রবিবার, ৩১ মে, ২০১৫

ভারত বেড়াতে যেতে পারেন তমলুক



ভ্রমণ করে না অথবা করতে চায় না এমন মানুষ এই দুনিয়ায় পাওয়া বড় মুশকিল। একজন পর্যটক হিসেবে আপনি ঘুরে আসতে পারেন গোটা বিশ্ব। দেশের বাইরে ঘুরে আসতে চান? তবে স্বদেশ মূল্যে ঘুরে আসতে পারেন বিদেশ। আর এই বিদেশ অন্য কোন দেশ নয়। আমাদেরই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত। যে দেশের মধ্যে রয়েছে একদিকে মরুভূমি, অন্যদিকে বরফ আচ্ছাদিত পাহাড়, পর্বত, সমুদ্র, জঙ্গল, স্থাপত্য, পুরাকৃর্তি ইত্যাদি। পর্যটকদের আকর্ষণের জন্য রয়েছে সব ধরনের বিনোদনের ব্যবস্থা, প্রাকৃতিক সম্পদের অফুরন্ত সম্ভার। প্রবাদ আছে, ‘সমগ্র ভারত ভ্রমণ করলে পৃথিবীর অর্ধেক দেখা হয়ে যায়’। আর আপনি যদি একজন পর্যটক হিসেবে ভারতে ভ্রমণ করতে চান, তবে তার গোড়াপত্তন ও ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কে জানা উচিত। ভারত ঘুরে এসে ভ্রমণ পিপাসু পাঠকদের উদ্দেশ্যে পর্যটন বোর্ড ও ভারতীয় ভ্রমণ সঙ্গী গাইডের অবলম্বনে লিখেছেন রোটা. মো: রিয়াজ উদ্দিন (পূর্ব প্রকাশের পর) প্রাচীন বাংলার রাজধানী তথা খ্রিপূ কালের বন্দরনগরী তাম্রলিপ্ত-আজকের তমলুকও বেড়িয়ে নিতে পারেন চলার পথে। এই তমলুকই ভারত ছাড়ো আন্দোলনে শহীদ হন মাতঙ্গিনী হাজরা। নানান কিংবদন্তিতে ঘেরাওড়িশি শৈলীতে বৌদ্ধরীতিতে মাকড়া পাথরে গড়া তমলুকের বর্গভীমা মন্দিরে প্রাচীন তারামূর্তি রয়েছে। ব্যাঘৃচর্ম পরিহিত চতুর্ভুজ দেবী শবের উপর আসীন। পৌষ সংক্রান্তিতে বারুণীর মেলা মন্দিরের আর্কষণীয় উৎসব। এছাড়াও মন্দির রয়েছে আরও নানান। রাজবাড়িটিও আজ হেরিটেজ তালিকাভুক্ত। আর আছে শুঙ্গ, মৌর্য, কুষাণ, গুপ্ত, পাল ও মধ্যযুগের পুরাকীর্তির নানান কিছু সম্ভারে সমৃদ্ধ তাম্রলিপ্ত মিউজিয়ম, শহীদ স্মৃতি ভবন ও শ্রীরামকৃষ্ণ মিশণ তমলুকে। থাকারও হোটেল আছে পৌরভবনের কাছে শ্রীনিকেতন, হাসপাতালের কাছে ক্লাসিক লজ ও রূপনারায়ণের কাছে গ্রিণভ্যালী হোটেল ও রির্সোট। মুহুর্মহু বাস যাচ্ছে ১৬ কিমি দূরের মহিয়াদল, আরও ৮ কিমি যেতে গেঁওখালি। লঞ্চে হুগলি নদী পেরিয়ে নুরপুর হয়েও ফেরা যেতে পরে গৃহপানে। দীঘায়-মেচেদা বাসও যাচ্ছে তমলুক হয়ে। তেমনিই তমলুকের ১৬ কিমি দূরে পরিখায় ঘেরা দ্বীপ অতীতের ময়নাগড়-ও বেড়িয়ে নেওয়া যায়। পুব ও উত্তর জুড়ে কংসাবতী, দক্ষিণে কেলেঘাই আর পশ্চিমে চন্ডিয়া নদী। পরিখায় ঘেরা বৌদ্ধ নরপতি মহাবীর লাউসেনের রাজধানী ময়নাগড়ে বৌদ্ধ সঙ্ঘারামও গড়ে ওঠে সেকালে। তবে, অতীত লুপ্ত হয়ে আজকের ময়নাগড় খ্যাত রাসমেলার জন্য। রাসপূর্ণিমার প্রতি রাতে (৭দিন ব্যাপী) শ্যামসুন্দর জিউ আসেন আলোয় ঝলমল সুসজ্জিত নৌকায় চড়ে গড় থেকে রাসমঞ্চে। যাত্রীও আসেন দূর-দূরান্ত থেকে শ্যামসুন্দরের শোভাযাত্রার সাথে অতীত রোমন্থন করতে। থাকার কোনও ব্যবস্থা নেই ময়নাগড়ে-নিকটতম হোটেল তমলুকে মেলে। সরাসরি যাত্রায় হওড়া থেকে ট্রেনে মেচেদা (৫৯ কিমি) পৌঁছে বাসে শ্রীরামপুর থেকে (২৬ কিমি) হয়ে চলায় দূরত্ব কশে। শ্রীরামপুর থেকে ১ কিমি দূরে ময়নাগড়। হাওড়া রেল স্টেশন থেকে বাসও যাচ্ছে ৯২ কিমি দূরের শ্রীরামপুরে। ঘন্টা তিনেকের পথ। দিনে ফেরাও যায় ময়নাগড় বেড়িয়ে কলকাতায়। ঝাড়গ্রাম/ কাঁকড়াঝোড় হাওড়া থেকে দক্ষিণ-পূর্ব রেলে ট্রেন যাচ্ছে আড়াই ঘন্টায় ১৫৫ কিমি দূরের ঝাড়গ্রাম। ৫-৬ ৫য় ইস্পাত এক্স, শালিমার থেকে ১৫-০০টায় লোকমান্য তিলক এক্স, হাওড়া থেকে ১৭-৩০এ স্টিল এক্স, ২১-৩৫এ হাওড়া-কোরাপুট, ২২-২০এ হাতিয়া এক্স যাচ্ছে হাওড়া থেকে খড়গপুর/ঝাড়গ্রাম/ঘাটশিলা হয়ে টাটা। আর যাচ্ছে ২-২৫ থেকে ২৩-৫০এ নানান লোকাল ট্রেন হাওড়া থেকে খড়গপুর/মেদিনীপুর। লোকাল ট্রেনে আড়াই ঘন্টায় খড়গপুর পৌঁছে ৫-৩৫, ৯-১৫, ১৫-১৫, ১৮-২০, ২১-০০টায় খড়গপুর-টাটা/ঘাটশিলা মেমু প্যা ট্রেনে ৩/৪ ঘন্টায় ঝাড়গ্রাম চলা যেতে পারে। এক্স ট্রেন থেকে সময়ে আধিক্য লাগলেও ভাড়ায় সাশ্রয় মেলে। ঈঝঞঈ-র বাসও যাচ্ছে ৮ ঘন্টায় কলকাতার শহীদ মিনার থেকে ১২-০০টায় ছেড়ে কলকাতা-মুম্বাই ঘঐ-৬ ধরে ২৪৬ কিমি দূরে লোধাশুলি থেকে ডানহাতি পথে গড় শালবনী হয়ে ১৪ কিমি গিয়ে ঝাড়গ্রামে। কলকাতায় ফেরে ঝাড়গ্রাম থেকে ৫-০০টায়। আর প্রাইভেট বাস যাচ্ছে হাওড়া স্টেশন থেকে ৫-৩০ থেকে ১৫-২০এ। প্রাইভেট বাস ফেরে৫-৩০এ প্রথম ছেড়ে ১৩-১৫য় শেষ। এছাড়াও বাস যাচ্ছে দীঘা, মেদিনীপুর, খড়গপুর, মুকুটমণিপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, বেলপাহাড়ি, তামাজুড়ি ছাড়াও মেদিনীপুর জেলার দিকে দিকে ঝাড়গ্রাম থেকে। শাল, পিয়াল, শিমুল, জারুল, মহুয়ায় সাজানো প্রকৃতির সাজঘর ঝাড়গ্রাম। রুখু মাটি শাল-পিয়াল-আকাশমণি-সোনাঝুরির গা বাঁচিয়ে লাল কাঁকুরে পথঘাটে। বসতিও শাল-পিয়ালের ফাঁকে ফাঁকে চলতে ফিরতে পথেঘাটে। জলবায়ু স্বাস্থ্যপ্রদ। ঝাড়গ্রামের জল উদরঘটিত ব্যাধিতে মহৌষধির কাজ করে। ঋতুভেদে বদলও ঘটে প্রকৃতিতে। গ্রীষ্মের দিনগুলিতে মহুয়ার মৌতাত বাতাসকে ভারী করে তোলে। বর্ষায় মঞ্জরী ধরে শালের শাখে শাখে। ঝরঝর মুখর বাদল দিরে রিমঝিম তান- সেও যেন মৌতাত ধরায় ঝাড়গ্রামের মাধুর্যে। চাঁদনী রাতে মাধুর্য বাড়ে আরও বেশি। প্রকৃতিই মুখ্য দ্রষ্টব্য ঝাড়গ্রামে। তবে, উচিত হবে ঝাড়গ্রামের সঙ্গে জুড়ে দিনভর প্রোগ্রামে জিপ বা গাড়িতে ১০০০-১২৫০ টাকায় জঙ্গলমহল-জামবনি-চিল্কীগড়-গিধনি-বেলপাহাড়ি-কাঁকড়াঝোড়-ঘাঘরা-তারাফেনি ব্যারেজ বেড়িয়ে নেওয়া। রেল স্টেশন থেকে ৩ কিমি দূরে শহরের উপকন্ঠে ঝাড়গ্রাম প্যালেস অর্থাৎ চক মিলানো রাজার বাড়ি। হোটেল বসেছে একতলায়। বিশেষ অনুমতিতে রাজবাড়ি দেখার ব্যবস্থা মেলে। আর আছে চতুর্মুখ শিব, লোকেশ্বর বিষ্ণু, মনসা দেবীর মন্দির। স্বল্পদূরে কিংবদন্তি খ্যাত সবিতার দাসী সাবিত্রী মন্দির। অতীতে মন্দির ছিল পাথরের, বর্তমান মন্দিরটি ১৯২০এ তৈরী। পেটিকায় মানবী দেবী সবিতার কেশও খড়গ পূজিত হচ্ছে আজও। বিগ্রহ হয়েছে চন্দন ও সিন্দুরে। প্রতিদিন ৯-৩০, ১২-৩০ ও সূর্যাস্ত থেকে ২ ঘন্টা খোলা থাকে মন্দির। আর আছে শহর থেকে ৩ কিমি দূরে কৃষ্ণনগরে ১৯৮৩-তে গড়া ৩৪.৫ হেক্টর ব্যাপ্ত ঝাড়গ্রাম ডিয়ার পার্ক তথা মিনি চিড়িয়াখানা। বিশাল এক দিঘীকে ভর করে মনোরম পরিবেশে রূপ পেয়েছে। টিকিট ৪্। আর আছে রঘুনাথপুরের আদিবাসী সংস্কৃতি পরিষদ। ঝাড়গ্রামের বিক্রমজিৎ মল্ল উগাল দেব বাহাদুরের খনন করা রাধানগরে ১০০ একর ব্যাপ্ত বিশাল দিঘী অর্থাৎ কেচেন্দা বাঁধ বা রাজবাঁধ, এরই সামনে মনোরম পরিবেশে সেবায়তন আশ্রম। অতিথিশালাও হয়েছে আশ্র্রমে। চলার পথে আর এক দিঘী মেলাবাঁধ। রিকশায় একে একে দেখে নেওয়া যায় ৫০ টাকায়। রেল স্টেশন থেকে ১০, লোধাশুলির ৫ কিমি দূরে কলকাতার আড়িয়াদহর অজয় ঘোষাল মহাশয়ের শখ ও স্বল্প রূপ পেয়েছে ২০ বিঘা ব্যাপ্ত জঙ্গলমহল, হর্টিকালচার তথা বটানিক্যাল গার্ডেন। রংবেরঙের শতাধিক ধর্মী গোলাপের বাগিচায় নানান বর্ণের গোলাপের সাথে ব্ল্যাক প্রিন্স অর্থাৎ কালো গোলাপ, ক্যাকটাস, অর্কিড, জীবজন্তু, ফুলফল গাছগাছালির জঙ্গলমহল আজ ঝাড়গ্রামে অন্যতম দ্রষ্টব্য। থাকারও ব্যবস্থা মেলে ঔঁহমষব গধযধষ জ ঐ, উ ২০০-৩০০। রেশন নিজস্ব ব্যবস্থায় সঙ্গে নিতে হয়। সিটি বাস যাচ্ছে শহর থেকে। অটোও মেলে, যাতায়াত ১২৫। আর পথেই পড়ে বাস রোডে পাশাপাশি মহারাজ উদ্যান বাটী। মল্ল রাজাদের খাস মহলে ৪০ বিঘা ব্যাপ্ত উদ্যানে জঙ্গলের আদিমতাকে অক্ষুন্ন রেখে প্রকৃতি প্রেমিকদের জন্য মহুয়া ও কাজু বাগানে ঝষনড়হর জবঃৎবধঃ হয়েছে। টেলিস্কোপও বসেছে। আহারেও অভিজাত ও আন্তরিক বাঙালিয়ানা বর্তমান। জঙ্গলমহল থেকে সরাসরি বাসের অমিল হলেও ঝাড়গ্রাম থেকে চিল্কীগড়/গিধনিমুখী বাসে জঙ্গলমহলের পথে ২ কিমি এসে ডানহাতি ১১ কিমি যেতে জামবনি পেরিয়ে আরও ৫ কিমি গিয়ে চিল্কীগড়। রজক অর্থাৎ ধবরদের হারিয়ে উপাধিধারী ধলভূম রাজদের রাজবাড়ি ডুলুং নদী পেরিয়ে চিল্কীগড়ে। ব্রিটিশের বিরুদ্ধে প্রথম গণবিদ্রোহ চুয়াড় বিদ্রোহে শামিল হন রাজা। দেবতাও রয়েছেন নানান রাজবাড়ি চত্বরে। চিল্কীগড়ের প্রশস্তি গড় বা জঙ্গলমহল দুর্গ ও মন্দিরের জন্য। পথ থেকে সরে প্রকৃতির যাদুঘরে অতীতের পঞ্চরতœ মন্দিরটি পরিত্যক্ত হতে ১৩৪৮এ গড় জঙ্গলের মাঝে পিঢ় রীতিতে নতুন করে মন্দির হয়েছে অশ্বারূঢ়া, ত্রিনয়না, চতুর্ভুজা, অষ্টধাতুর জাগ্রতা শাক্তদেবী কনকদুর্গার। দীর্ঘ অতীতে কনক অর্থাৎ সোনার দেবীকেও লুঠ করে ভাস্কর পন্ডিত। স্বপ্নাদিষ্টা ৩০০ বছরের প্রাচীন দেবীও রয়েছেন বেদিতে। অতীতে প্রতি অমাবস্যায় নরবলির প্রথা ছিল। আর আজ ছাগ ও মহিষ বলি হচ্ছে নবমীর রাতে কনকদুর্গা সকাশে। অরণ্য চিরে নিচু দিয়ে বয়ে চলেছে ডুলুং নদী চড়–ইভাতির আদর্শ পরিবেশ চিল্কীগড়। থাকারও ব্যবস্থা মেলে মন্দিরের যাত্রী আবাসে। যাতায়াতের পথে জামবনির সন্নিকটে শীতের দিনে কেন্দুয়া গ্রামে (যতীন মাহাতোর বাড়ী) পরিযায়ী পাখির রোজনামচা দেখে নেওয়া যায়। মন্দির রেখে রাজবাড়ি দেখে ৬ কিমি যেতে গিধনি। রেলও আসছে ঝাড়গ্রাম থেকে পরের স্টেশন গিধনি (১৫ কিমি)। হাওড়া থেকে ১৭০ কিমি দূরে পশ্চিমবাংলার প্রান্তভূমি গিধনি। আকাশ জুড়ে ঝাড়খন্ডের বাতাস। শালবন চিরে পথ চলে ডুলুং নদী। অনুকুল ঠাকুরের শিষ্যদের উদ্যোগে আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল। রাঙাপথের বাঁকে বাঁকে ছোট ছোট গ্রাম, মেটে বাড়িঘর। পুটুশ, বনতুলসী, কুসুম, মহুয়া বনে মুন্ডা, সাঁওতাল, মহালি, শবরদের বাস। ১৯৫৫র ১লা এপ্রিল ২২ হেক্টর বনভূমি ৩ বিটে ভাগ হয়ে নাম হয়েছে তার আমতোলিয়া, কানাইসোল আর গদরাসোল। গিধনি থেকে ১কিমি দূরে নীল আকাশের গায়ে সারস, টিয়া, শালিকের কোলাজ কানাইসোল। কানাইসোল বাংলোর অদূরে একদিকে পরিহাটি অপরদিকে চিল্কীগড়। অদূরে দলমা পাহাড়- ভালুক, হাতি, হায়নারা অভিসারে নামে পাহাড়ে থেকে। এ পথে আরও যেতে বেলপাহাড়ি। সরাসরি বাসও পাওয়া যায়। ঝাড়গ্রাম/মেদিনীপুর ছাড়াও দিগি¦দিক থেকে বেলপাহাড়ি, তামাজুড়ি/ঝিলিমিলির। ঝাড়গ্রাম থেকে ৪৫ কিমি দূরে শালে ছাওয়া টিলা টিলা সুন্দর পাহাড়ি। ঝাউ, মহুয়া, পিয়াল, ইউক্যালিপটাস, সোনাঝুরি, আর শিরীষও ছাতা ধরেছে বেলপাহাড়ির শিরে। সুন্দর নৈসর্গিক শোভার মাঝে সহজ সরল মানুষজন। চোখে পড়ে কনাইসোল পাহাড়ের ভালে টিকলি হয়ে পূর্ণিমার চাঁদ। পাহাড়তলিও ঠিকরে পড়া আলোয় উদ্ভাসিত। মকর সংক্রান্তিতে এলাকা জুড়ে টুসুর উৎসব চলে। দোকানপাট, খাবার হোটেল আছে। সপ্তাহান্তিক ছুটি কাটাবার মনোরম পরিবেশ।বেলপাহাড়ি থেকে লাল সুরকির পথে ৯ কিমি দূরে আর এক স্বপ্নপুরী ঘাঘরা। বাসের চল নেই- জিপ যাচ্ছে। আবার পায়ে পায়ে ট্রেক করেও মিনিট চল্লিশে চলা যায় ঘাঘরায়।

ভাদ্র ১৪২১, সেপ্টেম্বর , ২০১৪

ডুয়ার্সের জঙ্গলে কয়েকদিন

১) যাত্রারম্ভ -- শিলিগুড়ি
বাগডোগরায় উড়ে গিয়ে ডুয়ার্স ভ্রমণ শুরু করার বাসনা আমার মনে আদপেই ছিল না। বরং ইচ্ছে ছিল রাত্তিরে দার্জিলিং মেলে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যাবার, যাতে করে ভোরবেলা হাতমুখ ধুয়ে ফিটফাট হয়ে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নামতে পারি। কিন্তু বিধি বাদ সাধলেন। যাবার দিনে কোনো রাতের ট্রেনেই রিজার্ভেশন পাওয়া গেল না। দার্জিলিং মেলের বাতানুকুল দ্বিতীয় শ্রেণীর শায়নযানে দেখি সাতচল্লিশজনের নাম রয়েছে প্রতীক্ষারতদের তালিকায়। প্রথম শ্রেণীতেও দশজনের বেশী “ওয়েট লিস্টে”। অগত্যা উড়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিতেই বাধ্য হলাম।
বাগডোগরা বিমানবন্দর দেখে ভালো লাগলো – ছোটো হলেও বেশ ছিমছাম ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। টারমাকে ভারতবর্ষের প্রায় সবকটি অন্তর্দেশীয় বিমানসংস্থার প্লেন দাঁড়িয়ে আছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাবার জন্য। কিন্তু বেরুতে গিয়ে এক অপ্রত্যাশিত বাধার সম্মুখীন হলাম। পার্কিং লটে আমাদের গাড়ী আটকে দেওয়া হোলো, কারণ ওই সময় পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শ্রীমতী মমতা ব্যানার্জি সদলবলে শিলিগুড়ি থেকে কলকাতা ফিরছিলেন “উত্তরবঙ্গ উৎসব” উদ্ধোধন কোরে। আমি বুঝতেই পারিনি যে সম্পূর্ণ অজান্তে আমার সফর আর উত্তরবঙ্গ উৎসব একই সঙ্গে পড়ে গেছে। এই উৎসব একটি প্রায় সপ্তাহব্যাপী বাৎসরিক অনুষ্ঠান যেটি উত্তরবঙ্গের একাধিক শহরে একই সময় উদযাপিত হয় শিল্পী এবং প্রোগ্রাম ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ও ভাগাভাগি করে। এ লেখার শেষে আমি আবার উত্তরবঙ্গ উৎসবে ফিরে আসবো।
বাগডোগরা থেকে শিলিগুড়ি যাবার পথে স্বভাবতঃই ছিল গাড়ীর ভীড়, ট্র্যাফিক জ্যাম ও পুলিশের ছড়াছড়ি। এই আমার দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর পরে শিলিগুড়িতে আসা, তাই বহির্দৃশ্য যথাসাধ্য উপভোগের চেষ্টা করলাম। গাড়ী গেল নর্থ বেঙ্গল ইউনিভার্সিটির প্রধান দরজার পাশ দিয়ে – এটা পঞ্চাশ বছর আগে ছিল না। তবু বলব যতটা শুনেছিলাম শিলিগুড়ি ঠিক ততটা ইঁট আর কংক্রীটের বিশাল শহরে পর্যবসিত হয় নি। কিছু উঁচু উঁচু বাড়ি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু গ্রাম বাংলার মিষ্টি ছাপ এখনো যথেষ্ট রয়েছে।
আমার প্রথম গন্তব্যস্থল ছিল একটি চার-তারকার নিরামিষ হোটেল। (এহেন ব্যাজস্তুতি কি একমাত্র ভারতবর্ষেই সম্ভব?) জায়গাটির সন্ধান দিয়েছিল আমার এক ভ্রমণে অভিজ্ঞ শ্যালক – বলেছিল যাত্রারম্ভে সমীচীন হবে। কথাটা মন্দ বলেনি। হাজার হোক চার তারকা তো পেয়েছে! দেখলাম ঘরগুলি সুন্দর, কল খুললে ঠাণ্ডা এবং গরম দুরকম জলই পড়ে, ডিনারে মেলে সুস্বাদু নিরামিষ খানা, ও রাত্রে “বার”টি ঠাসা থাকে বিদেশী মাদকদ্রব্যের দামী বোতলে। কিন্তু “সিণ্ড্রেলা” নামটিতে খটকা লাগলো – সিণ্ডারেলা নয় কেন? হোটেলের মালিককে সে প্রশ্ন করায় তিনি লজ্জিত মুখে স্বীকার করলেন যে সেটি তারই ভুল; উচ্চারণটি চারিপাশে ওইরকম শুনে শুনে বানানটি ভুল করে বসেছেন। এটি হোটেলটির একটি অতিরিক্ত বিশেষত্ব বলা চলতে পারে।
হোটেলের মালিকের সাথে দেখা করেছিলাম কারণ সে এবং তার পরিচিত ট্রাভেল এজেন্ট আমার ডুয়ার্স সফরের সব বন্দোবস্ত করে দিয়েছিল। কথায় কথায় জানলাম ভদ্রলোকের আদিপুরুষ এসেছিল বিকানীর থেকে। তার প্রপিতামহ এসে পত্তন গাড়ে আসামের তেজপুর শহরে এবং সেখানে ব্যবসা করে বেশ বিত্তশালী হয়ে ওঠে। কিন্তু ঊনিশশো বাষট্টির চীন যুদ্ধের পরে তার পিতৃপিতামহ সপরিবার উত্তর বাংলায় চলে আসে। তার অধুনা বিস্তৃত পরিধির ব্যবসার মধ্যে রয়েছে হোটেল ছাড়াও একটি হিন্দী ভাষার দৈনিক সংবাদপত্র। শিলিগুড়ি থেকে প্রকাশিত হয় অনেক ভাষার দৈনিক পত্রিকা, যেটা অবশ্যই ওই অঞ্চলের বিভিন্ন ভাষাভাষী বাসিন্দাদের প্রতিফলনমাত্র।
২) জলদাপাড়া – বন্যপ্রাণীদের জন্য সংরক্ষিত এলাকা
ডুয়ার্স নামটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ দ্বার থেকে। ডূয়ার্স বলতে বোঝায় পূর্ব হিমালায়ের পাদদেশের সমতল ও পাহাড়ের নদীবারি সিঞ্চিত বন্যাপ্রবণ জায়গা, যেটা সিকিম ও ভুটানের পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের সমতলভূমিতে নামার দ্বারস্থান বিশেষ। নেপালের দিকে এই একই জায়গার নামকরণ হয় তরাই। ডুয়ার্সে ভারতের অধিকাংশ প্রান্ত থেকে আসতে হয় নেপাল ও বাংলাদেশ দিয়ে চাপা এক অতি সরু “করিডোর” দিয়ে, যার মাঝে রয়েছে অতি গুরুত্বপূর্ণ সেই শিলিগুড়ি শহর আর জংশন স্টেশন।
সিণ্ড্রেলা হোটেলে এক রাত কাটিয়ে আমি এবং আমার স্ত্রী পরের দিন রওনা দিলাম ভাড়া করা ভ্যানে চেপে জলদাপাড়া সংরক্ষিত বনাঞ্চল উদ্দেশে। শিলিগুড়ি থেকে রাস্তায় ডুয়ার্স যেতে গেলে তিস্তা নদী পার হতে হয় “করোনেশন ব্রিজ” দিয়ে। এই ব্রিজটা জল থেকে অনেক উঁচুতে দুটো পাহাড়কে সংযোজন করে; নীচে গভীর খাদের মধ্যে দেখা যায় জলধারা। সে এক অতি মনোরম দৃশ্য (প্রথম ছবিটি দেখুন)। ব্রিজটির নামকরণের কারণ এটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় ১৯৩৭ খৃষ্টাব্দে সম্রাট ষষ্ঠ জর্জের রাজসিংহাসন আরোহণের সময়। ব্রিজটির নির্মাণকার্য সমাপ্ত হয় ১৯৪১ সালে। এটিকে অনেক সময় “সেবক ব্রিজ”ও বলা হয় তৈরীর সময়কার তত্বাবধনকারী ব্রিটিশ আর্মি এঞ্জিনীয়ার সেবক সাহেবের নাম স্মরণ করে।

প্রথম ছবি - করোনেশন ব্রিজ থেকে তিস্তার বঙ্কিম দৃশ্য
জলদাপাড়া পৌঁছাতে দিনের বেশীরভাগটাই কেটে গেল। রাস্তাটি নামে জাতীয় সড়ক হলেও কার্যতঃ অনেক জায়গাতেই তার বেশ অবহেলিত ভাঙচুড় অবস্থা। গিয়েছে কখনো বনের ভেতর দিয়ে, কখনো ফাঁকা সমতলভূমি কেটে, কখনো বা শীতে প্রায় জলশূন্য নদীর উপর ব্রিজ ধরে। রাস্তার ধারে প্রত্যক্ষদৃশ্য বনজ সম্পদ – শাল, সেগুন, খয়ের, অর্জুন প্রভৃতি দামী কাঠের গাছ। কিন্তু যেটা আমাদের সবচেয়ে চোখে পড়ল ও আকৃষ্ট করল সেটা হল রাস্তার ধারে সারি সারি সুদৃশ্য চা-বাগান। চা গাছগুলো ওপর থেকে এমন নিপুণভাবে ছাঁটা যে দেখে মনে হয় দিগন্তবিস্তৃত সবুজ গালিচা কেউ পেতে দিয়েছে। শুধু মাঝে মাঝে গালিচা ফুঁড়ে উঠেছে ছত্রছায়াধারী কিছু গাছ। আমাদের সঙ্গের নেপালী ড্রাইভারটি স্বচ্ছন্দে বাংলায় কথা বলছিল; জানালো যে তার এক বড় ভাই ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে কার্গিল যুদ্ধে শহীদ হয়েছে। আমার উত্তর বঙ্গ ভ্রমণের একটি ফলশ্রুতি হোলো এই যে আমি ওই অঞ্চলের বাসিন্দা বিভিন্ন জাতি-উপজাতি সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারলাম। আর সেই সঙ্গে বুঝতে পারলাম ওই নানা সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দাবি-দাওয়া সর্বসম্মতিক্রমে মেটানোর সমস্যাটা কত দুঃসাধ্য।
সন্ধ্যাবেলা পৌঁছে গেলাম পশ্চিমবঙ্গ সরকার পরিচালিত জলদাপাড়া ট্যুরিষ্ট লজে। সুন্দর ছিমছাম পরিষ্কার এই অতিথিশালা ও তার সঙ্গে খাবার ব্যবস্থা। কাঠের দোতলা মজবুত বাড়ী তৈরী করা হয়েছে বনের ভেতরে একটু ফাঁকা জায়গায়। পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ছোট্ট পাহাড়ী ঝরণা, ওপরে সাঁকো। (শীতকালে অবশ্যই শুকনো, জলবিহীন)। ট্যুরিষ্ট লজের এক দিকে রয়েছে কেয়ারি করা ফুলের বাগান, আর মাঝখানে আছে সযত্নে পরিচর্যিত মাঠ ও মিনিয়েচার পাহাড় ও নালার মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা স্থানীয় পশু ও প্রাণীদের খোদাই করা মূর্তি। সেখানে দেখতে পাবেন প্রমাণ সাইজের হাতী, গণ্ডার, চিতা, নানারকমের হরিণ ও পাখী, এমনকি বিবিধ সাপ এবং বিছেও। শুধু তাই নয়, রাত্রে মূর্তিগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে শব্দ-ও-আলোর (“সন এ লুমিয়্যারের”) খেলায়। তখন বিভিন্ন প্রাণীর ওপরে আলো পড়ে আর নেপথ্যে শোনা যায় তাদের প্রকৃতি ও স্বভাবগত তথ্য। এই নেপথ্যবাণীতে পুরুষের কণ্ঠস্বর দিয়েছেন প্রখ্যাত অভিনেতা এবং প্রকৃতিপ্রেমী সব্যসাচী চক্রবর্তি।
ভারতবর্ষে সংরক্ষিত বনাঞ্চল রয়েছে তিন শ্রেণীর। “বন্যপ্রাণীর নিরাপদাশ্রয়” (“Wildlife Sanctuary”) হোলো এমন এক জায়গা যেখানে বন্যপ্রণীরা অবাধে বিচরণ করতে পারে মানুষের খুব একটা সংশ্রবে না এসে। “জাতীয় উদ্যান” (“National Park”) সংরক্ষিত এই অর্থে যে সেখানে গাছ কাটা নিষিদ্ধ। কিন্তু স্থানীয় লোকেরা সেখানে পোষ্যপ্রাণী (যেমন গরু, মোষ) চড়াতে পারে ও প্রান্তিক এলাকায় কিছু চাষ-আবাদও করতে পারে। আর “জাতীয় বন” (“National Forest”) সংরক্ষিত হলেও সেখানে গভর্মেন্টের তত্ত্বাবধানে কাঠুরিয়াদের গাছ কাটতে দেওয়া হয়; তবে গাছ কাটা হলে সেই জায়গায় গভর্মেন্ট আবার নতুন করে গাছ লাগায়।
পরদিন খুব ভোরে আমরা অন্যান্য অভিযাত্রীদের সঙ্গে রওনা হয়ে গেলাম জলদাপাড়ার মাঝখানে হোলং নামে একটা জায়গার উদ্দেশে। মুখ্য উদ্দেশ্য হাতীর পিঠে চড়ে খোলা জঙ্গলে বুনো পশু দেখতে যাওয়া। হোলঙে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বড়কর্তাদের জন্য তৈরী একটি সুন্দর বাংলো আছে। বাংলোটিকে বন থেকে তফাৎ করেছে তোর্সা-গামী একটি পাহাড়ী উপনদী। আসলে জলদাপাড়ার বনকে নানাস্থানে কেটে কেটে তোর্সার বেশ কয়েকটি উপনদী বয়ে গেছে। বাংলোর সামনে যে চওড়া নালাটা আছে, তার উলটো দিকে বনের সামনে কিছুটা জায়গা সাফ করা। সেখানে বন-বিভাগের কর্মচারীরা কয়েকটি নুনের ঢিপি চৈরী করে রাখে, যাতে করে বন্য প্রাণীরা (লবণের প্রয়োজনে) সেটা চেটে নালায় জল খেতে আসতে পারে। আমাদের ভাগ্য ছিল প্রসন্ন; পৌঁছানোমাত্রই দেখলাম সকালের কুয়াশা ভেদ করে একটি গণ্ডার ধীরে-সুস্থে, হেলতে দুলতে এগিয়ে আসছে নুনের ঢিপি চাটবার জন্যে (দ্বিতীয় ছবিটি দেখুন)।
দ্বিতীয় ছবি -- গণ্ডার এগোচ্ছে নুনের ঢিপির দিকে (হোলং, জলদাপাড়া)
আমাদের দল ছিল সকালের “সাফারি”র দু নম্বর গ্রুপ। প্রথম গ্রুপের হাতী ও আরোহীদের জন্য আপেক্ষা করতে করতে আমার কিছু জ্ঞানার্জন হল। যথা, প্রতি হাতীর পিঠে চারজন সওয়াড়ি বসতে পারে। তারা বসে হাতীর পিঠে বাঁধা একটা কাঠের বোর্ডের ওপর, যেটার চারিদিক দিয়ে সুরক্ষার কারণে “গার্ড রেল” দেওয়া থাকে। যাত্রীরা বসে একদিকে দুজন ও অন্যদিকে দুজন; সীটে বসে ধরে থাকে গার্ড রেল আর পা গলিয়ে দেয় রেলের তলা দিয়ে হাতীর পিঠের ধারে। সবচেয়ে মজার কথা, এই সাফারিতে যান হিসেবে কেবলমাত্র মেয়ে হাতী ব্যবহার করা হয়, কারণ তাদের পিঠ চওড়া ও চারটি যাত্রী নিতে সক্ষম। পুরুষ হাতীরা বেশী উঁচু এবং তাদের পিঠের গড়নটা ঢালু। সেখানে কাঠের বোর্ড দিয়ে চারজনের বসা সম্ভব নয়।
হাতীর পিঠে চড়তে হয় সিঁড়ি দিয়ে উঠে একটা কংক্রীটের প্ল্যাটফর্ম থেকে। আমার উঠে গিয়ে ঠিক জায়গায় বসতে বিশেষ অসুবিধে হোলো না। একটু চাপাচাপি ছিল অবশ্যই, কিন্তু হাতী চলাকালে কোনো অস্বস্তি বা কষ্ট হয় নি। আমাদের মা-হাতীটার সঙ্গে তার আবার একটা বাচ্চাও ছিল; সুযোগ পেলেই সে শুঁড় দিয়ে একটু একটু দুধ চুষে নিচ্ছিল। অল্প পরেই আমরা দেখতে পেলাম জঙ্গলে উঁচু ঘাসের মধ্যে আধখানা ঢাকা আরেকটা গণ্ডার। জলদাপাড়া বনের প্রকৃতি অন্ততঃ তিন রকমের – কোথাও ঘন জঙ্গল, কোথাও অনেকখানি জায়গা জুড়ে শুঘু উঁচু ঘাস, আর কোথাও বা মাঠের মাঝে হঠাৎ করে কতিপয় বড় গাছের সমষ্টি। আমরা যেতে যেতে প্রায়শঃই তোর্সার উপনদীগুলো পার হচ্ছিলাম (তৃতীয় ছবিটি দেখুন) আর হঠেৎ হঠাৎ করে দেখতে পেলাম (বাহারি শিংসহ) সম্বর হরিণ, গাউর (অথবা ভারতীয় বাইসন), ছোট সাইজের “বার্কিং ডিয়ার” ও নানা জাতের রঙ-বেরঙের পাখী। আমাদের সামনের হাতীর যাত্রীরা নাকি নিমেষের জন্য চিতাবাঘ দেখতে পেয়েছিল; আমরা পাই নি। বুনো হাতীও দেখিনি – ভাগ্য ভাল বলে কি? – আর মনে হয়না ওই বনে আসল বাঘ এখন আর আছে। যাই হোক, সব মিলিয়ে সাফারিটা হল এক আসাধারণ ও অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
তৃতীয় ছবি - হাতীর পিঠে চেপে জলদাপাড়ায় ছোট নদী অতক্রম
৩) চিলাপাতা ও গরুমারা
জলদাপাড়ায় সাফারি করে বিকেলে আমরা গেলাম চিলাপাতা জাতীয় বন দেখতে। আর পরের দুদিন ঘুরলাম গরুমারা জাতীয় উদ্যানের ভেতরে ও চারিপাশের অঞ্চলে। হাতীর পিঠে চেপে বেড়াবার মত মজা অবশ্য আর কোথাও করা যায় নি। পশুপাখীও জলদাপাড়ায় যা দেখেছি অন্য দু জায়গায় সেরকমটিই দেখলাম। তবে দু-একটা উল্লেখযোগ্য নতুন জিনিস দেখা গেলো।
প্রথমতঃ চিলাপাতার জঙ্গলের মাঝখানে গাইড আমাদের নিয়ে গিয়ে দেখাল “নল রাজার গড়ে”র ধ্বংসাবশেষ। সেখানে যাবার আগে কেউ একজন আমায় বলেছিল যে ওই নল রাজা আর মহাভারাতের নল ও দময়ন্তী উপাখ্যানের নায়ক একই। আমাদের গাইড সে প্রসঙ্গকে উড়িয়েই দিল অবাস্তব ও অনৈতিহাসিক বলে। আমাদের গাইডটি ছিল একটি অল্পবয়সী অত্যুৎসাহী ছেলে; বিজ্ঞানসম্মত ইতিহাসে তার বিরাট আস্থা। তার মতে চিলাপাতার নল রাজা ছিলেন স্থানীয় কোনো ছোটখাট অঞ্চলের অধিকর্তা। গড় বা দুর্গ বানিয়েছিলেন প্রজাদের উত্তর (সম্ভবতঃ ভুটান) থেকে আগত হানাদারদের অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করতে। দুঃখের কথা দুর্গের এখন চরম দুর্গতি – ভাঙ্গা ইঁটের দেয়াল আর তোরণের অবক্ষয় ছাড়া বিশেষ কিছুই অবশিষ্ট নেই। সেগুলোও আবার গাছ ও আগাছায় অনেকাংশে ঢেকে গেছে। সাপ ও বিছের ভয়ে আমি গড়ের ভগ্নদ্বার অতিক্রম করার চেষ্টা করিনি।
দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য জিনিস গরুমারা জাতীয় উদ্যানের “যাত্রাপ্রসাদ” দর্শনস্তম্ভ বা ওয়াচটাওয়ার। গরুমারাতে কোনো হাতীর পিঠে চড়ে সফরের ব্যবস্থা নেই। তার পরিবর্তে আছে বেশ কয়েকটি পশুপাখী দেখার পক্ষে উপযুক্ত বাঁধানো উঁচু জায়গা। সেসব ওয়াচটাওয়ার থেকে বন্যপ্রাণীরা নুন চাটতে বা জলপান করতে আসলে তাদের দেখতে পাওয়া যায়। “যাত্রাপ্রসাদ” নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক অভিনব গল্প। নামটি আসলে ছিল একটি পোষা পুরুষ হাতীর, যেটি গ্রামবাসী থেকে বনবিভাগের কর্মচারী সকলেরই খুব প্রিয় ছিল। কারণ সে একাধারে মানুষ থেকে শুরু করে শস্যক্ষেত্র রক্ষা করত বুনো বা পাগলা হাতীর কবল থেকে। হাতীটি মারা গেলে তার নামে তৈরী করা হয় সবচেয়ে আকর্ষণীয় দর্শনস্তম্ভ। আমরা “যাত্রাপ্রসাদ” থেকে দেখতে পেলাম আরো কিছু গণ্ডার, গাউর (ভারতীয় বাইসন) ও এক দল গায়ে গোলগোল ছাপওয়ালা চিতল হরিণ (চতুর্থ ছবিটি দেখুন)।


চতুর্থ ছবি – গরুমারার যাত্রাপ্রসাদ থেকে তোলা চিতল হরিণের দৃশ্য
গরুমারায় এসে আমার স্থানীয় আদিবাসী এবং উপজাতি সম্বন্ধে ধারণাটা আরো স্পষ্ট হোলো। উত্তর বাংলার আদিবাসীরা এক প্রজাতির নয়। এদের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন উপজাতি – যেমন সাঁওতাল, ওড়িয়া, রাজবংশী, ইত্যাদি। গরুমারায় আমরা একটি ওড়িয়া উপজাতির গাইড পেয়েছিলাম। “যাত্রাপ্রসাদ” থেকে ফেরার পথে সে আমাদের মানে যাত্রীর দলকে নিয়ে গেল একটা পাথরের বেঞ্চি দিয়ে গোল করে ঘেরা সুন্দর মাঠে। সেখানে একদল আদিবাসী তরুণী তাদের নিজস্ব চিত্তাকর্ষক গ্রুপ নাচ (“লাইন ড্যান্স”) করে আমাদের দেখাল। পরে গরুমারার কাছে অনেক দোকানে দেখলাম যে আদিবাসী গহনা ও হস্তশিল্প বিক্রী হচ্ছে। আগেই শিলিগুড়িতে নেপালী ড্রাইভার ছাড়াও অনেক গুর্খা দেখেছিলাম। গরুমারায় এসে বুঝলাম যে উত্তর বঙ্গের রাজনৈতিকি ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এবং সর্বজনগ্রাহ্যা শাসন ব্যবস্থা নির্ণায়নে গুর্খারা ছাড়াও বিভিন্ন আদিবাসী উপজাতিদেরও বড় ভূমিকা থাকতে বাধ্য।
৪) পারিপার্শ্বিক যাত্রা – ভুটান (ফুন্টশোলিঙ) ও সুন্তালিখোলা
ভারত-ভুটান সীমানার একদিকে আছে পশ্চিম বাংলার শশব্যস্ত শহর জয়গাঁও আর অন্যদিকে শান্ত ছবির মতো ভুটানের শহর ফুন্টশোলিঙ। ভারতীয়দের ভুটানে (বিশেষ করে সীমান্ত অঞ্চলে) ঢুকতে কোনো নিষেধ নেই; দু-দেশের সীমান্তরক্ষীরাই পাহাড়া দেয় বেশ ঢিলেঢালা ভাবে। আমি সেই ঢিলেঢালামি ও নিজের চেহারার সুযোগ নিয়ে গাড়ীতে করে দিব্যি ভুটানে ঢুকে পড়লাম সরকারী কাগজ-পত্র ছাড়াই। ঢুকে অল্প উঁচুতে একটি বৌদ্ধবিহার দেখতে গেলাম। বৌদ্ধবিহারটি তৈরী হয়েছে একেবারে পাহাড়ের গায়ে; সেখান থেকে নীচে শহরের ও অল্প দূরে খাড়া পাহাড়ের কোলে প্রবহমান তোর্সা নদীর এক অতি মনোরম দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায় (পঞ্চম ছবিটি দেখুন)।


পঞ্চম ছবি – বৌদ্ধবিহার থেকে তোলা ফুন্টশোলিঙ এবং তোর্সা নদীর দৃশ্য
ফুন্টশোলিঙ ছাড়াও গরুমারা থেকে আমি আরেকটা সাইড ট্রিপ নিয়েছিলাম দার্জিলিঙ জেলার সুন্তালিখোলা নামে সাতশ মিটার উচ্চতার একটি ছোট পাহাড়ী শহরে। যাত্রাপথে পড়ল গুডরিক কোম্পানীর বিখ্যাত চালসা চা-বাগান। তবে সাত্যি কথা বলতে কি সুন্তালিখোলা শহরটিতে বিশেষ কিছু দ্রষ্টব্য দেখতে পেলাম না। শহরের মাঝখানে কয়েকটি দোকান ও চায়ের স্টল ছাড়া অন্য কিছু চোখে পড়ল না। এটা অবশ্য বলতেই হবে যে একটু নীচে নেমে একটা রাজ্যসরকার পরিচালিত সুদৃশ্য “ট্যুরিষ্ট কটেজ” রয়েছে, আর তার কাছেই রয়েছে খাড়া পাহাড়ের মাঝখানে একটি ঝর্ণার ওপরে ঝুলন্ত সাঁকো। দুঃখের কথা শীতকালে ঝর্ণায় জলের তুলনায় উপলখণ্ডের আধিক্য ছিল। মনে মনে কল্পনা করে নিলাম বর্ষাকালে সরু নদীটি কেমন স্রোতস্বিনী হয়ে উঠবে। ফেরার পথে আরেকটি দ্রষ্টব্য জায়গা ছিল “সিনক্লেয়ার্স রিট্রিট” হোটেলের সামনের পার্কটি। এখান থেকে পাওয়া যায় গরুমারা জাতীয় উদ্যান ও বনের এক পূর্ণাঙ্গের অসাঘারণ দৃশ্য।
৫) উপসংহার – জাতি, উপজাতি ও তিস্তাপারের রাজনীতি
ডুয়ার্স ভ্রমণ আমার অনেক কারণেই মনে থাকবে। একদিকে দেখলাম নানান জায়গার অতি মনোরম দৃশ্য; অন্যদিকে জানলাম স্থানীয় জন্তু-জানোয়ার ও গাছ-পালা সম্পর্কে অনেক তথ্য। কিন্তু যে বিষয়ে আমার অপ্রত্যাশিত জ্ঞানলাভ হোলো তা হচ্ছে কী ধরণের লোক উত্তর বঙ্গে বসবাস করে, এবং সেই বিভিন্ন উপজাতির সহাবস্থানের প্রতিফলন কীভাবে ভবিষ্যতের রাজনীতির ওপরে পড়তে পারে।
বলতে পারেন এটা আমার অজ্ঞতা, কিন্তু আমি শিলিগুড়িতে গিয়েছিলাম এই ভেবে যে আমি একটি নিছক বাঙালী শহর দেখবো। ওখানে গিয়ে বুঝলাম যে ব্যাপারটা অতটা সহজ নয়। শিলিগুড়ির অধিবাসীদের মধ্যে রয়েছে বাঙালী ছাড়াও নেপালী, আদিবাসী ও ভারতবর্ষের নানা জায়গার মানুষের সংমিশ্রন। ফলতঃ সেখানে দেখা যায় নানা ভাষার দৈনিক পত্রিকা – বাংলা, হিন্দী, নেপালী, ইংরেজি – যাদের বেশীরভাগই শিলিগুড়ি থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। শিলিগুড়ি থেকে আমরা যত পূর্বদিকে (অর্থাৎ ডুয়ার্স অভিমুখে) যেতে থাকলাম, তত দেখতে পেলাম যে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে গুর্খার সংখ্যা কমছে ও আদিবাসীদের সংখ্যা বাড়ছে। এদের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় তফাৎও যে আছে তা বুঝলাম যখন লক্ষ্য করলাম ডুয়ার্সের গ্রামে গ্রামে রয়েছে ছোট ছোট গীর্জার সমারোহ। আর একটি জিনিস আমার বিশেষ করে দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ভুটান সীমান্তে ফুন্টশোলিঙের উলটো দিকে পশ্চিম বাংলার জয়গাঁও নামে যে শহরটি রয়েছে, সেখানে আমি মাত্র দুটি সাইনবোর্ডে বাংলা হরফে লেখা দেখতে পেলাম। এবং সে দুটি লেখাও হচ্ছে সরকারী দপ্তরের সুবাদে – যেমন ধরুণ পুলিশ স্টেশন। অথচ হিন্দী ও ইংরেজিতে লেখা সাইনবোর্ড দোকানে দোকানে অজস্র – এমনকি বাঙালী মালিকানার গয়নার দোকানেও। হঠাৎ আমার সামনে পরিষ্কার হয়ে উঠল পশ্চিম বঙ্গকে বিভাজন করে গুর্খাল্যাণ্ড, কামতাপুর ইত্যাদি তৈরীর তাগিদা ও উৎসাহ কোনখান থেকে আসছে। আর এটাও বুঝলাম উত্তর বঙ্গে গুর্খা ও আদিবাসীদের ক্ষমতার লড়াইয়ের উৎস কোথায়, যে কারণে প্রস্তাবিত “গুর্খাল্যাণ্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে”র সীমারেখা নির্ধারণে ও শাসনক্ষমতা বন্টনে এত অসুবিধে হচ্ছে।
ভবিষ্যৎ উত্তর বঙ্গকে কোন দিকে নিয়ে যাবে তা আন্দাজ করা শক্ত, কিন্তু এ কথা স্বচ্ছন্দে বলা যায় যে আগামী বেশ কয়েক বছর ধরে এর সমস্যা বাংলার রাজধানী কলকাতাকে বেগ দেবে। আসাম, উত্তর প্রদেশ ও মধ্য প্রদেশের ইতিহাস ভাবলে আমার মনে হয় যে পশ্চিম বঙ্গের পার্বত্যাঞ্চল ভেঙ্গে আলাদা একটা রাজ্য বানানোর সম্ভাবনা বেশ প্রবল। এই ভাঙ্গনের প্রভাব কাটানোর একটা উপায় হতেই পারে বাঙ্গালী সংস্কৃতি ও কৃষ্টির গৌরবময় ঐতিহ্যকে সামনে রেখে ও তার ওপর নির্ভর করে প্রদেশের সমস্ত বাসিন্দাদের ঐক্যবধ্য করা। কেন জানিনা আমার (স্বাভাবকুটিল?) মনে ধারণা হোলো “উত্তর বঙ্গ উৎসবের” পেছনে এমন একটা গূঢ় অভিসন্ধি উদ্যোক্তাদের অবচেতন মনে রয়েছে। আমি যখন গরুমারা জাতীয় উদ্যানের পাশের শহর লাটাগুড়িতে থাকছিলাম, তখন ওই বহুপ্রতীক্ষিত বাৎসরিক উৎসবের একটি অংশ ওখানে মঞ্চস্থ করা হচ্ছিল। একটি বিশাল প্যাণ্ডেল খাটানো হয়েছিল আমার হোটেলের সামনের রাস্তার ঠিক উল্টো দিকে। লাউড স্পীকারের সঠিক অবস্থানের কল্যাণে এক রাতে “সহজ মা”র গানের প্রোগ্রাম ঘর থেকে পুরোই শোনা গেল। পরদিন সন্ধ্যেবেলা আমি ও আমার স্ত্রী হেঁটে গেলাম কী প্রোগ্রাম তা অনুসন্ধান করতে। প্রায় সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দিনে ছিল নানান ধরণের গান (আধুনিক, রবীন্দ্রসঙ্গীত) ও অন্যান্য বিনোদনের ব্যবস্থা। আমরা যেদিন গেলাম, সেদিনের বড় আকর্ষণ ছিল উদ্ভট নামের বাংলা যাত্রা – “সিঁদুর কৌটোয় কাঁকড়াবিছে”। গিয়ে দেখি জায়গাটা লোকে লোকারণ্য; টারপলিনে ঢাকা প্যাণ্ডেল উপচে পড়ে জনতা বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে। ভীড়ের একটা বড় অংশ মনে হল আদিবাসী মহিলাদের দল। দূরে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ যাত্রা দেখে বেরিয়ে আসলাম। আর মনে মনে ভাবলাম দ্বিতীয় বঙ্গভঙ্গ রোধে বাংলা যাত্রা বা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কি কার্যকরী হবে?
শেষ করার আগে আরেকটা কথা না বলে পারছি না। উত্তর বাংলায় ঘুরতে ঘুরতে আমার অনেক সময়েই মনে হচ্ছিল দেবেশ রায়ের “তিস্তা পারের বৃত্তান্ত”র কথা। আমি ঠিক বাঘারুর মত চা-বাগানের ভেতর দিয়ে হেঁটে গিয়ে গরুমারা জঙ্গলে মোষের বাথানে অবশ্যই যাইনি। কিন্তু চা-বাগানের পাশ দিয়ে যেতে যেতে বা গরুমারা জঙ্গলের প্রান্তে পোষ্যপ্রাণী চড়তে দেখে তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্তর কথা অনেক সময়েই মনে পড়েছে। ভেবেছি ও তারিফ করেছি দেবেশ রায়ের অসাধারণ খুঁটিনাটি দেখার ও বর্ণনা করার ক্ষমতা। এমন কি লাটাগুড়িতে উত্তর বঙ্গ উৎসবে যাত্রা দেখতে গিয়ে মনে পড়ে গেছে অতীতে একই উপলক্ষে দেবেশ রায়ের শ্রীদেবীর নাচের বর্ণনা। শীতকালে তিস্তা বা তোর্সার সেরকম জলের স্রোত দেখিনি – বন্যায় গ্রামকে গ্রাম ডুবে যাওয়া তো দূরের কথা। দেবেশ বাবুর নভেল শেষ হয়েছে তিস্তার ব্যারেজের বর্ণনা দিয়ে, যার লক্ষ্য জলপাইগুড়ি অঞ্চলকে গত ষাট বা সত্তর দশকের মহাপ্লাবনের পুনরাবৃত্তি থেকে বাঁচানো। সেটা কতদূর কার্যকর হয়েছে জানার জন্য বর্ষাকালে আবার উত্তর বঙ্গে ফিরে যাবার ইচ্ছে রইলো।

দীঘা ডাকছে হাতছানি দিয়ে



অতি সম্প্রতি ‘হুদহুদ’ আঘাত হানার দিন(১২-১০-১৪) আমার সিডিউল ছিল পশ্চিমবঙ্গের পুর্ব মেদিনীপুর জেলার দীঘা সমুদ্রতটে কিছু সময় কাটানো।জরুরী বার্তায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় যাত্রা একদিন পিছিয়ে দিলাম।দার্জিলিং যেমন পাহাড় পর্বত, চা-বাগান আর পাহাড়ি দৃশ্য তেমনি পশ্চিমবাংলার ঠিক বিপরীত প্রান্তে দীঘা হচ্ছে সমুদ্র সৈ্কত ও সমুদ্রতটের নৈসর্গিক দৃশ্য।

দীঘা হচ্ছে ভারতের অন্যতম স্বাস্থ্যকর ও সমুদ্রসৈ্কত।পশ্চিমবাংলার শ্রেষ্ঠতম সমুদ্র সৈকত। বড় বড় ঢেউ আর প্রচন্ড গর্জন মনকে করে দোলায়িত। আর সুর্যাস্তের অপুর্ব দৃশ্য! মনে থাকবে অনেকদিন।সমুদ্র সৈকত বরাবর ফুটপাত দিয়ে হেঁটে চলা ও সাগরের আছড়ে পড়া ঢেউ’র জলকণায় আপনাকে ভিজিয়ে দেবে।দারুণ রোমান্স সৃষ্টি হবে মনে!দীঘা’কে দু’টি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে। একটি ‘ওল্ড’ দীঘা। এখানে সমুদ্রের বড় বড় ঢেউ ও গর্জন অনেক বেশি। এটাই আসল দীঘা। এখানে গোসলের অনুমতি দেওয়া হয় না। অপেক্ষাকৃ্ত শান্ত হচ্ছে ‘নিউ দীঘা’। এখানে মাঝে মধ্যে গোসলের অনুমতি দেওয়া হয়।সাগরজলে গোসল করে অন্যরকম অনুভূতি জাগবে আপনার।

সৈকত বরাবর সারি সারি আবাসিক হোটেল পরিবেশ নষ্ট করলেও এসব হোটেল থেকে সমুদ্রের অপুর্ব দৃশ্য উপভোগ করা যায়।হোটেলের পরিমান এতো বেশি যে ভরা মৌসুমেও আবাসিক সংকট দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা একেবারে নেই বললেই চলে। দীঘা’র পাশেই মন্দারমণি সমুদ্র সৈকত। তার পাশেই তাজপুর, জুনপুট, উদয়পুর,শংকরপুর সৈকত।আরো আছে দীঘা-ওড়িশ্যা বর্ডার পেরিয়ে তালসারি সৈ্কত। এ সমুদ্র সৈ্কতগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো এই যে, যে কোন এক সৈ্কতে অবস্থান করে(রাত যাপন) সবগুলো সৈকত উপভগ করা যায়।ভাড়া ট্যাক্সি পাওয়া যায় প্রচুর।

ওল্ড দীঘা’র মেরিন অ্যাকোয়ারিয়ামে জীবন্ত সাগর প্রাণী’র জগত।নিউ দীঘা’র সায়েন্স সেন্টারে সব শ্রেণি’র মানুষের বিজ্ঞান চর্চার উপকরন, তারামন্ডল। আছে অমরাবতী’র পার্ক ও তার পিছনের রাস্তায় নবনির্মিত টয় ট্রেনসহ ডিজনি পার্ক।‘অমরাবতী’র পার্কে বোটিং করা যায়।

নিউ দীঘা’র শেষ প্রান্তে উদয়পুর বিচের পাশেই বিরাট লজ ও ফুল বাগান দিয়ে সদ্য গড়ে উঠা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পর্যটন দপ্তরের টেন্টে রাত্রি যাপনের সুবর্ণ সুযোগ।তাঁবু প্রতি ভাড়া ৮০০/-।তাছাড়া সমগ্র দীঘায় বিভিন্ন মান ও দামের আবাসিক হোটেল রয়েছে।দীঘা স্টেশনের ‘রিটায়ারিং’ রুমে টিকেট দেখানো সাপেক্ষে অল্প খরচে রাত যাপন করতে পারেন।

হাওড়া থেকে এক্সপ্রেস ট্রেনে ৩ থেকে সাড়ে ৩ ঘন্টা সময় লাগে।এছাড়া হাওড়া বা ধর্মতলা থেকে সড়কপথে বিভিন্ন সরকারী-বেসরকারী এসি/ভলবো/সাধারন বাস সার্বক্ষনিক চলাচল করছে। সড়কপথে কোলকাতা থেকে দীঘা পৌঁছাতে সময় লাগে ৪ থেকে সাড়ে ৪ ঘন্টা।

বিস্তীর্ন ঝাউবন, ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি, ক্যাকটাস আর কাজুবাগানের আড়ালে উঁকি মারে সমুদ্র। মন্দারমনি আর তাজপুরের জলদা খালের মোহনা। দ’জায়গা থেকেই এই সুন্দর সঙ্গম দেখতে ভালো লাগে। নৌকায় চড়ে এপার-ওপার করা যায়।উপভোগ করা যায় লাল কাঁকড়াদের কর্মকান্ড।অতএব যাদের সময় আছে-চলুন না একটু দীঘা ও এর আশপাশের সমুদ্রটত থেকে!

আবু আফজাল মোহাঃ সালেহ
উপজেলা পল্লী উন্নয়ন অফিসার, উপজেলা পরিষদ চত্ত্বর, জীবননগর,চুয়াডাঙ্গা।
গ্রামঃ- মদনা, ডাকঘরঃ- দর্শনা, উপজেলাঃ-দামুরহুদা, জেলাঃ- চুয়াডাঙ্গা।
মোবাইল নঃ- ০১৯১৫৯৪৮৬২৩, ই-মেইলঃ-abuafzalsaleh@gmail.com

কোনার্কের সূর্যমন্দির



প্রধান সড়ক থেকে সূর্যমন্দিরে হাঁটার পথ। ৩০০ গজ হবে। মন্দিরের গেটে গিয়ে থামতে হল। টিকিট কাটতে হবে। জগদীশ দা টিকিট কাটলেন। মন্দিরে ঢুকতে চওড়া সড়ক। সড়কের দুই পাশে সবুজ পরিপাটি বাগান। এরপর মন্দিরে ঢোকার প্রধান গেট। সূর্যমন্দির। একসময় মন্দিরটি সমুদ্রের পাড়ে অবস্থিত ছিল। কথিত আছে, শ্রীকৃষ্ণর ছেলে শাম্ব এখানে সূর্য উপাসনা করে কুষ্ঠ রোগ থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। এ জন্যই এটির নাম সূর্যমন্দির। মন্দিরটি আন্তর্জাতিক বিশ্ব ঐতিহ্য প্রকল্প কর্তৃক প্রস্তুতকৃত ও ইউনেস্কো নিয়ন্ত্রিত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পূর্ব গঙ্গা রাজবংশের (১০৭৮-১৪৩৪) রাজা প্রথম নরসিংহদেব (১২৩৮-১২৬৪) দ্বারা নির্মিত। এক হাজার ২০০ শিল্পী ১২ বছরে এটির নির্মাণ কাজ শেষ করেন। পুরো মন্দিরটি পাথরের খাঁজ কেটে তৈরি করা হয়েছে। কারুশিল্পের চমৎকার নিদর্শন এই মন্দির। না দেখলে বোঝার উপায় নেই কারুকার্যের নিদর্শন এরূপ হতে পারে। মন্দিরটির উচ্চতা ২২৮ ফুট। মন্দিরের কারুকার্যে তিন রকমের সূর্যদেবতা রয়েছে। দক্ষিণ পাশের সূর্যদেবতাকে ‘উদিত সূর্য’, যার উচ্চতা ৮.৩ ফুট, পশ্চিম দিকের সূর্যদেবকে ‘মধ্যাহ্ন সূর্য’, যার উচ্চতা ৯.৬ ফুট এবং উত্তর দিকের সূর্যদেবকে ‘অস্ত সূর্য’, যার উচ্চতা ১১.৫ ফুট, আখ্যায়িত করা হয়েছে।
পুরো সুর্যমন্দিরটি একটি রথের মতো। এটি তৈরি করা হয়েছিল সূর্যদেবের পুজোর জন্য। মন্দিরে আছে ২৪টি চাকা। প্রতি চাকায় আটটি খাডি। একেকটি চাকার ব্যাস ৯.৯ ফুট।
মন্দিরের দক্ষিণ দিকের কারুকার্যে খচিত রয়েছে দুটি যোদ্ধা ঘোড়া। প্রতিটি দৈর্ঘ্যে ১০ ফুট ও প্রস্থে ৭ ফুট। পূর্ব দিকে মন্দিরে প্রবেশের মুখে দুই পাশে দুটি ঐশ্বর্যপূর্ণ সিংহ দুটি হাতির ওপর চেপে আছে। প্রতিটি সিংহ ও হাতির মূর্তি একটি পাথরের তৈরি। এটি দৈর্ঘ্যে ৮.৪, প্রস্থে ৪.৯ এবং উচ্চতায় ৯.২ ফুট। প্রতিটি সিংহ  ও হাতির ওজন ২৭.৪৮ টন। এটি মন্দিরের প্রধান গেট। এ ছাড়া মন্দিদের গায়ে অসংখ্য দেবদেবীর কারুকার্য শোভিত। প্রত্যেক দেবদেবীর রয়েছে নিজস্ব ইতিহাস। তবে অধিকাংশ দেবদেবীর ক্ষয়িষ্ণু অবয়ব। আগের সেই দেহবল্লরি যেমন শোভা পাচ্ছে না, তেমনি হাত-পা ভেঙে মন্দিরটি প্রতিনিয়ত ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ঐতিহ্যের ক্ষয়িষ্ণু নির্মাণ দর্শন করছে পর্যটকরা। যা হোক, মন্দির পরিদর্শন শেষে বেরিয়ে আসতে ইচ্ছে করে না। বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। মন্দিরের শিল্পকর্ম নিয়ে যে কোন শিল্পপ্রেমীর মন ভাবনার অতলে ডুবে যাবে বারবার। তবুও সূর্যমন্দির থেকে একসময় বেরিয়ে আসতে হল। 

মোগল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র সুবাদার শাহ সুজার আমলের হোসেনী দালান

তপু রায়হান

হোসনী দালান পুরানো ঢাকায় অবস্থিত শিয়া সম্প্রদায়ের একটি ইমারত। বাংলায় নির্মিত মোগল শাসনামলের দর্শনীয় স্থাপনার মধ্যে ঢাকার হোসেনী দালান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য নিয়ে আজও টিকে রয়েছে। দালানটি মূলত একটি স্মৃতিসৌধ। হজরত ইমাম হোসেন (রা.) এর স্মৃতির উদ্দেশ্যে এটি নির্মিত হওয়ার কারণে এর নামকরণও হয়েছে তারই নামানুসারে অর্থাৎ হোসেনী দালান। হোসেনী দালানটি নির্মিত হয় মোগল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র বাংলার সুবাদার শাহ সুজার আমলে। শাহ সুজা ছিলেন শিয়া মতাবলম্বী শাসক। তিনি যখন সুবাদার হয়ে বাংলায় আগমন করেন, তখন তার সঙ্গে করে তিন শতাধিক শিয়া অনুচর ও তাদের পরিবার এদেশে নিয়ে আসেন। শাহ সুজার নৌবাহিনী প্রধান-শিয়া মতাবলম্বী অনুচর সৈয়দ মীর মুরাদ এই হোসেনী দালান তৈরি করেন।
কথিত রয়েছে, সৈয়দ মীর মুরাদ এক রাতে স্বপ্নে দেখতে পান, কারবালার যুদ্ধের স্মৃতির উদ্দেশ্যে একটি স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করছেন এবং স্বপ্নে মীর মুরাদকেও অনুরূপ একটি দালান নির্মাণের নির্দেশ দিচ্ছেন। স্বপ্নে নির্দেশ লাভ করে মীর মুরাদ ১৬৪২ খিস্ট্রাব্দ নাগাদ হোসেনী দালানটি নির্মাণ করেন। বাংলায় মোগল নির্মিত অন্য সব স্থাপনার মতো এটিও মোগল স্থাপত্য রীতি-নীতি অনুসারে নির্মিত হয়। ঢাকার নায়েব নাজিমগণ শিয়া মতাবলম্বী হওয়ার কারণে দীর্ঘদিন তারাই হোসেনী দালানটির মুতাওয়াল্লী ছিলেন।
দালানের দুই দিকে রয়েছে দুইটি মিনার, দক্ষিণ দিক ঘেঁষে বিশাল পুকুর আর উত্তর দিকে প্রশস্ত মাঠের পর বিশাল গেটওয়ে। ভবনটি দ্বিতল আকৃতি বিশিষ্ট। নিচে রয়েছে কবরখানা। দ্বিতীয় তলায় রয়েছে জরিখানা, হুক্কাখানা, নিশিত খাঁ নামের তিনটি কক্ষ। হোসেনী দালানটি নির্মাণের পর এখান থেকে বিভিন্ন উৎসবে জাঁকজমকপূর্ণ ও সজ্জিত মিছিল বের হতো। এছাড়া রয়েছে নহবতখানা, যেখানে প্রতিটি চাঁদ দেখার রাত থেকেই শুরু হতো নহবত বাজানো।

ত্রিপুরা


সুদীপ্ত দাস
ত্রিপুরায় বেড়াতে গেলে খুঁজে পাবেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অনেক ইতিহাস। ত্রিপুরার বিভিন্ন জায়গাতেই গড়ে উঠেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের বেশিরভাগ প্রশিক্ষণ ক্যাম্প। যার মধ্যে সবচেয়ে বড়টি ছিল মেলাঘরে।
তবে শুধু ইতিহাস অনুসন্ধান নয়, ত্রিপুরার সৌন্দর্যও পর্যটকদের কাছে টানে। ভারতের দ্বিতীয় ক্ষুদ্রতম রাজ্য ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা। পরিবেশ-প্রকৃতি বাংলাদেশের সমতলভূমির মতোই, তবে আরেকটু ভেতরে ঢুকলেই গহিন অরণ্য। আছে ছোট ছোট পাহাড়, বিচিত্র জীবনধারার পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। গহিন বনে তৈরি হয়েছে ইকোপার্ক। রাজধানীর কাছেই আছে লেকের মাঝখানে মহারাজাদের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ। আরেকটু দূরে গেলে দেখা যাবে পাহাড়ের গায়ে পাথর কেটে তৈরি করা দেবীমূর্তি। ‘চির বসন্তকাল’ পাওয়া যাবে আরও দূরের জাম্পুই পাহাড়ে।
ঢাকা থেকে আগরতলার দূরত্ব মাত্র ৯০ কিলোমিটার। যাতায়াতও খুব সহজ এবং সস্তা। ট্রেনে বা বাসে চেপে প্রথমে আখাউড়া যেতে হবে।  আখাউড়া নেমে স্কুটার বা রিকশা নিয়ে চলে যাবেন আখাউড়া স্থলবন্দর। ইমিগ্রেশন-কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা সেরে আবারও রিকশা নিয়ে মাত্র ২ থেকে ৩ কিলোমিটার দূরেই আগরতলা। ঢাকা থেকে আগরতলা সরাসরি বিআরটিসির বাসও চলে, তবে তা প্রায়ই বন্ধ থাকে। সব মিলিয়ে সকাল ৭টায় রওনা দিলে সকাল ১১টার মধ্যেই আগরতলা পৌঁছে যাবেন।
হোটেলে উঠে দুপুরের খাবার আর কিছুক্ষণ দিবানিদ্রার পর বিকেলে বের হয়ে পড়ুন আগরতলা শহর দেখতে। অবশ্যই দেখতে যাবেন অতীতের মহারাজাদের উজ্জয়নী প্রাসাদ, যা এখন বিধানসভা ভবন। শহরের উত্তরে নেহরু পার্কে কাটিয়ে আসতে পারেন কিছুক্ষণ। আবার দক্ষিণে ফুল আর সবুজে ছাওয়া রবীন্দ্র কাননে গিয়ে দেখে আসতে পারেন পুতুলনাচ।
পরদিন সকালে শহর থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে রুদ্রসাগর লেকে নীরমহল প্রাসাদ দেখার পালা। শহর থেকে বাসেই যেতে পারবেন। নৌকায় লেক পাড়ি দিয়ে মাঝখানের প্রাসাদে যেতে হবে। মুঘল আর হিন্দু স্থাপত্যকলায় নির্মিত এক অনুপম সুন্দর এই প্রাসাদ। নীরমহল প্রাসাদ দেখে চলে যাবেন সেখান থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরের মেলাঘরে।
মেলাঘর থেকে ফিরে এসে সেদিনকার বিকেলটাও আগরতলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরে কাটিয়ে দিন। পরদিন সকালে চলে যাবেন ‘চির বসন্তকালের জাম্পুই পাহাড়ে। জায়গাটা আগরতলা থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে, মিজোরাম সীমান্তের কাছে। মেঘের সঙ্গে কোলাকুলি করতে করতে পৌঁছে যাবেন প্রায় ৩ হাজার ফুট উঁচু এই পাহাড়ে। পথে চারদিকে পড়বে কমলালেবুর গাছ।
জাম্পুই পাহাড়ের বৈশিষ্ট্য এর আবহাওয়া। সারা বছরই প্রায় বসন্তকালীন তাপমাত্রা, শীত-গ্রীষ্মের পার্থক্য খুব বেশি নয়। গ্রীষ্মে শুধু বৃষ্টি আর মেঘ। এই পাহাড়ে মূলত লুসাই উপজাতির বাস। জাম্পুই পাহাড়ে রাত কাটিয়ে আসতে পারেন, সেখানে আছে সরকারি মোটেল। স্থানীয় লুসাইদের কারও বাসাতেও থাকতে পারবেন ‘পেয়িং গেস্ট’ হয়ে।
আবারও আগরতলায় ফিরে এসে পরদিন প্রায় পৌনে দুইশ কিলোমিটার দূরের ঊনকুটি দেখতে যেতে পারেন। ট্রেনে বা বাসে কাইলাশহর জেলা সদর, সেখান থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের গায়ে পাথর খোদাই করে বানানো এই মন্দির। আগরতলা থেকে বেশি দূরে যেতে না চাইলে ২৫ কিলোমিটার দূরের সিপাহিজালা বন্যপ্রাণী অভয়াশ্রম দেখে আসতে পারেন। আরেকটু দূরে গোমতী অভয়ারণ্য। আর তৃষ্ণা অভয়ারণ্যের দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার।
ফেরার পথে আগরতলা থেকে সকালে রওনা দিলে দুপুরেই পৌঁছে যাবেন ঢাকা। 

দার্জিলিং যাবেন কিভাবে? কোনপথে?


এম খোরশেদ আলম
দেশ দেখে বেড়ানোটা আনন্দের। কিন্তু সেটা যদি হয় আর্থিক সঙ্গতির মধ্যে, তবেই তা সম্ভব। বিভিন্ন মানুষের দেশ দেখে বেড়ানো বিভিন্ন রকম। বিলাসবহুল জীবনযাপন যারা করেন তারা একটু আভিজাত্যের ছাপ রেখেই দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করে বেড়ান। কিন্তু সবার সঙ্গতি তো আর সমান নয়। আর সমান নয় বলেই কি দেশ-বিদেশ ভ্রমণ করা যাবে না?
যাবে। অবশ্যই যাবে। চারদিক থেকে নিজের আভিজাত্যকে একটু কাটছাঁট করে নিলেই তা সম্ভব। স্বল্প খরচে, অল্প আরামে মনটাকে মানিয়ে নিতে পারলেই আমাদের চোখের সামনে খুলে যাবে সৃষ্টির অনেক অজানা দুয়ার। আর সেই দুয়ার খুলেই চলুন চট করে বেড়িয়ে আসা যাক, হিমালয়ের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা ছবির মতো সুন্দর স্বপ্নপুরী দার্জিলিং থেকে।
কিভাবে যাবেন?
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিভোর নগরী পাহাড়ে ঘেরা অপূর্ব চিরহরিৎ ভূমির দার্জিলিংয়ে স্থলপথে রাজধানী ঢাকা থেকে সরাসরি দার্জিলিং যেতে চাইলে উত্তরবঙ্গের বুড়িমারি সীমান্ত অতিক্রম করে যাওয়াটাই সবচেয়ে সুবিধাজনক। ঢাকার গাবতলী থেকে প্রতিদিন অসংখ্য যাত্রীবাহী বাস চলাচল করে উত্তরবঙ্গের বুড়িমারী সীমান্তের উদ্দেশে। ঢাকার ভারতীয় দূতাবাস থেকে পাসপোর্টে নির্দিষ্ট সময়ের ভিসা নিয়ে রাত ১০টার সুপার সেলুন চেয়ার কোচে উঠে পড়–ন বুড়িমারী সীমান্তের উদ্দেশে। ভাড়া জনপ্রতি আর কত সামর্থের মধ্যেই। ভোর ৭টা নাগাদ আপনি অনায়াসে পৌঁছে যাবেন বুড়িমারী চেকপোস্টে। ইমিগ্রেশন অফিসের কাছেই সব বাস থামে। প্রাতঃরাশ সম্পন্ন করে ইমিগ্রেশনের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তির সঙ্গে সম্পন্ন করে নিন ভ্রমণ কর ও কাস্টমসের সব প্রক্রিয়া। অবশ্য আপনি চাইলে ঢাকা থেকেই ভ্রমণ কর প্রদান করে যেতে পারেন সোনালী ব্যাংকের যে কোন শাখায়। বুড়িমারী অতিক্রম করে ওপারে চ্যাংড়াবান্দা সীমান্তে পৌঁছে একইভাবে সম্পন্ন করে নিন আপনার ইমিগ্রেশন ও কাস্টমসের সব প্রক্রিয়া। ও ভালো কথা, আপনার বহনকৃত ইউএস ডলার চ্যাংড়াবান্দায় অবস্থিত সরকার অনুমোদিত ডিলারদের কাছ থেকেই ভারতীয় মুদ্রায় পরিবর্তন করে নেবেন। অন্যথায় পরবর্তী সময়ে টাকা ভাঙাতে আপনাকে বেশ বেগ পেতে হবে।
চ্যাংড়াবান্দা থেকে সরাসরি ময়নাগুড়ির বাস ধরে দেড় ঘণ্টায় পৌঁছে যাবেন শীর্ষেন্দু-সমরেশের উপন্যাসখ্যাত শিলিগুড়ি জিপ স্টেশনে। ভাড়া জনপ্রতি ৭০ ভারতীয় রুপি। সেখান থেকে ঝটপট ১২০ ভারতীয় রুপির বিনিময়ে সংগ্রহ করে নিন দার্জিলিংগামী কমান্ডার জিপের টিকিট। হাতে শীতের পোশাক নিয়ে বসে পড়–ন আপনার নির্ধারিত আসনে। ব্যস, মাত্র আড়াই ঘণ্টায় আপনি পৌঁছে যাবেন মেঘের দেশ স্বপ্নিল ভুবনের দার্জিলিংয়ে।
তাছাড়া কলকাতা থেকে যেতে চাইলে আপনাকে শিয়ালদহ রেলওয়ে স্টেশন থেকে সন্ধ্যা ৭টা ১৫ মিনিটের দার্জিলিং মেল ধরতে হবে। টিকিট সংগ্রহ করবেন ট্যুরিস্টদের জন্য নির্ধারিত কাউন্টার ফেয়ারলি প্যালেস থেকে। অতঃপর প্রায় ৫৭৬ কিলোমিটার অর্থাৎ ১৪ ঘণ্টার এক ট্রেন ভ্রমণ করে পরদিন সকাল ১০টা নাগাদ নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে পৌঁছে যাবেন। স্টেশন থেকে প্রাতঃরাশ সম্পন্ন করে রিকশাযোগে চলে আসুন শিলিগুড়ি জিপ স্টেশনে। ১০-১২ রুপি ভাড়া পড়বে।  সেখান থেকে ওই কমান্ডার জিপে চড়ে পৌঁছে যেতে পারেন স্বপ্নপুরী দার্জিলিংয়ে।

কোথায় থাকবেন?
পুঞ্জীভূত মেঘের কণা ভেদ করে আঁকাবাঁকা পথের ধারে পুরো দার্জিলিং শহরে রয়েছে অসংখ্য আবাসিক হোটেল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হোটেলে প্রতিদিনের থাকা এবং খাওয়াসহ জনপ্রতি ভাড়া প্রায় ৮৫০-১২০০ রুপি করে। প্রায় প্রতিটি হোটেলেই রয়েছে দর্শনীয় স্থানসমূহ ঘুরে বেড়ানোর জন্য আকর্ষণীয় জিপ, সার্বক্ষণিক গরম পানির ব্যবস্থা, ঠাণ্ডা প্রতিরোধে ওষুধসহ যে কোন মুহূর্তে যে কোন সমস্যার তাৎক্ষণিক সেবা।
খাবার-দাবার
ট্যুরিস্টদের জন্য হোটেলগুলোতে সব ধরনের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। ফলে পুষ্টিকর ও রুচিসম্মত খাবার নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু নেই। বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর অসংখ্য ট্যুরিস্টের আগমনের ফলে এখানকার হোটেল মালিকরা বাংলাদেশীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থায় একেবারে বাঙালি রুচিসম্মত খাবার-দাবারের জোগান দিয়ে থাকেন। ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ এবং ডিনার ছাড়াও হোটেল কর্তৃপক্ষ ভোরবেলায় বেড-টি এবং ডিনারের আগে ইভনিং-টি’র ব্যবস্থাও করে থাকেন।
কোথায় বেড়াবেন?
ছোট বড় মিলিয়ে বেড়ানোর জন্য প্রায় ১৭টি আকর্ষণীয় স্থান রয়েছে দার্জিলিং জুড়ে। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত রেলওয়ে স্টেশন ‘ঘুম’ ছাড়াও আরও যেসব দর্শনীয় স্থান দেখে আপনার আনন্দময় অভিজ্ঞতা অর্জিত হবে তা হচ্ছে;
সমুদ্র-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১০,০০০ ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়া থেকে অপূর্ব  সুন্দর সূর্যোদয় দেখা। পৃথিবীর বিখ্যাত প্রার্থনা-স্থান ঘুম মোনাস্ট্রি। ছবির মতো অপূর্ব সুন্দর স্মৃতিসৌধ বাতাসিয়া লুপ বিলুপ্ত-প্রায় পাহাড়ি বাঘ Snow Lupard খ্যাত দার্জিলিং চিড়িয়াখানা। পাহাড়ে অভিযান শিক্ষাকেন্দ্র  ‘হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট’।
সর্বপ্রথম এভারেস্ট বিজয়ী তেনজিং-রক- এর স্মৃতিস্তম্ভ। কেবল কারে করে প্রায় ১৬ কিলোমিটার এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে ভ্রমণ।
হ্যাপি ভ্যালি টি গার্ডেনে বসে তাৎক্ষণিকভাবে পৃথিবীখ্যাত ব্ল্যাক টি পানের অপূর্ব অভিজ্ঞতা।
যুদ্ধবিধ্বস্ত শরণার্থী কেন্দ্র  তিব্বতিয়ান সেলফ হেলপ্ সেন্টার। সমুদ্র-পৃষ্ঠ থেকে প্রায়  ৮,০০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত মনোরম খেলাধুলার স্থান দার্জিলিং গোরখা স্টেডিয়াম।
নেপালি জাতির স্বাক্ষর বহনকারী দার্জিলিং মিউজিয়াম। পৃথিবীর বিখ্যাত বৌদ্ধ বিহার জাপানিজ টেম্পল ব্রিটিশ আমলের সরকারি নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র  কাউন্সিল হাউস ‘লাল কুঠির’ অসাধারণ শৈল্পিক নিদর্শন খ্যাত ‘আভা আর্ট গ্যালারি’। শতবর্ষের প্রাচীন মন্দির ‘দিরদাহাম টেম্পল’। এসব নিদর্শন ছাড়াও আপনার মনের চিরহরিৎ জগতকে শুধু আনন্দময় নয়, এক নতুন জীবনের যাত্রা শুরু করাতে চলে যেতে পারেন পাথর কেটে তৈরি ‘রক গার্ডেন’ এবং গঙ্গামায়া পার্কে উপরোল্লিখিত দর্শনীয় স্থানগুলো ছাড়াও আপনার হদয় গহিন থেকে রোমাঞ্চিত করবে মহান সৃষ্টিকর্তার বিশাল উপহার হিমালয় কন্যা ‘কাঞ্চন-জংঘা’, বিশুদ্ধ পানির অবিরাম ঝর্ণাধারা ‘ভিক্টোরিয়া ফলস্’ এবং মেঘের দেশে বসবাসরত এক সুসভ্য জাতির সংস্কৃতি।
কেনাকাটা
দার্জিলিং শহরের লাডেন-লা রোডের কোল ঘেঁষে রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় মার্কেট। দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহার্য প্রায় সব জিনিসই আপনি পেয়ে যাবেন আপনার ক্রয়- ক্ষমতার মধ্যে। সবচেয়ে ভালো পাবেন শীতের পোশাক। হাতমোজা, কানটুপি, মাফলার, সোয়েটারসহ যে কোন প্রকারের লেদার জ্যাকেট পেয়ে যাবেন আপনার পছন্দমতো মূল্যে। তাছাড়া ১০০ থেকে ৫০০ রুপির মধ্যে পেয়ে যাবেন অসাধারণ কাজ করা নেপালি শাল এবং শাড়ি যা আপনার পছন্দ হতে বাধ্য। প্রিয়জনকে উপহার দিতে সর্বনিু ২০ রুপি থেকে ২৫০ রুপির মধ্যে পেয়ে যাবেন বিভিন্ন অ্যান্টিক্স ও নানাবিধ গিফট আইটেম, যা আপনার প্রিয়জনের ভালোবাসা কেড়ে নিতে সক্ষম। তাছাড়া আকর্ষণীয় লেদার সু আর বাহারি সানগ্লাস তো আছেই। কেনাকাটা করতে গিয়ে প্রতারিত হওয়ার আশংকা একেবারেই নেই। তবে হোটেলগুলোতে কিছু নেপালি তরুণ-তরুণী ভ্রাম্যমাণ ফেরি করে শাল, শাড়ি বিক্রয় করে থাকে। তাদের কাছ থেকে না কেনাটাই উত্তম।
ঝুঁকি
মানুষের জীবনটাই একটা বড় ঝুঁকি। তার পরেও সাবধানতা অবলম্বন করে ঝুঁকি এড়িয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে বেঁচে থাকার প্রয়াস পেয়েছে মানুষ দীর্ঘকাল। দার্জিলিং ভ্রমণেও ছোটখাটো কিছু ঝুঁকি রয়েছে। মাঝে-মাঝেই পাহাড়ি অঞ্চলে  ছোটখাটো ধস নামে। তবে সেটা বেশি হয় বর্ষা মৌসুমে। শীত বা গরমে সে ঝুঁকিটা একেবারেই নেই। আর গরম জামাকাপড় ব্যবহারে অবহেলা না করলে ঠাণ্ডা লাগার ঝুঁকিটাও কমে যায় একেবারেই। তাছাড়া হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সবরকম বিষয়ে পরামর্শ করে চলাফেরা করলে স্থানীয় দালাল বা হারিয়ে যাওয়ার আশংকা থেকেও আপনি পেয়ে যাবেন পুরোপুরি মুক্তি।
মোট খরচ
স্বল্প খরচে, অল্প আরামে মনটাকে মানিয়ে নিতে পারলে শীত মৌসুমে মাত্র ১০,০০০ টাকার মধ্যেই আপনি সেরে নিতে পারেন স্বপ্নপুরী দার্জিলিং দেখার যাবতীয় কার্যক্রম। ভালো কথা, এ হিসাবটা শুধু  বুড়িমারী সীমান্ত পথের। কলকাতার শিয়ালদহ হয়ে গেলে এ হিসাব বেড়ে দাঁড়াবে সর্বসাকুল্যে ১৫০০০ টাকায়। আমাদের দেশে রয়েছে অসংখ্য ট্যুরিজম কোম্পানি, যারা দার্জিলিংসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্যাকেজ ট্যুরের আয়োজন করে থাকে।
আশপাশে
দার্জিলিং শহর থেকে কিছুটা দূরে নেপাল শহরের নিকটবর্তীতে অবস্থান করছে মিরিক লেক ও পশুপতি মার্কেট। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৫টার মধ্যে জনপ্রতি ৪৫০ রুপি ভাড়ার মধ্যে আকর্ষণীয় জিপে ঘুরে আসতে পারেন। সেজন্য অবশ্য আরও একটি দিন বেশি অতিবাহিত করতে হবে দার্জিলিং শহরে। তবুও যাত্রার দিন থেকে নিয়ে সর্বমোট ৫ দিনেই সবকিছু ঘুরে-ফিরে আসতে পারবেন আপনার প্রিয়জনদের মাঝে অপূর্ব স্বপ্নিল অভিজ্ঞতা নিয়ে।
MAIN LINK