শুক্রবার, ৪ জুলাই, ২০১৪

মালদ্বীপে সাবমেরিনে করে সমুদ্র তলদেশে ভ্রমণের সুযোগ

পৃথিবীর অন্যতম নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত দেশ মালদ্বীপ। প্রকৃতি এখানে পাখা মেলেছে অবারিত স্বাধীনতায়। আর এ কারণেই মালদ্বীপের আয়ের প্রধান উৎস পর্যটন।
প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক মালদ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে যাচ্ছেন পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে। পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র মালদ্বীপেই বিশালাকায় সাবমেরিনে করে সমুদ্র তলদেশে ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে।
মালদ্বীপে বাস করে বিরল প্রজাতির পানি কাটা পাখি। এক ঋতুর দেশটির উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম মিলে রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার ছোট ছোট দ্বীপ। এ দ্বীপগুলোর সমন্বয়েই সৃষ্টি মালদ্বীপ।
মালদ্বীপের বর্তমান জনসংখ্যা তিন লাখের কিছু বেশি। মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপে পর্যটকদের স্বাগত জানাতে তৈরি হয়েছে অত্যাধুনিক মালে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। এছাড়া মালদ্বীপের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কল্যাণে পর্যটকরা অনায়াসে ছুটে বেড়াতে পারেন এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে।
পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ সাবমেরিনে করে সমুদ্র তলদেশে ভ্রমণের সুযোগ। যা পর্যটকদের ১২০ ফুট গভীর সমুদ্র তলদেশ পর্যন্ত নিয়ে যায়। পৃথিবীর আরেক সুন্দর জগত গভীর সমুদ্র তলদেশে বিশাল বিশাল মাছ, গাছ গাছালি, ভয়ংকর প্রাণি, উঁচু-নিচু পাহাড় দেখে মুগ্ধ হন পর্যটকরা।
প্রাণ ভরে ছবি তোলেন তারা। সমুদ্র তলদেশে ভ্রমণ  এতই রোমাঞ্চকর যে বার বার ফিরে আসতে ইচ্ছে করে মালদ্বীপে। হয়ও তাই । প্রতি বছর পুরানো পর্যটকরা  সঙ্গে কওে নিয়ে আসেন তার প্রিয়জনকে।
সমুদ্র উপকূলের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য রয়েছে সাফারিবোর্ট। যা উপকূল থেকে পর্যটকদের নিয়ে যায় গভীর সমুদ্রে। সৌন্দর্য পিপাসুদের দেয় অনাবিল আনন্দ। এক একটি সাফারিবোর্ট ১৫ থেকে ২০দিনের জন্য ২০ থেকে ২৫ জন পর্যটক নিয়ে পাড়ি জমায় গভীর সমুদ্র ভ্রমণের পথে। সাফারিবোর্টে ভ্রমণের অংশ হিসেবে পর্যটকরা অক্সিজেন, ওয়াটার প্রুফ জ্যাকেট নিয়ে পাড়ি জমায় অজানার উদ্দেশ্যে। সঙ্গে থাকে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত গাইড।
মালদ্বীপের আরেক বিস্ময় হল সমুদ্রের মাঝখানে স্কয়ার সাইজের কয়েক কিলোমিটার জায়গা। যেখানে নেই কোন সাগরের ঢেউ মনে হয় পুকুরের পানির মত নীরব হয়ে আছে। এই জায়গায় পর্যটকরা নির্ভয়ে সাতার কাটে। স্পিডবোটে চড়ে আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠেন।
পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য মালদ্বীপে রয়েছে প্রায় ২শতের বেশি সাফারিবোর্ট। মালদ্বীপের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য ইউরোপের দেশগুলো থেকে আসছে হাজার হাজার পর্যটক। এ কারণে শত শত হোটেল রিসোর্ট সব সময় থাকে মুখরিত।
মালদ্বীপের একটি রিসোর্টের নাম রাঙ্গালিয়া। এতে রয়েছে পানির নিচে বিশেষ রেষ্টুরেন্ট। সেখানে গিয়ে একবেলা খাবার খেতে ব্যয় হয় এক হাজার ইউএস  ডলার। দাম এত উচ্চ হওয়ার পরও রেষ্টুরেন্টটিতে  পর্যটকদের প্রতিনিয়ত ভীড় জমেই থাকে ।
সবচেয়ে মজার বিষয় হল- পর্যটকরা যখন রাজধানী মালে আসেন তখন প্রথমে তাদের মন কেড়ে নেয় একটি পার্ক। সেই পার্কে রয়েছে শত শত কবুতর। এই কবুতরের সঙ্গে   পর্যটকরা মনে খুলে আনন্দ উল্লাস করে।
এর পর চলে যান সুলতান পার্কে। সেখানে গিয়ে প্রাণ খুলে কিছুক্ষণের জন্য বিশ্রাম করে। মালদ্বীপে আসা বাংলাদেশি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশার-এর সহযোগিতায় তৈরি মালদ্বীপের রাজধানী মালের বড় মসজিদটি।
প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত পর্যটকদেও ভীড় থাকে এই মসিজদটি দেখার জন্য। এছাড়া মালদ্বীপে বহু বছরের পুরানো অনেক ছোট ছোট মসজিদ আছে যা পর্যটকদের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। মালদ্বীপের জাদুঘর পৃথিবীর সমৃদ্ধ জাদুঘরগুলোর মধ্যে অন্যতম।
এখানে রয়েছে তাদের পুরানো স্থানীয় মুদ্রা, বিশাল বিশাল মাছের কংকাল, মালদ্বীপের লোকজ শিল্পের সংগ্রহ। মালদ্বীপ শতভাগ মুসলমান অধ্যুষিত দেশ। দেশটির প্রধান আয়ের উৎস পর্যটন। দ্বিতীয় আয় হচ্ছে মাছ ও মাছজাত পণ্য রফতানি।
সাগর থেকে মাছ ধরে বিদেশে রফতানি  করে হাজার হাজার ডলার আয় করছে দেশটি। দেশটিতে প্রায় ১ লক্ষ ২৫ হাজার প্রবাসী শ্রমিক কাজ করছে। বর্তমানে মালদ্বীপে বাংলাদেশিদের সংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার। এ বিপুল সংখ্যক প্রবাসী প্রতিবছর দেশে পাঠাচ্ছেন বিপুল পরিমান বৈদেশিক মূদ্রা। যা জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ন অবদান রাখছে।

হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী, নাটেশ্বরের দেউল

History part of Banglaমুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ি থানার নাটেশ্বর গ্রামে আবিষ্কৃত হয়েছে প্রাচীন বাংলার বৌদ্ধদের বিশাল স্মৃতিচিহ্ন, দেউল। পূর্বের বঙ্গ ও সমতট অঞ্চলের রাজধানী বিক্রমপুরে অবস্থিত এ দেউল (দেবালয়) বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের ইতিহাস সন্ধানে নতুন পথ খুলে দিয়েছে। এটি বৌদ্ধদের বিহার বা বেশ কয়েকটি মন্দিরের সমষ্টি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে এ দেউলের ইতিহাস জানা এবং এর ঐতিহ্য সংরক্ষণের কাজ চলছে পুরোদমে। গোটা দেউলের ইতিহাস জানা গেলে বাংলা এবং বিশ্বের ইতিহাসের অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই স্পষ্ট হবে বলে ধারণা করছেন ইতিহাসবিদ ও প্রত্নতাত্ত্বিকরা। প্রখ্যাত পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্করের বাল্যজীবন, শিক্ষালাভের সূত্রও উন্মোচন করতে পারে নাটেশ্বর দেউল।
জাহাঙ্গীরনগর ও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, ঐতিহ্য অন্বেষণ ও অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন এবং কয়েকজন বিশেষজ্ঞ দেউলটির প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান, উত্খনন ও গবেষণা করছেন। প্রায় সাত একর জমি জুড়ে দেউলটি বিস্তৃত। এর মধ্যে মূল ঢিবিটির আয়তন প্রায় দুই একর। ঢিবির প্রায় ২৫ শতাংশ জমিতে বর্তমানে খনন কাজ চলছে। ২০১৩ সালের শেষার্ধ এবং এ বছরের উত্খননে নাটেশ্বর দেউলে ৯ মিটার × ৯ মিটার পরিমাপের একটি বৌদ্ধ মন্দির, অষ্টকোণাকৃতি স্তূপ, ইট নির্মিত নালা, আরো বেশ কিছু স্থাপত্যিক নিদর্শন আবিষ্কৃত হয়েছে। বৌদ্ধ মন্দিরটির অনেকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও পশ্চিম-দক্ষিণ কোণা ২৪০ মিটার উচ্চতায় টিকে আছে। ১ দশমিক ৭৫ মিটার প্রশস্ত দেয়ালের ভিত্তিমূলে ঝামা ইট ব্যবহার করা হয়েছে। সম্ভবত আদ্রতা রোধক হিসেবে ঝামা ইট বেছে নেয়া হয়েছে। মন্দিরের দেয়ালের বহিঃস্থ দিকে অসাধারণ অলংকরণ করা হয়েছে। হাতে কাটা ইটের অপূর্ব জালি নকশা এবং বিভিন্ন আকৃতির ইটের কাজ মন্দিরকে অসাধারণ নান্দনিক স্থাপত্যের রূপ দান করেছে।
নাটেশ্বরের সদ্য আবিষ্কৃত এ বৌদ্ধ দেউলটি সংরক্ষণে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে। প্রাচীন স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে কাদামাটির মর্টার, পুরনো ইট পুনঃব্যবহার ও ঐতিহ্যবাহী কুমারদের দ্বারা তৈরি বিভিন্ন আকারের ইট ব্যবহার করা হচ্ছে। বাংলাদেশে এটিই প্রথম কোনো স্থাপত্য নিদর্শন যা প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
দেশে এখন পর্যন্ত প্রায় ২২-২৩টি বৌদ্ধ বিহার আবিষ্কৃত হয়েছে। নাটেশ্বর দেউলে চলমান খননের ফলে তাত্পর্যপূর্ণ প্রত্নবস্তু আবিষ্কৃত হচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এটিও বিহার হিসেবে প্রমাণিত হলে বিক্রমপুরের ও বাংলার আঞ্চলিক ইতিহাসের অনেক সূত্রই খুঁজে পাওয়া যাবে। পুরো ব্যাপারটি নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে স্থানীয়দের মাঝে।
দেশের ও দেশের বাইরের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মধ্যেও ব্যাপক উত্সাহ তৈরি হয়েছে নাটেশ্বরের বৌদ্ধ বিহারকে কেন্দ্র করে। বৌদ্ধ ভিক্ষু, গুরু ও ধর্মাবলম্বীরা দেউলটি দেখার জন্য প্রায়ই ভিড় করছেন।

সুন্দর দ্বীপগুলোর অন্যতম মালদ্বীপে

সুবর্ণা. প্রিয় শ্রোতা, সবাই ভালো আছেন তো? আজকের 'চলুন বেড়িয়ে আসি' আসরে আপনাদের স্বাগত জানাই, আমরা আপনাদের বন্ধু সুবর্ণা আর আলিম। নতুন বছর এসেছে, চলে গেছে আরো একটি বছর আমাদের জীবন থেকে। গেল বছরে আমরা আপনাদের নিয়ে চীন ও বিশ্বের অনেক অঞ্চলে বেড়াতে গিয়েছি। একজন পর্যটক হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বেড়াতে যাওয়া একটি দারুণ মজার ব্যাপার।
আলিম. নতুন বছরে কোথায় কোথায় বেড়ানো যায়, তা নিয়ে পর্যটকরা নিশ্চয়ই মাথা ঘামাচ্ছেন। গত শতাব্দীর ৭০-এর দশকেও ভ্রমণ চীনাদের কাছে তেমন একটা জনপ্রিয় ছিল না। অনেক চীনা এ ব্যাপারে এক্কেবারেই সচেতন ছিলেন না। আশির দশকে এসে অনেক চীনার মনে ভ্রমণ বিষয়টি স্থান পায়। তখন অবশ্য বেশিরভাগ চীনাই ভ্রমণ বলতে বুঝতেন কাজের খাতিরে বাসা থেকে কয়েক দিনের জন্য বাইরে থাকাকে। নব্বইয়ের দশকে চীনাদের জন্য তিব্বতের লাসা শহরে বেড়াতে যাওয়া একটি দারুণ মজার ব্যাপার ছিল। কিন্তু একুশ শতকে এসে প্রায় সকল চীনার জীবনে ভ্রমণ একটি প্রয়োজনীয় অংশে পরিণত হয়েছে। 'রাস্তায় আছি' এবং 'লাগেজ নিয়ে যে কোনো স্থানে বেড়াতে যাওয়া' শব্দগুচ্ছ এখন চীনাদের কাছে খুবই পরিচিত ও বহুল ব্যবহৃত।
সে যাক, গত কয়েক দশক ধরে ভ্রমণ সম্পর্কে মানুষের চিন্তাধারা অনেক উন্নত হয়েছে। মানুষ এখন স্রেফ বিনোদনের জন্য ভ্রমণ করে না, জীবনকে সমৃদ্ধ করতে এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থান ও জাতি সম্পর্কে জানার পরিধিকে বিস্তৃত করতেও ভ্রমণ করে। প্রিয় শ্রোতা, বিশ্বে অনেক সুন্দর দর্শনীয় স্থান আছে, আপনারা সেটা জানেন। গত বছরের মতো এ বছরেও আমরা আপনাদের নিয়ে যাব সুন্দর সুন্দর সব পর্যটন স্থানে; আর ঘুরে বেড়াবো মনের আনন্দে। আজ চলুন বেড়িয়ে আসি বিশ্বের অন্যতম সুন্দর দ্বীপ মালদ্বীপে।
সুবর্ণা. মালদ্বীপ আমার কাছে একটি দারুণ সুন্দর ও মজার পর্যটন স্থান। এক সময় আমার একটি পরিকল্পনা ছিল। পরিকল্পনাটি হচ্ছে: দক্ষিণ এশিয়ার এই দ্বীপ দেশেই হবে আমার হানিমুন। কিন্তু মানুষের সব পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দেওয়া যায় না। সময় ও পরিস্থিতির কারণে, মালদ্বীপে আমার হানিমুন হয়নি। এখন ভাবছি, আমার অনাগত সন্তানকে নিয়ে আমি মালদ্বীপে বেড়াতে যাব। দেখা যাক, এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায় কি না। প্রিয় শ্রোতা, আপনারা আমার এবং আমার অনাগত সন্তানের জন্য দোয়া করবেন।
তো, বলছিলাম মালদ্বীপের কথা। সেখানকার দ্বীপের সুন্দর দৃশ্য, সমুদ্রের বাতাস, সমুদ্রের উপর নির্মিত বাড়িঘর আর নারিকেল গাছ সবই খুবই সুন্দর। ছবি দেখে আর বর্ণনা শুনেই আমি এসবের ভক্ত হয়ে গেছি। আপনি ছুটি কাটাতে কোনো সুন্দর জায়গার কথা ভাবছেন? আপনার ভাবনায় অবশ্যই স্থান পাবে মালদ্বীপ। মালদ্বীপ তো স্রেফ একটি দ্বীপদেশ নয়, এ যেন স্বর্গ। শহরের ব্যস্ত জীবন ও ধোয়াশার চেয়ে এখানকার সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য অনেক আকর্ষণীয় বৈকি।
আলিম. হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন। এ দেশ সম্পর্কে আমার কিছুটা ধারণা আছে। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি বারো শতাধিক ছোট দ্বীপ নিয়ে গঠিত। এসব দ্বীপের মধ্যে মাত্র ২০২টিতে মানুষ বাস করে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দেশটি শ্রীলংকা থেকে ৬৭৫ কিলোমিটার, উত্তরাঞ্চলে ভারত থেকে ১১৩ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। দেশটির মোট আয়তন মাত্র ৩০০ বর্গকিলোমিটার। বলা বাহুল্য, এটি এশিয়ার সবচে ছোট দেশ। বিশ্বের অনেক পর্যটক এ দেশকে দুনিয়ায় সবচে সুন্দর স্বর্গ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
সুবর্ণা. ভারতীয় সমুদ্রের একটি দ্বীপপুঞ্জ হিসেবে এখানকার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১.৮ মিটার। বিষুবরেখার কাছে অবস্থিত হওয়ার কারণে এখানে মাত্র একটি ঋতু আছে। এদেশে সারা বছর গড় তাপমাত্রা ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। মালদ্বীপের ইতিহাস সুদীর্ঘকালের। ১৯৬৫ সালে মালদ্বীপ ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। প্রাচীনকালে মালদ্বীপ ছিল পর্যটকদের বিশ্রামস্থল। গ্রিসের ভূগোলবিদ টলেমি খ্রিষ্টিয় দ্বিতীয় শতাব্দীতে তাঁর বইয়ে লিখেছেন: "শ্রীলংকার পশ্চিম দিকে ১৩৭৮টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত একটি জায়গা আছে।" বস্তুত তখন থেকেই মালদ্বীপ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের কাছে একটি দারুণ রহস্যময় স্থান হিসেবে চিহ্নিত হয়। নবম শতাব্দীতে পার্সিয়ান ব্যবসায়ী সুলেইমান ভারতীয় সমুদ্র অতিক্রম করেছিলেন। তখন তিনি লিখেছিলেন: "১৯০০টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত দেশের মালিক একজন মহিলা; তাঁর সম্পত্তি অনেক বেশি।" চীনের পর্যটক জেং হোও মালদ্বীপে বেড়াতে এসেছিলেন। ১৪৩৩ সালে তিনি পূর্ব আফ্রিকায় যাত্রা করার পথে তাঁর ব্যবসায়ী জাহাজ মালদ্বীপে এসে দড়ি কিনেছিল। চীনের মিং রাজবংশ আমলে চীনারা এ দ্বীপপুঞ্জ সম্পর্কে অনেক তথ্য সংগ্রহ করে। তারা এ দ্বীপপুঞ্জকে 'পানির নিচে লুকিয়ে থাকা পাহাড়' হিসেবে আখ্যায়িত করে এবং স্থানীয় অঞ্চলের রীতিনীতি ও আবহাওয়া সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য লিপিবদ্ধ করে।
আলিম. আচ্ছা, মালদ্বীপের কিছু তথ্য জানার পর এখন আমরা একটি গান শুনি। গানের শিরোনাম 'বিস্তীর্ণ সমুদ্র আর আকাশ'। গানটি গেয়েছে চীনের হংকং বিশেষ প্রশাসনিক এলাকার বিখ্যাত ও জনপ্রিয় ব্যান্ড দল 'বিয়ন্ড'। এ গানের সুর ও কথা গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে চীনাদের মধ্যে অতি জনপ্রিয় ছিল। চলুন একসঙ্গে গানটি শুনি।
সুবর্ণা. প্রিয় শ্রোতা, সুন্দর গানটি শোনার পর এখন মালদ্বীপ সম্পর্কে আরো কিছু তথ্য জানাই। প্রাচীনকালে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা অভিবাসীরা নানা ধরনের সংস্কৃতি নিয়ে এসেছে এখানে। এ কারণেই, স্থানীয় অঞ্চলের সংগীত ও নৃত্যের র্সাথে পূর্ব আফ্রিকার সংস্কৃতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। তা ছাড়া, দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্য সংস্কৃতি মালদ্বীপের ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। এ দেশের মানুষ মূলত ইসলাম ধর্মাবলম্বী। দেশটির অধিকাংশ নারী সমাজের বিভিন্ন কাজে অংশ নেয়। সরকারি অফিস, সেনাবাহিনী ও পুলিশ স্টেশনে অনেক মহিলা কর্মকর্তা দেখা যায়।
আলিম. সার্কভুক্ত দেশ মালদ্বীপের সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য বিশ্বব্যাপী আকর্ষণীয় ও জনপ্রিয়। এখানকার সমুদ্রের রঙ অতি পরিস্কার ও নীল এবং বালির রঙ সাদা। সমুদ্রের মধ্যে হাজার ধরনের মাছ দেখা যায়। মালদ্বীপে বেড়াতে এলে আপনি থাকতে পারেন সমুদ্রের পানির ওপর বিশেষভাবে নির্মিত বাড়িতে। এসব বাড়ি থেকে পর্যটকরা সমুদ্রের বিভিন্ন রঙের মাছ ও প্রাণি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পান; শুনতে পান সামুদ্রিক পাখির ডাক। আর যদি আপনি সমুদ্র সৈকতে থাকতে চান, তাহলে আপনার জন্য আছে বিশেষভাবে নির্মিত বাড়ি। সাধারণত সমুদ্রের মধ্যে নির্মিত বাড়িগুলো সৈকত থেক ১০ মিটার দূরে অবস্থিত। কাঠের সেতু দিয়ে সেগুলোকে সৈকতের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। কিছু কিছু জায়গায় কাঠের সেতুও থাকে না; পর্যটকরা ছোট নৌকায় করে সমুদ্রের বুকে নির্মিত বাড়িতে প্রবেশ করেন।
সুবর্ণা. মালদ্বীপের রাংগারি দ্বীপের একটি হোটেলের কর্তৃপক্ষ সমুদ্রের ৬ মিটার গভীরে স্বচ্ছ গ্লাস দিয়ে একটি রেস্তোরাঁ নির্মাণ করেছে। এ রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে মোট ১২ জন অতিথি বসতে পারেন। এ রেস্তোরাঁয় শুধু লাঞ্চ ও ডিনার পরিবেশন করা হয়। রেস্তোরাঁর নাম 'ithaa undersea restaurant'। স্থানীয় ভাষায় 'ইথা' অর্থ মুক্তা। রেস্তোরাঁর দেয়াল গ্লাস দিয়ে তৈরি। এটি সমুদ্রের গভীরে গ্লাস দিয়ে নির্মিত একমাত্র রেস্তোরাঁ। এটি নির্মাণ করতে খরচ হয়েছে ৫০ লাখ মার্কিন ডলার। রেস্তোরাঁয় মোট ৬ টেবিল আছে। প্রতিটি টেবিলে মাত্র ২ জন অতিথি বসতে পারেন। অতিথিরা সুস্বাদু খাবার খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের নীচের মনোরম দৃশ্য দেখতে পারেন। নানা ধরনের রঙিন মাছ তাদের চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায়। সে এক মজার অভিজ্ঞতা। তবে, এত সুন্দর পরিবেশে খাবার খাওয়ার মূল্যও কিন্তু বেশি। এখানে সবচে সস্তা লাঞ্চের জন্য আপনাকে গুনতে হবে ২০০ মার্কিন ডলার।
আলিম. মালদ্বীপে পর্যটকদের জন্য বিনোদনের ব্যবস্থার অভাব নেই। বিশেষ করে সমুদ্রকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন বিনোদন-প্রকল্প। পর্যটকরা এখানে সমুদ্রে ডাইভিং করতে পারেন; পারেন বিভিন্ন ধরনের নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়াতে। মালদ্বীপের সবচে আকর্ষণীয় দৃশ্য দেখা যাবে কোরাল দ্বীপে। পর্যটকরা চাইলে সমুদ্রে মাছ ধরতে পারেন। আপনার মাছ ধরার অভিজ্ঞতা নেই? নো প্রবলেম। আপনার জন্য সহজে মাছ ধরার ব্যবস্থা আছে সেখানে। নিজে মাছ ধরুন এবং সেই মাছের রোস্ট দিয়ে ক্যান্ডেল ডিনার সারুন প্রিয় মানুষের সঙ্গে। যদি ডাইভিং করার আগ্রহ থাকে, তবে মালদ্বীপে যাওয়ার আগেই কিনে নিতে পারেন ডাইভিংয়ের কিছু প্রয়োজনীয় সামগ্রী। কারণ, এ দেশে ডাইভিংয়ের প্রয়োজনীয় উপকরণ ভাড়া করতে আপনাকে অনেক অর্থ ব্যয় করতে হবে।
সুবর্ণা. মালদ্বীপের সূর্য দ্বীপে যেতে রাজধানী মালে থেকে নৌকায় ৪ ঘন্টা সময় লাগে। এ দ্বীপে আছে মালদ্বীপের বৃহত্তম আরামদায়ক হোটেল। এর ইতিহাস অনেক পুরাতন। হোটেলের বিভিন্ন কক্ষ দ্বীপটির বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। আপনি চাইলে নারিকেল গাছের নিচে শুয়ে সমুদ্রের ডাক শুনতে পারেন। আসলে হোটেলের কক্ষটিই তৈরি হয়েছে নারিকেল গাছের নীচে। ফলে আপনি নিজের ঘরে বসে উপভোগ করবেন সমুদ্রের মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য। আপনি ঘর থেকে বের হয়ে সূর্যালোকে বসে বই পড়তে পারেন বা সমুদ্রে সাঁতার কাটতে পারেন।

প্রতিবছর বড় দিন ও নববর্ষে হোটেলের ভাড়া অনেক বেড়ে যায়। তখন প্রতিদিন আপনাকে কক্ষের ভাড়া বাবদ গুনতে হবে কমপক্ষে ৫০০ মার্কিন ডলার। ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক পর্যটক এখানে এসে নববর্ষ বা বড় দিন উদযাপন করেন। এখানে বসে যেন স্বর্গের সুখ আর আনন্দ উপভোগ করা যায়। এ দ্বীপের হোটেলে অনেক ধরনের খাবার পাওয়া যায়। মুসলিম অধ্যুষিত দেশ বলে আপনি এখানে শুকরের মাংস পাবেন না। তবে পাবেন মাছ, মুরগী ও গরুর মাংস দিয়ে তৈরী নানা ধরনের সুস্বাদু ডিশ এবং বহু ধরনের মিষ্টি। এখানে বেড়াতে এলে আপনি বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের খাবার চেখে দেখার সুযোগ পাবেন।
আলিম. আচ্ছা, প্রিয় শ্রোতা, সময় দ্রুত চলে যায়। আজকের অনুষ্ঠানও শেষ করতে হবে। আশা করি মালদ্বীপের সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্যের বর্ণনা শুনে আপনিও সেখানে বেড়াতে যাবার সিদ্ধান্ত মনে মনে নিয়ে ফেলেছেন। মালদ্বীপ বাংলাদেশের প্রতিবেশী দেশ। সুতরাং বাংলাদেশ থেকে সেখানে বেড়াতে যাওয়া খুব কঠিন কাজ নয়। ভারত থেকেও মালদ্বীপে যাওয়া-আসা খুব সহজ। আশা করি সুযোগ পেলে আপনিও সেখানে বেড়াতে যাবেন এবং দেখে আসবেন পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য। তাহলে, আজকের মতো এখানেই বিদায়। আগামী সপ্তাহে একই সময় আবার কথা হবে। সবাই ভালো থাকুন, সুন্দর থাকুন, আর চীন আন্তর্জাতিক বেতারের বাংলা অনুষ্ঠানের সাথেই থাকুন। যাইচিয়ান।(সুবর্ণা/আলিম)

নয়নাভিরাম দ্বীপের দেশ মালদ্বীপ

পৃথিবীর অন্যতম নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত দেশ ভারত মহাসাগরের দ্বীপ রাষ্ট্র মালদ্বীপ। হাজারের বেশি টুকরো টুকরো দ্বীপ মিলেয়ে ছোট্ট এই দেশ। নীল সাগর, সমুদ্র সৈকত, অসংখ্য দ্বীপ আর জলের নিচের প্রবাল বাগান-সবকিছু মিলে মালদ্বীপ কিন্তু রোমান্টিক জায়গা হিসেবে দারুণ। দেশটির হৃদয়কাড়া সৌন্দর্যের কথা বলে শেষ হবে না, প্রিয়জনের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে চোখ জুড়াতে পারেন মালদ্বীপের সৌন্দর্যে।
প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্তর থেকে লাখ লাখ পর্যটক মালদ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে আসেন। এক ঋতুর দেশটির উত্তর, দক্ষিণ, পূর্ব, পশ্চিম মিলে রয়েছে প্রায় আড়াই হাজার ছোট ছোট দ্বীপ। এ দ্বীপগুলোর সমন্বয়েই সৃষ্টি মালদ্বীপ।

মালদ্বীপের বর্তমান জনসংখ্যা তিন লাখের কিছু বেশি। পর্যটকদের স্বাগত জানাতে রয়েছে অত্যাধুনিক মালে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট। মালদ্বীপের উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কল্যাণে পর্যটকরা অনায়াসে ছুটে বেড়াতে পারেন এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে। পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র মালদ্বীপেই বিশালকায় সাবমেরিনে করে সমুদ্রর তলদেশে ভ্রমণের সুযোগ রয়েছে। যা পর্যটকদের ১২০ ফুট গভীর সমুদ্রর তলদেশ পর্যন্ত নিয়ে যায়। গভীর সমুদ্রর তলদেশে বিশাল বিশাল মাছ, গাছ-গাছালি, ভয়ংকর প্রাণী, উঁচু-নিচু পাহাড় দেখে মুগ্ধ হন পর্যটকরা। সমুদ্রর তলদেশে ভ্রমণ এতই রোমাঞ্চকর যে, বারবার ফিরে আসতে ইচ্ছে করে মালদ্বীপে। সমুদ্র উপকূলের সৌন্দর্য উপভোগের জন্য রয়েছে সাফারিবোট। যা উপকূল থেকে পর্যটকদের নিয়ে যায় গভীর সমুদ্রে। সৌন্দর্য পিপাসুদের দেয় অনাবিল আনন্দ।

এক একটি সাফারিবোট ১৫-২০ দিনের জন্য ২০-২৫ জন পর্যটক নিয়ে পাড়ি জমায় গভীর সমুদ্র ভ্রমণের পথে। সাফারিবোটে ভ্রমণের অংশ হিসেবে পর্যটকরা দক্ষ ও প্রশিক্ষিত গাইড, অক্সিজেন, ওয়াটার প্রুফ জ্যাকেট নিয়ে পাড়ি জমায় অজানার উদ্দেশ্যে। পর্যটকদের ভ্রমণের জন্য মালদ্বীপে রয়েছে প্রায় ২০০র বেশি সাফারিবোট। মালদ্বীপের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের জন্য ইউরোপের দেশগুলো থেকে আসছে হাজার হাজার পর্যটক। এ কারণে শত শত হোটেল রিসোর্ট সব সময় থাকে মুখরিত। মালদ্বীপের আরেক বিস্ময় হল সমুদ্রের মাঝখানে স্কয়ার সাইজের কয়েক কিলোমিটার জায়গা। যেখানে নেই কোন সাগরের ঢেউ, মনে হয় পুকুরের পানির মতো নীরব হয়ে আছে। এই জায়গায় পর্যটকরা নির্ভয়ে সাঁতার কাটে। স্পিডবোটে চড়ে আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠেন।
এখানে দেখা মিলে বিরল প্রজাতির পানি কাটা পাখি। পর্যটকরা যখন রাজধানী মালে আসেন তখন প্রথমে তাদের মন কেড়ে নেয় একটি পার্ক। সেই পার্কে রয়েছে শত শত কবুতর। এই কবুতরের সঙ্গে পর্যটকরা মনে খুলে আনন্দ-উল্লাস করে।
এই তো কিছুদিন আগেও শুধু টাকা-পয়সাওয়ালা পর্যটকরাই সেখানে যেতে পারতেন। মালদ্বীপে পা রাখলেই গুনতে হতো মোটা অংকের ট্যাক্স। তবে দিন পাল্টেছে। বছর কয়েক আগে আইনে সংস্কার আনায় এখন কম খরচে সেখানে যাওয়া যাচ্ছে। তাই নয়নাভিরাম দ্বীপ দেশে ঘুরতে চাইলে বেরিয়ে পারেন প্রিয়জনদের নিয়ে।
সার্কের অন্তর্ভুক্ত দেশ মালদ্বীপের আয়ের একটা বড় অংশ আসে পর্যটন খাত থেকে। দ্বীপ রাষ্ট্র হওয়ার কারণে পশ্চিমা পর্যটকদের কাছে মালদ্বীপ খুবই আকর্ষণীয়। বিশেষ করে পশ্চিমা নবদম্পতিরা সেখানে যেতে খুব পছন্দ করেন।কিন্তু পশ্চিমা পর্যটক মানেই তাদের বিশেষ কিছু সুবিধা দিতে হয়। যেমন অবাধে পানীয় পানের সুযোগ, ইচ্ছামতো পোশাক আশাক পরা। কিন্তু এর কোনোটাই মুসলিম দেশ মালদ্বীপের সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আগে পর্যটকদের মনুষ্য বসতি আছে এমন কোনো জায়গায় যেতে দেয়া হতো না। রাজধানী মালের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর পর্যটকদের স্পিডবোটে বা এয়ার ট্যাক্সিতে করে বিভিন্ন দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হতো। সেসব দ্বীপে কোনো বসতি থাকত না। ফলে পর্যটকরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারতেন। তবে ২০০৯ সালে দেশটিতে অনুষ্ঠিত প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর মোহাম্মদ নাশিদ একটি সংস্কার আনেন। এর ফলে মালেতে বসবাসকারীরা তাদের ‘গেস্টহাউস’ বিদেশি পর্যটকদের কাছে ভাড়া দেয়ার সুযোগ পান।
এতে করে যেটা হয়েছে তা হলো পর্যটকদের আর স্পিডবোট বা এয়ার ট্যাক্সির মতো ব্যয়বহুল যানে চড়তে হচ্ছে না। আর রাজধানীতে থাকতে পারার কারণে কম খরচে খাওয়া দাওয়ার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অথচ আগে এয়ার ট্যাক্সিতে করে যে দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হতো সেখানে মানুষজন না থাকায় খাবারের দাম হতো অনেক বেশি। এখানে প্রতি রাতের ভাড়া ৩০ ডলার।
দ্বীপগুলোতে যে রিসোর্ট রয়েছে সেখানে ভাড়াটা এর চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি! সুতরাং ভ্রমণপ্রিয় মানুষেরা সময় ও সুযোগ পেলে চলে যেতে পারেন মালদ্বীপে। মালদ্বীপের এয়ারলাইন্স ‘মালদিভিয়ান’ সপ্তাহে দু’দিন ঢাকা থেকে মালেতে চলাচল করে।
:: আবিদা আজাদ :: মার্চ ১৪, ২০১৪

ঘুরে দেখুন উড়িষ্যা প্রদেশ

Tuesday 8th of April 2014 10:00:11 AM
রাজধানী : ভুবনেশ্বর। জেলার সংখ্যা : ৩০। শহরের সংখ্যা : ১৩৮। গ্রামের সংখ্যা : ৪৭,৫২৯। জনসংখ্যা : ৪,১৯,৪৭,৩৫৮ (২০১১)। শিক্ষিতের হার : ৭৩.৪৫% (২০১১)।
বিমানবন্দর : ভুবনেশ্বর।  বন্দর : পারাদীপ, গোপালপুর।
জেলা শহরগুলো হলো : (১) মালকানগিরি (২) কোরাপুট (৩) রায়গড় (৪) নবরঙ্গপুর (৫) ছত্রপুর (৬) পারলাকিমিদি (৭) ভবানী পাটনা (৮) পুরী (৯) নয়াগড় (১০) খুরদা (১১) ভুবনেশ্বর (১২) জদৎসিংপুর (১৩) কটক (১৪) কেন্দ্রপাড়া (১৫) পানিকোইল (১৬) ভদ্রক (১৭) বালেশ্বর (১৮) বারিপদা (১৯) ঢেংকানল (২০) আঙ্গুল (২১) কেন্দু ঝারগড়  (২২) সুন্দরগড় (২৩) ঝাড়সুগুদা (২৪) সম্বলপুর (২৫) বারগড় (২৬) নুয়াপাড়া (২৭) বোলাঙ্গির (২৮) ফুলবনি (২৯) বৌধ (৩০) সোনপুর।

সাতকোশিয়া : নদীর দুপাশ থেকে উঠে যাওয়া পাহাড় আর পাহাড়ের মধ্য দিয়ে মহানদীর বয়ে চলার পথ, আর পথের একদিকে বিস্তীর্ণ বালুচরে সারি সারি রং-বেরঙের তাঁবু এই হলো সাতকোশিয়া গর্জের টিকরপাড়া নেচার ক্যাম্প। পাহাড়ের আড়াল দিয়ে মহানদী সাত ক্রোশ পথ পাড়ি দিয়ে চলেছে, তাই এর নাম সাতকোশিয়া গর্জ অভয়ারণ্য। ৮০০ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই জঙ্গল সিমলিপালের পর উড়িষ্যার দ্বিতীয় টাইগার রিজার্ভ। মহানদীর চরে সার সার তাঁবু আর তার থেকে ১৫০ মিটারের মধ্যে কুমির আর ঘড়িয়ালের রোদ পোহানোর দৃশ্য। টিকরপাড়া নেচার ক্যাম্প থেকেই আপনি বেড়িয়ে নিতে পারেন লবঙ্গির জঙ্গল, পুরানাকোট, বাঘমুণ্ডা প্রভৃতি নজরমিনার। প্রত্যেকটি জায়গাতেই থাকার বাংলো আছে। গোটা ক্যাম্পজুড়ে সব সময় মৃদুমন্দ হাওয়া এবং তার সঙ্গে তালমিলিয়ে অজস্র পাখির কূজন। সকালবেলা পাহাড়ের ওপর থেকে মহানদীর জলের ওপর সূর্যকিরণ এবং উপত্যকাজুড়ে কুয়াশা ও সূর্যের আলোর খেলা দেখতে বেশ ভালো লাগে। ক্যাম্পের ছেলেরাই আপনাকে সকালবেলা দেড় কিলোমিটার হেঁটে জঙ্গল ভ্রমণে নিয়ে যাবে, যাওয়ার পথেই দেখতে পাবেন মালাবার জায়েন্ট স্কুইর‌্যাল, ওরিয়েন্টাল ব্লু ম্যাগপাই বা প্যারাডাইস ফ্লাইক্যাচার। বোটিং করতে করতে দেখতে পাবেন কুমিরের অলস রোদ পোহানো, পাথরের ওপর ক”ছপের চুপচাপ বসে থাকা, অসংখ্য মাছরাঙা পাখি, আর রাডি শেলডাকের কর্কশ ডাক। সন্ধেবেলা যখন জেলেরা ডিঙিনৌকা নিয়ে বাড়ি ফেরার তোড়জোড় করবে, আপনিও তখন ক্যাম্পে ফিরে তৈরি হয়ে নিন ক্যাম্পফায়ারের জন্য। যখন পশ্চিম দিকের পাহাড়ে সূর্যাস্তের আলো পড়বে তখন দেখবেন কোথাও হলুদ, কোথাও কমলা বা লাল রঙের আভা। ক্যাম্পের একশো মিটারের মধ্যে মহানদীর নীল জল, কিন্তু ভুলেও জলে পা দেবেন না। মহানদীতে প্রচুর কুমির। পায়ে হেঁটে দেখে নিন ঘড়িয়াল রিসার্চ সেন্টার। মনে রাখবেন, টিকরপাড়ার দশ কিলোমিটার আগে থেকে কোনো মোবাইল কাজ করে না।

কীভাবে যাবেন : হাওড়া থেকে কটক। কটক স্টেশন থেকে ৩ কিলোমিটার দূরে বাদামবাড়ি বাসস্ট্যান্ড। বাদামবাড়ি থেকে বাসে আঙ্গুল। দূরত্ব প্রায় ১২০ কিলোমিটার। আঙ্গুল থেকে টিকরপাড়া ৬০ কিলোমিটার। দলে ভারী হলে কটক থেকে গাড়ি ভাড়া করে আঙ্গুল আসা যায়। ভাড়া ১,৮০০ থেকে ২,০০০ টাকা পড়বে। আঙ্গুল থেকে গাড়ি নিয়ে টিকরপাড়া। গাড়ির জন্য ফোন করুন : নবকিশোর : ০৯৪৩৯০-১৫০৬৬, রঞ্জন : ৯৪৩৭২-১৩৬২৪।

কোথায় থাকবেন : সাতকোশিয়া গর্জ অভয়ারণ্যে অনেকগুলো বনবাংলো আছে। যদিও বনবাংলোগুলো বেশ ভালো, তবে সব বনবাংলোতে সব সুবিধে নেই। টিকরপাড়া নেচার ক্যাম্প নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত খোলা থাকে। ক্যাম্পের ভাড়া ১,৫০০ টাকা। এর মধ্যে দুজনের থাকা, খাওয়া, ক্যাম্পফায়ার, বোটিং, জঙ্গল ট্রেক সব খরচ ধরা থাকে। অতিরিক্ত একজনের জন্য ৫০০ টাকা অতিরিক্ত।

বনবাংলো ও ক্যাম্প বুকিংয়ের জন্য চিঠি লিখুন :
ডিভিশনাল ফরেস্ট অফিসার, সাতকোশিয়া ওয়াইল্ডলাইফ ডিভিশন
আঙ্গুল, হাকিমপাড়া, পিন-৭৫৯১৪৩, উড়িষ্যা। ০৬৭৬৪-২৩৬২১৮ (অফিস) এছাড়া অনলাইন বুকিং করতে পারেন :
www.satkosia.org-তে। টিকরপাড়া নেচার ক্যাম্পের ম্যানেজার রাজু চৌহানের ফোন নম্বর : ০৯৪৩৯-৮২০৭২৭, ০৮৮৯৫-৭৮২৩১১।


পুরী
উত্তাল সমুদ্র, সুন্দরী বেলাভূমি এবং জগন্নাথদেব দর্শনের জন্য অগণিত মানুষ ছুটে আসেন পুরীতে। থাকা-খাওয়া-ঘোরার পর্যাপ্ত আয়োজন রয়েছে পুরীতে। পুরীর মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন আদি শঙ্করাচার্য। মন্দিরে শ্রীজগন্নাথ ছাড়া পাশাপাশি রয়েছেন বলরাম ও সুভদ্রা। পুরীর প্রাণকেন্দ্র স্বর্গদ্বার।

পুরী থেকে রঘুরাজপুর
পুরী থেকে অটো নিয়ে চলে যেতে পারেন পটের গ্রাম রঘুরাজপুর। সেখানে ঘরে ঘরে বর্ণময় পটের কাজ করছেন পটুয়ারা। এখানকার পটের খ্যাতি বিদেশেও পৌঁছেছে। শিল্পীর কাছ থেকে পট কিনতেও পারেন।

কীভাবে যাবেন : হাওড়া থেকে পুরী যায় ১২৮২১ ধৌলি এক্সপ্রেস (ছাড়ে সকাল ৬টায়, পৌঁছায় দুপুর আড়াইটায়), ১২৮৩৭ পুরী এক্সপ্রেস (ছাড়ে রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে, পৌঁছায় পরদিন সকাল সাড়ে ৭টায়), ১২২৭৭ দুরন্ত এক্সপ্রেস (ছাড়ে দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে, পৌঁছায় রাত ৯টা ৪০ মিনিটে), ১৮৪০৯ জগন্নাথ এক্সপ্রেস (ছাড়ে সন্ধে ৭টায়, পৌঁছায় পরদিন ভোর ৪টা ৪০ মিনিটে), ১২৮৮১ গরিব রথ এক্সপ্রেস (মঙ্গল, বৃহস্পতি) ছাড়ে রাত ৮টা ৫৫ মিনিটে, পৌঁছায় পরদিন ভোর ৫টা ৫৫ মিনিটে), ১২৮৯৫/১২৮৮৭ পুরী এক্সপ্রেস ৯ (শুক্র/সোম) (ছাড়ে রাত ৮টা ৫৫ মিনিটে, পৌঁছায় পরদিন ভোর ৫টা ৫৫ মিনিটে)।
কোথায় থাকবেন : উড়িষ্যা পর্যটনের পাš’নিবাস (০৬৭৫২-২২২৫৬২/২২২৭৪০), ভাড়া এসি স্যুইট ৩,০০০ টাকা, এসি ডিলাক্স ১,৮০০ টাকা, সাধারণ দ্বিশয্যা ৬৫০ টাকা, সাধারণ চার শয্যা ১,২০০ টাকা।
প্রাইভেট হোটেল : হোটেল ড্রিমজ গোল্ডেন লেগুন  (কলকাতা বুকিং : ৬৪১৫-২৪৯৬), ভাড়া ৭৫০-৯৫০ টাকা। হোটেল ডলফিন (কলকাতা বুকিং : ৯৩৩৯৪-৭৮৪১২), ভাড়া ৬০০-১,৫০০ টাকা। হোটেল নীলাদ্রি (কলকাতা বুকিং : ৬৫৪৮-২৮০৪), ভাড়া ২,০০০-২,৫০০ টাকা। কমলা রেসিডেন্সি (কলকাতা বুকিং : ৯৮৩০১-৩৩৫১১), ভাড়া ৬০০-১,৫০০ টাকা। হোটেল রাজ (কলকাতা বুকিং : ২২১২-৭৭১৫), ভাড়া ৯০০-১,২০০ টাকা।  হোটেল গোল্ডেন স্যান্ড (কলকাতা বুকিং : ৯৮৩১৩-৫৯৪০৮), ভাড়া ১,৩০০-১,৭৫০ টাকা। হোটেল দীপ রিসর্ট  (কলকাতা বুকিং : ২৪৮৬-৬০৫১), ভাড়া ৭৫০-২,০০০ টাকা। হোটেল পুলিনপুরী (কলকাতা বুকিং : ২৪৫৪-৯৪১০), ভাড়া ১,০০০-১,২০০ টাকা। রেবা বিচ রিসর্ট (কলকাতা বুকিং : ২২২৭-১৮৫০), ভাড়া ৮৫০-১,৫০০ টাকা। আনন্দ ভবন (কলকাতা বুকিং : ২২৩১-৮০১৯), ভাড়া ৪৫০-৮০০ টাকা।  হোটেল এশিয়ান ইন (কলকাতা বুকিং ২২১২-৭৩০১), ভাড়া ৮০০-১,০০০ টাকা। হোটেল ভূ-দেবী (কলকাতা বুকিং : ৯৫৪৭৩-০৮৪৪৬), ভাড়া ৪০০-১,২০০ টাকা। হোটেল হেভেন (কলকাতা বুকিং : ৯৮০৪২-৫৪০১৯), ভাড়া ৮০০-১,২০০ টাকা। হোটেল গ্র্যান্ড ডিলাক্স (কলকাতা বুকিং : ২২৬২-২৮২০), ভাড়া ৮০০-১,৪০০ টাকা। হোটেল ডায়মন্ড প্যালেস (কলকাতা বুকিং : ২২৬২-১৮৪৯), ভাড়া ৯০০-২,২০০ টাকা। হোটেল অবিনাশধাম (কলকাতা বুকিং : ৯৮০৪৯-৭৯৪১৪), ভাড়া ৫৫০-৯৯০ টাকা। এছাড়া পুরীতে অসংখ্য হোটেল এবং হলিডে হোম রয়েছে। তবু পুজোর ছুটিতে পুরী যেতে হলে হোটেল বুকিং করেই যাওয়া উচিত। পুরীর এস টি ডি কোড : ০৬৭৫২।
সরেজমিন বার্তা/এস

পুরী ভ্রমণ

Thursday, October 31, 2013

প্রথমেই বলে রাখি আমার ব্লগের এই পোস্টটা বাকিগুলোর থেকে কিছুটা আলাদা হবে, কারণ যেদিন থেকে আমি এই ভ্রমণসর্বস্ব ব্লগ লেখা শুরু করেছিলাম, সেদিনই ঠিক করেছিলাম বাঙালির তিনটে ঘোরার জায়গা দী-পু-দা (অর্থাৎ দীঘা-পুরী-দার্জিলিঙ) সম্পর্কে কখনও লিখব না । কারণ এইসব জায়গা সম্পর্কে বাঙালিদের নতুন করে কিছু জানার নেই । তাই আমাদের এই 'পুরী ভ্রমণ' সম্পর্কে অল্প কিছু কথা লিখে রাখছি এই কারণে যে হয়তো এই তথ্যগুলো অন্য কারুর বা পরবর্তীকালে আমাদের নিজেদেরই কাজে লাগতে পারে ।

যাওয়া : ২৬শে অক্টোবর, ২০১৩ রাত ১০:৩৫ - পুরী এক্সপ্রেস ।
ফেরা : ৩০শে অক্টোবর, ২০১৩ রাত ১০:১৫ - পুরী হাওড়া গরীবরথ এক্সপ্রেস ।

সারসংক্ষেপঃ

১. পুরীতে আমরা ছিলাম ইন্ডিয়ান ওভারসিস্‌ ব্যাঙ্কের হলিডে হোমে । পুরীতে গিয়ে হলিডে হোমে থাকা এখনও পর্যন্ত বেশ কমন্‌ ব্যাপার । কিন্তু যদি নিজেরা রান্না করার পরিকল্পনা না থাকে, তাহলে হলিডে হোমে না থাকাই ভালো । কারণ পুরীতে অনেক হোটেল পাওয়া যায় যেখানে থাকার খরচ হলিডে হোমের খরচের সমান ।
২. হলিডে হোমের দ্বিতীয় অসুবিধে হল বেশিরভাগ হলিডে হোমের সঙ্গে কোনও একটা ট্রাভেল এজেন্সির যোগাযোগ আছে । ঘোরার জন্য সেই এজেন্সির থেকে গাড়ি বা বাস না নিলে এরা ঝামেলা করে । আমরা এই পদ্ধতির কথা জানতাম না, তাই 'নন্দী ঘোষ ট্রাভেল্‌স্‌' - এর লোকজন রীতিমতো আমাদের ঘরে ঢুকে আমাদের হুমকি দিয়ে যায় ।
৩. পুরীর লোক্যাল সাইট সিয়িং এর জন্য বিভিন্ন ধরনের গাড়ি পাওয়া যায়, যার মধ্যে টাটা ম্যাজিক খুব বেশি চলে । আমাদের দলে ন'জন ছিলাম এবং একটা ম্যাজিকের ভাড়া নিল ৪২৫/- ।
৪. কোণার্ক আর ভুবনেশ্বরের ঘোরাঘুরির জন্য গাড়িভাড়া করে ঘোরাই ভাল, কারণ ভিডিও কোচের বাসে ঘোরা কিছুটা কষ্টসাধ্য । সেইসঙ্গে নিজের ভাড়া করা গাড়িতে ঘোরার আরেকটা সুবিধে হল কোনও জায়গায় নিজের মতো যতক্ষণ ইচ্ছে দাঁড়ানো যায় ।

উপসংহারঃ

আমাদের চারপাশে এমন কোনও বাঙালি পরিবার বোধহয় নেই যারা জীবনে কখনও পুরী যায়নি । তাই
পুরী !
পুরী সম্পর্কে কিছু জেনে নেওয়া ভীষণ সহজ ব্যাপার । আরেকটা মজার ব্যাপার "পুরী ঘুরে খুব ভালো লাগল" এটা আমি কখনও কারুর মুখে যেমন শুনিনি, তেমনই "দূর দূর, পুরী আবার একটা যাওয়ার মতো জায়গা হল ?" এরকম বলতেও কাউকে শোনা যায় না । কম পুঁজি আর খুব এফর্টলেস্‌লি ঘোরার জন্য পুরী একটা আদর্শ জায়গা । এখানে ঠকে যাওয়া খুব সহজ নয়, কারণ পুরী সম্পর্কে এখানকার লোকেরা যা জানে, বাঙালি ট্যুরিস্টরাও প্রায় তাইই জানে । পুরীর লোকেদের আর কোনও রুজি-রোজগারের ব্যবস্থা নেই, পুরী চলে প্রধানতঃ কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের টাকায় - আমরা হচ্ছি ওদের সবচেয়ে বড় কাস্টমার ! কাজেই "কাস্টমার ইজ গড" - এই কথাটা পুরীতে গিয়ে সবসময়ে মাথায় রাখা উচিৎ । আমরা জগন্নাথদেবের দর্শন করার জন্য পুরী যাই বটে, কিন্তু পুরীর মানুষের কাছে আসলে আমরাই 'জগন্নাথ' !
LINK 

পৃথিবীর অর্ধেক সৌন্দর্যের দেশ ইরান


বলা হয়ে থাকে, 'শহরে ইসফাহান/নেসফে জাহান'। সত্যিই তাই, পৃথিবীর অর্ধেক সৌন্দর্য নিয়ে এক ঘোরলাগা প্রাকৃতিক মহুয়া বন, জনশূন্য বিরান মরুভূমি আর এবড়ো-থেবড়ো সুউচ্চ পাহাড়ের কোল ঘেষে অবস্থান করছে ইসফাহান প্রদেশ। এখানকার উঁচু পাহাড়গুলোর মধ্যে রয়েছে বিদকান এবং সিমানসাফে। সাফাভি শাসনামলের ইরানের রাজধানী ইস্ফাহানের সৌন্দর্যের নয়ানাভিরাম দৃশ্যাবলী আর ইমাম স্কয়ারে ইমাম মসজিদের কারুকার্যময় দেয়ালচিত্র ও চোখ ধাঁধানো রং-বেরঙের হাজারো বাতির আলোর নাচন, কিংবা 'নকশে জাহান' নামের বিখ্যাত বাজারের বাঙ্গম কোলাহল আজও কানে বাজে, স্ফটিক আলোগুলো চোখে খেলা করে। তাই ইরান ঘুরে আসার চার মাস পরেও "ইরান ভ্রমনের" অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে এসে সবার আগে ইসফাহান শহরের কথাই মনে পড়ে।
৩১'শে জুলাই ২০১৩ থেকে ৫'ই সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৩৬ দিনের সফরে ইরানের বিভিন্ন শহরে- প্রান্তে-মরুতে ঘুরে বেড়ানোর অভিজ্ঞতা এই ছোট কলেবরে বর্ণনা করা অনেকটা অনুরোধে ঢেকি গেলার মতই। কী আর করা যাবে কর্তা জহির ভাইয়ের ইচ্ছায় ফরমায়েশি কর্ম ! অনেক মুহূর্ত, অনেক কথা আর প্রবাসী ভাইদের জমানো স্বপ্ন ও ভালোবাসাগুলো বুকে চাপিয়ে কিছু স্মৃতি, কিছু অনুভূতি আর অর্জিত উপলব্ধিগুলোই এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করব।
ইরানের বিজ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি মন্ত্রনালয়ের তত্ত্বাবধানে এবং 'সাদী ফাউন্ডেশান' এর উদ্যোগে ২৫ দিনব্যাপী ভাষাভিত্তিক ৮০তম ফারসি মানোন্নয়ন কোর্সে অংশগ্রহনের উদ্দেশ্যেই মূলত আমার ইরান যাত্রা। ঢাকাস্থ ইরান দূতাবাস ও ইরান কালচার সেন্টারের সহযোগিতায় যাওয়া-আসার বিমান টিকেট পাওয়ার পর আমাকে বলা হলো তেহরান বিমানবন্দর থেকেই আমাকে উষ্ণ আতিথেয়তা দেয়া হবে। তথাস্তু বলেই রওয়ানা হলাম আবহমান স্রোতের বিপরীতে স্বকীয় ইসলামী তাহজিব-তমুদ্দুনের ধারক ও বাহক হিসাবে প্রতিনিয়ত বহির্বিশ্বের সাথে সংগ্রাম করে চলা ফেরদৌসী, সাদী, জামী, খৈয়াম আর জাবের ইবনে হাইয়ানদের প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরপুর ইরানের পথে।
প্রোগ্রামের কয়েকদিন আগেই ইরানে চলে আসার দরুন আমার জন্য এইদিনগুলো শাপেবর হলো। চমত্কার বেশ কটা দিন কাটালাম 'রেডিও তেহরানে' কর্মরত ভাই তওহিদ এর অসাধারণ বন্ধুত্বসুলভ আন্তরিক সহযোগিতায়। টোও টো করে ওনাকে নিয়ে ঘুরে বেড়ালাম তেহরান শহরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। প্রাসাদোপম অট্টালিকা থেকে শুরু করে ঘিঞ্জি গলি-ঘুপচি ঘুরে অবাক না হয়ে পারলাম না। মেট্রো ট্রেনে তাজরিশ থেকে রওয়াহান পর্যন্ত ঘুরে কোথাও কোনধরনের বিশৃঙ্খলা, কোনধরনের মারা-মারি, ঝগড়া-ঝাটি, কিংবা বাসে-ট্রেনে সিট নিয়ে বাদানুবাদ কোনো কিছুই চোখে পড়েনি। 'হিউম্যান বিং' বলে যে একটা শব্দ ডিকশনারিতে মরি মরি করে বেঁচে আছে, তার আক্ষরিক প্রয়োগ পেলাম ইরানে এসে, বিশেষ করে ইরানের আরেকটি প্রাচীন রাজধানী কাজভিনে আসার পরে।
টাকায় জলছাপের ছবির ন্যায় সুন্দর কাজভিনের ইমাম খোমিনি আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস কিংবা পটে আঁকা শিল্পীর তুলিতে ফুটে ওঠা এর 'খাবগা' বা আবাসিক হলগুলোতে যে জীবনের জয়গান অনুরনিত হয় তা সত্যি অতুলনীয়। সকালের প্রাতরাশ কিংবা রাতের শাম বা ডিনারের জন্য আবাসিক ডারমেটোরি থেকে কেন্টিনের দু'কিলোমিটার পথ যেতে হয় বাসে। ক্ষুধা পেটে বাসে যেতে যেতে পেটের ক্ষুধা শুকিয়ে আমসত্ব হয়, আবার খেয়ে-দেয়ে বাসে আসতে আসতে সেই ক্ষুধা আবার চাঙ্গা হয়ে ওঠে। আতিথেয়তার যদিও কোনো কমতি নাই, তাই ফিরতি পথের কথা চিন্তা করে কেন্টিনে বসে পেট পূজার পাশাপাশি ব্যাগ পূজা করতেও কারো কোনো মানা নেই। দায়িত্বশীলগণ বরং মজা করে বলেন -'(অগায়ুন বেখোরিদ অ জিয়াদ বেগিরিদ, কাবেলি না দারেহ)! মানে- যা খাবার খাও এবং তার থেকে বেশি নিয়ে যাও, কোনো পয়সা দিতে হবে না।'
কোর্সের শিডিউলের ফাঁকে ফাঁকে অফিসিয়ালি ঘুরতে যাওয়ার সময় নানান দেশ হতে উড়ে আসা ভাইদের সাথে বিভিন্ন ধরনের আলোচনায় উঠে আসে এত বাধা-বিপত্তি, অর্থনৈতিক বিধি-নিষেধ আরোপ সত্তেও কিভাবে এতো দ্রুত উন্নয়ন করছে আর কিভাবেইবা পচনশীল পশ্চিমা রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে দীন-ধর্ম- ইসলামকে আঁকড়ে ধরে শনৈ শনৈ সমৃদ্ধ হচ্ছে। একরের পর একর বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সবুজের বুক চিড়ে প্রাকৃতিক পরিবেশে বিশাল বিশাল কল-কারখানা ও শিল্প প্রোডাকশন হাউসগুলো দেখে আমাদের দেশের ইপিজেডগুলোর হতাশাব্যঞ্জক দৈন্যতা বড্ড চোখে লাগে। আমরা এক-একদিন এক একটা শিল্প-কারখানায় দল বেঁধে ঘুরতে যেতাম আর আসার সময় সেই কারখানা থেকে উত্পাদিত পণ্য-সামগ্রী উপহার স্বরূপ নিয়ে আসতাম। বিভিন্ন কারখানায় ওনাদের মেহমানদারী ছিল বলার মতো। ওনাদের চোখে আমরা যেন এক-একজন ভি আই পি বিজনেস ম্যাগনেট।
প্রকৃতি যেন উদার হস্তে ইরানকে ঢেলে দিয়েছে। খনিজ সম্পদের উপর ভাসছে পুরো দেশ। কলেবরের সীমাবদ্ধতার দরুন নিজেকে খুবই অসহায় মনে হচ্ছে। খুব সাদামাটাভাবে বললে, আমরা গিয়েছিলাম আলামুত পর্বত মালার সর্বচ্চো চূড়ায়, সাঁতার কেটেছিলাম প্রকৃতির অনিন্দ জলজ-কন্যা 'দরিয়াচেহ ইভানে।' 'গারে আলী সদের' এর হিম শীতল পানিতে প্যাডেল বোট চালিয়ে ঘুরে বেরিয়েছি আর বালখিল্য আনন্দ চিত্কারে নিজের প্রতিধ্বনি শুনে আমরা নিজেরাই শিহরিত। সহস্র বছরের পুরানো 'গারে আলী সদের' এর 'অবে চাশ্ম' পানির নিচে রেড কোরাল বা রক্ত প্রবল আর মুক্তো খোঁজার অদম্য ইচ্ছা থেকে অনেককেই দেখলাম চুপিসারে গা ছমছম করা অন্ধকার সেই গুহার মাইনাস তাপমাত্রার পানিতে ঝাপ দিতে।
বোরকা বা হিজাব শুধু পর্দা বা ফরজ অনুশীলন ছাড়াও যে আলাদা একটা শিল্পে রূপ পেতে পারে তা ইরানের আল্ট্রা -মডার্ন তরুনীদের না দেখলে আমার অজানাই থেকে যেত। হতে পারে তারা ইহুদি, খ্রিস্টান কিংবা যরথুস্ত্রিও অথবা মুসলিম, কিন্তু রাষ্ট্রীয় আইন কিংবা শরিয়া অনুশাসন পালনের নামে অনেককেই দেখলাম স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটার কি নির্মোহ চেষ্টা। তারপরও সেখানে নারীদের কর্ম পরিবেশ সত্যি অসাধারণ। আমাদের লোকাল বাসের মত সেখানে লোকাল ট্যাক্সি আছে যেখানে রাতের দশটা বাজেও নারীরা সেই লোকাল ট্যাক্সিতে ড্রাইভারের পাশে কিংবা পিছনে দুই অপরিচিত যাত্রীর মাঝখানে বসে গন্তব্যে চলেন খুবই স্মার্টলি। নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা সেখানে এতটা বিদ্যমান যে নারী নির্যাতন -ধর্ষণ শব্দগুলো সেখানে খুবই বেমানান।
আবার ফিরে যাই ইস্ফাহানের অলিতে-গলিতে। চোখের সামনে ভেসে উঠে শহরের এই মাথা থেকে ও-মাথায় অসংখ ব্রিজ। নির্মান- শৈলীর দিক থেকে খুবই কারুকার্যময় ও সুসংহত। ইস্ফাহান শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে যা'য়াইন্দে রুদ নদী। নদীটি শহরটিকে দুইভাগে ভাগ করে দিয়েছে। নদীটি পূর্ব-পশ্চিমে হওয়ায় শহরটি উত্তর-দক্ষিণে বিভক্ত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ইরানের মধ্যে সবচে জলটৈটুম্বুর নদী হলো এই যা'য়াইন্দে রুদ । খা'জু ব্রিজ বা সেতু, আল্লাভারদিখান সেতু বা সি ও সেহ সেতু, শাহরেস্তান সেতু, এবং এই সেতুগুলো সত্যি দেখার মতো। সি ও সেহ সেতুটি দৈর্ঘ্যে তিন শ' মিটার আর প্রস্থে চৌদ্দ মিটার। যাইয়ান্দে রুদের উপরে যতোগুলো সেতু আছে তাদের মধ্যে সবচে লম্বা সেতু এটা।
যাযাবর জীবনের কিছু খন্ড চিত্র আমরা দেখলাম মাজেন্দারান যাবার পথে ইমাম রেজা বাজারে ঢোকার মুখে। কি বিচিত্র মানুষের জীবন। বেঁচে থাকার সংগ্রামে লিপ্ত মানুষগুলোর মেহমানদারী এবং অমায়িক হাসির আড়ালে অভাবের দৈন্যতা চাইলে কি ঢেকে রাখা যায়, কোনো ফাঁক-ফোকর দিয়ে তা ঠিকই উঁকি দিয়ে থাকে। অথচ এই মানুষগুলোর কেউ সরকার বা ইসলামী অনুশাসনের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ নয়। দেশপ্রেমের প্রতি তাদের স্পৃহা খুবই ঈর্ষণীয়।
ইরানে যে ক'দিন ছিলাম প্রতিদিনই খাওয়ার সময় স্বদেশের মায়া অনুভব করেছি, বিশেষ করে দেশীয় খাবার আর ঝাল-যুক্ত খাবার এতো বেশি মিস করেছি যে বাধ্য হয়ে কিছু ইন্ডিয়ান কাঁচা মরিচ কিনে ফ্রিজে রেখেছিলাম এবং খাবার সময় পকেটে নিয়ে ঘুরতাম। ইরানিরা তাদের প্রত্যেকটা খাবার মনে হয় চিনি দিয়ে রাঁধে। যেকোনো পার্টিতেই খাবারে তাদের রুটি, মাখন ও পনির থাকা চাই'ই চাই।
কাজভিনের দিনগুলো ছিল খুবই ব্যস্তময়। কোর্স, ক্লাস, প্রোগ্রাম, আর রাতে ফ্লাডলাইটের আলোয় ফুটবল খেলা কিংবা ইনডোর মাঠে বাস্কেটবল খেলা ও ক্যাম্পাসের বাইরে সুইমিং পুলে সাঁতার কাটতে যাওয়া ছিল রোজকার রুটিন। স্বদেশী দু'তিনজন ছাত্র যারা আগে থেকেই কাজভিন ক্যাম্পাসে থেকে বিভিন্ন সাবজেক্ট নিয়ে পড়া-শুনা করছেন, একজন দেশী ভাই পেয়ে ওনাদের আন্তরিকতা ও অনভ্যস্ত হাতে দেশী খাবার তৈরী করে মেহমানদারী করা, সত্যি আমার পক্ষে ভুলে যাওয়া অসম্ভব।
ইরানের সর্বোচ্চ পাহাড় হচ্ছে দামাভান্দ পাহাড়। ঢাকা শহরের ইট-কংক্রিটের হাইরাইজ বস্তিতে সিঁড়ি ভাঙ্গতে অভ্যস্ত হলেও ইরানে গিয়ে আমার ‘আলবুর্জ’ কিংবা ‘দামাভান্দ’ পাহাড় বেয়ে চূড়া উঠা কষ্ট-সাধ্য ও ক্লান্তিকর একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা চেষ্টা ছিল। সবার আগে পায়ে হেঁটে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে পুরস্কার পাওয়ার লোভ থেকে দু'চারজন অতি চালাকের দেখাদেখি আমিও গাধার পিঠে চড়ে ভিন্ন ট্রেইল অনুসরণ করে পাহাড়ে উঠার চেষ্টা করেছিলাম, তবে মাঝপথেই আমাদের ছলা-কলা ধরা পরে যাওয়ায় সেখানেই যাত্রার বিরতি টানতে হলো। তবে ভ্রমনের সেইদিনগুলো অনেক আনন্দের ছিল।
একটা সুসংহত সমাজ, একটা কার্যকর রাষ্ট্র গঠনের জন্য যে একটি অনুকরণীয়, অনুসরণীয় চরিত্র ও তার আদর্শ একান্ত প্রয়োজন; তা ইরানের খেঁটে খাওয়া মানুষ ও তাদের সর্ব-শ্রদ্ধেয় নেতা ইমাম খোমেয়েনি (র.) এর প্রতি নিষ্শর্ত আনুগত্য দেখে উপলব্ধি হলো। বিভিন্ন জাতির বসবাস ইরানে, বিশেষ করে জরথুস্ত্রিও ও ইহুদিদের সাথে অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠির যে বিশ্বাস ও আকীদাগত মতপার্থক্য তা একসূত্রে বেঁধে সবাইকে দেশপ্রেমের আদর্শে অনুপ্রানিত করার জন্য একজন ইমাম খোমেয়েনি (র.) যে খুবই প্রয়োজন তা বাংলাদেশের বর্তমান অসামঞ্জস্য পরিস্থিতিতে সহজেই অনুধাবনযোগ্য।
farhad fozlul bary
Friday, 20 June 2014 - 9:21pm