দেখে মোহিত হয়ে গেলাম। একটা ভবনের সামনের টানা বারান্দায় অনেকগুলো শিশু আর্ট প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। আমি ঘুরে ঘুরে প্রত্যেকটা শিশুর চিত্রকর্ম দেখেছি। ওরা অনেক সুন্দর করে মন্দিরগুলোর চিত্র আঁকার চেষ্টা করেছে।
ভক্তপুরে আরও অনেক মন্দির আছে। এগুলোর মধ্যে ন্যাতাপোল মন্দির, ভৈরবনাথ মন্দির, দত্তত্রয়া মন্দির, চ্যাঙ্গো নারায়ণ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। আমরা ঘুরে ঘুরে এগুলো দেখলাম। ন্যাতাপোল মন্দির ১৭০২ সালে রাজা ভূপতীন্দ্র কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। পাঁচটি ট্যারেসের উপর নির্মিত এই মন্দিরভবনে দুজন বিখ্যাত রেসলারের ভাস্কর্য, দুটো হাতি, দুটো সিংহ, দুটো গ্লিফিনস, বাঘিনি এবং সিংহী এর পাথুরে মূর্তি আছে। বাঘ ও সিংহকে দেবতা বলে কল্পনা করা হচ্ছে।
আমরা সারাদিন ধরে প্রচ- রোদে ঘুরে ঘুরে ভক্তপুরের সকল স্থাপনাগুলো দেখলাম। দুপুরে আমরা মন্দির এলাকাতেই একটা রেস্টুরেন্টে খেয়ে নিলাম। খাওয়া দাওয়া করার পর আমরা বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন মন্দিরের পাদদেশে বসে বিশ্রাম নিলাম।
পড়ন্ত বিকেলে বাইরে আসার পথে একজনকে আইসক্রিম খেতে দেখে আমাদেরও আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে হল। আমরা আশপাশের দোকানগুলো খুঁজে কোথাও আইসক্রিমের সন্ধান পেলাম না। আমি তখন সবাইকে অপেক্ষা করতে বলে আবার মন্দিরের ভেতরের দিকে গিয়ে সেই লোকটাকে খুঁজে বের করলাম যিনি আইসক্রিম খাচ্ছেন। ভাগ্য ভালো, তাঁর আইসক্রিম খাওয়া তখনও শেষ হয়নি। আইসক্রিমের দোকানের কথা তাঁকে জিজ্ঞেস করাতেই তিনি সানন্দে গেইট পর্যন্ত এগিয়ে এসে আঙুল উঁচিয়ে আমাকে দোকানটি দেখিয়ে দিলেন।
আমরা সবাই যে জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছি আইসক্রিমের দোকানটি তার খুব কাছে। মাঝখানে একটা ছোট্ট মন্দির ডিজাইনের স্থাপনা থাকায় আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম না। এবার আমি সেখানে গিয়ে আইসক্রিম কিনে নিয়ে খেতে খেতে চলে এলাম।
  
আমরা যখন কাঠমান্ডু পৌঁছলাম তখন সন্ধ্যা উৎরে গেছে। এবার আমাদের জন্য নতুন হোটেল ঠিক করেছে মিতুল। এর নাম হোটেল একসেস। চার রুমের মধ্যে আমাদের রুমটি একেবারেই ব্যতিক্রমী এবং সুন্দর। রুমের বাইরে একটি প্রশস্ত গোলাকার বারান্দা আছে। ছাদওয়ালা এই বারান্দায় বেশ কতগুলো চেয়ার আছে। এখানে বসে সকলে মিলে জম্পেস আড্ডা দেওয়া যায়। আমাদের বারান্দা দেখে চটপট টুটুল আর বন্যা চলে এল। মিতুলসহ অন্য সকলেই ঘন ঘন বারান্দায় আসা-যাওয়া করতে লাগল। এ রকম একটি চটকদার বারান্দার মালিক হিসেবে আমরা খুব আনন্দ পেলাম।
এ এলাকাটার নাম থামেল। এটা কাঠমান্ডুর প্রাণকেন্দ্র। প্রাচীনকাল হতেই এ জায়গাটা ছিল জমজমাট। বিদেশিদের শতকরা আশি ভাগ লোকই বেড়াতে এসে এই থামেল এলাকায় থাকেন। বিভিন্ন দালানে বহু প্রাচীন ঐতিহ্যের নজির দেখা যায়। অনেক রাত পর্যন্ত এখানে দোকানপাট খোলা থাকে। পরের দুদিন আমরা পরম আনন্দে অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়েছি আর আশপাশের রেস্টুরন্টে খেয়েছি। মেয়েরা দিনব্যাপী শপিং করেছে। আমার স্ত্রী তো শপিংঅন্তপ্রাণ। দেশের বাইরে গিয়ে পাকঘরের খুন্তি থেকে শুরু করে বেডরুমের জন্য আলমারি পর্যন্ত নিয়ে আসতে চায়। সে আর বন্যা প্রাণভরে শপিং করেছে। নব্য বিদেশ আগতা জয়িতাও পিছিয়ে থাকেনি। সেও অনেক অনেক জিনিসপত্র কিনেছে। কার কার জন্য উপঢৌকন কিনতে হবে তার তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। কারও নাম একজন ভুলে গেলেও অন্যজন মনে করিয়ে দিচ্ছে। আবার একজনের জন্য একটা জিনিস কিনে ফেললে সমমর্যাদা সম্পন্ন আরও পাঁচজনের নাম চোখের সামনে ভেসে বেড়াচ্ছে। এনার জন্য কেনা হল, তেনারা কী ভাববেন? সুতরাং তেনাদের জন্যও কেনা হোক। এভাবেই তালিকা বাড়ে।
নেপাল ভ্রমণের শেষদিন খাওয়াদাওয়ার পর হোটেলে ফিরে এসেছি। হঠাৎ বেবীর মনে হল, চায়ের সঙ্গে চিনি না মিশিয়ে আলাদা পটে টেবিলে চিনি দেওয়ার জন্য একটা স্টিলের কৌটা সে রেস্টুরেন্টগুলোতে দেখেছে। ওটা না নিতে পারলে নেপাল ভ্রমণই হবে বৃথা। এমনিতেই পৃথিবীর অনেক স্থান ঘোরা বৃথা হয়ে বসে আছে। আমি একটু দেখে আসি বলে বাইরে এলাম। রেস্টুরেন্টে এবং বিভিন্ন দোকানে জিজ্ঞেস করে করে অবশেষে এই চিনির কৌটার একটা ঠিকানা জোগাড় করতে পারলাম। একজন বলে দিলেন, “সোজা গিয়ে ডানে, আবার যেখানে চৌরাস্তা, সেখানে বামে। আবার বেশ কিছুদূর গিয়ে পাবেন দুই রাস্তা, তখন ডানে। এ রকম একটা স্থানে গিয়ে এই কৌটা পেলেও পেতে পারেন।”
আমি সোজা হাঁটা শুরু করলাম। কথামতো ডানবাম করে আমি যেখানে গিয়ে পৌঁছলাম সেখানে কৌটা পাওয়ার কোনো লক্ষণই দেখা গেল না। তবে চমৎকার তরতাজা সবজি আর ফলমূল দেখা গেল প্রচুর। বিদেশ বিভুঁইয়ে সবজি কিনে কোনো লাভ নেই। আর এখান থেকে সবজি কিনে বাংলাদেশে নিয়ে যেতে চাইলে আমার বউ খুশি হতে পারে বটে, তবে উড়োজাহাজ কোম্পানি খুবই অখুশি হবে।
শেষপর্যন্ত আবারও মানুষকে জিজ্ঞেস করে করে এগুতে থাকলাম। কাঁচাবাজারের দোকানদারদের প্রায় সবাই ইংরেজি বুঝতে পারেন না। এখান থেকে বেছে বেছে ইংরেজি জানা মানুষ আবিষ্কার করাও কষ্টসাধ্য। এভাবে অনেক সাধনার পর সাত রাজার ধনের মতোই সেই কৌটা পাওয়া গেল। খুশির চোটে আমি দুটো কৌটা কিনে ফেললাম। ছোটবেলায় রূপকথায় পড়েছিলাম, রাক্ষসের প্রাণ ভোমরা থাকে কৌটায়। সেটাকে মেরে ফেলতে পারলেই রাক্ষসের মৃত্যু হয়। তখন রাজপুত্র আর হারিয়ে যাওয়া রাজকন্যার মুখে হাসি ফোটে। আমার মুখেও কৌটা পেয়ে হাসি ফুটল।
আমি ঝটপট কৌটা নিয়ে রওনা হলাম। কিছুটা পথ এসেছি, ঠিক এমনি সময়ে ঝপ করে নামল বৃষ্টি। আর আমিও একটা ছোট্ট রেস্টুরেন্টে ঢুকে গেলাম। এ ধরনের চেহারার রেস্টুরেন্ট বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জেও প্রচুর দেখা যায়। আমার চোখে পড়ল গরম গরম জিলিপি। আহা, নেপালেও তাহলে জিলিপি পাওয়া যায়! আমি বেশ কয়েক পিস জিলিপি কিনে নিলাম। এখানে প্রতি পিস পাঁচ রুপি করে জিলিপি বিক্রি হচ্ছে।
বৃষ্টি একটু কমলে আমি জোর কদম হাঁটা দিলাম এবং এক সময় লক্ষ করলাম যে, এখানকার পথঘাট আমি চিনতে পারছি না। একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম যে আমি ঠিক উল্টোদিকে যাচ্ছি। অগত্যা আমাকে আবার ফিরতে হল।
পরদিন সকালে আমরা যখন এয়ারপোর্টের দিকে রওনা হচ্ছি, তখন আমাদের খুব মায়া হচ্ছিল। মাত্র দশদিনেই আমরা নেপালের বন্ধু হয়ে গেছি। এখানকার সব কিছুর সঙ্গে আরও কিছুদিন থাকতে ইচ্ছে করছে। বিদায় নেপাল, বিদায় পোখরা, বিদায় নাগরকোট।

বাংলার অজানা পাঁচটি সমুদ্র সৈকত

১ ) কাট্টলী সমুদ্র সৈকতঃ
বাংলাদেশে সমুদ্র সৈকত বললেই প্রথমেই চোখের সামনে ভেসে উঠে কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটার মুখ। কিন্তু এর বাহিরেও যে বেশ কয়েকটি সমুদ্র সৈকত বাংলাদেশে রয়েছে তা অনেকেরই অজানা। এমন একটি দৃষ্টিনন্দন আর নিরিবিলি সমুদ্র সৈকত হল কাট্টলী সমুদ্র সৈকত। চট্টগ্রাম শহর থেকে কিছুটা দূরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দক্ষিণ পাশে আকর্ষণীয় সমুদ্র সৈকতটির নাম কাট্টলী সমুদ্র সৈকত। পাহাড়তলী থানার দক্ষিণ কাট্টলী ওয়ার্ডের এই সমুদ্র সৈকতটি অনেকের কাছেই অজানা। চট্টগ্রামবাসী কেউ কেউ এর খবর জানলেও বাহিরের পর্যটকরা এর খবর খুব একটা জানেন না।
এই সৈকতটির আরেকটি নাম হল জেলেপাড়া সমুদ্র সৈকত। জায়গাটির নৈসর্গিক সৌন্দর্য সহজেই বিমোহিত করে প্রকৃতিপ্রেমীদের। একদিকে সমুদ্র সৈকত আর একদিকে গ্রামীণ পরিবেশ অন্য কোন সৈকতে খুজে পাওয়া যাবে না। চট্টগ্রাম শহর থেকে টোল সড়ক ধরে সহজেই পৌঁছুতে পারেন জায়গাটিতে। এ ছাড়া চট্টগ্রামের একমাত্র আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের পাশ দিয়েও এ সৈকতে আসা যায়। এ জায়গাটির নাম সাগরিকা সমুদ্র সৈকত। যারা জহুর আহমেদ স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে আসেন তাদের জন্য এই সমুদ্র সৈকতটি একটি আদর্শ ভ্রমন স্পট। এখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মৃতুমন্দ বাতাস, সাম্পান নৌকা, জেলেদের মাছ ধরা আর তাদের জীবনযাপন আপনাকে মুগ্ধ করবে। আর সন্ধ্যার সূর্যাস্ত আপনাকে মোহাবিষ্ট করবে। এমন নিরিবিলি সূর্যাস্ত হয়তো আপনি আর কোথাও দেখতে পারবেন না। সবকিছু মিলিয়ে এটি হতে পারে আপনার জন্য একটি নতুন অভিজ্ঞতা।
পার্শ্ববর্তী দৃশ্যাবলী
বারুণী স্নান
কাট্টলী সমুদ্র সৈকত রানি রাসমণি বারুণী ঘাটে অসংখ্য পুণ্যার্থীর ঢল নামে। ওঁ সাধ্যাপতকহন্দ্রী সর্বদুঃখ বিনাশিনী, সুখদা মোক্ষদা গঙ্গা গঙ্গৈব পরমগতি এ মন্ত্র পাঠ করে প্রতি বছর চৈত্র মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে সনাতনী সম্প্রদায়ের পুণ্যার্থী নর-নারী রানি রাসমণি বারুণী স্নানঘাট এলাকায় পাপমুক্তির প্রত্যাশায় পুণ্যতোয়া বঙ্গোপসাগরে স্নান করে।
বারুণী স্নান ও মেলা পরিষদ দিনব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করে। নগরীর পাথরঘাটা গঙ্গাবাড়ি, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, হাটহাজারীর ফরহাদাবাদ মন্দাকিনী, চৌধুরীহাট ইছামতি বাড়ি, আনোয়ারার পারকি সমুদ্র সৈকত, রাউজানের কলমপতি দক্ষিণ হিঙ্গলা কাশখালি, পটিয়ার শ্রীমাই, বাঁশখালীর খানখানাবাদ সাগরচরসহ বিভিন্ন স্থানে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বারুনী স্নান ও মেলা উদযাপিত হয়ে থাকে।
যেভাবে যেতে হবে
ঢাকা থেকে সড়ক, রেল ও আকাশ পথে যেতে পারেন চট্টগ্রাম শহরে। চট্টগ্রাম শহর হতে প্রথমে আপনাকে আসতে হবে পাহাড়তলী থানায়। ব্যাক্তিগত গাড়ী কিংবা সিএনজি বা মাইক্রোবাসে আসতে পারেন পাহাড়তলী। পাহাড়তলী হতে জহুর আহমেদ স্টেডিয়ামের পাশ ঘেসে আসতে হবে টোল সড়কে। টোল সড়কের পাশেই পেয়ে যাবেন কাট্টলী সৈকত। অথবা আপনি শহর হতে টোল সড়ক ধরেও আসতে পারেন কাট্টলী।
পাহাড়তলী কিছু হোটেল রেয়েছে। চাইলে সেখানে থাকতে পারেন। অথবা চট্টগ্রাম শহরে থাকতে পারেন।
চট্টগ্রাম শহরে থাকার জন্য বিভিন্ন মানের প্রচুর হোটেল আছে। এখানে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হোটেলের যোগাযোগের ঠিকানা দেয়া হলো। শহরের আগ্রাবাদ এলাকায় হোটেল আগ্রাবাদ (০৩১-৭১৩৩১১-৮), হোটেল পেনিনসুলা (০৩১-৬১৬৭২২, ৬১৯৮৫০) স্টেশন রোডে হোটেল এশিয়ান (০৩১-২৮৫০৩৪৬-৮, ৮০০-২০০০ টাকায় কক্ষ আছে) স্টেশন রোডে হোটেল সুপার (০৩১-৮৪১৪৫১-২, ৬০০-১৫০০ টাকায় কক্ষ আছে) খুলশী এলাকায় হোটেল লর্ডস (০৩১-২৫৫২৬৭১-৪) পাঁচলাইশ এলাকায় রওশন বোর্ডিং (০৩১-৬৫১৪১৬) জুবিলী রোডে হোটেল টাওয়ার ইন (০৩১-৮৪২৬৯১-২) এছাড়াও চট্টগ্রাম শহরের প্রতিটি এলাকাতেই আছে বিভিন্ন মানের হোটেল।

২ ) মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতঃ
বাংলাদেশে যে মান্দারবাড়িয়া নামে একটা সমুদ্র সৈকত আছে তা বেশীর ভাগ মানুষের কাছেই অজানা। সাতক্ষীরা জেলার হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর তীরে মান্দারবাড়িয়ায় বন আর তার সম্মুখে বঙ্গোপসাগরের তীর জুড়ে নয়নাভিরাম বালুকাময় সমুদ্র সৈকত যেন প্রকৃতির এক অপার সৃষ্টি। সাতক্ষীরার বুড়িগোয়ালিনীর নীলডুমুর নৌঘাট থেকে মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতের দূরত্ব আনুমানিক ৭৫ কিলোমিটার। নীলডুমুর পর্যন্ত গাড়ীতে যাওয়া যায়, তার পরের পথ যেতে হবে ইঞ্জিন চালিত নৌকা বা স্পীড বোটে। এই ৭৫/৮০ কিলোমিটার পথের পুরাটাই সুন্দরবনের বুক চিরে যাওয়া বিভিন্ন নদী। বুঝতেই পারছেন মান্দারবাড়ীয়া কেবল মাত্র হার্ডকোর ঘুরুঞ্চিদের জন্য। মান্দারবাড়িয়ার একদিকে সুন্দরবন অপরদিকে বঙ্গোপসাগরের মায়াবী জলরাশির অবিশ্রান্ত গর্জন যে কোনো মানুষকেই নেশা ধরিয়ে দেবে।
নীলডুমুর ঘাট থেকে যাত্রা শুরু করে খোলপেটুয়া-কপোতাক্ষ নদের সঙ্গমস্থলের পাশ কাটিয়ে কলাগাছিয়া, আড়পাঙ্গাশিয়া, মালঞ্চ নদী হয়ে পৌঁছতে হবে মান্দারবাড়িয়ায়। এই যাত্রাপথের পাশে দেখা যাবে আরো বিশাল নদী। এই নদীগুলোর উভয় পাশেই দেখা যাবে চিরহরিৎ সুন্দরবনকে। দেেখ দেখে চোখ জুড়িয়ে যাবে। এ যেন সবুজের রাজ্য। সুন্দরী, কেওড়া, বাইন, পশুর, গরান, গোলপাতা, সিংড়া, হেতাল, খলসী, গেওয়া গাছের সম্মিলনে এখানে ঘটেছে সবুজের মিলনমেলা। ম্যানগ্রোভ ফরেষ্টের শ্বাসমূল আর তাতে হরিণ সহ নানা প্রাণীর ছুটে চলা আপনাকে বিমোহিত করে রাখবে। নয়ন ভরে দেখার মত েস দৃশ্য। পানকৌড়ি আর বালিহাসের উড়ে যাওয়া দেখতে দেখতে এক সময় পৌছে যাবেন মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতে।
প্রায় ৮ কিলোমিটার লম্বা এই সমুদ্র সৈকত যেন ছবির মত । অসম্ভব ভালোলাগার আচ্ছন্নতায় মুগ্ধ। কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া, ইনানী, সেন্টমার্টিন সহ বঙ্গপোসাগরের অনেকগুলো সৈকত হয়তো দেখেছেন। সুন্দরবনে এসে এত বড় একটি সৈকতের দেখা হয়ে যাবে তা হয়তো কেউ ভাবতেও পারবে না। মান্দারবাড়িয়া অন্য সৈকতগুলো হতে একেবারেই আলাদা। অপূর্ব সৌন্দর্য ঘেরা এক জায়গা। পিছনে বাঘের ভয় আর সামনে অসম্ভব ভালোলাগার হাতছানি দেয়া সমুদ্র, বিস্তীর্ণ সৈকত, সবুজ রহস্যে ঘেরা বন। পর্যটকেরা এখানে নির্জন সৈকতে নিজেকে নষ্টালজিয়ার জালে জড়িয়ে খুঁজতে থাকবেন ভিন্ন এক অনুভূতি। সৈকতের বুকে হরিণ আর বাঘের পায়ের ছাপ েস সম্মোহনকে আরও বাড়িয়ে দেবে কয়েকগুন। তাই যারা ভ্রমন বিলাসী, ঘুরুঞ্চি আর এ্যাডভেঞ্চার করত আগ্রহী তারা ঘুরে আসুন দেশের অজানার সুন্দর সৈকত মান্দারবাড়িয়া থেকে আর নিজের নামটা লিখিয়ে রাখুন নতুনদের তালিকায়।
যেভাবে যেতে হবেঃ
ঢাকার শ্যামলী থেকে সাতক্ষীরার বাস ধরে সাতক্ষীরা/শ্যামনগর যেতে হবে। সাতক্ষীরা সদর থেকে বুড়িগোয়ালীনি ৭০ কিলোমিটার। সহজে মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতে যাওয়া যাবে বুড়িগোয়ালিনীর নীলডুমুরস্থ নৌঘাট থেকে। ইঞ্জিন চালিত নৌকা, স্টিমার বোটে করে শীত মৌসুমে (অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত) সময়ে মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকতে যাওয়া যাবে। স্টিমার বা ইঞ্জিন চালিত নৌকা করে পৌঁছাতে সময় লাগবে ৬/৭ ঘণ্টা। স্পিড বোট যোগে বুড়িগোয়ালিনীর নীলডুমুর থেকে মান্দারবাড়িয়া পৌঁছাতে সময় লাগবে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা।
কোথায় থাকবেনঃ
থাকতে হবে সাতক্ষীরার কোন হোটেলে কিংবা শ্যামনগর রেষ্ট হাউজে।

৩ ) সোনারচর সমুদ্র সৈকতঃ
বাংলাদেশে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের পরে আর একটি সৈকতের নাম জানতে চাইলে সবাই এক বাক্যে বলবে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা। কিন্তু দেশের বেশীর ভাগ লোকই জানেন না যে এই জেলাতেই রয়েছে আমাদের দেশের আর একটি দৃষ্টিনন্দন ও নয়ানাভিরাম সমুদ্র সৈকত। নাম সোনারচর সমুদ্র সৈকত।
পটুয়াখালী জেলা সদর থেকে প্রায় দেড় শ’ কিলোমিটার এবং গলাচিপা উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণে সাগরের মাঝ বরাবরে এর অবস্থান। গত কয়েক বছরে পর্যটকদের কাছে সোনার চর বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বিপদসঙ্কুল দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা উপেক্ষা করে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য অবলোকন করতে অনেকেই যাচ্ছে সোনার চরে। সাগরের উত্তাল ঢেউ। জেলেদের মাছ ধরা। বিশাল বনাঞ্চল ছাড়াও সেখানে দেখার আছে অনেক কিছু। বিশেষ করে প্রায় দশ কিলোমিটার লম্বা বিশাল সমুদ্র সৈকত জুড়ে কোটি কোটি লাল কাঁকড়ার বিচরণ পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। দেখে মনে হবে যেন লাল কাঁকড়ার ভিন্ন এক জগত। গোটা সৈকত লাল গালিচা বিছিয়ে রেখেছে।
পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলা সদর থেকে সড়কপথে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে পানপট্টি লঞ্চঘাট। সেখান থেকে সামনে এগিয়ে গেলেই আগুনমুখা মোহনা। ট্রলার কিংবা লঞ্চযোগে আগুনমুখা মোহনা থেকে ঘণ্টা তিনেক এগুলেই চোখে পড়বে মায়াবী দ্বীপচর তাপসী। তাপসীর বাঁকে পৌঁছাতেই সোনারচরের হাতছানি। তাপসী থেকে ৩০ মিনিটের পথ সামনে এগুলেই সোনারচর। প্রায় ১০ কিমি দীর্ঘ একটি অনন্য সুন্দর চোখ জুড়ানো সমুদ্রসৈকত।
বাইরে থেকে আসা বেশিরভাগ পর্যটকই পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটায় ঘুরে চলে যান। কিন্তু সোনারচর, রূপারচর ও চরহেয়ারসহ সমুদ্র ফুলে জেগে ওঠা সবুজ বনাঞ্চলের সন্ধান জানেন না অনেকেই। সাগরের বুক চিরে জেগে ওঠা প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের দ্বীপ সোনারচর। এ দ্বীপের একই জায়গায় দাঁড়িয়ে অবলোকন করা যায় সূর্যের উদয়াঅস্ত। এর চারদিকেই দিগন্ত-বিস্তৃত সাগরের অথৈ নীল জলরাশি। উথালপাতাল ঢেউ দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতে জোয়ারের সময় আছড়ে পড়ে দৃষ্টিনন্দনভাবে। ভোরের সূর্য কোমল আলো ছড়ায় সোনারচরের চিক চিক বালুকণায়। অস্তগামী সূর্যের লালিমা তেমনি মায়া ঢালে নিভৃতের আঁধারে। অপরূপ সৌন্দর্যের আধার সোনারচর বর্ণিল শোভায় ঘেরা। দূর থেকে মনে হয় কোনো শিল্পীর হাতে আঁকা নিপুণ ছবি। প্রকৃতি যেন অকৃপণ হাতে উজাড় করে সৃষ্টি করেছেন এ দ্বীপটিকে।
নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের এক আধার এই সোনারচর সমুদ্র সৈকত। শেষ বিকালের রোদের আলো যখন সোনারচরের বেলেভূমিতে পড়ে, তখন পুরো দ্বীপটাকেই মনে হবে যেন কাঁচা সোনার প্রলেপ দেয়া একটি সোনালি থালা। সাগরে যখন জোয়ারের পানি উথলে ওঠে, তখন অন্য এক সৌন্দর্য বিকশিত হয় সোনারচরে। তটরেখায় আছড়ে পড়ে ছোট-বড় ঢেউ। গলে পড়ে ঝুরঝুরে বালি। লোনাপানিতে ঘন সবুজ অরণ্যের নিবিড় ছাউনি।
ইতিহাসঃ
সোনারচরে সোনা নেই ঠিকই কিন্তু আছে সোনার অঙ্গের বালি। সূর্যের প্রখর রোদ যখন বালির উপর পরে দূর থেকে তা দেখতে সোনার মতই। এভাবে ৩০ এর দশকে জেগে ওঠা অপার সম্ভাবনা সৌন্দর্যের দ্বীপটির নাম পাল্টে গিয়ে হয় সোনারচর।
আশেপাশে যা পাবেনঃ
ম্যানগ্রোভ ফরেষ্ট
এখানে দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত ছাড়াও আছে ৫ হাজার একরের বিশাল বনভূমি। গলাচিপা উপজেলা প্রশাসনের দেয়া তথ্যমতে, সুন্দরবনের পরই আয়তনের দিক থেকে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বনাঞ্চল। সোনারচরের বিশাল বনভূমির মধ্যে ছড়িয়ে আছে দেড় শতাধিক ছোট-বড় খাল। ছোট্ট নৌকা বা ইঞ্জিনচালিত ট্রলার নিয়ে এসব খালে ভেসে ভেসে দেখা যায় বিচিত্র সব পাখ-পাখালির বিচরণ। তবে ভয় নেই। একমাত্র শিয়াল আর মেছোবাঘ ছাড়া হিংস্র কোনো জন্তু নেই এখানে।
বনাঞ্চলের কাছাকাছি গেলে হয়তো সহজেই চোখে পড়বে বুনো মোষ। ভাগ্য ভালো থাকলে দেখা হতে পারে হরিণ পালের সঙ্গে। এখানে রয়েছে শূকর, বানর, মেছোবাঘসহ অন্যসব বন্যপ্রাণী। এসব দেখতে হলে খুব সকালেই বেরিয়ে পড়তে হবে। দেখতে পারবেন সমুদ্রগামী হাজারো জেলের জীবনসংগ্রাম। পর্যটকদের জন্য এখানে রয়েছে একটি ডাকবাংলো এবং বন বিভাগের ক্যাম্প।
সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত
এখানে আছে প্রায় ৩ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত। এখন আর কুয়াকাটাই একমাত্র সমুদ্র সৈকত নয় যেখানে একই স্থান হতে সূযোর্দয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। সোনারচর সমুদ্র সৈকতও এইক রূপে অপরূপা। এখানেও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে দেখা যায় সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের এক অপুলক দৃশ্য।
লাল কাঁকড়ার গালিচা
সোনারচরের আর একটি আকর্ষনীয় দিক হল সৈকত পাড়ের লাল কাঁকড়া। প্রায় দশ কিলোমিটার লম্বা বিশাল সমুদ্র সৈকত জুড়ে কোটি কোটি লাল কাঁকড়ার বিচরণ। দেখে মনে হবে যেন এ এক লাল কাঁকড়ার বিশাল রাজ্য। গোটা সৈকত লাল গালিচা বিছিয়ে রেখেছে। কাঁকড়ার এ প্রজাতিটি সামুদ্রিক প্রাণী হলেও চরের বালুমাটিতেই বাস করে। বালুমাটির গভীরে তৈরি সুড়ঙ্গে দলবেঁধে চলাচল করে। সমুদ্রের জোয়ারের পানিতে গোটা সৈকত যখন ডুবে যায়, তখন ওরা নিরাপদ আশ্রয় নেয় সেই সুড়ঙ্গে। লাল কাঁকড়ার অবাধ চলাচল যতই চোখ জুড়াক না কেন ওদের ধরা কিন্তু ততটা সহজ নয়। মানুষের শব্দ পেলেই ওরা নিজেদের তৈরি সুড়ঙ্গের ভেতর লুকিয়ে যায়। যে কারণে কম করে হলেও ১০/২০ ফুট দূর থেকেই লাল কাঁকড়ার সৌন্দর্য উপভোগ করতে হয়। সমুদ্রের কাঁকড়া বেশ সুস্বাদু হলেও এ প্রজাতিটি যথেষ্ট বিষাক্ত। যে কারণে এটিকে কেউ ধরে না বা নিধন করে না। ওরা গর্ত বা সুড়ঙ্গ করার সময়ে মাটি খোঁড়াখুঁড়ি করেও এক অপূর্ব শিল্পকর্ম সৃষ্টি করে। যা দেখে মনে হবে যেন কোন শিল্পী তার নিপুণ হাতে মাটিতে অাঁচড় দিয়েছে। পর্যটকদের কাছে সোনারচরের লাল কাঁকড়ার এ রাজত্ব আরেকটি দর্শণীয় বিষয়। একবার ঘুরে এলেই এর প্রমাণ মিলবে।
যেভাবে যাবেনঃ
ঢাকা থেকে সুবিধাজনক লঞ্চ উপায়ে কিংবা বাসে করে পটুয়াখালী। লঞ্চই উত্তম পন্থা। পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলা সদর থেকে সড়কপথে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে পানপট্টি লঞ্চঘাট। সেখান থেকে ইঞ্জিনচালিত ট্রলারযোগে আগুনমুখা মোহনা পেরিয়ে দক্ষিণে যাত্রা। ডিগ্রি নদীর বুক চিরে একটু বাঁয়ে যেতেই আরেকটি নদী—বুড়া গৌরাঙ্গ। সামনে গিয়ে বাঁক ঘুরতেই দাঁড়ছিড়া নদী। দু’পাশে সারি সারি ঘন ম্যানগ্রোভ বাগান। নদীর বুকজুড়ে গাংশালিকের অবাধ বিচরণ। সামুদ্রিক হাওয়ার মৃদুমন্দ ছোঁয়া। সব মিলিয়ে এক অন্যরকম ভালোলাগার অনুভূতি। ট্রলার কিংবা লঞ্চযোগে আগুনমুখা মোহনা থেকে ঘণ্টা তিনেক এগুলেই চোখে পড়বে মায়াবী দ্বীপচর তাপসী। তাপসীর বাঁকে পৌঁছাতেই সোনারচরের হাতছানি। তাপসী থেকে ৩০ মিনিটের পথ সামনে এগুলেই সোনারচর।
যেখানে থাকবেনঃ
থাকতে হবে পটুয়াখালী শহরে কিংবা গলাচিপায়। এখানে বেশ কয়েকটি হোটেল রয়েছে।

৪ ) চরগঙ্গামাতি সমুদ্র সৈকতঃ
চরগঙ্গামাতি। কুয়াকাটা সংলগ্ন একটি সৈকত। বনভূমির নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে ঘেরা লীলাভূমি। সৈকত ঘেষা বালুকা বেলার একই স্থানে দাড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের দৃশ্য দেখা যায়। এ দৃশ্য দেখার জন্য প্রতিদিনই দেশী বিদেশী পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে। চরগঙ্গামাতি পর্যটকদের কাছে এখন অন্যতম ভ্রমনের স্পট হয়ে দাড়িয়েছে।
পটুয়াখালী জেলার সমুদ্র তীরবর্তী কলাপাড়া উপজেলার ধুলাসার ইউনিয়নের চরগঙ্গামতি এলাকায় এর অবস্থান। দু’হাজার একরেরও বেশি খাস জমি নিয়ে বিশাল সমূদ্র বেলাভুমি। এখানে রয়েছে বনবিভাগের এগারশ একর জমি নিয়ে একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল। সমূদ্র সৈকত কুয়াকাটা থেকে মাত্র ৫ মিলোমিটার পূর্ব দিকে সমূদ্রের কোল ঘেষেই চরগঙ্গামতি। এছাড়া কলাপাড়া উপজেলা শহর থেকে বালিয়াতলী হয়ে কুয়াকাটা-কলাপাড়া বিকল্প সড়কের একটি মাত্র ফেরী পাড় হয়ে চরগঙ্গামতী যাওয়া যায়।
চরগঙ্গামতি সংলগ্ন মিশ্রিপাড়ায় রয়েছে শত বছরের পুরানো এশিয়ার সু-উচ্চ বৌদ্ধ বিহার।এর কাছাকাছি রয়েছে রাখাইনদের বৌলতলীপাড়া। এই পড়ায় রয়েছে অলৌকিক একটি ঘটনা। যা আজও এখানকার স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। মুন্সিগঞ্জ এলাকার এক সাপুড়ে সরদার আবদুল আলী গারুলীকে রাতে স্বপ্নে দেখেন যে, বৌলতলী রাখাইন পাড়ার উত্তর পশ্চিম পাশে ৩শ’ ৬০ টি বাশের একটি ঝাড়ের নিচে একটি সাপ রয়েছে। স্বপ্নে বলে দেয় ওই সাপ ধরার আগে দু’টি পাঠা পুঁজো করে নিতে হবে। আবদুল আলী গারুলী ওই স্বপনের কথা আর মানলেন না। সে সাপ ধরতে যায়। সাপটিকে স্পর্শ করার সঙ্গে সঙ্গে রেগে গারুলীকে মুখে নিয়ে ৩শ’ ৬০ টি বাঁশের সঙ্গে পেচিয়ে রাখে। সাপটি যে গর্তে ছিল তা আজও কালের স্বাক্ষী হিসাবে রয়েছে।
কলাপাড়া পৌর শহর থেকে চরগঙ্গামতির দুরত্ব প্রায় ২১ কিলোমিটার। একটি মাত্র ফেরি পাড় হয়ে যেতে হয়। অপরদিকে পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটার দুরত্ব ও ২১ কিলোমিটার। কলাপাড়া পৌর শহর থেকে এই ২১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে তিনটি ফেরি পাড় হতে হয়।
যেভাবে যেতে হবে
ঢাকা থেকে বেশ কয়েকটি বাস এখন সরাসরি কুয়াকাটা যায়। ঢাকা থেকে সাকুরা পরিবহন ছাড়াও বিআরটিসি পরিবহনের বাস সরাসরি কুয়াকায় যায়। আপনি এসব বাসে গেলে আপনাকে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত থেকে ২০০ মিটার দূরে নামিয়ে দিবে। ঢাকা থেকে কুয়াকাটা বাসে যেতে মোট সময় লাগে প্রায় ১২/১৩ ঘন্টা।
যারা নদী পথে যেতে চান তারা ঢাকা সদরঘাট হতে পটুয়াখালীর লঞ্চে করে চলে যেতে পারেন পটুয়াখালী আর সেখানথেকে বাসে করে সোজা কুয়াকাটা। এটি সর্বাধিক আরামের ভ্রমন। কেননা ঢাকা থেকে পটুয়াখলী পর্যন্ত অন্তত একটি বিলাশবহুল আর আয়েশের ভ্রমন দিতে পারবেন। যারা কখনো লঞ্চে ভ্রমন করেননি তাদের জন্য এটি হবে একটি উল্লেখযোগ্য ভ্রমন।
আর উত্তরবঙ্গ থেকে আসতে চাইলে সৈয়দপুর থেকে খুলনা পর্যন্ত রূপসা অথবা সীমান্ত আন্তঃনগর ট্রেনে করে আসতে পারবেন। রাত্রের টে্রনে আসলে সকাল ৭ টার বিআরটিসি বাসে করে কুয়াকাটা যেতে পারবেন।
কলাপাড়া পৌর শহর থেকে চরগঙ্গামতির দুরত্ব ২১ কিলোমিটার আর কুয়াকাটা সৈকত হতে মাত্র ৫ কিলোমিটার। মোটারসাইল নিয়ে খুব সহজেই চলে যাওয়া যায় সেখানে।
নিকটবর্তী দর্শনীয় স্থান
কুয়াকাটা

৫ ) লালদিয়া বন ও সমুদ্র সৈকতঃ
বরগুনা জেলার পাথরঘাটা উপজেলার দক্ষিণে লালদিয়ার বন। সুন্দরবনের হরিণঘাটার মধ্য দিয়ে দুই ঘণ্টা পায়ে হেঁটে বন পার হয়ে গেলে পাওয়া যায় এই লালদিয়া। এ বনের পূর্বে বিশখালী নদী এবং পশ্চিমে বলেশ্বর নদী । দুই নদী ও সাগরের মোহনা এ বনকে ঘিরে রেখেছে । বন সংলগ্ন পূর্ব প্রান্তে সমুদ্র সৈকত। সমুদ্র সৈকতটি বেশ ছোট। তবে ছোট হলেও সৌন্দর্য কোন অংশে কমতি নেই। এখানে বিভিন্ন রকমের পাখির কলকাকলি এবং সমুদ্রের গর্জন শুনে পর্যটকরা হবেন বিমোহিত এবং ফিরে আসবেন বারে বারে। এখানে সাগরের নোনা জল এসে আছড়ে পরছে বালুকাবেলায়। উড়ে যায় গাংচিল আর হাজার হাজার লাল কাকড়ার দল ছুড়ে বেড়ায় বেলাভুমিতে। সে এক নান্দনিক দৃশ্য। মনকাড়া অনুভুতি যা আপনাকে আবারও কাছে টানবে বার বার।
লালদিয়া সৈকতের পাশেই রয়েছে একটি শুটকি পল্লী। সৈকত ঘেরা লালদিয়ার চরে বছরে কার্তিক মাস থেকে শুরু হয়ে ফাল্গুন মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে শুঁটকি চাষ। এখানে যে শুঁটকি প্রস্তুত করা হয় তার ৯০ ভাগই হয় হাঁস-মুরগির খাদ্যের জন্য, বাকি ১০ ভাগ আমরা খাই। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে এখানে শুঁটকির কারবার চলে আসছে।
যেভাবে যেতে হবে
ঢাকা হতে সড়ক ও নৌ উভয় পথেই বরগুনা যাওয়া যায়। ঢাকার গাবতলী ও সায়েদাবাদ থেকে বিভিন্ন পরিবহন সকাল এবং রাতে উভয় সময় ছেড়ে যায়। দ্রুতি পরিবহন(০১১৯৬০৯৫০৩৩) সকাল সাড়ে ৮টায় এবং একই সময় রাতে বরগুনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়, সাকুরা পরিবহন(০১১৯০৬৫৮৭৭২, ০১৭২৫০৬০০৩৩) গাবতলী থেকে সকাল এবং রাত পৌনে ৯টায় এবং সায়েদাবাদ বাসস্টান্ড থেকে সকাল ও রাত সাড়ে ৮টায় ছেড়ে যায় এছাড়াও আবদুল্লাহ পরিবহনসহ(০১৭১০৬২৫৮০৯)বেশ কয়েকটি পরিবহন ঢাকা-বরগুনা রুটে চলাচল করে। আপনি চাইলে নদী পথেও বরগুনা যেতে পারেন। একদিন পর পর ‘এম ভি বন্ধন-৭’(০১৮২১১৬৫৮৭৫) নামে একটি লঞ্চ ঢাকার সদরঘাট নদীবন্দর থেকে বরগুনা যায়। লঞ্চই আরামদায়ক বাহন।
বরগুনা হতে ট্রলার কিংবা নৌকা ভাড়া করে যাওয়া যায় লালদিয়া বনে। অথবা সুন্দরবনের হরিণঘাটা দিয়ে হেটেও যাওয়া যায় লালদিয়া বন ও সমুদ্র সৈকতে। যারা এডভেঞ্চার পছন্দ করেন তাদের জন্য এটি একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা হতে পারে।
কোথায় থাকবেন
আমতলী উপজেলায় ভাল মানের তেমন কোন হোটেল নেই। থাকতে হবে বরগুনা শহরে। বরগুনায় রাত্রিযাপন ব্যবস্থা খুবই ভাল। অনেকগুলি রেস্ট হাউস আছে এছাড়া আছে কয়েকটি আবাসিক হোটেল।
রেস্ট হাউস জেলা পরিষদ ডাকবাংলো(০৪৪৮-৬২৪১০)
খামারবাড়ী রেস্ট হাউস(০৪৪৮-৬২৪৬৯)
পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্ট হাউস(০৪৪৮-৬২৫৫১)
এ্যাগ্রো সার্ভিস সেন্টার(০৪৪৮-৬২৭২৮)
গণপূর্ত বিভাগ(০৪৪৮-৬২৫০৫)
রেস্ট হাউস এল.জি.ই.ডি রেস্ট হাউস (০৪৪৮-৬২৫৪২)
সিইআরপি রেস্ট হাউস (০৪৪৮-৬২৫৫১)।
এছাড়া বরগুনায় আছে একাধিক আবাসিক হোটেল
হোটেল তাজবিন(০৪৪৮-৬২৫০৩)
বরগুনা রেস্ট হাউস(০১৭১৮৫৮৮৮৫৬)
হোটেল আলম(০৪৪৮-৬২২৩৪)
হোটেল বসুন্ধরা(০৭১২৬৪৫৩০০৭)
হোটেল মৌমিতা(০৪৪৮-৬২৮৪২)
হোটেল ফাল্গুনী (০৪৪৮-৬২৭৩৩)।
তবে লালদিয়া থেকে কুয়াকাটার দুরত্ব মাত্র ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘন্টার। সুতরাং ইচ্ছে করলে কুয়াকাটাও থাকতে পারেন। কুয়াকাটা থাকাই সবচেয়ে উত্তম। তাতে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতটাও দেখা হয়ে যাবে।
নিকটবর্তী দর্শনীয় স্থান
সোনাকাটা বা টেংরাগিরি বন

SOURCE LINK